শাহানাজ পারভীন ম্যাম শিক্ষাগুরু ও জীবনের সেরা শিক্ষক

শিক্ষক দিবস কেবল একটি দিন নয়, এটি এমন এক উপলক্ষ, যেদিন আমরা থেমে গিয়ে স্মরণ করি তাঁদের, যাঁরা আমাদের অন্ধকার দূর করে আলো দেখিয়েছেন, যাঁদের স্নেহ, প্রজ্ঞা ও দিকনির্দেশনায় আমরা জীবনের পথে হাঁটতে শিখেছি। শিক্ষক মানেই শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দান নয়; একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীর ভেতরে জাগিয়ে তোলেন আত্মবিশ্বাস, সাহস, মানবিকতা ও স্বপ্নপূরণের অনুপ্রেরণা। আমার জীবনেও অনেক শিক্ষক এসেছেন, কিন্তু একজন আছেন যিনি আজীবন আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে অমর হয়ে থাকবেন। তিনি আমার জীবনের সেরা শিক্ষক, আমার শিক্ষাগুরু—শাহানাজ পারভীন ম্যাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়টা ছিল নতুন স্বপ্ন, নতুন শঙ্কা আর অচেনা পরিবেশের মিশ্রণে ভরা। তখনই প্রথম দুই সেমিস্টারে আমি পেয়েছিলাম শাহানাজ পারভীন ম্যামের ক্লাস। তাঁর পড়ানোর ধরন ছিল এমন, যেন তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাঠ নয়, আমাদের চিন্তা করার কৌশলও শিখিয়ে দিচ্ছেন। জটিল কোনো বিষয়কে তিনি এত সহজভাবে উপস্থাপন করতেন যে মনে হতো, জ্ঞানের দরজা আমাদের জন্য অনায়াসে উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাঁর ক্লাস নিছক লেকচার ছিল না, ছিল এক বৌদ্ধিক ভ্রমণ, যেখানে প্রতিটি প্রশ্ন আমাদের ভাবতে বাধ্য করত, উত্তর খুঁজতে উৎসাহিত করত।
তবে শাহানাজ পারভীন ম্যামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে খুঁজে বের করতে পারতেন। তিনি আমাকে শুধুমাত্র পড়াশোনার ক্ষেত্রেই নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি নাটকে তিনি আমাকে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছিলেন। আগে কখনও ভাবিনি যে আমি দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে এমন দায়িত্ব পালন করতে পারব। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ও উৎসাহ আমার আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি কেবল দর্শকদের হাততালি পাইনি, নিজের ভেতরের এক নতুন আমিকে আবিষ্কার করেছি। এই আবিষ্কারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাঁর।
শাহানাজ পারভীন ম্যাম আমাকে শিখিয়েছেন, পড়াশোনার বাইরে একজন শিক্ষার্থীর ভেতরে কত ধরনের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে। নাটকের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমি শিখেছি নেতৃত্ব কাকে বলে, দল নিয়ে কাজ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আর নিজের ভেতরের ভয় জয় করে দাঁড়িয়ে থাকা কত বড় এক সাফল্য।
তবে কষ্টের বিষয় হলো, মাত্র দুই সেমিস্টারের পর তিনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। খবরটা আমার কাছে ছিল হৃদয়বিদারক। মনে হয়েছিল, জীবনের এক আলোকবর্তিকা হঠাৎ দূরে সরে গেলেন। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক কখনো অনুপস্থিত হন না। তাঁর উপস্থিতি থাকে শিক্ষার্থীর অন্তরে, তাঁর শেখানো প্রতিটি পাঠে, প্রতিটি অনুপ্রেরণায়। আজও কোনো দ্বিধায় পড়লে মনে হয়, তিনি হয়তো বলতেন—“চেষ্টা করো, নিজের উপর বিশ্বাস রাখো।” সেই কথাই আমাকে আজও সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
শিক্ষক দিবস তাই আমার কাছে নিছক আনুষ্ঠানিক কোনো দিন নয়। এটি সেই দিন, যেদিন আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি শাহানাজ পারভীন ম্যামকে। তিনি শুধু আমার শিক্ষক নন, তিনি আমার জীবনের দিশারি, আমার অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর শেখানো শিক্ষা, তাঁর বিশ্বাস, আর তাঁর দেওয়া সাহস আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে চিরকাল।
আমি গর্বের সঙ্গে বলি—আমার জীবনের সেরা শিক্ষক, আমার শিক্ষাগুরু, তিনি শাহানাজ পারভীন ম্যাম। তাঁর মতো শিক্ষক খুব কমই জন্মান। শিক্ষক দিবসে তাঁকে জানাই অসীম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং হৃদয়ের গভীর কৃতজ্ঞতা।
ইনসাফ উদ্দিন মাহমুদ শিক্ষার্থী ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি
আমাদের কাছে আপনার প্রিয় শিক্ষাগুরুকে নিয়ে লিখুন
লেখা পাঠাবেন: boicharita@gmail.com
