জর্জ বার্কলের দর্শন-১: বাস্তবতা, চেতনা ও ঈশ্বরের এক বিকল্প অধিবিদ্যা

১.

পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে কিছু কিছু দার্শনিক এমন আছেন, যাঁদের গুরুত্ব তাঁদের প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের চেয়ে বরং তাঁদের উত্থাপিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর মধ্যে নিহিত। জর্জ বার্কলে (George Berkeley, ১৬৮৫–১৭৫৩) নিঃসন্দেহে সেই শ্রেণির একজন দার্শনিক। তিনি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন, যখন ইউরোপীয় চিন্তাজগৎ মধ্যযুগীয় ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বদৃষ্টি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের নতুন যুগে প্রবেশ করছিল। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল—মানুষ যে জগতকে বাস্তব বলে জানে, সেই বাস্তবতার প্রকৃত ভিত্তি কী? বাহ্যিক জগত কি মানুষের চেতনা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন কোনো বস্তুগত সত্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত, নাকি বাস্তবতা মূলত চেতনা ও অভিজ্ঞতার কাঠামোর মধ্যেই গঠিত হয়?

এই প্রশ্নের উত্তরে বার্কলে যে দর্শন নির্মাণ করেন, তা পাশ্চাত্য অধিবিদ্যার ইতিহাসে এক গভীর পরিবর্তন সূচিত করে। তাঁর মতে, বাস্তবতার মৌলিক উপাদান পদার্থ নয়; বরং দুটি বিষয়—চেতনা বা আত্মা (spirit) এবং ধারণা (ideas)। জড়বস্তুর কোনো মন-স্বাধীন, অজ্ঞেয় বস্তুগত ভিত্তি নেই; বস্তু হলো উপলব্ধ ধারণার সুসংগঠিত সমষ্টি। এই মতবাদই তাঁর অবস্তুবাদ (immaterialism) বা ভাববাদী অধিবিদ্যার (idealistic metaphysics) মূল ভিত্তি। তাঁর বিখ্যাত সূত্র—Esse est percipi aut percipere—অর্থাৎ “অস্তিত্ব মানে উপলব্ধ হওয়া অথবা উপলব্ধি করা”—শুধু একটি দার্শনিক বাক্য নয়; এটি বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির ঘোষণা।

বার্কলের দর্শনকে যথাযথভাবে বোঝার জন্য তাঁর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা অপরিহার্য। সপ্তদশ শতাব্দী ছিল ইউরোপীয় চিন্তার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক যুগ। মধ্যযুগে অ্যারিস্টটলীয় দর্শন এবং খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব জ্ঞান ও বাস্তবতার প্রধান ব্যাখ্যামূলক কাঠামো প্রদান করেছিল। কিন্তু রেনেসাঁস, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এবং নতুন দার্শনিক অনুসন্ধানের ফলে সেই কাঠামো ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণ, কেপলারের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং নিউটনের গাণিতিক পদার্থবিদ্যা প্রকৃতিকে একটি নিয়মতান্ত্রিক, যান্ত্রিক এবং গাণিতিক ব্যবস্থারূপে উপস্থাপন করে।

এই নতুন বৈজ্ঞানিক বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দার্শনিকেরা বাস্তবতা ও জ্ঞানের নতুন ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন। রেনে দেকার্ত (René Descartes) যুক্তিকে জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং মন ও পদার্থের দ্বৈতবাদ (mind-body dualism) প্রস্তাব করেন। জন লক (John Locke) অভিজ্ঞতাবাদের ভিত্তিতে মানুষের জ্ঞান বিশ্লেষণ করেন। নিকোলা মালব্রঁশ (Nicolas Malebranche) ঈশ্বরকে জ্ঞান ও উপলব্ধির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখান। বারুখ স্পিনোজা (Baruch Spinoza) একক সর্বব্যাপী সত্তার দর্শন নির্মাণ করেন এবং লাইবনিজ (Gottfried Wilhelm Leibniz) বাস্তবতাকে অসংখ্য আধ্যাত্মিক একক বা মোনাডের সমন্বয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই বহুমাত্রিক দার্শনিক পরিবেশের মধ্যেই বার্কলের চিন্তার বিকাশ ঘটে।

১৬৮৫ সালে আয়ারল্যান্ডের কিলকেনির কাছে জন্মগ্রহণকারী বার্কলে অল্প বয়সেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। তিনি ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে শিক্ষা লাভ করেন, যা সে সময়ে ইউরোপীয় আধুনিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি দেকার্ত, লক, হবস, মালব্রঁশ এবং নিউটনের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। তবে তাঁর চিন্তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল স্বাধীন সমালোচনামূলক মনোভাব। তিনি কোনো দার্শনিকের খ্যাতি বা প্রচলিত মতের ভিত্তিতে কোনো ধারণা গ্রহণ করেননি। তাঁর ব্যক্তিগত নোটবই Philosophical Commentaries-এ এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বার্কলের দার্শনিক প্রকল্প মূলত একটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রকল্প ছিল—কিন্তু শুধুমাত্র নেতিবাচক অর্থে নয়। তিনি পূর্ববর্তী দর্শনের ভুল সংশোধন করে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রধান আপত্তি ছিল সেই ধারণার বিরুদ্ধে, যেখানে বলা হয় যে মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরে একটি মন-স্বাধীন পদার্থ বিদ্যমান। তাঁর মতে, এমন একটি সত্তার কথা বলা হয়, যা কোনো রং, আকৃতি, গন্ধ, স্বাদ, শব্দ বা স্পর্শের অধিকারী নয়, কিন্তু যা আবার এসব গুণের আধার। বার্কলের কাছে এই ধারণা ছিল একটি অস্পষ্ট বিমূর্ত কল্পনা, যার কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগত ভিত্তি নেই।

বার্কলের দর্শনের গভীরতা বোঝার জন্য প্রাচীন গ্রিক দর্শনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষত প্লেটো (Plato) ও অ্যারিস্টটলের দর্শনের সঙ্গে তাঁর চিন্তার একটি জটিল সম্পর্ক রয়েছে। প্লেটোর দর্শনে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগত এবং প্রকৃত বাস্তবতার মধ্যে একটি পার্থক্য করা হয়। তাঁর মতে, পরিবর্তনশীল ইন্দ্রিয়জগতের পেছনে রয়েছে অপরিবর্তনীয় আদর্শ রূপ (Forms)। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ অসম্পূর্ণ জ্ঞান লাভ করে; প্রকৃত জ্ঞান অর্জিত হয় বুদ্ধির মাধ্যমে আদর্শ রূপ উপলব্ধির দ্বারা।

বার্কলের সঙ্গে প্লেটোর একটি সাদৃশ্য হলো—উভয়েই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের পেছনে একটি গভীরতর বাস্তবতার প্রশ্ন উত্থাপন করেন এবং বস্তুগত জগতকে চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেন না। তবে তাঁদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে। প্লেটোর কাছে রূপ বা Forms হলো মন-স্বাধীন এক ধরনের বিমূর্ত বাস্তবতা; কিন্তু বার্কলে কোনো বিমূর্ত, অচৈতন্য সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। তাঁর বাস্তবতা গঠিত হয় চৈতন্য এবং ধারণার মাধ্যমে। প্লেটোর দর্শনে জ্ঞান ইন্দ্রিয়জগত অতিক্রম করে আদর্শ জগতে পৌঁছায়; বার্কলের দর্শনে জ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকে অভিজ্ঞতার মধ্যেই, যদিও সেই অভিজ্ঞতার চূড়ান্ত ভিত্তি ঈশ্বরীয় চেতনা।

অ্যারিস্টটলের সঙ্গে বার্কলের সম্পর্ক আরও জটিল। অ্যারিস্টটল বাস্তবতাকে বস্তু ও রূপের সমন্বয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, পৃথক কোনো বিমূর্ত জগত নেই; বরং বস্তুগত জগতের মধ্যেই রূপ বিদ্যমান। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্লেটোর অতীন্দ্রিয় ভাববাদের বিরোধিতা করে একটি বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করে। বার্কলে অ্যারিস্টটলের মতো ইন্দ্রিয়জগতের গুরুত্ব স্বীকার করেন, কিন্তু তাঁর কাছে বস্তুগত জগতের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। অ্যারিস্টটল যেখানে বস্তু ও রূপের সমন্বয়ে বাস্তবতা ব্যাখ্যা করেন, বার্কলে সেখানে ধারণা ও চেতনার সম্পর্কের মাধ্যমে বাস্তবতা ব্যাখ্যা করেন।

