হালিমা ম্যাম এক গভীর অনুপ্রেরণার নাম হিসেবে চির অম্লান থাকবে

তখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্রী৷ স্কুল গন্ডির সীমানা পার করে বাইরের প্রসারিত জগতের নতুন সবুজের হাতছানি। এক বছর পরেই মাধ্যমিক। ঘরের পড়ার টেবিলের কাছ ঘেঁসে থাকা জানালার ওপারে দাঁড়ানো প্রকাণ্ড আম গাছের মাথার ওপর থেকে সূর্যটা যখন রোজ টুপ করে ঝরে পড়ত তখুনি মনে হত পরীক্ষা বলে ভয়ানক সেই দিনক্ষণ এক লাফে আরও একটু সামনে এগিয়ে এল। ফরফর করতে থাকা ফ্যানের বাতাসও গায়ে ছুটে যাওয়া কালঘামের স্রোত থামাতে পারত না। তা পড়ার তোড়জোড়ে বাসায় মায়ের বকুনি তো ছিলই তার সঙ্গে সখ্য গড়ে নিয়েছিল স্কুলের বায়োলজি ম্যামের জুজুর ভয়৷ জুজুর আতঙ্ক বলছি এজন্য যে আমাদের এই শিক্ষক তাঁর কড়া শাসনের জন্য গোটা বিদ্যালয়ে এক ত্রাসের নামই লিখে নিয়েছিলেন। বাপ রে! কোনো মতে যদি পেটের বিদ্যে ঠোঁট অবধি আসতে হোঁচট খেত তো তাহলেই হলো। কোনো মতেই রক্ষে ছিল না। সোজা চপেটাঘাত গিয়ে পড়ত নরম নরম গালে। আর ফলাফল টমেটোর মতো টুকটুকে লাল প্রসাধন আর ক্লাস শেসে সহপাঠীদের টিটকেরি৷ কী বিড়ম্বনা ভাবুন তো! এর থেকে নিস্তার লাভ কলম্বাসের আমেরিকা জয়ের থেকে কোন অংশে কম ছিল না।

তা সে ম্যামের চল্লিশ মণ চড়ের ভয়েই হোক আর সে হোক বন্ধুদের ইয়ার্কির হাত থেকে রেহাই পাওয়া, এসব হতে নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে অন্য যে পড়াই মিস হোক অন্তত জীববিজ্ঞান ক্লাসে পাঠ হজম না করে যেতাম না কেউই ৷ ক্লাসে কাটানো সেই পুরো এক ঘণ্টাকে মনে হত যেন পৃথিবী তার পুরো চব্বিশ ঘণ্টা অতি ধীর গতিতে প্রদক্ষিণ করে নিতে মত্ত থাকত৷ এসব কিছুর মাঝেও অবশ‍্য পিনপতন নীরবতা, ঠুসঠাস ছন্দ আর ফিসফিসানি হাসি সব মিলিয়ে সময়টা দারুণ থ্রিলও দিত বৈকি। ব্ল্যাক বোর্ডে আঁকা ব্যাঙের টিবিয়া ফিবুলাকে মনে হতো জাঁদরেল কোনো লাঠি ৷ তা এভাবেই দিনপাত হয়ে যেত। কিছুটা ভয়, কিছুটা হাসি এসব কিছুর মিশ্রণে ক্লাসটা সত্যি বলতে এক রকম উপভোগ্যও লাগত।

তা এমনি একদিনের কথা। রোজকার মতো সেদিন রুটিনে জীববিজ্ঞান ক্লাস রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে হাড় কাঁপানো পড়ার দাপট৷ সেদিন বাড়ির কাজ ছিল, কোষ বিভাজন। তা বাড়ি থেকে বলতে গেলে গোটা চ্যাপ্টার হেফজ করে এসেছিলেম। ক্লাসে ওগুলোই বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছিলাম নিজে নিজে। চোখ ছিল ম্যামের ওপর। ও হ্যাঁ। বলা হয়নি, ম্যাডামের নাম ছিল হালিমা খাতুন। ছোটখাটো গড়নের ছিপছিপে শরীর। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, পিঠ ছাপানো লম্বা বেনিতে ওনাকে এমনিতেই আরও রাগী দিদিমনির মতো দেখাত৷ যাকে বলে, বিশ্লেষণে বাড়তি প্রলেপ। চশমার আঁড় থেকে ছোট ছোট চোখে উনি যখন তাকাতেন তখন নির্ঘাত আমাদের হৃদপিণ্ডের ছন্দ পতন যে হতো এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই যেমন লিখতে গিয়ে হাঁটুর কাঁপুনি এখনো অনুভব করছি।

