মহাশ্বেতার শতবর্ষে দুই বাংলায় হিরন্ময় নীরবতা

একজন লেখকের জন্মের একশো বছর পূর্ণ হয়েছে। তিনি জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন র্যামন ম্যাগসেসে। পেয়েছেন পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণ। তাঁর লেখা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে, পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক সাহিত্যজগতেও। বাংলা ভাষার একজন লেখকের ক্ষেত্রে এমন উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে গর্বের। অথচ তাঁর জন্মশতবর্ষে সেই অনুপাতে কোনও বৃহৎ সাংস্কৃতিক আলোড়ন চোখে পড়ছে না। বিস্ময়টা এখানেই—মহাশ্বেতা দেবীর শতবর্ষে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক জগত এত নীরব কেন?
১৪ জানুয়ারি ১৯২৬-এ ঢাকায় জন্মেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। ২০২৬ তাঁর জন্মশতবর্ষ। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনই দেশভাগের পর তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে কোনও একটি ভূখণ্ডের সীমানায় আবদ্ধ করা যায় না। তিনি বাংলা ভাষার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের লেখক। দুই বাংলার পাঠকের কাছেই তাঁর সাহিত্য পৌঁছেছে, আলোচিত হয়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রশ্ন করেছে। তাই তাঁর শতবর্ষও শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, সমগ্র বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কাছে আত্মসমীক্ষার একটি মুহূর্ত।
একটি শতবর্ষ নিছক জন্মতারিখের পুনরাবৃত্তি নয়; একজন স্রষ্টার কাজকে নতুন সময়ের আলোয় ফিরে দেখার বিরল সুযোগ। মহাশ্বেতা দেবীর ক্ষেত্রে সেই পুনর্পাঠের প্রয়োজন আরও গভীর। কারণ তাঁর সাহিত্য বাংলা ভাষার পরিচিত সামাজিক পরিসরকে বহুদূর প্রসারিত করেছিল। তিনি সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন এমন মানুষদের, যাঁরা দীর্ঘদিন সমাজ ও সাহিত্যের মূল স্রোতে প্রায় অদৃশ্য ছিলেন।
আদিবাসী, শবর, মুন্ডা, শ্রমজীবী, ভূমিহীন, দরিদ্র, নিপীড়িত নারী—তাঁদের তিনি করুণার পাত্র করে দেখেননি। দিয়েছেন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, মর্যাদা ও কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্য তাই কেবল প্রান্তিক জীবনের বিবরণ নয়; মানুষের অস্তিত্ব, সামাজিক বৈষম্য, ক্ষমতার কাঠামো এবং প্রতিরোধেরও গভীর অনুসন্ধান।
‘অরণ্যের অধিকার’-এর বিরসা মুন্ডা, ‘হাজার চুরাশির মা’-এর সুজাতা, ‘দ্রৌপদী’-র দ্রৌপদী—বাংলা সাহিত্যের স্মরণীয় চরিত্রগুলির মধ্যে তাঁরা আজও জীবন্ত। ‘রুদালী’, ‘স্তনদায়িনী’, ‘তিতুমীর’-সহ তাঁর অসংখ্য রচনায় ইতিহাস, সমাজ, নারীজীবন, বঞ্চনা ও প্রতিরোধ নানা মাত্রায় উঠে এসেছে। তাঁর বড় শক্তি এখানেই—তিনি পাঠককে শুধু কাহিনি শোনাননি, দেখার অভ্যাস বদলে দিয়েছেন। সমাজের যে অংশকে আমরা দূরে রাখি, তাঁর সাহিত্য সেই অংশের দরজা খুলে দিয়েছে।
এই কারণেই তাঁর জন্মশতবর্ষে প্রশ্নটি শুধু কতগুলি অনুষ্ঠান হল, কতগুলি স্মরণসভা আয়োজন করা হল, তা নয়। আসল প্রশ্ন—মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যকে আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে কতটা ফিরিয়ে দিতে পারলাম? তাঁর রচনাগুলি কি নতুন পাঠকের হাতে পৌঁছল? তাঁর সাহিত্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক, গবেষণা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্র তৈরি হল? দুই বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসর কি তাঁর শতবর্ষকে নতুন পাঠের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল?
