আমার মা আমার বড় শিক্ষক

আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম গাইড আর প্রথম প্রেরণা আমার মা। শুধু মা নন, তিনি ছিলেন আমার স্কুলের শিক্ষকও। সত্যি বলতে, ছোটবেলায় বুঝিনি কিন্তু আজ বুঝি—আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক, যিনি আমাকে শুধু অক্ষর চেনাননি, মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলেছেন, তিনি আমার মা।

আমার মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিক। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৩৭নং উত্তর রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি শেষে এখন অবসরে আছেন। এ স্কুলেই আমার পড়াশোনার শুরু। গ্রামের স্কুল, চারপাশে সবুজ গাছপালা, মাঠ আর দূর থেকে ভেসে আসত পাখির ডাক। আমরা বাড়ি থেকে ধান খেত আর এ বাড়ি-ও বাড়ির মাঝ দিয়ে স্কুলে আসতাম হেঁটে হেঁটে। আমাদের সময়ে স্কুলটা ছিল বাঁশের বেড়া দেওয়া, উপরে টিনের ছাউনি—তবুও সেখানে ছিল অগাধ ভালোবাসা আর শেখার আনন্দ। শিশুরা দৌড়ে আসত, হাতে বই, মুখে হাসি।  আর সবার মাঝে ছিলেন আমার মা—আমার গর্ব, আমার শিক্ষক।

আমার জন্মের আগেই মা শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। চাঁদপুর জেলার ঘড়িহানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো মায়ের প্রথম স্কুল যেখানে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। স্কুল ছিল আমাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে। সে সময়ে বাড়ি থেকে সে স্কুলে যাওয়ার খুব ভালো যানবাহন ছিলো না। কিন্তু তাতে মায়ের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। আমার জন্মের পর প্রতিদিন সকালে মা আমাকে কোলে করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। ক্লাস চলার সময় আমি বসতাম স্কুলের টেবিলের ওপরে। মা পড়াতেন ছাত্রদের, আর আমি তাকিয়ে থাকতাম মায়ের দিকে। এসবই শুনেছি পরে মায়ের কাছে। তখন বুঝতাম না, কিন্তু আজ বুঝি—সেই সময় থেকেই আমি শিখছিলাম জীবনের প্রথম পাঠ—দায়িত্ব, ধৈর্য আর ভালোবাসা।

চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৩৭নং উত্তর রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: লেখক

সময় গড়িয়ে গেল। পরে মা বদলি হয়ে আমাদের গ্রামের পাশের স্কুলে এলেন। তখন সেই স্কুলটাই হয়ে গেল আমাদের শিক্ষার আসল ঠিকানা। আমি আর আমার ছোট ভাই আছিব, দু’জনেরেই প্রাথমিক স্কুল শুরু হয় মায়ের স্কুলের মাধ্যমে। সে হিসেবেই আমার মা শুধু মা নন, আমাদের ক্লাসের শিক্ষকও হলেন।

মজার বিষয় হলো, সকালে মা আমাদের স্কুলে নিয়ে যেতেন শিক্ষক হিসেবে, বিকেলে স্কুল শেষে ফিরতেন মা হয়ে। স্কুলে তিনি ছিলেন সবার ম্যাডাম, কিন্তু ঘরে ফিরেই হয়ে যেতেন আমাদের মা—যিনি আমাদের হাত ধরে লিখতে শেখাতেন, গল্প শোনাতেন আবার মাঝে মাঝে বকাও দিতেন। মা-ই ছিলেন আমাদের প্রথম স্কুলের শিক্ষক, আবার ঘরের বাইরের জীবন শিক্ষারও একমাত্র গুরু। চাকরির সুবাদে আমার বাবা শরীফুল আলম চৌধুরী ছিলেন প্রবাসে। যার ফলে স্কুল কিংবা ঘর সব জায়গাতেই ছিলো মায়ের বিশেষ অবদান।

গ্রামের স্কুলগুলোর পরিবেশটাই ছিল আলাদা। চারদিকে কাঁঠাল, আম, জাম, সুপারিগাছ ঘেরা সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাতাসে ছিল মাটির গন্ধ আর শিশুদের নির্মল হাসি। মাঠের ধারে বাঁশের বেড়া ঘেরা স্কুল ভবনটিতে সকালে সূর্যের আলো পড়লে ঝলমল করত টিনের ছাউনি। ছোট্ট খেলার মাঠে আমরা দৌড়াতাম, মাটি লেগে যেত পায়ে, কিন্তু মায়ের চোখে তৃপ্তির হাসি থাকত—ছেলেরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা করুক, সেটাই তিনি চাইতেন।

মায়ের পড়ানোর ধরন ছিল অন্যরকম। তিনি সবসময় বলতেন, “শেখা মানে শুধু বই পড়া নয়, ভালো মানুষ হওয়াও শেখা।” তাই তিনি আমাদের শুধু গণিত বা বাংলা শেখাননি, শেখাতেন কেমন করে বড়দের সম্মান করতে হয়, কেমন করে মিথ্যা না বলতে হয়, কেমন করে পরিশ্রম করতে হয়।

অনেক সময় বাড়িতে বিকেলে মা আমাদের উঠানে বসিয়ে পড়াতেন। হাতে থাকত লাল কলম, পাশে একটা পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে খাতায় দাগ টানতেন। পড়ার ভুল ধরতেন, কিন্তু কখনো রাগ করতেন না। বরং বলতেন, “ভুল করো, কিন্তু শিখে নাও।” সেই কথাগুলো আজও মনে বাজে।

এখন মা অবসর নিয়েছেন। স্কুলে আর যান না, কিন্তু তাঁর শেখানো প্রতিটি শিক্ষা এখনো আমার জীবনের দিশা। অনেক সময় নিজের সন্তানদের পড়াতে গিয়ে মায়ের সেই ধৈর্য, ভালোবাসা আর মমতা মনে পড়ে যায়। বুঝতে পারি, মা শুধু শিক্ষক নন, তিনি এক চলমান বিদ্যালয়—যার শিক্ষা কখনো শেষ হয় না।

জীবনে যত দূরই যাই না কেন, মায়ের শেখানো অক্ষরগুলোই আমার পথ দেখায়। তিনি শুধু আমার জন্মদাত্রী নন, আমার চরিত্র, চিন্তা, আর জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন।

তাই আজও গর্ব করে বলি: ‘আমার মা-ই আমার বড় শিক্ষক’।

নুরুন্নবী চৌধুরী: সাংবাদিক ও লেখক।

আরও পড়ুন:
যে আমার জীবনের গল্পকে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন করেছেন
শাহানাজ পারভীন ম্যাম শিক্ষাগুরু ও জীবনের সেরা শিক্ষক
মনের আলোয় দেখেছি
হালিমা ম্যাম এক গভীর অনুপ্রেরণার নাম হিসেবে চির অম্লান থাকবে

আরও পড়ুন