তবে একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, বার্কলের দর্শনে অ্যারিস্টটলীয় একটি প্রবণতার পুনরাবির্ভাব দেখা যায়—অর্থাৎ তিনি বিমূর্ত কল্পনার পরিবর্তে অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তবতার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি মনে করেন, দর্শনকে এমন কোনো কাল্পনিক সত্তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, যার সঙ্গে মানুষের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এই দিক থেকে তাঁর দর্শন অভিজ্ঞতার প্রতি এক ধরনের মৌলিক আনুগত্য প্রকাশ করে।

বার্কলের চিন্তায় প্লেটোনিক প্রভাবের আরেকটি দিক তাঁর ঈশ্বরতত্ত্বে দেখা যায়। প্লেটোর দর্শনে সর্বোচ্চ কল্যাণের ধারণা যেমন সমগ্র বাস্তবতার চূড়ান্ত ভিত্তি, তেমনি বার্কলের দর্শনে ঈশ্বর হলেন অসীম চেতনা, যিনি সমগ্র অভিজ্ঞতাজগতের ধারাবাহিকতা ও শৃঙ্খলার ভিত্তি। তবে বার্কলের ঈশ্বর প্লেটোর বিমূর্ত নীতির মতো নন; তিনি ব্যক্তিগত, সক্রিয় এবং সৃষ্টিশীল চেতনা।

এইভাবে দেখা যায়, বার্কলের দর্শন প্রাচীন ও আধুনিক উভয় দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর সংলাপে গড়ে উঠেছে। প্লেটোর মতো তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের চূড়ান্ত বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, অ্যারিস্টটলের মতো তিনি অভিজ্ঞতার জগতকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু উভয়ের থেকে ভিন্নভাবে তিনি বাস্তবতার ভিত্তি হিসেবে চেতনা ও উপলব্ধিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

২.

বার্কলের দর্শনের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে তাঁকে তাঁর পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক প্রধান দার্শনিকদের সঙ্গে একটি সক্রিয় বৌদ্ধিক সংলাপের মধ্যে স্থাপন করতে হয়। তিনি কোনো শূন্য পরিসরে তাঁর দর্শন নির্মাণ করেননি; বরং দেকার্তীয় যুক্তিবাদ, লকীয় অভিজ্ঞতাবাদ, মালব্রঁশের ঈশ্বরকেন্দ্রিক দর্শন, স্পিনোজার একত্ববাদ এবং লাইবনিজের আধ্যাত্মিকতাবাদী অধিবিদ্যার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে তাঁর নিজস্ব অবস্তুবাদী দর্শন নির্মাণ করেন। তাঁর দর্শনের একটি বড় অংশ মূলত এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে—মানুষ কীভাবে বাহ্যিক জগতকে জানে এবং সেই জগতের অস্তিত্বের প্রকৃত ভিত্তি কী?

সপ্তদশ শতাব্দীর আধুনিক দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞানতাত্ত্বিক নিশ্চয়তার অনুসন্ধান। মধ্যযুগীয় চিন্তায় যেখানে ঈশ্বর, গির্জা ও অ্যারিস্টটলীয় দর্শন জ্ঞানের প্রধান কর্তৃত্ব হিসেবে বিবেচিত হতো, আধুনিক যুগের দার্শনিকেরা সেখানে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে জ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে রেনে দেকার্তের দর্শন একটি নতুন সূচনা নির্দেশ করে।

দেকার্তের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল সন্দেহের পদ্ধতি (methodical doubt)। তিনি এমন একটি জ্ঞানের ভিত্তি খুঁজছিলেন, যা কোনোভাবেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকবে। এই অনুসন্ধানের ফল হিসেবে তিনি পৌঁছান তাঁর বিখ্যাত সূত্রে—“আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি” (Cogito, ergo sum)। দেকার্তের মতে, মন বা চিন্তাশীল সত্তা (res cogitans) এবং বিস্তৃত পদার্থ (res extensa)—এই দুই ধরনের মৌলিক সত্তা বিদ্যমান। মন হলো অদৈহিক, চিন্তাশীল এবং অবিভাজ্য; আর পদার্থ হলো বিস্তৃত, পরিমাপযোগ্য এবং যান্ত্রিক নিয়মে পরিচালিত।

