জর্জ বার্কলের দর্শন-২: বাস্তবতা, চেতনা ও ঈশ্বরের এক বিকল্প অধিবিদ্যা

৩. 

বার্কলের দর্শনের সবচেয়ে মৌলিক ও বৈপ্লবিক দিক হলো তাঁর অবস্তুবাদ (Immaterialism) বা ভাববাদী অধিবিদ্যা (Idealism)। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের একটি দীর্ঘস্থায়ী ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন—যে ধারণা অনুযায়ী মানুষের চেতনা থেকে স্বাধীন একটি বস্তুগত জগত বিদ্যমান। বার্কলের মতে, এই প্রচলিত ধারণা শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং দার্শনিক বিভ্রান্তির মূল উৎস। তাঁর সমগ্র দর্শনের উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে বাস্তবতার ব্যাখ্যার জন্য কোনো অচৈতন্য, মন-স্বাধীন পদার্থের অনুমান করার প্রয়োজন নেই। বরং চেতনা (spirit) এবং ধারণা (ideas)—এই দুটি মৌলিক উপাদানের মাধ্যমেই সমগ্র বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

বার্কলের এই অবস্থানকে সংক্ষেপে প্রকাশ করা হয় তাঁর বিখ্যাত নীতিবাক্য—Esse est percipi aut percipere। ল্যাটিন এই বাক্যের অর্থ হলো—”অস্তিত্ব মানে হয় উপলব্ধ হওয়া, অথবা উপলব্ধি করা।” অর্থাৎ কোনো নিষ্ক্রিয় বস্তু বা ধারণার অস্তিত্ব তার উপলব্ধ হওয়ার মধ্যেই নিহিত, আর সক্রিয় আত্মা বা মন সেই সত্তা, যা উপলব্ধি করে। এই সূত্রের মাধ্যমে বার্কলে বাস্তবতাকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করেন—ধারণা (ideas) এবং আত্মা বা চেতনা (spirits)।

ধারণাগুলো হলো নিষ্ক্রিয় (passive) বিষয়বস্তু, যা নিজেরা কোনো কাজ করতে পারে না। রং, শব্দ, স্বাদ, গন্ধ, আকার, গতি—এসবই আমাদের চেতনায় উপস্থিত ধারণা। অন্যদিকে আত্মা বা মন হলো সক্রিয় সত্তা, যা ধারণাকে উপলব্ধি করে, চিন্তা করে এবং ইচ্ছা প্রকাশ করে। মানুষ নিজের আত্মার অস্তিত্ব প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করে, কারণ আমরা আমাদের চিন্তা, ইচ্ছা ও অনুভূতির সক্রিয় উৎস হিসেবে নিজেদের উপলব্ধি করি। কিন্তু কোনো বস্তুগত পদার্থকে আমরা কখনো এইভাবে উপলব্ধি করি না।

বার্কলের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা যখন কোনো বস্তু সম্পর্কে কথা বলি, তখন আসলে কী বোঝাই? উদাহরণ হিসেবে একটি আপেলের কথা ধরা যাক। সাধারণ অভিজ্ঞতায় আমরা বলি, আপেল একটি বাস্তব বস্তু। কিন্তু আপেল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কী দিয়ে গঠিত? আমরা আপেলের লাল রং দেখি, মিষ্টি স্বাদ অনুভব করি, তার গন্ধ পাই, তার আকার ও কঠোরতা উপলব্ধি করি। অর্থাৎ আপেল সম্পর্কে আমাদের সমস্ত জ্ঞানই বিভিন্ন অনুভূতি বা ধারণার সমষ্টি। এই ধারণাগুলোর বাইরে এমন কোনো “আপেল-সত্তা” কল্পনা করা, যা কোনোভাবেই অনুভূত হয় না, বার্কলের মতে অর্থহীন।

এখানে তাঁর দর্শন লকের প্রতিনিধিত্ববাদী বাস্তববাদের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে প্রবেশ করে। লক মনে করতেন, আমাদের মনে যে ধারণা সৃষ্টি হয়, তার পেছনে একটি বাহ্যিক বস্তু রয়েছে, যা সেই ধারণার কারণ। বার্কলের প্রশ্ন ছিল—যদি সেই বাহ্যিক বস্তু কখনো আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয় না হয়, তবে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কীভাবে সম্ভব? কোনো ধারণা কীভাবে এমন কিছুর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, যার সঙ্গে তার কোনো সাদৃশ্য নেই?

