আমার শিক্ষক: হায়াৎ মামুদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্রজীবনের সূচনালগ্নে আমি ছিলাম দর্শন বিভাগের ছাত্র, কিন্তু মন পড়ে থাকত সাহিত্যের জগতে। সেই টানেই কখনও কবিতা লিখতাম, কখনও ছোট কাগজে সম্পাদনার কাজ করতাম। তরুণ কবি হিসেবে সবার আগে যার দ্বারস্থ হয়েছিলাম, তিনি ড. হায়াৎ মামুদ। তখনো তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক নন, কিন্তু এক ধরনের আনুষ্ঠানিক দূরত্ব পেরিয়ে এক আত্মিক আকর্ষণ অনুভব করতাম তার প্রতি। প্রথম গিয়েছিলাম তার কাছে লেখা চাইতে, আমার সম্পাদিত “কবিতা সিরিজ” সংকলনের জন্য। সেই আমি তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র মাত্র। তার স্নিগ্ধ অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর পরিমিত অথচ সুনির্দিষ্ট বাক্য ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তখন তিনি বাংলা বিভাগের শিক্ষক, আর আমি দর্শনের ছাত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় তখন সাহিত্য, দর্শন ও নাটকের বিশিষ্ট শিক্ষকদের এক অসাধারণ সমাবেশ। ইংরেজি বিভাগে ছিলেন কবি মোহাম্মদ রফিক, শফি আহমেদ, ‘ড. খালিকুজ্জামান ইলিয়াস; বাংলা বিভাগে
মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম , আব্দুল কাইয়ুম, শামসুল হক,
ফাতেমা কাওসার প্রমুখ। নাটক ও নাট্যতত্ত্বে সেলিম আল দীন, আফসার আহমদ আর দর্শন বিভাগে নাজমা সিদ্দিকী, ওবাইদুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। এই সব গুণীজনের মাঝে তরুণদের প্রতি আলাদাভাবে স্নেহশীল ছিলেন মোহাম্মদ রফিক ও সেলিম আল দীন। আমি ছিলাম তাদের স্নেহধন্য। আমার কবিতা লেখার খ্যাতি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই সূত্রেই সেলিম স্যার রীতিমতো ডেকে পাঠাতেন—হেঁটে বেড়াতেন আমার সঙ্গে, সন্ধ্যার আড্ডায় মাতিয়ে রাখতেন জীবন ও শিল্পের গল্পে। রফিক স্যারের সঙ্গে প্রান্তিক গেট কিংবা তার রুমে, এমনকি ঢাকায় গিয়ে পর্যন্ত আড্ডা জমত। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল লিটল ম্যাগাজিন—ছোট কাগজে লেখার সেই রীতি ও আদর্শ গঠনে তার চিন্তা আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
এইসব সম্পর্কের সমান্তরালে, ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল আমার আর ড. হায়াৎ মামুদের এক অন্যতর সম্পর্ক—গুরুশিষ্য পরম্পরার। দর্শন বিভাগ থেকে আমি যখন বাংলা বিভাগে এসে নন্দনতত্ত্বে পিএইচডি শুরু করি, তখন তিনি হয়ে উঠলেন আমার তত্ত্বাবধায়ক। শুরুটা ছিল নির্লিপ্ত, কিন্তু অল্প অল্প করে তার গভীর মনোযোগ, তার শৈল্পিক রসবোধ, তার জীবনানন্দময় দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে নতুন করে গড়ে তুলতে শুরু করল। তিন বছরে সম্ভব ছিল গবেষণা শেষ করা, কিন্তু তিনি সময় নিলেন দশ বছর। কারণ, তিনি শুধু গবেষণা করাতে চাননি—তিনি আমার মানস গঠন করতে চেয়েছিলেন। একজন কবির মনে দর্শন, সাহিত্য ও জীবনের সম্মিলন ঘটাতে চেয়েছিলেন।
তার শিক্ষা কেবল পাঠ্যতালিকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আড্ডার মধ্য দিয়ে তিনি পড়াতেন, কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ আলোচনায় বসতেন কোনও ইউরোপীয় সাহিত্যিকের তত্ত্ব নিয়ে, আবার কোনওদিন একটি কবিতা নিয়ে তর্ক জমিয়ে ফেলতেন। তার বাসায়, বা বিভাগীয় কক্ষে, কিংবা হাঁটতে হাঁটতে চলত আমাকে পাঠ দেওয়া।কীভাবে লেখার গভীরে প্রবেশ করতে হয়, কীভাবে জীবনের রস পেতে হয়, কীভাবে একজন আনন্দ রসিক মানুষ হওয়া যায়—এই সবই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন এক অনুপম সৌন্দর্যবোধ ও সংবেদনশীলতা দিয়ে।
তিনি খুব কম ছাত্র ফেলো হিসেবে নিতেন, আমার বেলায়ও কিছুটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু শেষে একটাই কারণ যথেষ্ট ছিল—আমি কবি। সেই পরিচয়ই আমাকে তার স্নেহ ও মনোযোগের কাছে পৌঁছে দেয়। কবিতার ভাষা, সাহিত্য বিশ্লেষণ, বিশ্বসাহিত্যের তুলনামূলক পাঠ, সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি আমাকে এমন এক দরোজা দেখান, যা আমার ভেতরের ভাবনার আকাশ খুলে দেয়। দর্শন ও সাহিত্য, জীবন ও শিল্প—সব কিছুর সংমিশ্রণে যে জীবনবোধ গড়ে ওঠে, তার ছাপ আজও আমার লেখায়, চিন্তায় স্পষ্ট।
এই দীর্ঘ দশ বছরের যাত্রা কেবল ডিগ্রি অর্জনের ছিল না, ছিল একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার, একজন কবি হিসেবে গভীরতর উপলব্ধির, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে চূড়ান্ত আত্ম উপলব্ধির। ড. হায়াৎ মামুদের মতো একজন শিক্ষক, যিনি জীবনকে শুধু পড়ান না, বরং তাকে উপলব্ধি করাতে জানেন, তার সান্নিধ্য আমার জীবনের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে।
২.
হায়াৎ স্যারের দীননাথ সেনের বাসায় বহুবার গিয়েছি, কখনও কারণে, কখনও বা নিছক অকারণে। সেই বাড়ির প্রতিটি কোণ আমার শুধু চোখের চেনা নয়, মনের গভীরে স্মৃতিসত্তার অংশ হয়ে আছে।ভাবীর ব্যবহার ছিল একেবারে মাতৃসম, যেন সত্যিকারের গুরুপত্নী—সম্মানের, স্নেহের, এবং আশ্রয়ের মূর্ত প্রতীক। তাঁর অসীম সহানুভূতি, গৃহস্থালি জীবনের মধ্যেও আমাদের প্রতি যত্ন, আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে।
স্যারের বাড়িটিকে আমি টোল বলেই মনে করতাম—একটি চৌভরী, যেখানে শুধু পড়াশোনা নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক গঠনের সূক্ষ্ম কারিগরি চলত। সেই গৃহ যেন গুরুকুলের আধুনিক সংস্করণ, যেখানে শিষ্য শুধু জ্ঞানে নয়, মানসে ও মননে গঠিত হয়। আমি ছিলাম সেই গৃহের স্নাপন, অবিরাম প্রবাহমান এক শিষ্যত্ববোধে সিক্ত। আমার মনে হয়, হায়াৎ স্যার কোনো স্থূল পরামর্শ বা উপদেশ দেননি; তিনি এক প্রাচীন ভারতীয় রীতির মতো, কথোপকথনের ছলে, আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে, প্রশ্ন আর প্রতিপ্রশ্নের কৌশলে আমার মানসিক কাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছেন।
তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো মানেই ছিল এক গভীর অনুশীলন—যেখানে বই পড়া বা লেখালিখির বাইরেও যুক্তি, দর্শন, রাজনীতি, সাহিত্যের নানা স্তরে তিনি আমাকে নিয়ে যেতেন। কোনও এক অলিখিত নিয়মে, স্যারের বাসা হয়ে উঠেছিল মুক্ত চিন্তার একটি ক্ষেত্র। ওখানে পড়াশোনার মধ্যেই ছিল আড্ডার অবকাশ, গল্পগুজবের প্লাটফর্ম এবং তর্কের সম্মানজনক পরিসর। তিনি জানতেন, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জীবন ও জ্ঞানের আরও অনেক পাঠ থাকে, যেগুলো শিক্ষকের হাতে শিষ্যর মনে স্থাপন করতেই হয়।
স্যারের সংস্পর্শে এসে আমি জেনেছি, শিক্ষা শুধু তথ্যের সঞ্চয় নয়—এ এক নিরবিচ্ছিন্ন মানসিক অনুশাসন, এক গভীর আত্মিক অনুরাগ। তাঁর সেই বাড়িতে প্রতিটি দিন ছিল আমার আত্মবিকাশের এক নতুন ধাপ। আজও যখন স্মৃতির খেরো খাতায় সেই দিনগুলো উঁকি মারে, দেখি আমি আসলে একজন শিক্ষক নই, একজন শিষ্য হয়ে উঠতে পেরেছি—আমার এই সৌভাগ্যই হয়তো হায়াৎ স্যারের সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ।
৩.
