শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’: একটি বাখতিনীয় পাঠ-পর্যালোচনা

১.
বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬–১৯৩৮) রচিত রাজনৈতিক উপন্যাস পথের দাবী শুধু সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি নয়, বরং তা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিবাদ। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হলেও, এর বিপ্লবাত্মক চরিত্র ও চিন্তার কারণে ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার উপন্যাসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই নিষেধাজ্ঞা উপন্যাসের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ ও প্রচার করে।
কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস পথের দাবী জন্ম নিয়েছিল এক ধরনের দ্বন্দ্ব ও প্রতিবাদের পরিবেশে—লেখকের নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব উপন্যাসটির জনপ্রীতিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং তার বিপরীতে সাধারণ পাঠকের মধ্যে তা সৃষ্টি করেছিল আলোড়ন, উদ্দীপনা এবং চেতনার এক নতুন ঢেউ। তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে জেগে উঠেছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস এবং সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা।
বঙ্গবাণী পত্রিকার মালিক নতুন লেখার খোঁজে শরৎচন্দ্রের দ্বারস্থ হলে লেখক জানান, তার কাছে প্রকাশযোগ্য কিছু নেই। কিন্তু মালিকের চোখে পড়ে একটি পাণ্ডুলিপি—পথের দাবী। শরৎচন্দ্র তা ছাপাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তবুও একপ্রকার চাপ ও অনুরোধে উপন্যাসটি ১৯২৬ সালের ৩ মার্চ প্রকাশিত হয়। এটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, ছিল সময়ের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সাহসী উচ্চারণ। সমাজের অবহেলিত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের বঞ্চনার বাস্তবচিত্র এতে উঠে এসেছে গভীর দৃষ্টিতে। বইটির মূলমন্ত্রই যেন হয়ে দাঁড়ায়: “আমরা সবাই পথিক। মানুষের মনুষ্যত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবি অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙ্গেচুরে চলব।”
ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষে যখন শাসনের নামে অন্যায় আর বৈষম্য চলছিল, তখন এই উপন্যাস ছিল এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। শরৎচন্দ্র বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা কেবল দু’বেলা ভাত নয়, বরং তা হলো চিন্তার, মতের, জীবনের, পথচলার পূর্ণ অধিকার। শ্বেতাঙ্গদের কাছে ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, শোষকের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত আইন এবং নিপীড়িতদের ন্যায় বিচারের বঞ্চনা—সবকিছু মিলেই তিনি দেখিয়েছেন একটি শোষিত সমাজের বাস্তব চেহারা। এই চেহারাকে পাল্টাতে হলে প্রয়োজন ছিল জাগরণ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের।
পথের দাবী-এর সব্যসাচী চরিত্রে মূর্ত হয়েছে এই সংগ্রামী চেতনা। গান্ধীর অহিংস পথের ভিন্ন সুরে শরৎচন্দ্র তুলে ধরেন সরাসরি প্রতিরোধের ধারণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবর্তনের জন্য সমাজকে আঘাত করতে হয়। তার এই মনোভাবের প্রতিফলন ছিল বিপ্লবী সূর্যসেনকে উৎসর্গকৃত আশীর্বাদে, যেখানে তিনি বলেন, “পথের দাবীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সূর্যসেন। আমার আশীর্বাদ রইলো তার সাথে।”
সব্যসাচী বিপ্লবের নায়ক হলেও তিনি নিছক একজন যোদ্ধা নন, একজন গভীর চিন্তক। তার মনে প্রশ্ন জাগে—প্রান্তিক মানুষেরা কেন স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত? কেন স্বাধীনতা বোঝার আগেই তারা নিজেকে শোষণের সঙ্গে মানিয়ে নেয়? এর বিপরীতে আছে অপূর্বর চরিত্র, যে সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি। অপূর্বর চরিত্রে প্রকাশ পায় সেই আত্মপরাধীনতা, যে শিকল বাইরের নয়, ভেতরের। নিজের স্বার্থ রক্ষায় সঙ্গীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাও করে সে। এখানেই উপন্যাসটি হয়ে ওঠে কেবল রাজনৈতিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণও।