বার্কলের মতে, একটি ধারণা কেবল আরেকটি ধারণার মতো হতে পারে; একটি মানসিক ধারণা কোনো অচেতন, অদৃশ্য পদার্থের প্রতিরূপ হতে পারে না। কারণ সাদৃশ্যের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উভয় পক্ষেরই কোনো না কোনো সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। কিন্তু একটি ধারণা ও একটি কথিত বস্তুগত পদার্থের মধ্যে এমন কোনো সাধারণ বৈশিষ্ট্য নেই। ফলে প্রতিনিধিত্ববাদ একটি অপ্রমাণযোগ্য অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।

বার্কলের অবস্তুবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তাঁর বিমূর্ত ধারণার (abstract ideas) সমালোচনা। জন লক মনে করেছিলেন, মানুষ বিশেষ বিশেষ অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ ধারণা তৈরি করতে পারে। যেমন, আমরা বিভিন্ন ধরনের মানুষ দেখে “মানুষ” নামক একটি সাধারণ ধারণা তৈরি করি, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য থাকে না। বার্কলে এই ধরনের বিমূর্ত ধারণার সম্ভাবনা অস্বীকার করেন।

তাঁর মতে, মানুষ কখনো এমন কোনো ধারণা গঠন করতে পারে না, যা একই সঙ্গে নির্দিষ্ট এবং অনির্দিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, “ত্রিভুজ” সম্পর্কে এমন কোনো বিমূর্ত ধারণা তৈরি করা সম্ভব নয়, যা একই সঙ্গে সমবাহু, সমদ্বিবাহু ও বিষমবাহু ত্রিভুজের বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ত্রিভুজ হবে না। বরং একটি নির্দিষ্ট ত্রিভুজের ধারণাকে আমরা সাধারণ অর্থে ব্যবহার করি। অর্থাৎ সাধারণতা ধারণার মধ্যে নয়; ধারণার ব্যবহারের মধ্যে নিহিত।

এই যুক্তির মাধ্যমে বার্কলে লকের জ্ঞানতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিকে আক্রমণ করেন। কারণ বস্তুবাদী দর্শনের অনেক ধারণা—যেমন “বস্তু”, “বিস্তার”, “আকার”, “পদার্থ”—এমন বিমূর্ত ধারণার ওপর নির্ভর করে, যেগুলো বার্কলের মতে বাস্তবে গঠন করা সম্ভব নয়।

বার্কলের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক গ্রন্থ An Essay Towards a New Theory of Vision (১৭০৯)-এ তাঁর পরবর্তী অবস্তুবাদের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের মূল বিষয় ছিল দৃষ্টির মাধ্যমে দূরত্ব উপলব্ধির সমস্যা। সে সময় দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক ছিল—মানুষ কীভাবে চোখের মাধ্যমে দূরের বস্তু সম্পর্কে ধারণা লাভ করে?

বার্কলে দেখান যে দূরত্ব সরাসরি দৃষ্টির মাধ্যমে অনুভূত হয় না। আমরা দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ করি অভ্যাস, স্পর্শ, দেহের চলন এবং বিভিন্ন দৃশ্যমান সংকেতের মাধ্যমে। চোখে যা প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত হয়, তা হলো রং, আলো, আকৃতি ইত্যাদি দৃশ্যমান ধারণা; কিন্তু দূরত্ব হলো অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখা একটি সম্পর্ক।

এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে বার্কলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছান—দৃষ্টির জগত এবং স্পর্শের জগত এক নয়। আমরা যা দেখি এবং যা স্পর্শ করি, তা একই ধরনের বাস্তবতা নয়। দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তু মূলত ধারণার সমষ্টি। এই চিন্তা পরবর্তীকালে তাঁর পূর্ণাঙ্গ অবস্তুবাদের ভিত্তি তৈরি করে।

১৭১০ সালে প্রকাশিত A Treatise Concerning the Principles of Human Knowledge গ্রন্থে বার্কলে তাঁর পরিণত দর্শন উপস্থাপন করেন। গ্রন্থটির সূচনাতেই তিনি ঘোষণা করেন যে মানুষের জ্ঞান মূলত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা যা জানি, তা হলো আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয়বস্তু। এর বাইরে কোনো অজ্ঞেয় বস্তুগত সত্তার কথা বলা দর্শনকে জটিলতা ছাড়া আর কিছু দেয় না।

Principles-এ বার্কলে বস্তুবাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রধান যুক্তি উপস্থাপন করেন। প্রথমত, আমরা যা উপলব্ধি করি তা হলো ধারণা; কিন্তু বস্তুবাদী যে “বস্তু”র কথা বলে, তা ধারণা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। ফলে আমাদের জ্ঞান ও বাস্তবতার মধ্যে একটি অতিক্রমণযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, তিনি বলেন, কোনো ধারণা নিজে থেকে কোনো ধারণার কারণ হতে পারে না। ধারণাগুলো নিষ্ক্রিয়; তাদের মধ্যে কার্যকারণ শক্তি নেই। ফলে আমাদের অভিজ্ঞতার নিয়মিততা ব্যাখ্যা করার জন্য একটি সক্রিয় চেতনার প্রয়োজন। এই সক্রিয় চূড়ান্ত উৎস হলো ঈশ্বর।

তৃতীয়ত, বার্কলে যুক্তি দেন যে পদার্থের ধারণা কোনো সমস্যার সমাধান করে না। বরং এটি নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে। যদি বস্তু আমাদের ধারণার কারণ হয়, তবে বস্তু কীভাবে মনের ওপর প্রভাব ফেলে? একটি অচেতন পদার্থ কীভাবে একটি সচেতন মনের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি করতে পারে—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর বস্তুবাদ দিতে পারে না।

Three Dialogues between Hylas and Philonous (১৭১৩)-এ বার্কলে তাঁর দর্শনকে আরও সহজ ও সাহিত্যিক রূপে উপস্থাপন করেন। এখানে হাইলাস (Hylas) বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধি এবং ফিলোনাস (Philonous) বার্কলের নিজস্ব মতের প্রতিনিধি। সংলাপের মাধ্যমে দেখানো হয় যে বস্তুবাদী ধারণাগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যেই অসংগতি সৃষ্টি করে।

এই গ্রন্থে বার্কলে বিশেষভাবে দেখান যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য গুণগুলো মন-নির্ভর। গরম বা ঠান্ডা, মিষ্টি বা তিক্ত, রং বা শব্দ—এসব অভিজ্ঞতা উপলব্ধিকারী সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। একই বস্তু একজনের কাছে আনন্দদায়ক এবং অন্যজনের কাছে অপ্রীতিকর হতে পারে। ফলে এসব গুণকে মনের বাইরে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান বলা কঠিন।

তবে বার্কলে কখনোই বলেননি যে জগত একটি কল্পনা বা স্বপ্নমাত্র। এটি তাঁর দর্শন সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল বোঝাবুঝির একটি। তিনি ব্যক্তিগত কল্পনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেন। কল্পনার ধারণা আমাদের ইচ্ছাধীন; কিন্তু ইন্দ্রিয়ের ধারণাগুলো আমাদের ইচ্ছাধীন নয়। আমরা ইচ্ছা করলেই সূর্য, গাছ, নদী বা পাহাড়ের অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করতে পারি না। এগুলোর নিয়মিততা ও স্থায়িত্বের কারণ হলো ঈশ্বরের কার্যকর উপস্থিতি।

এইভাবে বার্কলের দর্শনে ঈশ্বর একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেন। ঈশ্বর হলেন অসীম আত্মা, যিনি প্রকৃতির ধারণাসমূহ নিয়মিতভাবে সৃষ্টি করেন। মানুষের অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা, প্রকৃতির নিয়ম এবং জগতের স্থায়িত্ব—সবকিছুর ভিত্তি হলো ঈশ্বরীয় চেতনা।