এখানেই আমাদের সাংস্কৃতিক দায়। একজন লেখকের স্মৃতি কোনও একটি প্রতিষ্ঠান বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সাহিত্যিক, সম্পাদক, প্রকাশক, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্রকার এবং পাঠক—প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। মহাশ্বেতা দেবীর জন্মশতবর্ষ ছিল এই সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের একটি বিরল সুযোগ।
সাহিত্যপত্রগুলি তাঁর সাহিত্য নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে পারে, তাঁর রচনার নতুন পাঠ ও সমালোচনার জায়গা তৈরি করতে পারে। প্রকাশকেরা গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলির প্রামাণ্য ও সুলভ সংস্করণ প্রকাশ করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সাহিত্যচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, নারী-অধ্যয়ন ও আদিবাসী অধ্যয়নের সঙ্গে তাঁর সাহিত্যকে যুক্ত করে নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। নাট্যদল ও চলচ্চিত্রকারেরা তাঁর রচনাকে সমকালীন শিল্পভাষায় নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন।
এই কাজ দুই বাংলাতেই হতে পারে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্যপত্র, প্রকাশনা সংস্থা, গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিও তাঁর সাহিত্য নিয়ে পাঠচক্র, আলোচনা, গবেষণা, অনুবাদ ও মঞ্চায়নের উদ্যোগ নিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরের যৌথ উদ্যোগ হলে এই শতবর্ষ আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। বাংলা ভাষার সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে রাজনৈতিক সীমানার বাইরে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখারও এ এক সুযোগ।
স্কুল-কলেজেও কাজটি কঠিন নয়। পরীক্ষার প্রস্তুতির বাইরে একটি গল্প নিয়ে একটি ক্লাস, একটি পাঠচক্র, একটি মুক্ত আলোচনা—এভাবেই একজন নতুন পাঠকের সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবীর পরিচয় ঘটতে পারে। একটি বইয়ের সঙ্গে একজন তরুণের গভীর পরিচয় অনেক সময় একটি বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। কারণ সাহিত্য শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানে নয়, পাঠকের মনে বেঁচে থাকে।
সাহিত্য অকাদেমির কাছেও প্রত্যাশা রয়েছে। ১৯৭৯ সালে ‘অরণ্যের অধিকার’-এর জন্য মহাশ্বেতা দেবী এই প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার পেয়েছিলেন। ফলে তাঁর জন্মশতবর্ষে নির্বাচিত রচনার নতুন সংস্করণ, ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ, গবেষণা এবং সর্বভারতীয় সাহিত্যিক আলোচনার উদ্যোগ প্রত্যাশিত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে মহাশ্বেতা দেবীর স্মরণের দায় শুধু সাহিত্য অকাদেমির নয়; তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার গোটা সাংস্কৃতিক সমাজের।
সরকারের ভূমিকাও থাকতে পারে—বিশেষত স্কুল, গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে যুক্ত করে তাঁর সাহিত্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও সরকারি অনুষ্ঠান একজন লেখককে জীবিত রাখে না। তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে পাঠ।
আর এখানেই মহাশ্বেতা দেবীর বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা সবচেয়ে স্পষ্ট। তিনি যে প্রশ্নগুলি তুলেছিলেন, সেগুলির অনেকগুলিই এখনও আমাদের সমাজের অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রান্তিক মানুষের অধিকার, ভূমি ও জীবিকার নিরাপত্তা, আদিবাসী সমাজের অস্তিত্ব ও মর্যাদা, নারীর ওপর নিপীড়ন, সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষমতার অসম বণ্টন—এসব কোনও অতীতের বিষয় হয়ে যায়নি। সময় বদলেছে, সমস্যার চেহারা বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নগুলির অনেকটাই রয়ে গেছে।