বাংলা একাডেমির বর্ধমান ভবনের নিচতলার লাইব্রেরীর নির্জন অথচ প্রাণবন্ত কক্ষে স্যার চলে আসতেন আমাদের দেখতে।আমি তখন বাংলা একাডেমির একজন রিসার্চ ফেলো, সদ্য শুরু করেছি পিএইচডি গবেষণার কাজ স্যারের তত্ত্বাবধানে। স্যার শুধু একজন শিক্ষক নন, ছিলেন আমাদের অভিভাবক, পথপ্রদর্শকও। বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিতে—এক কাপ চা, কিছু বই, আর আমাদের দুজনকে নিয়ে একটা ছোট্ট সভা যেন বসে যেত সেখানে।আর হ্যা,আমার সঙ্গে তখন আরেকজন রিসার্চ ফেলো ছিলেন প্রখ্যাত ছড়াকার ও কবি প্রফেসর খালেদ হোসাইন। খালেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার সেই সময়ের বন্ধুত্ব আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে। আমাদের দুজনেরই একাডেমির বৃত্তিতে পিএইচডি করার সুযোগ মিলেছিল, আর স্যার ছিলেন দুজনেরই তত্ত্বাবধায়ক।ফলে আমাদের গবেষণা আর সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা ছিল নিত্যদিনের কাজ। স্যার মাঝে মাঝেই এসে জিজ্ঞেস করতেন, “কি, আজ কী লিখলে? কাদের পড়ছো?” কখনো বা একগাল হেসে বলতেন, “চলো, আজ একটু বাইরে বেরোই, শুধু বই-খাতা না, চোখ-কান খোলা রাখাটাও গবেষণার অংশ।”
এইভাবেই একদিন তিনি হঠাৎ বললেন, “আজ জাদুঘরে একটা সেমিনার আছে, তারপর আজিজ মার্কেটে যাব বই দেখতে।” আমরা তাঁর সঙ্গে গেলাম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে। সেদিন স্যার বক্তৃতা দিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে নিয়ে—বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মুখ, যাঁর লেখায় আধুনিকতা ও অস্তিত্ববাদের সম্মিলন ঘটে। স্যারের কণ্ঠে ছিল তথ্য, আবেগ ও বোধের এক অপূর্ব সমন্বয়। তিনি এমনভাবে ওয়ালীউল্লাহকে তুলে ধরলেন, মনে হচ্ছিল লেখক যেন মিলনায়তনের মঞ্চেই দাঁড়িয়ে আছেন, নিঃশব্দে আমাদের দিকে তাকিয়ে।
সেমিনার শেষে খালেদ ভাই জাহাঙ্গীরনগর চলে গেলেন।আমরা হেঁটে গেলাম আজিজ মার্কেটের পাঠক সমাবেশে। বইয়ের ঘ্রাণ, কাগজের স্পর্শ আর আলাপ-আলোচনার গুনগুন শব্দে মুখর ছিল সেই বিকেল। বই দেখা শেষে যখন স্যার ও আমি মার্কেট থেকে বের হচ্ছি, হঠাৎ দেখা হয়ে গেল আমার সমসাময়িক কয়েকজন কবি ও লেখক বন্ধুদের সঙ্গে। আমি খানিকটা সংকোচে পড়ে গেলাম! কিন্তু স্যার নিজের মতোই সহজ, অবলীলায় আমাদের আড্ডায় মিশে গেলেন। যেন অনেকদিনের পরিচিত, যেন তিনিও সেই দশকের সাহিত্য আন্দোলনেরই একজন নীরব সংগঠক।
কবিতা, প্রবন্ধ, সমকালীন রাজনীতি, বিশ্বসাহিত্য—বিষয়ের কোন গণ্ডি ছিল না আমাদের সেদিনের আড্ডায়। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছিল স্যারের কথা। তিনি কোনো দম্ভ ছাড়াই আমাদের ভাবনায় যোগ দিচ্ছিলেন, আবার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরণ টানছিলেন। কখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত দশটা হয়ে গিয়েছিল, বুঝতেই পারিনি। সেই দিনটির মতো আরেকটি দিন যেন হয় না। স্যার, তার গাড়ি বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আড্ডা শেষে স্কুটারে করে চলে গেলেন গেন্ডারিয়ার দিকে, নিজের বাসার পথে।
আসলে সেই সময়টা শুধু গবেষণার ছিল না, ছিল শেখার, বেড়ে ওঠার, আর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক অনুপম অধ্যায়। হায়াৎ স্যার আমার শুধু তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন না—তিনি ছিলেন পথচলার সাথী, যিনি আমাদের চোখে সাহিত্যের গভীরতা ও জীবনের পরিপূর্ণতা দেখাতে চেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে সেইসব দুপুর-সন্ধ্যা-রাতের মুহূর্তগুলো আজও আমার লেখালেখির শক্তি, আত্মার আলো হয়ে আছে।
৪.