বার্কলের অবস্তুবাদ তাই কোনো সরল “সবকিছুই মনের কল্পনা” ধরনের মতবাদ নয়। বরং এটি একটি সুসংগঠিত অধিবিদ্যা, যেখানে বাস্তবতা গঠিত হয় সক্রিয় আত্মা, ঈশ্বর এবং অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণার সমন্বয়ে। তাঁর লক্ষ্য ছিল বস্তুবাদকে পরিত্যাগ করে এমন একটি বাস্তববাদ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষ সরাসরি তার অভিজ্ঞতার জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে এবং সেই জগতের চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ঈশ্বরের উপস্থিতি স্বীকৃত হয়।

বার্কলের এই মৌলিক দর্শন পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর ধর্মদর্শন, নীতিদর্শন, ভাষাদর্শন ও বিজ্ঞানদর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও বিস্তৃত রূপ লাভ করে। বিশেষত Alciphron, De Motu, The Analyst এবং Siris গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন যে তাঁর অবস্তুবাদ কেবল অধিবিদ্যার একটি তত্ত্ব নয়; বরং জ্ঞান, ভাষা, বিজ্ঞান ও মানবজীবনের একটি সামগ্রিক ব্যাখ্যা।

৪.

বার্কলের দর্শনকে কেবল অবস্তুবাদ বা ভাববাদের একটি অধিবিদ্যাগত তত্ত্ব হিসেবে বিচার করলে তাঁর চিন্তার পূর্ণাঙ্গ রূপ উপলব্ধি করা যায় না। তাঁর দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব, ধর্মদর্শন, নীতিদর্শন, ভাষাদর্শন এবং বিজ্ঞানদর্শন পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তিনি পদার্থের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিলেন কেবল একটি দার্শনিক কৌতূহল থেকে নয়; বরং তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি বিশ্বদৃষ্টি নির্মাণ করা, যেখানে মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস একটি সুসংহত কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করে। তাঁর কাছে বস্তুবাদ শুধু একটি ভুল অধিবিদ্যাগত মতবাদ ছিল না; এটি ছিল এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যা সংশয়বাদ ও নাস্তিকতার দিকে মানুষকে পরিচালিত করতে পারে।

বার্কলের ধর্মদর্শনের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে তাঁর অবস্তুবাদী অধিবিদ্যার মধ্যে। যদি জগতের মৌলিক বাস্তবতা পদার্থ না হয়ে চেতনা হয়, তবে প্রশ্ন আসে—এই অসংখ্য নিয়মতান্ত্রিক ধারণার উৎস কোথায়? মানুষের মন তো সীমিত, পরিবর্তনশীল এবং অসম্পূর্ণ। আমরা এমন অভিজ্ঞতা লাভ করি, যা আমাদের ইচ্ছার অধীন নয়। আমরা চাইলে কোনো পাহাড়, নদী বা সূর্যের অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করতে পারি না। আবার প্রকৃতির ঘটনাগুলো একটি সুসংবদ্ধ নিয়ম অনুসরণ করে। এই নিয়মিততার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বার্কলে ঈশ্বরের ধারণাকে অপরিহার্য বলে মনে করেন।

বার্কলের মতে, ঈশ্বর হলেন অসীম, সক্রিয় ও সর্বজ্ঞ আত্মা। তিনি সমগ্র প্রকৃতির ধারণাসমূহের চূড়ান্ত উৎস। মানুষের মনের ধারণাগুলো যেখানে সীমিত ও নিষ্ক্রিয়, ঈশ্বরের ধারণা ও ইচ্ছা সেখানে অসীম এবং সৃষ্টিশীল। প্রকৃতির নিয়ম কোনো অন্ধ বস্তুগত শক্তির ফল নয়; এগুলো ঈশ্বরের ইচ্ছার নিয়মিত প্রকাশ। এই কারণে প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা যখন প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করেন, তখন তাঁরা প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের প্রতিষ্ঠিত ধারণার ধারাবাহিকতা ও সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বার্কলের সময়কার প্রচলিত বৈজ্ঞানিক বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করে। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা যেখানে মহাবিশ্বকে যান্ত্রিক নিয়মে পরিচালিত একটি বস্তুগত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করছিল, বার্কলে সেখানে মহাবিশ্বকে একটি চেতনাভিত্তিক ও নিয়মতান্ত্রিক অভিজ্ঞতার জগৎ হিসেবে দেখেন। তবে তিনি বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং তিনি বিজ্ঞানের অর্থকে পুনর্নির্ধারণ করেছেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞান প্রকৃতির পেছনে কোনো অদৃশ্য বস্তুগত সারসত্তা আবিষ্কার করে না; বিজ্ঞান আবিষ্কার করে ঈশ্বর-প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞতার নিয়মিত সম্পর্ক।

এই কারণে বার্কলের ধর্মদর্শনকে নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিরক্ষা হিসেবে দেখা ভুল হবে। তাঁর কাছে ঈশ্বর একটি দার্শনিক প্রয়োজনীয়তা। ঈশ্বর ছাড়া আমাদের অভিজ্ঞতার স্থায়িত্ব, প্রকৃতির নিয়ম এবং ব্যক্তিগত চেতনার পারস্পরিক সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে আধুনিক দার্শনিকদের অনেকেই প্রশ্ন করেছেন—ঈশ্বরকে এইভাবে ব্যাখ্যার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা কি প্রকৃতপক্ষে একটি নতুন অপ্রমাণিত অনুমান নয়? বার্কলের উত্তর ছিল, পদার্থের তুলনায় ঈশ্বরের ধারণা অধিক যুক্তিসঙ্গত, কারণ আমরা আত্মা বা চেতনার সক্রিয়তা সরাসরি উপলব্ধি করি, কিন্তু পদার্থের অস্তিত্ব কখনো প্রত্যক্ষ করি না।

বার্কলের নীতিদর্শন তাঁর ধর্মদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যদিও তিনি কান্ট বা অ্যারিস্টটলের মতো একটি সুসংবদ্ধ নৈতিক দর্শন নির্মাণ করেননি, তাঁর বিভিন্ন রচনায় নৈতিকতার প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর মতে, মানুষ কেবল ইন্দ্রিয়সুখ অনুসরণকারী প্রাণী নয়; মানুষ একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্তা। মানুষের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে তার আত্মিক উন্নয়ন, ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নৈতিক জীবনের মধ্যে।

বার্কলের নৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষের ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা। যেহেতু বাস্তবতার মূল উপাদান হলো আত্মা, তাই মানুষের নৈতিক দায়িত্বও আত্মার সক্রিয়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। জড় বস্তু কোনো নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না; কিন্তু আত্মা চিন্তা করতে পারে, উদ্দেশ্য স্থির করতে পারে এবং কর্ম নির্বাচন করতে পারে। এই কারণে নৈতিকতা মানুষের চেতনার একটি মৌলিক প্রকাশ।

তাঁর মতে, নৈতিকতার চূড়ান্ত ভিত্তি হলো ঈশ্বরের নৈতিক শৃঙ্খলা। ভালো ও মন্দ কেবল সামাজিক রীতি নয়; এগুলোর একটি গভীর আধ্যাত্মিক ভিত্তি রয়েছে। মানুষ যখন সত্য, ন্যায়, দয়া ও সংযমের পথে চলে, তখন সে ঈশ্বরীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন করে। এই ধারণায় বার্কলের নৈতিক দর্শন খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

শিক্ষা সম্পর্কেও বার্কলের দৃষ্টিভঙ্গি নৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত ছিল। তিনি মনে করতেন, শিক্ষার লক্ষ্য কেবল জ্ঞান অর্জন নয়; বরং মানুষের চরিত্র গঠন। এই কারণেই তিনি আমেরিকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, নতুন পৃথিবীতে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে জ্ঞান, ধর্ম ও নৈতিকতা একত্রে মানবজীবনকে উন্নত করবে।

বার্কলের ভাষাদর্শন তাঁর চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। Alciphron: or the Minute Philosopher (১৭৩২) গ্রন্থে তিনি ভাষার প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর মৌলিক মত প্রকাশ করেন। জন লকের মতে, শব্দের অর্থ মূলত ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো শব্দ অর্থবহ হয় কারণ তা কোনো মানসিক ধারণাকে নির্দেশ করে।

