সেঁজুতি রহমানের ৫টি কবিতা

একটি শব্দের পুনর্জন্ম

তুমি রোজ এসে দাঁড়াও
একটি মাত্র শব্দের পাশে—
সেই একটাই শব্দ!
কখনও ভীষণ চেনা,
আবার কখনও অচেনা নক্ষত্রের মতো দূর,
কখনও সে প্রভাতের শিশিরবিন্দু, সন্ধ্যাতারার স্নিগ্ধ দীপ্তি,
কখনওবা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের হারানো বাঁশির সুর।
বটের ঝুরির মতো
নৈঃশব্দ্যের ভেতর নেমে আসে ধীরে
হৃদয়ের নিবিড় ছায়াতলে।

একটাই শব্দ—
অথচ প্রতিদিন নতুন কোনো
মায়ার ছদ্মবেশে,
নতুন কোনো ব্যথার প্রদীপ হাতে
বিদ্ধ করে আমাকে!
তুমি যেন এক শব্দের জাদুকর
আর আমি সেই কুর্চি ফুল
যাকে একদিন বিরহী যক্ষ মেঘের দূতকে দিয়েছিল।

তোমার অধর ছুঁয়ে
যখন সে শব্দ উচ্চারিত হয় প্রতিবারই মনে হয় —
এ যেন প্রথম প্রেমের কম্পন
আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণ
বর্ষার প্রথম কদমফুলের ঘ্রাণ
প্রথমবার স্পর্শের স্পন্দন।
মনে হয় —
সৃষ্টির আদিলগ্ন হতে
এই একটি শব্দের প্রতীক্ষায় আমি
একটি মাত্র শব্দের পুনর্জন্ম পুনর্বার।

কুয়াশার মিথলজি

তোমাকে কুয়াশা নামেই ডাকি
নিঃশব্দ জলপতনে পুণ্যবতী হয় বিভাবরী
কুয়াশাচ্ছন্ন মুখে সবুজ অরণ্যের কারুকাজ
টোল পড়া হাসিতে যেন সোনালী ফসলের ঝিলিক,
বড় তৃষ্ণা এ বুকে
জল চাই, প্রেম চাই, চন্দ্রগ্রহণেও চাই জ্যোৎস্নায় অবগাহন।
জড়িয়ে ধরো আমাকে স্বেচ্ছাচারী স্বর্ণলতার মতন
প্রেম প্রবাহিত হোক সমস্ত শিরা উপশিরায়।

তারপরও যদি যেতে চাও, যেও না বেশি দূর
রোদের কাছাকাছি হলে কুয়াশা ফিকে হয়
ভুবন চিলের ডাকে কেঁপে ওঠে নিস্তব্ধ বনভূমি
নির্জন দ্বীপে নিঃসীম শূন্যতায়
থাকো পাশাপাশি, হৃদয়ের খুব কাছাকাছি
ভেজা ভেজা আবছা আলোয় লেখা হোক কুয়াশার মিথলজি।

নীল সমুদ্রের বিষণ্নতা

সমুদ্রের নোনা জলে
চলো, ভাসিয়ে দিই কিছু বিষণ্নতা —
নীল রং আরও একটু গাঢ় হোক
ঢেউয়ের দোলায় ফিরে আসুক
শৈশবের নতুন মলাটে বাঁধানো পুরোনো বইয়ের সোঁদা গন্ধ।

দেখো কাজল চোখের মেয়ে
তীব্র দহনে দগ্ধ ডানা,
তবুও আগুন পোড়াতে পারে না
পতঙ্গের পুড়ে যাওয়ার সুখ।

সমুদ্রের মতো গভীরতা
তোমার কাজল কালো চোখে।
কত যে চেয়েছি—
সেই গভীরতার অতল নীলে
ডুবে যাক আমার সমস্ত বিষাদ
অস্তিত্বের ভার, বিরহী দীর্ঘশ্বাস।

অথচ তুমিও সমুদ্রের মতো —
আমার ভালোবাসাকে
টেনে নিয়েছ ভাটার টানে
আবার প্রতিটি ঢেউয়ের শেষে ফিরিয়ে দিয়েছ নিঃসঙ্গ বালুকাবেলায়।

শোনো, একটা নীল সমুদ্র
এখনও আমার গভীর ব্যথায়
জানি না জোয়ারের মতো তুমি ফিরবে কিনা—
তবুও আমার প্রতীক্ষায় নিমগ্ন
ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।

বালুকাবেলার স্বপ্নরা

তোর নামে রাখা নদীটাও
বদলেছে রং
প্রতিটা ভাটায় রেখে গেছে
অসমাপ্ত চুম্বনের দাগ।
একটা দীর্ঘ স্বপ্নের পরে চোখ জ্বালা করে
জোয়ারের পানি এসে ফিরে গেলে
বালুকাবেলায় কিছু রঙিন স্বপ্ন মৃত্যুর প্রহর গোনে।

জোয়ার-ভাটায় জেলেরা শিকার করে মাছেদের ভুল।

আমাদের একটা সন্ধ্যা ছিল

আমাদের একটা সন্ধ্যা ছিল
ফুটপাতে অগুনতি চোখের ভিড়ে
স্পর্শকাতর দৃষ্টি ছোঁয়ার কয়েকটা মুহূর্ত ছিল
চায়ের কাপে চাঁদ ডোবানো
কয়েক চুমুক জ্যোৎস্না ছিল
খুব কাছাকাছি হৃদয় পোড়ানোর
উসকে দেওয়া আগুন ছিল
ফিরে আসার তাগিদও ছিল।

হয়তো কিছুই ছিল না আমাদের নিজস্ব
তবু্ও অসময়ে পাগল করা
শিউলি ফোটার মাতন ছিল।

দুঃখও এক পাখি

কোনো এক বিষণ্ন দুপুরে
বলে দেবো তাকে—
একদিন আমিও পাখি হবো,
চঞ্চুতে তুলে নেবো
উঠোনে ছড়ানো রোদ, শস্যদানা।

তপ্ত আলোয় দগ্ধ হবার আগেই
লুকিয়ে রাখবো বুকের কোণে
সব দুঃখকণা—
দুঃখও এক পাখি
নিঃসঙ্গ ডানায় ওড়ে,
আমার মতোই গন্তব্যহীন
অজানা কোনো এক অন্তহীন আকাশে।

নিঃসঙ্গ পথ

ক্ষুধাকে রুটির বদলে
তুলে দিয়েছিলাম কিছু পুরনো দুঃখ
যেগুলো স্বপ্নের মতোই
জেগে উঠলে মিলিয়ে যায় শূন্যতায়।

দুঃখ হাঁটতে থাকে —
সুখের প্রত্যাশায়, ক্ষুধাকে ভুলে
জীবনের সরু আলপথ ধরে
যার এক পাশে প্রেম, অন্য পাশে বিরহ।

পথটা ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে
অতিক্রান্ত সময়ের দুরত্ব ভুলে
আবার ফিরতে চায় জন্মের কাছে।

কেননা সামনেই ছিল গভীর অন্ধকার,
নিশ্ছিদ্র এক রাত—

যে রাত ক্ষুধা, সুখ, দুঃখ, প্রেম ও বিরহকে
তলিয়ে নিতে চায় ঘুমের অতল গহ্বরে
অপেক্ষার শেষ প্রহরে।

আরও পড়ুন