বার্কলে দেকার্তের এই দ্বৈতবাদ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি এর বিরোধিতা করেন। দেকার্ত যেমন মন ও পদার্থকে দুটি পৃথক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করেন, বার্কলে তেমন কোনো জড় পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। তাঁর মতে, যদি আমরা কোনো বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করি, তবে আমরা আসলে সেই বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত ধারণা বা অনুভূতিকেই জানি। এমন একটি “পদার্থ” কল্পনা করা, যা কোনোভাবেই উপলব্ধ নয়, বার্কলের কাছে অর্থহীন।

তবে দেকার্তের সঙ্গে বার্কলের একটি গভীর মিলও রয়েছে। উভয়েই মনে করেন যে চেতনা বা মন বাস্তবতার কেন্দ্রীয় উপাদান। দেকার্ত যেখানে মনকে পদার্থের পাশাপাশি একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখান, বার্কলে সেখানে মন বা আত্মাকেই একমাত্র সক্রিয় বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে বলা যায়, বার্কলের অবস্তুবাদ এক অর্থে দেকার্তীয় দ্বৈতবাদের একটি র‌্যাডিক্যাল সংশোধিত রূপ—যেখানে পদার্থকে বাদ দিয়ে কেবল চৈতন্যের জগতকে মৌলিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বার্কলের চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপক্ষ ছিলেন জন লক। লক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An Essay Concerning Human Understanding (১৬৮৯)-এ অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মতে, মানুষের মন জন্মের সময় একটি শূন্য পট (tabula rasa)-এর মতো থাকে; অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেখানে জ্ঞান সঞ্চিত হয়। সমস্ত ধারণার উৎস হলো ইন্দ্রিয়ানুভূতি (sensation) এবং অন্তর্দর্শন (reflection)।

লকের দর্শনে বস্তুজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি মনে করেন, বাহ্যিক বস্তু আমাদের মনে ধারণা সৃষ্টি করে। তবে তিনি সমস্ত গুণকে একই ধরনের বলে মনে করেননি। তিনি গুণকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন—প্রাথমিক গুণ (primary qualities) এবং গৌণ গুণ (secondary qualities)। আকার, বিস্তার, সংখ্যা, গতি ইত্যাদি প্রাথমিক গুণ বস্তুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য; কিন্তু রং, স্বাদ, গন্ধ, শব্দ ইত্যাদি গৌণ গুণ মূলত আমাদের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

বার্কলের দর্শনের সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা মূলত লকের এই গুণ-বিভাজনের বিরুদ্ধে। তাঁর যুক্তি ছিল—আমরা কোনো বস্তুর রং, আকার, গন্ধ বা স্বাদকে আলাদা করে অনুভব করি না; আমরা সবসময় একটি সমন্বিত অভিজ্ঞতা লাভ করি। তাহলে কীভাবে বলা যায় যে আকার বা বিস্তারের মতো কিছু গুণ বস্তুর মধ্যে বাস্তবভাবে বিদ্যমান, কিন্তু রং বা স্বাদ কেবল মনের সৃষ্টি?

বার্কলের মতে, প্রাথমিক ও গৌণ গুণের মধ্যে এই পার্থক্য যুক্তিগতভাবে টেকসই নয়। কারণ উভয় ধরনের গুণই শেষ পর্যন্ত উপলব্ধির বিষয়। আমরা যে “বস্তু”কে জানি, তা হলো বিভিন্ন অনুভূতির সমষ্টি। কোনো উপলব্ধির বাইরে অবস্থিত অজ্ঞেয় পদার্থের কথা বলা কেবল একটি অপ্রয়োজনীয় অনুমান।

লকের প্রতিনিধিত্ববাদী জ্ঞানতত্ত্বের (representative realism) বিরুদ্ধেও বার্কলের আপত্তি ছিল গভীর। লকের মতে, আমরা সরাসরি বস্তু নয়, বরং বস্তুর দ্বারা সৃষ্ট মানসিক ধারণাকে প্রত্যক্ষ করি। এই ধারণা বস্তুকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু বার্কলের প্রশ্ন ছিল—যদি আমরা কেবল ধারণাকেই সরাসরি জানি, তাহলে কীভাবে নিশ্চিত হব যে সেই ধারণা সত্যিই কোনো বাহ্যিক বস্তুকে প্রতিনিধিত্ব করছে?