তা যা বলছিলাম, মূল কথা থেকে সরে যাচ্ছি৷ ওইদিন ক্লাসে ম্যামের পড়া নেবার সময় আমার চোখ কেবল ওনাকে অনুসরণ করে চলছিল। লক্ষ্য করছিলাম, আমার আর ওনার কক্ষপথের মাঝে দূরত্ব ঠিক কতটুকু। যথারীতি এর মাঝেই কজনা চটাচট আতিথিয়েতা হজম করে নিয়েছে। আর এমন করেই এক পা এক পা করে আমার পালাও চলে এল অবশেষে। বলতে বাধা নেই। গুটিগুটি পায়ে ওনার আগমন হৃদয়ে এক ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দিল।

—প্রো মেটাফেজ স্টেজটা বল।

ওনার প্রশ্ন শেষ হবার আগেই গড়গড় করে এক নিশ্বাসে পড়াটা বলে নিলাম। জানে পানি এল৷ যাক বাবা। অবশেষে রক্ষে। তবে আমার হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ম্যাম মিটমিট করে হেসে বললেন
—হুম। বেশ। ক্লাসে একটা এক্সট্রা লাইন বলেছিলাম। বিভাজনের শেষে ক্রেনোটিন তন্তু কী হয়…

বিষম খাই৷ এই যা। সেরেছে। এই শানে নুযুল কখন হলো? বাড়তি জ্ঞান কখন বিলানো হয়েছিল? কোন দুনিয়ায় ছিলাম তখন? মন চাচ্ছিল দাঁতে আঙুল কামড়ে নেই৷ হাড়ের ঠকঠকানি টের পাই। পায়ের হাঁটুর জোর কমে আসছিল। মাথা ঝিমঝিম করছিল। কোন মতে খসখসে গলায় বলি

—জি, বিভাজনের শেষে ক্রেনোটিন তন্তু…

কী মুশকিল! কী বলব এরপর। আমার দ্বিধা একটু সহজ করলেন উনি। মায়া হয়েছিল কী না, কে জানে?

—ক্রেনোটিন তন্তু বিভক্ত হয় না বিলুপ্ত হয়?

এই যাহ! অপশান দিয়েছে। ক্লু পাওয়া গেল। রাগী হলেও ওনার মনটা নরম আছে কিছুটা। যাক। ঢিল মারা যাক৷ দেখি কী আছে কপালে। আমতা আমতা করে বলি

—বিলুপ্ত হয়।

—তাই? ভ্রু কুঁচকে নিলেন মহাশয়া। ঢোঁক চাপি৷ শতরঞ্জির চাল ভুল করে হাতির জায়গায় ঘোড়া চেলে দিলাম কি? খসখসে গলায় বলি

—বিভক্ত হয়।

—কী বল? তাই?

বলি! একী জ্বালা! আমাকে নিয়ে মজা করছেন বুঝি। কী বলব বুঝে পাই না। ওদিকে চশমাসহ চার চোখ যে বিনবিনিয়ে দেখে যাচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছি। গোটা ক্লাসের শ্বাসও যে আমার ওপর আটকে তা আর নাই বা বললাম। মনে মনে পরওয়ারদিগারকে স্মরণ করি। দাঁত মুখ চেপে বলি

—বিভক্ত হয়।

আর সঙ্গে সঙ্গেই পিঠের ওপর দড়াম দড়াম দু্ই-চারটা আদর টের পাই। বোকা, বিলুপ্ত হয়। ক্লাসে কই থাক? পড়া কানে যায় না। বসো।

মৃদু ধমকে খানিক রসিকতার সাথে উনি পরের শিকারের দিকে এগিয়ে যান। বাপরে! এ যাত্রায় গাল দুটো রক্ষে পেল তাহলে। আলতো করে মুখে হাত বুলাই। ক্লাসের সবাই হেসে ফেলে৷ যোগ দেই নিজেও। মজার বিষয় কেন জানি না সেদিন থেকে হালিমা ম্যাম আমার খুব প্রিয় শিক্ষক হয়ে ওঠলেন। ভয় তো কাজ করতই তবে কোথায় যেন ওনার সঙ্গে স্নেহ শাসন আদর মাখা এক সম্পর্কের সেতু তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তারপর যে কতবার কত কারণে ওনার হাতের জোরসে কান মলা খেয়ে লাল কান নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। ব্যথায় লতি টনটন করে ওঠলেও সেই বেদনায় এক স্নেহ খুঁজে পেয়েছি। অনুভব করেছি এক পরম মমতা। সব সময় পড়া তৈরি করে যাওয়াতে তিনিও বেশ আদর করতেন আমাকে।