হায়াৎ স্যারের সঙ্গে একদিন এক বিশেষ অভিজ্ঞতার পর্বে ঢুকে গিয়েছিলাম, যা আজও স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে আছে। স্যার শুধু বললেন, “চলো, আজ বজলুর বাসায় যাব।” তাঁর কণ্ঠে ছিল এক সহজাত আহ্বান, আর আমার তো এমন সুযোগে রাজি না হয়ে উপায় নেই—স্যারের সঙ্গে কোথাও যাওয়া মানেই যেন জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ।
গাড়িতে ওঠার পর স্যারের নিজের হাতে প্লে করা ক্যাসেট থেকে ভেসে আসছিল টপ্পা গানের রূপালি সুর। সুরের ঢেউয়ে গাড়ির জানালা পেরিয়ে যেন চলে যাচ্ছিলাম অন্য এক জগতে। স্যার বলছিলেন, কীভাবে টপ্পা গানের আবেদন তাঁকে মুগ্ধ করে রেখেছে বহু বছর ধরে। প্রতিটি অলঙ্কার, প্রতিটি খাত—তাঁর বর্ণনায় গানে লুকিয়ে থাকা শিল্প ও আবেগ যেন নতুনভাবে ধরা দিচ্ছিল আমার কাছে। আমি তখন পুরোপুরি এক ঘোরে। যেন কেবল একজন শিক্ষক নয়, একজন সংগীতানুরাগী, একজন জীবনশিল্পী পাশে বসে গল্প করে যাচ্ছেন।
এই ঘোরের মধ্যেই পৌঁছে যাই ঢাকায় বজলু ভাইয়ের বাসায়। দৈনিক সংবাদের সম্পাদক বজলু রহমান—হায়াৎ স্যারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাসাটা ছিমছাম, পরিপাটি, অথচ একদম আনুষ্ঠানিকতাহীন। ড্রয়িংরুমে আমরা বসে আছি, স্যার আর বজলু ভাই আড্ডায় মেতে উঠেছেন—রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য নিয়ে দারুণ গভীর অথচ প্রাণবন্ত আলোচনা। আমি চুপচাপ বসে শুনছি, মুগ্ধ হচ্ছি।
এক সময় একজন মহিলা ট্রেতে করে চা নিয়ে এলেন। একদম সাধারণ সুতির শাড়ি পরা, অনাড়ম্বর উপস্থিতি। প্রথমে তাঁর দিকে তাকিয়ে চেনা লাগলেও বুঝে উঠতে পারছিলাম না তিনি কে। আমার চোখের ভাষা বুঝে ফেললেন স্যার, হাসতে হাসতে বললেন, “ও আচ্ছা! তোমার সঙ্গে তো মতিয়া চৌধুরীর দেখা হয়নি!” আমি হতবাক। এ কি সেই মতিয়া চৌধুরী? বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, আপসহীন সংগ্রামী নেত্রী? অথচ এমন সাদাসিধে পোশাকে, নিরহংকারী ভঙ্গিতে, যেন পাশের বাড়ির এক সাধারণ গৃহবধূ।
সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করি—মানুষ বড় হয় অন্তরের বিশালতায়, পদ-পদবির জাঁকজমকে নয়। মতিয়া আপা’র অনাড়ম্বর উপস্থিতি, তাঁর জীবনের সহজতা আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তিনি ছিলেন অন্তরে-বাহিরে এক; যা ভাবতেন, তাই-ই বেঁচে থাকতেন। জীবনযাপনে এই সরলতা আর আদর্শের দৃঢ়তা আমাকে নতুন চোখে দেখিয়েছিল বড় মানুষের সংজ্ঞা।
হায়াৎ স্যার সেইদিন যেমন আমাকে এক অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন, তেমনি জীবনের গভীর একটি শিক্ষাও দিয়ে দিয়েছিলেন—‘সিম্পল লিভিং, হাই থিংকিং’ কেবল কোনো নীতিবাক্য নয়, বরং একজন মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মন্ত্র। তাঁর জীবন, তাঁর আচরণ, এমনকি তাঁর পছন্দের গানও যেন এই দর্শনেরই প্রতিফলন। সেদিনের সেই আড্ডা, সেই গান, সেই মানুষগুলো আমার জীবনে আজও এক চলমান অধ্যায়—জীবনের অভিজ্ঞতায় লেখা আত্মজৈবনিক একটি পৃষ্ঠা।
মাসুদুল হক : শিক্ষক ও সাহিত্যিক