আজ উন্নয়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা যখন বলা হয়, তখন তার কেন্দ্রে মানুষের জীবন, ভূমি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্ন কতটা থাকে—মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য আমাদের সেই প্রশ্ন করতে শেখায়। তাঁর লেখায় আদিবাসী বা দরিদ্র মানুষ কোনও পরিসংখ্যান নন, কোনও ‘উন্নয়ন-প্রকল্পের উপকারভোগী’ও নন; তাঁরা নিজস্ব ইতিহাস, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আজকের সমাজেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
নারীর ক্ষেত্রেও তাঁর সাহিত্য বর্তমানকে প্রশ্ন করে। ‘দ্রৌপদী’, ‘স্তনদায়িনী’ কিংবা ‘হাজার চুরাশির মা’-এর নারীচরিত্রগুলি শুধু নিপীড়নের শিকার নন; তাঁরা প্রশ্ন করেন, প্রতিরোধ করেন, প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোকে অস্বস্তিতে ফেলেন। নারী-নিরাপত্তা, শরীরের ওপর অধিকার, সামাজিক বৈষম্য ও লিঙ্গ-সম্পর্ক নিয়ে আজকের আলোচনায় তাঁদের নতুন করে পড়া প্রয়োজন। তাঁর চরিত্রগুলি আমাদের আরামদায়ক নৈতিকতার সামনে যে অস্বস্তি তৈরি করে, সেই অস্বস্তিই তাঁদের এখনও জীবন্ত রাখে।
তাঁর ইতিহাসচেতনারও আজ নতুন মূল্য রয়েছে। তিনি ইতিহাসকে শুধু রাজা, শাসক বা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার চোখ দিয়ে দেখেননি; ইতিহাসের নীচের তলায় চাপা পড়ে থাকা মানুষ, বিদ্রোহ, ক্ষুধা, বঞ্চনা ও প্রতিরোধকে সামনে এনেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু যা লেখা হয়েছে তার নয়, যা লেখা হয়নি তারও অনুসন্ধান। বর্তমানের ইতিহাসচর্চা, সমাজবিজ্ঞান, সাংবাদিকতা এবং জনস্মৃতির আলোচনাতেও এই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ।
আর একটি কারণে মহাশ্বেতা দেবী আজ জরুরি। তিনি সাহিত্য ও বাস্তব জীবনের মধ্যে দূরত্ব কমিয়েছিলেন। মানুষের জীবনকে কাছ থেকে জানা, মাঠে যাওয়া, প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে নিজের সৃষ্টির ভিতরে নিয়ে আসা তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল সময়ে, যখন অনেক সামাজিক সংকট কয়েকটি ছবি, পোস্ট বা পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাঁর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষকে সত্যিই বুঝতে হলে তার জীবনের কাছে যেতে হয়।
তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচয়ের কথাও যথাযথভাবে মনে রাখা দরকার। তাঁর রচনা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ২০০৯ সালে তিনি Man Booker International Prize-এর shortlist-এ ছিলেন। তাঁর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কোনও অতিরঞ্জিত বা অনিশ্চিত তথ্যের প্রয়োজন নেই। তাঁর সাহিত্যই যথেষ্ট।
এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। তাঁর পাণ্ডুলিপি, চিঠি, সাক্ষাৎকার, আলোকচিত্র ও অন্যান্য উপাদান নিয়ে একটি প্রামাণ্য ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ রচনার সুলভ সংস্করণের পাশাপাশি ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুবাদ বাড়ানো দরকার। তরুণ গবেষকদের জন্য ফেলোশিপ, বার্ষিক বক্তৃতামালা এবং তাঁর সাহিত্য নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণা-প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য যাঁদের জীবন থেকে উঠে এসেছে, তাঁদেরও এই পুনর্পাঠের অংশ করতে হবে। আদিবাসী ও প্রান্তিক সমাজের লেখক, শিল্পী ও গবেষকদের কণ্ঠ সামনে আনতে হবে। তাঁদের জীবনকে শুধু গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতাকেও সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে। সেটিই হবে মহাশ্বেতা দেবীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সবচেয়ে অর্থপূর্ণ সম্মান।