এখানে বার্কলে সংশয়বাদের সম্ভাবনা দেখতে পান। যদি মন কেবল নিজের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে বাহ্যিক বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কীভাবে নিশ্চিত হবে? তাঁর মতে, বস্তুবাদ ও প্রতিনিধিত্ববাদ অনিচ্ছাকৃতভাবে সংশয়বাদের পথ তৈরি করে। কারণ তারা এমন একটি জগতের কথা বলে, যা কখনো সরাসরি অভিজ্ঞতায় আসে না।

নিকোলা মালব্রঁশের দর্শন বার্কলের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। মালব্রঁশ ছিলেন ফরাসি দার্শনিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক, যিনি দেকার্তীয় মন-পদার্থ সমস্যার সমাধানে “অবসরবাদ” (Occasionalism) তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, মন ও শরীর পরস্পরের ওপর সরাসরি কার্যকারণ প্রভাব বিস্তার করতে পারে না; বরং ঈশ্বরই প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ। আমরা যখন কোনো বস্তু দেখি, তখন আসলে ঈশ্বর আমাদের মনে সেই উপলব্ধি সৃষ্টি করেন।

বার্কলে মালব্রঁশের ঈশ্বরকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা থেকে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তবে তিনি মালব্রঁশের মতো বস্তুগত জগতকে স্বীকার করেননি। মালব্রঁশ মনে করতেন, বস্তু বিদ্যমান কিন্তু তার সঙ্গে মনের সম্পর্ক ঈশ্বরের মাধ্যমে ঘটে; বার্কলে মনে করতেন, বস্তুগত পদার্থের ধারণাটিই অপ্রয়োজনীয়। তাঁর মতে, ঈশ্বর সরাসরি আমাদের অভিজ্ঞতার ধারণাগুলো সৃষ্টি করেন।

স্পিনোজার দর্শনের সঙ্গেও বার্কলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। স্পিনোজা একক সত্তার (substance monism) দর্শন নির্মাণ করেন। তাঁর মতে, সমগ্র বাস্তবতা একটি অসীম সত্তার প্রকাশ, যাকে তিনি ঈশ্বর বা প্রকৃতি (Deus sive Natura) নামে অভিহিত করেন। মন ও দেহ এই একক সত্তার দুটি গুণ বা প্রকাশমাত্র।

বার্কলে স্পিনোজার বস্তুবাদী একত্ববাদ গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে জগৎ কোনো অচৈতন্য একক সত্তার প্রকাশ নয়; বরং বাস্তবতা গঠিত হয় অসংখ্য সীমিত আত্মা, তাদের ধারণা এবং অসীম আত্মা ঈশ্বরের মাধ্যমে। তবে উভয়ের মধ্যে একটি আকর্ষণীয় মিল রয়েছে—দুজনেই প্রচলিত বস্তুগত স্বাধীন বাস্তবতার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। স্পিনোজা যেখানে পদার্থকে ঈশ্বরের মধ্যে বিলীন করেন, বার্কলে সেখানে পদার্থকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে চেতনাকে মৌলিক করেন।

লাইবনিজের দর্শনের সঙ্গেও বার্কলের একটি ঘনিষ্ঠ তুলনা করা যায়। লাইবনিজ মনে করতেন, বাস্তবতার মৌলিক উপাদান হলো মোনাড (Monad)—অর্থাৎ অবিভাজ্য আধ্যাত্মিক একক। বস্তুজগত আসলে মোনাডগুলোর উপলব্ধির প্রকাশ। তাঁর মতে, ঈশ্বর পূর্বনির্ধারিত সামঞ্জস্যের (pre-established harmony) মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

লাইবনিজ ও বার্কলে উভয়েই জড় পদার্থকে চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেন না। উভয়ের দর্শনেই চেতনা ও ঈশ্বর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে লাইবনিজ যেখানে বহু আধ্যাত্মিক সত্তার একটি জটিল ব্যবস্থা নির্মাণ করেন, বার্কলে সেখানে অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা ও উপলব্ধিকারী আত্মার সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন। লাইবনিজের মোনাডতত্ত্ব অধিবিদ্যাগতভাবে অধিক জটিল; বার্কলের দর্শন তুলনামূলকভাবে অধিক অভিজ্ঞতামুখী।

