মনের আলোয় দেখেছি

‘দোলনা হতে কবর অবধি শিক্ষাকাল ’ শিক্ষারও রকমফের আছে। কিছু শিক্ষা প্রকৃতি প্রদত্ত, কোনো শিক্ষা অভিজ্ঞতালব্ধ, কোনো শিক্ষা অন্তর থেকে আসে, কোনো শিক্ষা গুরু প্রদত্ত।

আমাদের সময় ছোটদের জন্য প্রথমেই গৃহশিক্ষকের তেমন প্রয়োজন হত না। সরাসরি স্কুলে ভর্তি হয়েই শিক্ষকের দেখা পেতাম। আমরা নারী শিক্ষককে ম্যডাম নয় আপা বলতাম। মাতৃ জঠরের সম্পর্ক যুক্ত সম্পর্ক তৈরি হত তখনি।

প্রাথমিক বিদ্যালয় উচ্চবিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়ে প্রচুর শিক্ষকের সাহচর্য পেয়েছি তাদের কাছে আকন্ঠ ঋণ। প্রথম যেদিন প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক ভর্তি করিয়েছিলেন সফেদ পোশাকে তাকে মনে হয়েছিল অন্যগ্রহ থেকে আসা দেবদূত। তিনবছর পড়ার পরও তার নামটি জানা হয়নি, তিনি হেডস্যার নামেই মনে আছেন। তারপর টাঙ্গাইলে গেলাম, এক শান্ত শীতল ভোরে নেমে এসেছিল পৌষের নরম আরাম রোদ তেমনি সময় বিন্দু বাসিনী বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখায় ভর্তি করাতে নিয়ে গেলেন আব্বা। তাৎক্ষণিক ভর্তি পরীক্ষায় তিনি জানালেন তৃতীয় শ্রেণিতে নয় চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করাতে চান, আব্বা কতটা খুশি হলেন বুঝতে পারলাম না আত্মা খুলে খুশিতে নেচে ওঠেতে চাইলাম, স্যারের সামনে বলে হলো না, এখানে দুই বছর পড়ালেখার মাঝেও তার নাম জানা হলো না, তিনিও হেডস্যার হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে থাকলেন।

এখানে কত আপা স্যারের সাহচর্য পেলাম তবে শাহজাদী আপা, নিজের ছাত্রীত্ব শেষ করেই এলেন শিক্ষাকতা পেশায়। তাকে ঠিক শিক্ষক নয় অনেকটা পাড়ার বড় বোন মনে হত। আমরা যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি তখন তার বিয়ে হয়, আমরা বিয়েতে দাওয়াত পাই।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই বিন্দু বাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। আমরা যেবার ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই সেবারই স্কুলটা সরকারি হয়। কঠিন নিয়ম শৃঙ্খলা ছিল স্কুলে। যেমন লেখাপড়ায় তেমনি অন্যন্য বিষয়ে অগ্রগামী থাকতে। দেশ সেরা বিদ্যালয় বিন্দু বাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।
সরকারি স্কুল বিধায় শিক্ষক বদলি হয়েছে প্রচুর তাই ষষ্ঠশ্রেণি থেকে এসএসসি অবধি অনেক শিক্ষকের সাহচর্য পেয়েছি। আমাদের সময়ে আমরা প্রচুর বই পড়তাম সেলাই করতাম। কুরশি কাটার সেলাই বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। আমি কখনো সেলাইয়ে দক্ষ নই, তবুও বান্ধবীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তুলে নিলাম সাদা সূতোর গোটা কুরশি কাটা।আমরা টিফিনে মাঠের কোনায় বসে গল্প করতাম আর সেলাই করতাম।

মাকসুদা আপা আমাদের সবার ডিজাইন দেখলেন, আমার ডিজাইন পছন্দ করলেন। অবাক কাণ্ড আমাকেই দায়িত্ব দিলেন তাকে কুরশি কাটায় ডিজাইন তুলে টেবিল ক্লথ তৈরি করে দিতে হবে।
মহামুসকিল, আমারটাই বান্ধবীরা আমার মা হাতে হাতে তৈরি করে দেন আর সেই আমিই কিনা মাকসুদা আপাকে টেবিল ক্লথ তৈরি করে দেব। মনটা তেমনটা সায় না দিলেও ক্লাসের সবার সামনে আমার সম্মান বেড়ে যাওয়ার সিঁড়িটা আঁকড়ে ধরি। পরদিনই এক বাক্স সাদা সূতো দুটো কুরশ কাটা ধরিয়ে দেয়। খুশিতে বাসায় গিয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে কুরশি কাটায় সূতো দিয়ে ডিজাইন তুলতে থাকি। কাজের অগ্রগতিতে নিজেকে নিজেই ধন্যবাদ দেই। মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি তৈরি শেষ করে আপার কাছে হস্তান্তর করতে পারব। সেদিনটা মনে মনে কল্পনা করে পুলকিত হই। এর মধ্যে শুধু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। চলে যাই গ্রামে, ফিরে আসি মাস দুয়েক পর। স্কুলে যাই আরও পরে। ততদিনে কোথায় গেছে কুরশ কাটা কোথায় সাদা সূতোর বাক্স।

