রামনগর নজরুল একাডেমির নজরুল সাধক ইউসুফ আলির নজরুলচর্চা

জাগ্ রে কৃষাণ সব ত গেছে কিসের বা আর ভয়
ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়
বল্ সবে ভাই, বল্ কৃষাণের বল্ লাঙলের জয়,
দেখবে এবার সভ্যজগৎ চাষার কত বল।।
‘কৃষাণের গান’ কবিতায় চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এই পঙ্ক্তিগুলো সত্যি হয়ে যায় নজরুল অনুরাগী ইউসুফ আলির জীবনে। চরম অর্থকষ্টে দিন অতিবাহিত করেও শুধুমাত্র নজরুলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাঁকে জীবনে অন্য পথের সন্ধান দিয়েছে। জীবনের প্রকৃত অর্থ তিনি খুঁজে পেয়েছেন। মুর্শিদাবাদ জেলার রামনগর গ্রামে ইউসুফের বসবাস। অদূরেই লালগোলা স্টেশন। নজরুল- স্মৃতি বিজড়িত লালগোলা সম্পর্কে নজরুল গবেষকদের আগ্রহ রয়েছে। সেই সম্পর্কে বেশ কিছু কাজও হয়েছে। কিন্তু রামনগরের বাসিন্দা, আদ্যন্ত নজরুলপ্রেমী ইউসুফ আলির কথা আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা। শুধুমাত্র নজরুলপ্রেমী নন, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নজরুল চর্চার প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত মতামত তাঁকে ব্যতিক্রমী করে তোলে। খুব ছোটবেলায় মা সখিনা বিবির কণ্ঠে শুনেছেন নজরুলের ‘রবিহারা’, ‘মা’ কবিতা। মায়ের কণ্ঠে নজরুলের গান শুনেও
মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। এই কথা শুনতে শুনতে মনে একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। জিজ্ঞেস করি, নজরুলের সৃষ্টির প্রতি তাঁর মায়ের ভালোবাসা কীভাবে তৈরী হল? চমৎকার উত্তর দিলেন ইউসুফ। বললেন, রাজারমপুরে তাঁর নানা আশরুদ্দীন মোল্লার বাড়িতে ছিল গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ার। তাকে ঘিরে বসত গান শোনার আসর। তৎকালীন সময়ে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে এটুকুই ছিল ভরসা। একের পর এক গান বাজত সেই যন্ত্রে, আর শুনে শুনেই সেই গান শিখে নিতেন সখিনা বিবি। মাত্র ৭ বছর বয়সে আফসার আলির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্মৃতি থেকেই নজরুলের সেই গান শুনিয়েছেন তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের। মায়ের হাত ধরেই নজরুলের প্রতি ভালোবাসা তৈরী হয় ইউসুফের। চরম দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করেও তিনি তাঁর নজরুল চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। গ্রামের মসজিদে আজান দিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্মে মনোনিবেশ করেন। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে যতটুকু অর্থ রোজগার করেন, তা দিয়েই জীবন অতিবাহিত করেন। নিজের জমি বলতে কিছুই নেই। ৫৯ বছর বয়সে এই পরিশ্রম তিনি হাসিমুখেই করেন। কারও প্রতি কোন অভিযোগ নেই বরং সংসারের সকলের প্রতি তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। নজরুল চর্চায় পরিবারের সকলে তাঁকে উৎসাহিত করেছেন। ছেলে ইয়াকুব আলি পেশায় রাজমিস্ত্রী, মেয়ে সুরাইয়া গৃহকর্মে নিপুণা। তাঁরাও নজরুলপ্রেমী। বাবার সঙ্গে নজরুল চর্চায় নিমগ্ন থাকেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে নজরুল সংক্রান্ত বহু তথ্য সংগ্রহ করেছেন ইউসুফ। যেখানে যখন খবর পেয়েছেন কোনও তথ্য সম্পর্কে, ছুটে গেছেন শুধুমাত্র নজরুলকে ভালোবেসে। বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে নজরুলের লেখা বই যেমন রয়েছে ঠিক তেমনই দুই বাংলার বিশিষ্ট নজরুল গবেষকদের লেখা শতাধিক বই ও পত্রিকাও স্থান পেয়েছে তাঁর সংগ্রহশালায়। ২০০০ সালে নিজের গ্রাম রামনগরেই তৈরী করেছেন রামনগর নজরুল একাডেমি। শুরুতে অনেকে যুক্ত ছিলেন ঠিকই কিন্তু সময় যত এগিয়েছে মানুষের উৎসাহে ভাটা পড়েছে। এখন অনেকটা একার কাঁধেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন তিনি। একাডেমির ঘরে নজরুলের বিভিন্ন ছবি স্থান পেয়েছে। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ ৪ ঘন্টার আলাপচারিতায় অনেক কিছু জানার সুযোগ হল। উপহার হিসেবে পেলাম রামনগর নজরুল একাডেমির বেশ কিছু বার্ষিক পত্রিকা। কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি রক্ষা, তাঁর জীবন, সাহিত্য-সঙ্গীত ও সামগ্রিক অবদান সম্পর্কে গবেষণা পরিচালনা, রচনাবলি সংগ্রহ, পত্রিকা প্রকাশ ও প্রচার রামনগর নজরুল একাডেমির কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। ইউসুফ আলির সম্পাদনায় ২০১২ সাল থেকে একাডেমির বার্ষিক পত্রিকার পথ চলা শুরু হয়। ২০২৪ সালে পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ইউসুফ লিখেছেন, “অখণ্ড বাঙালি সত্তাও যখন আজ বিপন্ন বহিরাগত ভাব-সংস্কৃতির অভিঘাতে তখন তাঁর বিপন্মুক্ততায় নজরুল চর্চা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক, অপরিহার্য। এই উদাসীন বাঙালি মনকে আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণচঞ্চল করে তুলতেই রামনগর কাজী নজরুল একাডেমি নিরলস প্রচেষ্টায় নজরুল চর্চাকে সাধ্যমত আগলে আসছে জন্মাবধি তার নানা কর্মে, বিশেষভাবে তার মুখপত্রের প্রতিটি সংখ্যায়।” পত্রিকার সম্পাদকীয় একটু মন দিয়ে পড়লে বোঝা যায়, শুধুমাত্র নজরুল সম্পর্কিত বই ও তথ্য সংগ্রহ করা নয়, নজরুলকে অন্তরে ধারণ করেন তিনি। নজরুল কখন যেন তাঁর আপনজন হয়ে উঠেছেন। ইউসুফের লেখায় — “কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের বিপ্লবাত্মক বিদ্রোহ-চেতনার অন্যতম প্রধান কবি। পরাধীন দেশে জন্মেছিলেন তিনি। অসামান্য ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কবি নজরুলের আজীবন সাধনা ছিল সমাজের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, আর সম্মানীয় সামাজিক মর্যাদার স্বীকৃতি। ধূমকেতুর মতই তাঁর আগমন, আর ধূমকেতুর মতই তাঁর প্রস্থান। কিন্তু তাঁর গল্প, কবিতা, নাটক ও গানে সমাজের অবহেলিত মানুষের অন্তর্নিহিত বেদনা ও অসহায়ত্ব এবং তাঁর বিরুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের একান্ত আপনজন।”

বর্তমান সময়ে নজরুল-চর্চার প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে ইউসুফ আলির স্পষ্ট উচ্চারণ — “আজ যখন দেশ জুড়ে চলছে ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংসার লহর, মুছে ফেলতে চাইছে আন্তঃসম্পর্ক-বন্ধনের স্নিগ্ধতা, শীতল শান্তির পরিবেশ, তখন আজ বেশি করেই প্রয়োজন অনুভূত হয়। প্রেমভরা কণ্ঠে গেয়ে ওঠে — ‘মোরা এক বৃত্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ বা উচ্চকিত নির্ভীক কণ্ঠে বলে ওঠা — হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন/ কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।” এখানেই নজরুল অবলীলায় সকলের হয়ে ওঠেন। শতবর্ষ আগে প্রণম্য বাঙালিদের প্রজ্ঞাকে সঙ্গী করে সমাজের কৃষক ও শ্রমিকদলের কল্যাণার্থে, চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ‘লাঙল’ পত্রিকা তৎকালীন সমাজে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সংগ্রামী, মেহনতি মানুষের কথা। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নজরুলের লেখাই যেন নিপীড়িত, দরিদ্র মানুষকে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস জোগায়।
অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা ইউসুফও জীবন-যুদ্ধে নজরুলের লেখায় আশ্রয় খোঁজেন — “আমরা সংগ্রাম করে বাঁচতে চাই। তাই নজরুল ইসলাম আমাদের প্রিয়। তাই তাঁর প্রতি অদ্ভুত এক স্মৃতির অনুভূতিতে আমরা আপ্লুত। ‘রামনগর নজরুল একাডেমি’ তাঁকে আরও ভালভাবে লোকমানসে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর ‘রামনগর নজরুল একাডেমি পত্রিকা’ হল এক অপরাজেয় ও অদম্য মানসিকতার প্রতিফলন। ‘আমাদের সঙ্গে সবাই আছে’ — এই পত্রিকা যেন এটাই বলতে চায়।” নিজের গ্রামেই রামনগর দিলবোরা কোপরা এম এস কে বিদ্যালয়ে প্রতি বছর নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন ইউসুফ। নজরুলকে নিয়ে তাঁর আবেগ গ্রামের মানুষদের ভাবায়। শুধুমাত্র নিজের গ্রমেই নয়, লালগোলা বইমেলা, জঙ্গিপুর বইমেলা, বহরমপুর রবীন্দ্র সদনে নজরুলের বই ও চিত্র প্রদর্শনী করেছেন। অর্থ নয়, দিনশেষে পেয়েছেন নজরুলপ্রেমীদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয়, নজরুলকে ভালোবেসে বাংলদেশে গেছেন বেশ কয়েকবার। সংগ্রহ করেছেন নজরুল সংক্রান্ত বই ও দুর্লভ চিত্র। সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর সংগ্রহশালাকে। তাই আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নজরুল গবেষকরা রামনগরে ছুটে আসেন শুধুমাত্র তাঁর সংগ্রহশালা দেখার জন্য। দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি নজরুল চর্চায় নিয়োজিত — অর্জন করেছেন মানুষের ভালোবাসা এবং পেয়েছেন মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে নজরুল পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার সহ একাধিক স্বীকৃতি। পুরস্কার অর্জনই শেষ কথা নয়, ইউসুফ স্বপ্ন দেখেন তাঁর নিজের হাতে গড়া রামনগর নজরুল একাডেমি একদিন নজরুলপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত হবে, তরুণরা এগিয়ে আসবে। নজরুলকে অন্তরে ধারণ করে নবীন প্রজন্ম আমাদের সঠিক পথের সন্ধান দেবে।
লেখক: সোমঋতা মল্লিক: নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)
