ছয় চেয়ারের টেবিল

সুবর্ণা এখনো মনে করে—ইফতারের ঠিক আগের সেই অস্থির সময়গুলো। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরম তেলের গন্ধ, পেঁয়াজু ভাজার শব্দ, আর ডাইনিং টেবিলের চারপাশে জমে ওঠা অকারণ উত্তেজনা। তারা ছিল চার ভাইবোন, সঙ্গে তাদের আম্মু আর আব্বু—ছয়জনের ছোট্ট একটা সংসার। কিন্তু ইফতারের সময় সেই ছোট্ট সংসারটাই যেন ভরে উঠত এক অদ্ভুত প্রাণে।

ডাইনিং টেবিলটা ছিল ছয় চেয়ারের। একটাও চেয়ার ফাঁকা থাকত না।

আজানের আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত ছোটখাটো কাড়াকাড়ি। কে আগে শরবতের গ্লাস নেবে, কে বড় পিস পেঁয়াজু পেয়েছে—এইসব নিয়ে তর্ক, ঝগড়া, আবার সেই ঝগড়ার ভেতরেই হাসি।

সুবর্ণার আম্মু মাঝে মাঝে রাগ করতেন, কিন্তু আব্বু সবসময় হেসে বলতেন, ‘আজান হোক, তারপর না হয় কাড়াকাড়ি করিস।’ তবুও কেউ শুনত না। ক্ষুধার চেয়ে আনন্দটাই তখন বড় ছিল।

সেই সময়টাকে এখন ভাবলে সুবর্ণার মনে হয়—ওগুলো আসলে কোনো দিন ছিল না, একটা দৃশ্য ছিল, যা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে।

প্রথমে সে নিজেই চলে গেল। পড়াশোনার জন্য, নিজের জীবনের জন্য। যাওয়ার সময় মনে হয়েছিল—এই তো, আবার ফিরবে, সব আগের মতোই থাকবে। কিন্তু জীবন কখনো কোনো কিছু আগের মতো রেখে দেয় না। ফিরে এসে সুবর্ণা দেখল, টেবিলটা একই আছে, চেয়ারগুলোও আছে, কিন্তু বসার মানুষগুলো বদলে গেছে। এর মধ্যে আরও দুটি চেয়ার যোগ হলো, স্বর্ণলতার চেয়ার, রাকিবের চেয়ার।  

তারপর একে একে ভাইয়েরাও চলে গেল। কেউ অন্য শহরে, কেউ অন্য দেশে। বাড়িটা তখনো ছিল, আম্মু তখনো ছিলেন, কিন্তু সংসারটা যেন ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে বিভূইয়ে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছিল।

একসময় তাদের সবাইকে ‘অতিথি’ মনে হতে লাগল নিজের ঘরেই। মাঝেসাঝে তারা ঈদে আসে, কয়েকদিন থাকে, আবার চলে যায়। সুবর্ণার আম্মু আগের মতোই রান্না করেন, আগের মতোই অপেক্ষা করেন তার প্রিয় সন্তানদের জন্য, কিন্তু এখন আর প্রতিদিন সেই ছয়জনের টেবিল ভরে না।

এর মাঝেই একদিন এমন কিছু ঘটে গেল, যেটার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। সুবর্ণার আব্বু চলে গেলেন। চলে যাওয়ার ভেতরেও অনেক রকম আছে—কেউ যায় ফিরে আসার জন্য, কেউ যায় কিছুদিনের জন্য, আর কেউ যায় এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না। আব্বুর চলে যাওয়াটা ছিল শেষের ধরনের।

সেদিনের পর থেকে ছয় চেয়ারের টেবিলটা যেন আর কখনো পূর্ণ হয়নি। এখন ইফতারের সময় সুবর্ণা বসে তার ছেলেকে নিয়ে। পাশে ভাইয়া থাকে, সামনে আম্মু। চারজন মানুষ, ছয়টা চেয়ার। দুটো চেয়ার ফাঁকা পড়ে থাকে—চুপচাপ, নিরুত্তাপ।

মজার ব্যাপার হলো, এখন আর কোনো কাড়াকাড়ি নেই। শরবতের গ্লাস পড়ে থাকে, পেঁয়াজু ঠান্ডা হয়ে যায়, আলুর চপ অর্ধেক খাওয়া থাকে। কেউ তাড়াহুড়া করে না, কেউ ঝগড়া করে না।

আম্মু মাঝে মাঝে বলেন, ‘খাস না, এত কিছু বানালাম।’ সুবর্ণা খায়, কিন্তু খাওয়ার ভেতর সেই পুরোনো স্বাদটা আর পায় না। তখন বুঝতে পারে—খাবারের স্বাদ আসলে খাবারে না, মানুষের ভেতরে থাকে।

কখনো কখনো সে খালি চেয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, সেখানে কেউ বসে আছে—হয়তো আব্বু, হয়তো তার দুই ভাই, সেই ছোটবেলার তারা নিজেরাই। কিন্তু চোখ সরালেই বোঝা যায়—ওটা শুধু শূন্যতা।

তার ছেলে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এত খাবার পড়ে থাকে কেন?’ সুবর্ণা উত্তর দেয়নি। কারণ সে জানে, এই প্রশ্নের উত্তর কোনো শব্দে দেওয়া যায় না। এটা বোঝার জন্য সময় লাগে, হারানোর অভিজ্ঞতা লাগে।

ইফতার শেষ হলে সবাই উঠে যায়। টেবিলে কিছু খাবার পড়ে থাকে। দুটো চেয়ার খালি থাকে।

আর সুবর্ণা বুঝতে পারে—জীবন আসলে এমনই। একসময় সবাই একসঙ্গে বসে, তারপর একে একে উঠে যায়। কেউ দূরে চলে যায়, কেউ আরও দূরে।

শেষ পর্যন্ত টেবিলে যা থাকে—তা শুধু কিছু অবশিষ্ট খাবার না, কিছু চেয়ারের শূন্যতা না, বরং একটা সময়ের নীরবতা, যেখানে একদিন খুব শব্দ ছিল।

সুবর্ণা টেবিলের ওপর হাত রেখে চুপ করে থাকে। তার মনে হয়, এই টেবিলটা সব জানে—কারা ছিল, কারা নেই, আর কার আর কোনোদিন ফিরবে না। জীবন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। আর মানুষ বসে থাকে—সেই ফাঁকা জায়গাগুলোর পাশে।

জীবনটা আসলেই ‘গডফাদার’ এর ভিটো কর্লিওনের ডাইনিং টেবিলেত মতোন… সবাই চলে যায় আসলে। শুধু একা একা বসে থাকে মাইকেল…!

হাবীব ইমন : কলামলেখক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
ধূসর শরৎ
সময়ের সাহসী নায়ক প্রফেসর আবদুল জলিল
রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত : বাংলা চেতনার ত্রিকোণ
আম্মা, ও আম্মা
তুমিও আমার মতো হয়ে গ্যা্লে!
আড়ালে থাকা এক বিস্মরণ বিপ্লবীর কথা
কেমন হওয়া উচিত ছাত্ররাজনীতি
নূর হোসেনের গণতন্ত্র কি মুক্তি পেয়েছে?
কার নির্দেশে খালেদ, হুদা এবং হায়দারকে হত্যা করা হয়েছিল?

আরও পড়ুন