তাঁকে স্মরণ করার অর্থ তাঁকে কোনও পূজার আসনে বসানোও নয়। বড় লেখককে জীবিত রাখার উপায় তাঁকে প্রশ্নহীন করে দেওয়া নয়; বরং নতুন প্রশ্ন নিয়ে তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া। তাঁর ভাষা, ইতিহাসচেতনা, চরিত্র নির্মাণ, সমাজদৃষ্টি এবং সাহিত্যিক কৌশল নিয়ে নতুন গবেষণা ও বিতর্কের দরজা খুলে দেওয়া প্রয়োজন। সময় বদলালে বড় সাহিত্যও নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে—মহাশ্বেতা দেবীর ক্ষেত্রেও সেটিই হওয়া উচিত।
এই জন্মশতবর্ষে তাই সাংস্কৃতিক জগতের কাছে আহ্বানটি স্পষ্ট। একদিনের স্মরণসভা নয়—দীর্ঘমেয়াদি পাঠের ব্যবস্থা হোক। শুধু স্মৃতিচারণ নয়—নতুন গবেষণা হোক। শুধু পুনর্মুদ্রণ নয়—অনুবাদ বাড়ুক। শুধু কলকাতা বা ঢাকায় বিচ্ছিন্ন অনুষ্ঠান নয়—দুই বাংলার জেলা, মফস্সল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারের পাঠক যুক্ত হোক। দুই বাংলার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি পারস্পরিক সহযোগিতায় তাঁর রচনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিক।
এই কাজের জন্য কোনও একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। যে যার জায়গা থেকে শুরু করতে পারে। একজন সম্পাদক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে পারেন। একজন প্রকাশক নতুন সংস্করণ আনতে পারেন। একজন শিক্ষক ছাত্রদের একটি গল্প পড়াতে পারেন। একটি গ্রন্থাগার পাঠচক্র করতে পারে। একটি নাট্যদল তাঁর গল্প মঞ্চস্থ করতে পারে। একজন চলচ্চিত্রকার তাঁর কোনও রচনাকে নতুন ভাষায় পর্দায় আনতে পারেন। একজন গবেষক নতুন প্রশ্ন তুলতে পারেন। আর একজন সাধারণ পাঠক তাঁর বই খুলে বসতে পারেন।
এই শেষ কাজটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মহাশ্বেতা দেবীর প্রকৃত স্মৃতিস্তম্ভ কোনও ভবন নয়, কোনও ফলক নয়, কোনও অনুষ্ঠানও নয়—তাঁর বই। সেই বই যতদিন নতুন পাঠকের হাতে যাবে, ততদিন মহাশ্বেতা দেবী বেঁচে থাকবেন।
তবু প্রশ্নটি থেকে যায়—একজন জ্ঞানপীঠপ্রাপ্ত, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লেখকের জন্মশতবর্ষে যদি বাংলা ভাষার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসর প্রত্যাশিত মাত্রায় আলোড়িত না হয়, তবে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক স্মৃতি নিয়েই কি নতুন করে ভাবার সময় আসেনি?
মহাশ্বেতা দেবী সারা জীবন বিস্মৃত মানুষদের কথা লিখেছেন। তাঁদের জীবন, বেদনা, সংগ্রাম ও স্বপ্নকে তিনি সাহিত্যের স্থায়ী স্মৃতিতে স্থান দিয়েছেন। তাঁর কলম যাঁদের দৃশ্যমান করেছে, তাঁদের কথা মনে রাখার মধ্যেই তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার রক্ষার প্রথম শর্ত। তাঁর শতবর্ষে তাই তাঁকে বিস্মৃতির হাতে তুলে দেওয়া শুধু একজন লেখকের প্রতি অবিচার নয়—আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির প্রতিও অবিচার।
শতবর্ষের একটি বছর পেরিয়ে গেলেও পুনর্পাঠের সময় শেষ হয়নি। বরং এখনই শুরু হতে পারে নতুন প্রকাশনা, নতুন অনুবাদ, নতুন গবেষণা, নতুন মঞ্চায়ন, নতুন পাঠচক্র। তৈরি হতে পারে এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর, যেখানে মহাশ্বেতা দেবী শুধু স্মরণীয় নন—প্রাসঙ্গিকও। কারণ একজন বড় লেখকের জন্মশতবর্ষের সবচেয়ে বড় সাফল্য কতগুলি মাল্যদান, বক্তৃতা বা স্মরণসভায় নয়; কতজন নতুন পাঠক তাঁর কাছে ফিরে এলেন, তার মধ্যে।
তাই মহাশ্বেতা দেবীর শতবর্ষ কোনও আনুষ্ঠানিক স্মরণে শেষ না হয়ে দুই বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পুনর্পাঠের সূচনা হোক। নীরবতা ভাঙুক। বই খুলুক। আলোচনা শুরু হোক। নতুন প্রজন্ম মহাশ্বেতা দেবীকে আবার আবিষ্কার করুক। সেখানেই তাঁর শতবর্ষের প্রকৃত সার্থকতা।
দীপক সাহা : কলামিস্ট, পশ্চিমবঙ্গ