হ্যাঁ, এমন নয় যে, আমি খুব প্রথম সারির কোনো ছাত্রী ছিলাম। পড়ালেখায় বরাবরই মোটামুটি ধাঁচের ছিলাম। কখনো কোনো বিষয়ে হোঁচট খেলে এই রাগী খোলসে লুকোন মায়াবতী মানুষটা পরম ভালোবেসে বুকে আগলে নিতেন। আদর্শলিপি পাঁকড়ে দেয়ার মতোই পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি জীবনের পাঠ পড়াতেন। কেবল কাগজে কলমে নয় বরং মননে বড় হওয়াটা জরুরি। সেখানেই মানুষের প্রকৃত সাফল্য। এ কথাটা তিনি সব সময় বলতেন। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে মৌখিকে ওলট–পালট জবাবের জন্য যে কত বকা খেয়েছি তা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু সত্যি বলতে কী, প্রহসনগুলো কখনোই খারাপ লাগত বরং এক অভুত ভালো লাগা কাজ করত। এসএসসি পরীক্ষার সময়ে আমাদের নিয়ে ম্যামের সে কী উদ্বিগ্নতা! মজার ব্যাপার হলো বোর্ড প্রশ্নে কোষ বিভাজন ধাপের সেই প্রশ্নটি কমন পড়েছিল। আর এবারে কিন্তু ঠেকে যাইনি৷ পিঠে পড়া সেই চাপড়গুলো সপাটে কলমের তীক্ষ কালিতে আঁচড় কেটে নিয়েছিল খাতাতেও। হলে বসে উত্তর লেখার সময় সেই স্মৃতি মনে হতেই ঠোঁটের কোণে জেগেছিল মুচকি হাসি৷ সে কথাগুলো ভাবলে আজও চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

পরীক্ষার ফল বের হলো যথাসময়ে। স্কুলের সামনে টাঙানো বোর্ডের সামনে মধু মক্ষিকার মতো ভিড়। পাঁচটা লেটারসহ স্টার মার্ক পেয়েছিলাম। মিষ্টি হাতে, হাসি মুখে যেদিন ওনার পা ছুঁয়ে নিতে চেয়েছিলাম, সেদিন বুকে আগলে নিয়ে উনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন। গুরু শিষ্যের হৃদ-স্পন্দের উষ্ণতা যে কতখানি উত্তাপ ছড়ায় সেদিনই বুঝেছিলাম সত্যিকার অর্থে। সময় গড়ায়। গড়িয়ে যায় নিয়ম মতোই। চেনা গল্পে ধূলি জমে। চরিত্ররা জীবনের বালুকাবেলায় ফেলে যায় অনুভবের গভীর ছাপ৷ জলতরঙ্গের দোলায় তা মিলিয়ে যায় না বরং কোথায় যেন একটা চাপা কান্না হয়ে লুকিয়ে যায়। কালের রথে দৌড়ে চলে জীবন। আমারও তাই হলো। স্কুল পেরুলাম অবশেষে। ভর্তি প্রতিযোগিতার ডামাডোলে বদলে গেল জায়গা। তৈরি হলো নতুন উপন্যাসের সূচনা অধ্যায়। চিরচেনা আম গাছের ডালে তখন নতুন কচি পাতা৷

এরপর কলেজ। কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়। সেই গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের এই পর্যায়ে এসেও মনে হয় এখনো বুঝি নিজে সেই স্কুল ড্রেসেই বন্দী এক বালিকা। সব আছে আজ৷ মধু মাখানো সেই দিনের স্মৃতি। হাসি-আনন্দ। নেই কেবল আমার হালিমা ম্যাম। কঠিন অসুখের সঙ্গে লড়াই করে জীবন যুদ্ধে ক্ষান্ত দিতে হয়েছে তাঁকে। মৃত্যুর মতো কঠিন সত্যের কাছে মেনে নিতে হয়েছে পরাজয়। হালিমা ম্যাম আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর দেয়া অনুশাসন আর শিক্ষা। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, একথা বুঝি পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ জগতে তার দৈহিক উপস্থিতি না থাকলেও আত্মিক টানটা কেমন করে যেন এক মায়ার বেড়িতে বেঁধেই থাকে। হালিমা ম্যামের স্মৃতিও ঠিক এমনি এক আলাপ জাগিয়ে তোলে৷ অদৃশ্য কোনো মায়ায় এমন করেই তিনি আছেন। আজীবন এভাবেই রয়ে যাবেন আমাদের মাঝে এক গভীর অনুপ্রেরণা হয়ে। আমার জীবনে তিনি এক প্রিয় শিক্ষাগুরুর নাম। এক গভীর অনুভবের সমার্থক শব্দ।

আরও পড়ুন:
যে আমার জীবনের গল্পকে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন করেছেন
শাহানাজ পারভীন ম্যাম শিক্ষাগুরু ও জীবনের সেরা শিক্ষক
মনের আলোয় দেখেছি


সোনিয়া তাসনিম কথাসাহিত্যিক ও কবি

আরও পড়ুন