নারী চরিত্রের ক্ষেত্রেও শরৎচন্দ্র ভাঙেন প্রচলিত রূপরেখা।সুমিত্রা, যার প্রকৃত নাম রোজ দাউদ, উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র। প্রথম জীবনে তিনি চোরাচালানে যুক্ত থাকলেও সব্যসাচীর প্রভাবে তিনি পথের দাবীর সভাপতি হন এবং একজন সাহসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি গোপনে সব্যসাচীকে ভালোবাসতেন এবং তার আদর্শকে শ্রদ্ধা করতেন।পথের দাবী-এর সুমিত্রা যেন বাস্তবের সাহসিনী বিমলার প্রতিরূপ—যিনি একসময় ছিলেন পতিতাপল্লীতে, পরে হয়েছিলেন দেশপ্রেমের প্রতীক। শরৎচন্দ্রকে প্রশ্ন করা হলে সুমিত্রা কি বিমলা, তিনি বলেন—“হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে, মেয়েটা কিন্তু সত্যিকার প্যাট্রিয়ট।” এই বক্তব্যে তিনি নারীকে সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও দেশপ্রেমের অনন্য উচ্চতায় স্থাপন করেন।
ভারতী চরিত্রটি শক্তিশালী, স্বাধীনচেতা ও বুদ্ধিমতী এক নারী, যিনি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ডাক্তার সাহেব বা সব্যসাচীকে ভাই এবং সুমিত্রাকে বোনের মতো ভালোবাসতেন। অপূর্বর সাথে তার সম্পর্ক শুরুতে টানাপোড়েনপূর্ণ হলেও, একসময়ে তা ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। উপন্যাসের শেষদিকে তারা একসঙ্গে চীনে সমুদ্রযাত্রা করেন, যা তাদের ভবিষ্যতের সংগ্রামের ইঙ্গিত বহন করে।
তালভালকার নামক মারাঠি চরিত্রটি বিপ্লবী চেতনার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। অপূর্বর সহকর্মী ও বন্ধু হিসেবে তিনি সমিতিতে যোগ দেন এবং জনসমক্ষে বিদ্রোহমূলক বক্তব্য দেওয়ায় তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন সহ্য করতে হয়।
করুণাময়ী, অপূর্বর মা, ছিলেন এক আদর্শ স্নেহময়ী মা, তবে গোঁড়া ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পরিবারে প্রায় একাকী। তার ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, যদিও তার কট্টরপন্থী মনোভাব তাকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়।
উপন্যাসটি কেবল সাহিত্যের স্তরে থেকে যায়নি, রাজনৈতিক স্তরেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তৎকালীন পুলিশ কমিশনার, চিফ সেক্রেটারি এবং পাবলিক প্রসিকিউটর। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি উপন্যাসটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তবে ততদিনে বইটি প্রায় তিন হাজার কপি পাঠকের হাতে পৌঁছে গেছে। দেশজুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। আইনসভাতেও উঠে আসে এই ইস্যু। সুভাষচন্দ্র বসু ও হরেন্দ্রনাথ চৌধুরীর মতো নেতারা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। শরৎচন্দ্রকে প্রস্তাব দেওয়া হয় কিছু পরিবর্তন করার, কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন—“এক শব্দও পরিবর্তন করব না।”
এমন অবস্থায় শরৎচন্দ্র লিখে পাঠান চিঠি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, নিষেধাজ্ঞা তোলার জন্য যেন তিনি প্রভাব খাটান। রবীন্দ্রনাথের জবাবে ছিল সতর্ক, কিন্তু কূটনৈতিক ভাষায় লুকানো সমালোচনা। তিনি লেখেন, পথের দাবী উত্তেজক, কিন্তু শক্তিশালী লেখক হিসেবে শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা দরকার ছিল ব্রিটিশদের। একই সঙ্গে বলেন, “শক্তিকে আঘাত করলে তার প্রতিঘাত সহ্য করার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।”
রবীন্দ্রনাথের এমন জবাবে শরৎচন্দ্রও চুপ থাকেননি। তিনি লেখেন, “বাংলা ভাষায় এ ধরনের বই কেউ লেখে না বলেই আমি লিখেছি। মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকলে শাস্তি পেতেই হবে। তবে প্রতিবাদ করব গ্রন্থ রচনা করেই।” এই জবাবে তিনি দেখিয়ে দেন, সাহিত্যের কাজ শুধু বিনোদন নয়, বরং সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও সাহিত্য হতে পারে এক ধরনের প্রতিবাদ।
পথের দাবী একটি প্রামাণ্য দলিল, যা ঘুমন্ত সমাজকে জাগিয়ে তুলতে চায়। শোষণ, বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ন্যায়বিচারের অভাব—সবকিছুর বিরুদ্ধে এই উপন্যাস একটি দৃঢ় উচ্চারণ। বইটি শুধুই একটি কাহিনি নয়, বরং এক সংগ্রামের দলিল, এক স্বপ্নের প্রকাশ। তার পথ চলা কখনও সহজ ছিল না, বরং নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে এই সাহিত্যিক বিপ্লব। শেষ পর্যন্ত এই বিপ্লব কতটা সফল, তা সময়ের বিচার এবং পাঠকের অনুভবই বলে দেবে। তবে এতটুকু নিশ্চিত—পথের দাবী তার দাবির ভাষা আজও অম্লান রেখেছে।
মাসুদুল হক : কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক
