বাংলার চোখে গান্ধী: ভালোবাসা, প্রশ্ন ও ক্ষত

বাংলার কাছে গান্ধী কে? শুধু অহিংসার প্রবক্তা, স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নৈতিক প্রতীক? নাকি তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নোয়াখালির আতঙ্ক, দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু জীবনের দীর্ঘ বেদনা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে একাংশের গভীর অভিমান? বাংলার ইতিহাসে গান্ধীকে বুঝতে গেলে এই দুই স্মৃতিকেই পাশাপাশি রাখতে হয়। কারণ গান্ধী এখানে শুধু শ্রদ্ধার মানুষ নন, প্রশ্নেরও মানুষ।

আর সেই ইতিহাসে গান্ধীর পাশে অনিবার্যভাবেই উঠে আসে আরও দুটি নাম—শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং সুভাষচন্দ্র বসু। তিনজনের রাজনৈতিক পথ এক ছিল না, তাঁদের ভাবনার জায়গাও এক ছিল না। গান্ধীর কাছে অহিংসা, নৈতিক শক্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান ভিত্তি। শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় হিন্দু বাঙালির নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ। আর সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে স্বাধীনতা ছিল আপসহীন জাতীয় মুক্তির লক্ষ্য, যার জন্য তিনি কংগ্রেসের প্রচলিত নেতৃত্বের সঙ্গেও সংঘাতে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। এই তিনটি স্রোতকে পাশাপাশি না রাখলে বাংলার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।

তবে শুরুতেই একটি সীমারেখা টানা জরুরি। নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক হিংসার জন্য গান্ধী দায়ী ছিলেন না। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরের ভয়াবহতার খবর পাওয়ার পর তিনি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৬ নভেম্বর কলকাতা থেকে রওনা হয়ে ৭ নভেম্বর চৌমুহনীতে পৌঁছন। আক্রান্ত গ্রামগুলিতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলা, ভয় কমানো, সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় মুসলমানদের নৈতিক দায়িত্বের কথা বলা এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল তাঁর শান্তি মিশনের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৪৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি নোয়াখালির গ্রামগুলিতে পায়ে হেঁটে ঘুরে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে থাকেন।

এই জায়গাটি মনে রাখা জরুরি। গান্ধী নোয়াখালির হিংসার কারণ ছিলেন না; তিনি গিয়েছিলেন হিংসার পরে। তাঁর কাছে রাজনৈতিক কাজের অর্থ শুধু ক্ষমতার সমীকরণ ছিল না—মানুষের বিবেককে জাগানোও ছিল তার অংশ। সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক দায়িত্ব সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—নোয়াখালিতে তাঁর কাজের মধ্যে এই বিশ্বাসই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এখানেই তাঁর রাজনীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। হিংসায় আক্রান্ত মানুষের কাছে নৈতিক আবেদন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল প্রশাসনিক নিরাপত্তা, অপরাধীর বিচার, সম্পত্তির সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোয় নিরাপদ অস্তিত্বের নিশ্চয়তা। গান্ধীর নৈতিক শক্তি পুলিশ-প্রশাসনের বিকল্প ছিল না, রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন ব্যবস্থারও বিকল্প ছিল না। ফলে তাঁর উদ্যোগের মানবিক গুরুত্ব স্বীকার করেও বলা যায়, তাঁর পদ্ধতি সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

এই জায়গাতেই হিন্দু বাঙালির একটি অংশের গান্ধী-অভিমানকে বোঝা যায়। তাদের কাছে নোয়াখালি কোনও দূরের রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; ছিল ঘর হারানোর, আতঙ্কের, আত্মীয়স্বজনের বিচ্ছেদের স্মৃতি। তাঁদের প্রশ্ন ছিল—সম্প্রীতির আহ্বান যদি থাকে, তবে আক্রান্ত মানুষের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? অপরাধীর বিচার কে করবে? ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামোয় সংখ্যালঘুর অধিকার কীভাবে রক্ষা হবে?

গান্ধীর উত্তর ছিল নৈতিকতা, আস্থা ও সহাবস্থান। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তর ক্রমশ নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে এগোয়। এই পার্থক্যকে শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি ছিল একই সংকটের সামনে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক অগ্রাধিকার।

অখণ্ড বাংলার প্রশ্নেও এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গান্ধী দেশভাগের সমর্থক ছিলেন না। ১৯৪৭ সালে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। অখণ্ড বাংলার সম্ভাবনা নিয়ে শরৎচন্দ্র বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছিল। বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর আলোচনা হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাকে ভাগ করার কোনও সরল পরিকল্পনার অংশ ছিলেন গান্ধী—এমন ধারণা ইতিহাসসম্মত নয়।

কিন্তু হিন্দু বাঙালির একটি অংশের আশঙ্কাও ছিল বাস্তব। নোয়াখালি ও পূর্ববঙ্গের হিংসার পরে তাদের প্রশ্ন ছিল—অখণ্ড বাংলায় ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য কী হবে? হিন্দুদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হবে? প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলার ওপর আস্থা রাখা যাবে তো? গান্ধী যে নৈতিক সহাবস্থানের কথা বলছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ সেই সহাবস্থানের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন। তাই তাঁদের বিতর্ককে শুধু ‘সম্প্রীতি বনাম সাম্প্রদায়িকতা’ বলে দেখলে বিষয়টি অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়। এর মধ্যে নিরাপত্তা, প্রতিনিধিত্ব, সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নও ছিল।

বাংলাভাগের ইতিহাসও কোনও একজন মানুষের হাতে লেখা হয়নি। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্রিটিশ সরকারের নীতি, পাকিস্তানের দাবি, সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গের দাবিকে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জন্মকে শুধু তাঁর একক কৃতিত্ব বলা যেমন ইতিহাসকে সরল করে, তেমনই গান্ধী দেশভাগ ঠেকাতে পারেননি বলে তাঁকেই দেশভাগের জন্য দায়ী করাও ইতিহাসসম্মত নয়।

গান্ধীর বাংলার ভূমিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি হল কলকাতা, ১৯৪৭। স্বাধীনতার প্রাক্কালে যখন দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি চলছে, গান্ধী তখন কলকাতায়। ১৩ আগস্ট তিনি বেলেঘাটার হায়দারি ম্যানশনে ওঠেন—সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় জর্জরিত শহরের এক অশান্ত এলাকায়। ১৫ আগস্ট তিনি উৎসবের পরিবর্তে উপবাস ও প্রার্থনায় দিন কাটান। ৩১ আগস্ট কলকাতায় আবার হিংসা শুরু হলে তিনি অনশন শুরু করেন। ৪ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন পক্ষের মানুষ হিংসা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি অনশন ভাঙেন। তাঁর উপস্থিতির সঙ্গে কলকাতার সেই সাময়িক শান্তি পরবর্তীকালে ‘মিরাকল অব ক্যালকাটা’ নামে পরিচিত হয়।

এই ঘটনাকে অতিরঞ্জিত না করেও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। গান্ধীর ব্যক্তিগত উপস্থিতি, নৈতিক চাপ এবং অনশন কলকাতার পরিস্থিতি শান্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু একটি শহরে সাময়িকভাবে হিংসা থামানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সাম্প্রদায়িক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান এক বিষয় নয়। কলকাতায় তাঁর নৈতিক নেতৃত্বের শক্তি যেমন প্রকাশ পেয়েছিল, তেমনই বোঝা গিয়েছিল যে নৈতিক নেতৃত্ব একা রাষ্ট্রের সব রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও পুনর্বাসন সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

আর এখানেই বাংলার গান্ধী-স্মৃতি দ্বিমুখী হয়ে ওঠে। কলকাতার বেলেঘাটায় তিনি শান্তির জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে রেখেছিলেন। নোয়াখালিতে তিনি আক্রান্ত মানুষের কাছে হেঁটে গিয়েছিলেন। কিন্তু পূর্ববঙ্গ থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে চলে আসা বহু পরিবারের স্মৃতিতে গান্ধীর সময় মানেই ছিল এক গভীর বিপর্যয়ের সময়। তাঁদের কাছে প্রশ্ন ছিল—যে দেশ স্বাধীন হল, সেই স্বাধীনতার ভোরে তাঁদের নিজেদের ঘর কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উদ্বাস্তু সমস্যার দিকে তাকাতেই হবে। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু উদ্বাস্তুদের আগমন ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও বহু পর্যায়ের। পাঞ্জাবের মতো বাংলায় দ্রুত জনবিনিময় ঘটেনি। পূর্ববঙ্গের বহু মানুষ প্রথমে ওপারে থেকে গিয়েছিলেন; পরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। ফলে বাংলার উদ্বাস্তু সমস্যা হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী। পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের দুর্ভোগ কম ছিল—এমন বলা যাবে না। সেখানে দেশভাগের সময় ভয়াবহ হিংসা ও দ্রুত জনবিনিময় হয়েছিল। কিন্তু সেই দ্রুত জনবিনিময়ের ফলে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ও কৃষিজমি পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে পুনর্বাসনের একটি আলাদা কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। বাংলায় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ফলে পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুদের একাংশকে দীর্ঘদিন শিবির, কলোনি, জমি ও জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে দণ্ডকারণ্যসহ দূরবর্তী অঞ্চলে পুনর্বাসনের উদ্যোগও নেওয়া হয়। বাংলার বঞ্চনার বড় জায়গাটি এখানেই—উদ্বাস্তু হওয়া তাঁদের জন্য একটি সাময়িক ঘটনা হয়ে থাকেনি; বহু পরিবারের কাছে তা হয়ে উঠেছিল প্রজন্মব্যাপী বাস্তবতা।

সরকারি হিসাবও সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝায়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাবে ১৯৪৬ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় ৫২.৩১ লক্ষ মানুষ ভারতে এসেছিলেন; তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪১.১৭ লক্ষকে ‘পুরনো উদ্বাস্তু’ এবং ১১.১৪ লক্ষকে ‘নতুন উদ্বাস্তু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পুরনো উদ্বাস্তুদের মধ্যে প্রায় ৩১.৩২ লক্ষ পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের জনগণনায় রাজ্যে displaced persons-এর সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ এবং ১৯৮১ সালের একটি মূল্যায়নে তা প্রায় ৮০ লক্ষে পৌঁছয়।

এই বঞ্চনা শুধু সরকারি পরিসংখ্যানের বিষয় ছিল না। শিবির, কলোনি, জমির অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সমস্যা এবং দূরবর্তী পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতা বহু পরিবারের জীবনকে বদলে দেয়। আবার উদ্বাস্তুরাও নিজেদের উদ্যোগে কলোনি গড়েছেন, স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, ব্যবসা ও পেশার মাধ্যমে নতুন জীবন তৈরি করেছেন। অর্থাৎ তাঁরা একই সঙ্গে বঞ্চিত এবং সংগ্রামী। তাঁদের ইতিহাসকে শুধু অসহায়তার ইতিহাস হিসেবে দেখলে যেমন অসম্পূর্ণ হয়, তেমনই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দিকটি অস্বীকার করলেও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে।

এই দীর্ঘ উদ্বাস্তু-অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় এক ধরনের স্থায়ী অভিমান—শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, ইতিহাসের প্রতিও। হারানো বাড়ি, পুকুর, জমি, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, গ্রামের রাস্তা, স্কুল, প্রতিবেশী—সব মিলিয়ে পূর্ববঙ্গ অনেক পরিবারের কাছে কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, হারিয়ে যাওয়া একটি জীবনজগৎ। সেই স্মৃতিতে গান্ধীও কখনও কখনও একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই আবেগকে ইতিহাসের সরল দায়ে পরিণত করা ঠিক নয়। গান্ধী ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতেই নিহত হন; পরবর্তী দীর্ঘ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন নীতি তাঁর হাতে ছিল না। সেই দায় স্বাধীন ভারতের সরকার, প্রশাসন ও পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বের।

বাঙালির গান্ধী-স্মৃতিতে আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজি বাঙালির কাছে শুধু একজন জাতীয় নেতা নন, গভীর আবেগের এক প্রতীক। সেই জনস্মৃতির একটি অংশের মধ্যে এমন ধারণাও রয়েছে যে গান্ধী ও কংগ্রেসের মূল নেতৃত্ব সুভাষের রাজনৈতিক পথের প্রতি যথেষ্ট ন্যায় করেননি। এই ধারণার পেছনে ১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেসের ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর গান্ধী-সমর্থিত নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মতপার্থক্য তীব্র হয়। কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটি, ভবিষ্যৎ কৌশল এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে—এসব প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত বসু সভাপতির পদ ছাড়েন এবং পরে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন। এই সংঘাত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কিন্তু গান্ধী ও নেতাজির সম্পর্ককে শুধুই ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। ২৫ মার্চ ১৯৩৯-এর এক বিবৃতিতে বসু লিখেছিলেন, তিনি গান্ধীর সব মত ও পরিকল্পনা নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করেন না, কিন্তু তাঁর আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। একই বিবৃতিতে তিনি বলেন, গান্ধীই কংগ্রেসকে সেই সংকট থেকে বের করে আনতে পারেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল তীব্র, কিন্তু সম্পর্কটি শুধু ব্যক্তিগত বিদ্বেষে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী জনস্মৃতিতে রাজনৈতিক সংঘাত প্রায়ই ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়। নেতাজির জনপ্রিয়তা যেমন বাঙালির কাছে গভীর আবেগের বিষয়, তেমনই গান্ধীর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সংঘাতও সেই আবেগের অংশ। কিন্তু ইতিহাসের দায়িত্ব হল আবেগকে অস্বীকার না করে তার ভিতরের ঘটনাগুলিকে আলাদা করে দেখা।

গান্ধী ও নেতাজি স্বাধীনতার পথ নিয়ে একমত ছিলেন না। গান্ধীর পথ ছিল গণআন্দোলন, অহিংস অসহযোগ এবং নৈতিক চাপ; সুভাষের পথ ক্রমশ হয়ে উঠেছিল আরও র‌্যাডিক্যাল, আন্তর্জাতিক শক্তির দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের সম্ভাবনা খোঁজা। তাঁদের লক্ষ্য স্বাধীনতা হলেও পথের প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল। এই পার্থক্যই পরবর্তী কালে দুই নেতার জনস্মৃতিকে আলাদা প্রতীকে পরিণত করেছে।

তাই বাংলার কাছে গান্ধীকে বুঝতে গেলে শুধু গান্ধীকে দেখলেই হয় না। দেখতে হয় নেতাজিকে, দেখতে হয় শ্যামাপ্রসাদকে, দেখতে হয় নোয়াখালির উদ্বাস্তু পরিবারকে, দেখতে হয় বেলেঘাটার সেই বাড়িকে যেখানে স্বাধীনতার দিনেও এক বৃদ্ধ নেতা উপবাসে ছিলেন। দেখতে হয় সেই পরিবারগুলিকেও, যারা দেশভাগের পরে নতুন করে জীবন শুরু করেছিল।

ইতিহাস শুধু রাষ্ট্রনায়কদের ইতিহাস নয়। ইতিহাস মানুষের স্মৃতিরও ইতিহাস। একজনের কাছে গান্ধী মানে অহিংসা। আর একজনের কাছে তিনি নোয়াখালির দিনগুলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। কারও কাছে বেলেঘাটার শান্তি, কারও কাছে হারানো পূর্ববঙ্গের বাড়ি। কারও কাছে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহাত্মা, কারও কাছে এমন এক নেতা যাঁর নৈতিক রাজনীতি বাস্তব নিরাপত্তার প্রশ্নে যথেষ্ট ছিল না। এই ভিন্ন স্মৃতিগুলিকে মুছে দিয়ে কোনও একটিকে একমাত্র সত্য ঘোষণা করলে বাংলার ইতিহাসকে বোঝা যাবে না।

তাই গান্ধীর মূল্যায়ন হওয়া উচিত না অন্ধ শ্রদ্ধায়, না অন্ধ প্রত্যাখ্যানে। নোয়াখালিতে তাঁর যাত্রা ছিল সাহসী মানবিক উদ্যোগ—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কলকাতায় তাঁর উপস্থিতি ও অনশন সাম্প্রদায়িক হিংসা থামানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল—এটিও নথিভুক্ত। দেশভাগের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানও স্পষ্ট। একই সঙ্গে তাঁর নৈতিক রাজনীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও ইতিহাসচর্চার অংশ। একজন নেতার মহত্ত্ব স্বীকার করার জন্য তাঁর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।

শ্যামাপ্রসাদকেও একই নির্মোহতায় দেখতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু তাঁকে একমাত্র ‘রক্ষাকর্তা’ বানালে যেমন ইতিহাস সরল হয়ে যায়, তেমনই তাঁকে কেবল একটি মতাদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে দেখলেও তাঁর সময়ের বাস্তব রাজনৈতিক উদ্বেগগুলি আড়াল হয়।

আর নেতাজির ক্ষেত্রেও আবেগের সঙ্গে ইতিহাসকে পাশাপাশি রাখতে হবে। তাঁর প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা গভীর ও স্বাভাবিক। কিন্তু গান্ধী-নেতাজি সম্পর্ককে শুধু ‘অন্যায়’ বা ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র শব্দে ব্যাখ্যা করলে ১৯৩৯-এর কংগ্রেস রাজনীতির জটিলতা হারিয়ে যায়। তাঁদের মতপার্থক্য ছিল বাস্তব, গভীর এবং ঐতিহাসিক; কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক স্বীকৃতির কিছু দিকও ছিল।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই—গান্ধী ভালো না শ্যামাপ্রসাদ, গান্ধী না নেতাজি—এমন নয়। ইতিহাস কোনও প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়। প্রশ্ন হল, একই সময়ের একই বাংলায় কেন এতগুলি ভিন্ন রাজনৈতিক উত্তর তৈরি হয়েছিল। একদিকে ছিল অহিংসা ও সম্প্রীতির স্বপ্ন, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আত্মরক্ষার দাবি, আবার অন্যদিকে আপসহীন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। ১৯৪৬-৪৭-এর রক্তাক্ত ইতিহাস এই তিন স্রোতকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। দেশভাগ সেই সংঘাতের একটি নির্মম পরিণতি। তার পরে উদ্বাস্তু জীবন, পুনর্বাসন, নতুন রাষ্ট্র, নতুন পরিচয়—সব মিলিয়ে সেই ক্ষত আরও গভীর হয়েছে।

বাংলার চোখে গান্ধী তাই কোনও একরঙা প্রতিকৃতি নন। তিনি নোয়াখালির পথে হাঁটা শান্তির দূত, বেলেঘাটায় হিংসার বিরুদ্ধে অনশনরত এক নৈতিক নেতা; আবার উদ্বাস্তু বাঙালির স্মৃতিতে তিনি এমন এক সময়ের প্রতীক, যখন স্বাধীনতা এসেছিল, কিন্তু বহু মানুষের কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল ঘর হারানো। তাঁর মহত্ত্ব স্বীকার করেও তাঁর রাজনীতির সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়; তাঁর সীমাবদ্ধতা দেখেও তাঁর মানবিক সাহস অস্বীকার করা যায় না। কারণ ইতিহাসের বিচার কোনও মূর্তি গড়া বা মূর্তি ভাঙার কাজ নয়। বাংলার ইতিহাসে গান্ধী তাই শেষ পর্যন্ত কোনও উত্তর নন—তিনি একটি অমোচনীয় প্রশ্ন: স্বাধীনতা যদি মানুষের ভিটে, নিরাপত্তা ও স্মৃতির ক্ষত সারাতে না পারে, তবে সেই স্বাধীনতার ইতিহাসকে আমরা কীভাবে মনে রাখব? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও একরৈখিক নয়। আর সেই কারণেই বাংলার স্মৃতিতে গান্ধী বেঁচে আছেন—শ্রদ্ধায়, বিতর্কে, ভালোবাসায় এবং ক্ষতচিহ্নের মতো এক দীর্ঘ প্রশ্ন হয়ে।

দীপক সাহা কলামিস্ট, পশ্চিমবঙ্গ 

আরও পড়ুন