পরে ভেবেছি একবাক্স সূতো কিনে ফিরিয়ে দেই। কিন্তু বেয়াদবি হবে বলে ভাবনা থেকে ফিরে এসেছি। আপাও কখনো জিজ্ঞেস করেনি বিষয়টা। তিনিও ভেবেছেন আমি লজ্জা পাব কী না।
স্কুল ছাড়ারও বহু পরে এক উৎসবের দিন আপার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাই। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন, আমি লজ্জা পাব বলেই তিনি তখন জিজ্ঞেস করেনি। এমন বিচক্ষণ মাতৃস্নেহের শিক্ষক আজ বিরল। এখনকার স্যার ম্যাডামরা তাদের কাছে প্রাইভেট পড়ার জন্য নানারকমের চাপ সৃষ্টি করে, অথচ আমাদের অঙ্কের নজরুল স্যার স্কুল শুরু হওয়ার আগে আধঘণ্টা অঙ্ক করাতেন। আমি বরাবরই অঙ্কে কাঁচা ছিলাম। রওশন আপা ছিলেন তুখোড় অঙ্ক শিক্ষক। তার ক্লাসের একজন ছাত্রী অঙ্কে কাঁচা বিষয়টা তার জন্য অসম্মানজনক। তিনি আমাকে পনরদিন অঙ্ক করালেন এবং পাস নাম্বর তোলার টেকনিক শিখিয়ে দিলেন, বাসায় একজন অঙ্ক শিক্ষকও এলেন। এরা সবাই সম্মানের জায়গা ধরে রেখেছেন আজীবন। কলেজের বিরাট ভুবনে প্রচুর শিক্ষকের দেখা পেলাম।

আমীর খোশরু স্যার বাংলা পড়াতেন। সবে তরুণীদের কাছে তার বিষয় বিশ্লেষণ পড়ানোর ভঙ্গি দারুণ হলেও অন্যান স্যার ম্যাডামদের তিনি অতিক্রম করতে পারেননি ইংরেজির কাফি স্যার অর্থনীতির মোস্তফা ম্যম সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে এলেন নেলী বড়ুয়া। আপার শাড়ি পরার স্টাইল বাচনভঙ্গি রাস্ট্র বিজ্ঞানের সূত্র বুঝিয়ে দেয়া সবই যেন ভালো লাগত, হোস্টেল তার রুমে রাশিরাশি বই ক্লাস শেষে তার সাথে রাস্ট্র বিজ্ঞানের বাইরেও সাহিত্য সমাজ নারীর অগ্রগতি বিষয় আলোচনা মাথায় করে নিয়ে আসতাম।

তিনি খুলে দিচ্ছিলেন চোখের সামনে হালকা অন্ধকার। সামাজিক অনেক বিষয় নিয়ে তিনি কুমুদিনী কলেজে পুকুর ঘাটে বসে বলতেন আমরা শুনতে শুনতে উঁচু দেয়াল টপকে আমাদের দৃষ্টি কখনও গ্রামীণ নারী কখনও ইতিহাসের নারী কখনও বহিঃবিশ্বের জগত দেখতে পেতাম৷

আপার জ্ঞানের ভান্ডার উপচে পরা সূধা সঞ্চয় করতাম বুকের অতলে। কখনো আমরা বসে থাকতাম আপার অপেক্ষায় তিনি ক্লাস শেষ করে সামান্য বিশ্রাম শেষ হেঁটে আসতেন, ছোটখাট মানুষটার হাঁটার ভঙ্গি খুব চমৎকার। মনে হতো দৌড়ে গিয়ে কেলে তুলে নেই। কেমন করে আমার প্রিয় শিক্ষক হয়ে আজও আলো ছড়ান হৃদয়ে। বয়স হয়ে গেছে তার তবে গ্রন্থ সঙ্গ আঁকড়ে আছেন এখনো। আমার প্রিয় শিক্ষক নেলী বড়ুয়া।

রোকেয়া ইসলাম : চেয়ারম্যান, প্রশিকা; কবি ও লেখক

আরও পড়ুন