বার্কলে এই মতের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করেন। তাঁর মতে, ভাষার কাজ কেবল ধারণার প্রতিনিধিত্ব করা নয়। অনেক সময় আমরা এমন শব্দ ব্যবহার করি, যা কোনো নির্দিষ্ট ধারণার প্রতীক নয়, কিন্তু তবুও তা অর্থবহ। উদাহরণস্বরূপ, কোনো আদেশ, অনুরোধ বা আবেগ প্রকাশকারী বাক্য সরাসরি কোনো ধারণা নির্দেশ না করেও কার্যকর হতে পারে। “দরজা বন্ধ কর”, “সাবধান হও” বা “ঈশ্বরকে স্মরণ কর”—এই ধরনের বাক্যের অর্থ তাদের ব্যবহারিক ভূমিকার মধ্যে নিহিত।

এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বার্কলে ভাষাকে একটি সক্রিয় মানবিক কার্যকলাপ হিসেবে দেখান। ভাষার উদ্দেশ্য কেবল মনের ভেতরের ছবি প্রকাশ করা নয়; ভাষা মানুষের আচরণ পরিচালনা করে, সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে এবং জ্ঞানের আদান-প্রদান সম্ভব করে। আধুনিক ভাষাদর্শনের ব্যবহারবাদী (pragmatic) প্রবণতার সঙ্গে এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে।

বার্কলের বিজ্ঞানদর্শন তাঁর De Motu (১৭২১) গ্রন্থে বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। এই রচনায় তিনি নিউটনীয় পদার্থবিদ্যার কিছু দার্শনিক ভিত্তির সমালোচনা করেন। তাঁর আপত্তি ছিল না নিউটনের গাণিতিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে; বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন “বল” (force), “আকর্ষণ” (attraction) কিংবা “মহাকর্ষ” (gravity)-এর মতো ধারণাকে স্বাধীন বাস্তব সত্তা হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে।

বার্কলের মতে, বিজ্ঞানী যখন বলেন যে একটি বস্তু অন্য বস্তুকে আকর্ষণ করে, তখন এটি প্রকৃত কারণের ব্যাখ্যা নয়; বরং ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি নিয়মিত সম্পর্কের বর্ণনা। বিজ্ঞান প্রকৃতির কার্যপ্রণালীর গাণিতিক কাঠামো প্রকাশ করে, কিন্তু সেই কাঠামোর পেছনে কোনো অদৃশ্য পদার্থগত শক্তি আছে—এমন দাবি করা বিজ্ঞানের সীমার বাইরে চলে যায়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রবাদ (scientific instrumentalism)-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। বার্কলের মতে, কোনো বৈজ্ঞানিক ধারণা সফল হতে পারে তার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষমতার কারণে, তার পেছনে একটি বাস্তব অদৃশ্য সত্তা থাকার কারণে নয়।

The Analyst (১৭৩৪) গ্রন্থে বার্কলে গণিতের ভিত্তি নিয়েও আলোচনা করেন। এখানে তিনি নিউটনের ক্যালকুলাসের যৌক্তিক ভিত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মূল আপত্তি ছিল “অসীম ক্ষুদ্র” (infinitesimal) ধারণার অস্পষ্টতা নিয়ে। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞানীরা কখনো কখনো যেসব ধারণাকে অত্যন্ত নির্ভুল বলে ব্যবহার করেন, সেগুলোর দার্শনিক ভিত্তি সবসময় স্পষ্ট নয়।

যদিও তাঁর সমালোচনা পরবর্তীকালের কঠোর গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অতিক্রান্ত হয়েছে, তবু এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এটি দেখায় যে বার্কলে কেবল অধিবিদ্যার প্রশ্নেই নয়, বিজ্ঞানের ধারণাগত ভিত্তি নিয়েও গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন।

জীবনের শেষ পর্যায়ে রচিত Siris (১৭৪৪) বার্কলের চিন্তার একটি ভিন্ন রূপ প্রকাশ করে। এই গ্রন্থের সূচনা টার-ওয়াটারের চিকিৎসাগত গুণ নিয়ে হলেও, ধীরে ধীরে এটি প্রকৃতি, বিজ্ঞান, দর্শন এবং ঈশ্বর সম্পর্কে এক বিস্তৃত আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে পরিণত হয়। এখানে নব্য-প্লেটোনিক প্রভাব স্পষ্ট। বার্কলে প্রকৃতির দৃশ্যমান জগতের মধ্য দিয়ে একটি গভীর আধ্যাত্মিক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন।

Siris-এ বার্কলের দর্শন পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোর তুলনায় অধিক রহস্যময় ও ধর্মতাত্ত্বিক। তবে এখানেও তাঁর মূল বিশ্বাস অপরিবর্তিত থাকে—বাস্তবতার চূড়ান্ত ভিত্তি কোনো জড় পদার্থ নয়; বরং চেতনা, বুদ্ধি এবং ঈশ্বর।

এইভাবে দেখা যায়, বার্কলের দর্শন একটি বিস্তৃত বৌদ্ধিক প্রকল্প। তাঁর অবস্তুবাদ কেবল “পদার্থ নেই”—এই নেতিবাচক বক্তব্য নয়; বরং এটি একটি ইতিবাচক বিশ্বদৃষ্টি, যেখানে বাস্তবতা চেতনা, অভিজ্ঞতা, ভাষা, বিজ্ঞান এবং ঈশ্বরের একটি সমন্বিত সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যাত হয়। তাঁর দর্শনের পরবর্তী প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় ডেভিড হিউম ও ইমানুয়েল কান্টের চিন্তায়।

*** প্রথম পর্ব

চলবে..

মাসুদুল হক : প্রাবন্ধিক, কবি ও শিক্ষক

গ্রন্থপঞ্জি:

১.Atherton, Margaret. Berkeley’s Revolution in Vision. Cornell University Press, 1990.

২.Berman, David. George Berkeley: Idealism and the Man. Clarendon Press, 1994.

৩.Berkeley, George. Alciphron, or the Minute Philosopher. Edited by T. E. Jessop and A. A. Luce, vol. 3 of The Works of George Berkeley, Bishop of Cloyne, Thomas Nelson and Sons, 1948–1957.

৪.Berkeley, George. An Essay Towards a New Theory of Vision. Edited by Michael Ayers, Philosophical Works, J. M. Dent, 1975, pp. 1–68.

৫.Berkeley, George. A Treatise Concerning the Principles of Human Knowledge. Edited by Michael Ayers, Philosophical Works, J. M. Dent, 1975.

৬.Berkeley, George. De Motu and The Analyst: A Modern Edition with Introductions and Commentary. Translated and edited by Douglas M. Jesseph, Kluwer Academic Publishers, 1992.

৭.Berkeley, George. Philosophical Commentaries. Edited by Michael Ayers, Philosophical Works, J. M. Dent, 1975.

৮.Berkeley, George. Siris: A Chain of Philosophical Reflexions and Inquiries Concerning the Virtues of Tar-Water. Edited by A. A. Luce and T. E. Jessop, vol. 5 of The Works of George Berkeley, Bishop of Cloyne, Thomas Nelson and Sons, 1948–1957.

৯.Berkeley, George. Three Dialogues between Hylas and Philonous. Edited by Jonathan Dancy, Oxford University Press, 1998.

১০.Bennett, Jonathan. Locke, Berkeley, Hume: Central Themes. Oxford University Press, 1971.

১১.Downing, Lisa. The Cambridge Companion to Berkeley. Cambridge University Press, 2005.

১২.Foster, John. The Case for Idealism. Routledge, 1982.

১৩.Hume, David. A Treatise of Human Nature. Edited by David Fate Norton and Mary J. Norton, Oxford University Press, 2000.

১৪.Kant, Immanuel. Critique of Pure Reason. Translated by Paul Guyer and Allen W. Wood, Cambridge University Press, 1998.

১৫.Jesseph, Douglas M. Berkeley’s Philosophy of Mathematics. University of Chicago Press, 1993.

১৬.Luce, A. A. The Life of George Berkeley, Bishop of Cloyne. Thomas Nelson and Sons, 1949.

১৭.Locke, John. An Essay Concerning Human Understanding. Edited by Peter H. Nidditch, Clarendon Press, 1975.

১৮.Pitcher, George. Berkeley. Routledge and Kegan Paul, 1977.

১৯.Sosa, Ernest. A Virtue Epistemology: Apt Belief and Reflective Knowledge. Oxford University Press, 2007.

২০.Tipton, I. C. Berkeley: The Philosophy of Immaterialism. Methuen, 1974.

আরও পড়ুন