এই তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে বার্কলের দর্শন কোনো বিচ্ছিন্ন চিন্তা নয়; বরং আধুনিক ইউরোপীয় দর্শনের প্রধান প্রবণতাগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্কযুক্ত। তিনি দেকার্তের চেতনার গুরুত্ব গ্রহণ করেন, লকের অভিজ্ঞতাবাদকে আরও কঠোর করেন, মালব্রঁশের ঈশ্বরকেন্দ্রিক ব্যাখ্যাকে রূপান্তরিত করেন, স্পিনোজার বস্তুবাদী একত্ববাদের বিরোধিতা করেন এবং লাইবনিজের আধ্যাত্মিক বাস্তবতার সঙ্গে এক ধরনের সংলাপ স্থাপন করেন।

কিন্তু এই সমস্ত দার্শনিক প্রভাবকে অতিক্রম করে বার্কলের নিজস্ব মৌলিক অবদান হলো—তিনি এমন একটি দর্শন নির্মাণ করেন যেখানে বাস্তবতার ভিত্তি হিসেবে পদার্থ নয়, বরং অভিজ্ঞতা ও চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাঁর এই বিপ্লবী অবস্থানই পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর অবস্তুবাদ, ভাববাদ এবং “অস্তিত্ব মানে উপলব্ধ হওয়া”—এই কেন্দ্রীয় নীতির বিশদ বিশ্লেষণের পথ প্রস্তুত করে।

চলবে..

মাসুদুল হক : প্রাবন্ধিক, কবি ও শিক্ষক

গ্রন্থপঞ্জি:

১.Atherton, Margaret. Berkeley’s Revolution in Vision. Cornell University Press, 1990.

২.Berman, David. George Berkeley: Idealism and the Man. Clarendon Press, 1994.

৩.Berkeley, George. Alciphron, or the Minute Philosopher. Edited by T. E. Jessop and A. A. Luce, vol. 3 of The Works of George Berkeley, Bishop of Cloyne, Thomas Nelson and Sons, 1948–1957.

৪.Berkeley, George. An Essay Towards a New Theory of Vision. Edited by Michael Ayers, Philosophical Works, J. M. Dent, 1975, pp. 1–68.

৫.Berkeley, George. A Treatise Concerning the Principles of Human Knowledge. Edited by Michael Ayers, Philosophical Works, J. M. Dent, 1975.

৬.Berkeley, George. De Motu and The Analyst: A Modern Edition with Introductions and Commentary. Translated and edited by Douglas M. Jesseph, Kluwer Academic Publishers, 1992.

৭.Berkeley, George. Philosophical Commentaries. Edited by Michael Ayers, Philosophical Works, J. M. Dent, 1975.

৮.Berkeley, George. Siris: A Chain of Philosophical Reflexions and Inquiries Concerning the Virtues of Tar-Water. Edited by A. A. Luce and T. E. Jessop, vol. 5 of The Works of George Berkeley, Bishop of Cloyne, Thomas Nelson and Sons, 1948–1957.

৯.Berkeley, George. Three Dialogues between Hylas and Philonous. Edited by Jonathan Dancy, Oxford University Press, 1998.

১০.Bennett, Jonathan. Locke, Berkeley, Hume: Central Themes. Oxford University Press, 1971.

১১.Downing, Lisa. The Cambridge Companion to Berkeley. Cambridge University Press, 2005.

১২.Foster, John. The Case for Idealism. Routledge, 1982.

১৩.Hume, David. A Treatise of Human Nature. Edited by David Fate Norton and Mary J. Norton, Oxford University Press, 2000.

১৪.Kant, Immanuel. Critique of Pure Reason. Translated by Paul Guyer and Allen W. Wood, Cambridge University Press, 1998.

১৫.Jesseph, Douglas M. Berkeley’s Philosophy of Mathematics. University of Chicago Press, 1993.

১৬.Luce, A. A. The Life of George Berkeley, Bishop of Cloyne. Thomas Nelson and Sons, 1949.

১৭.Locke, John. An Essay Concerning Human Understanding. Edited by Peter H. Nidditch, Clarendon Press, 1975.

১৮.Pitcher, George. Berkeley. Routledge and Kegan Paul, 1977.

১৯.Sosa, Ernest. A Virtue Epistemology: Apt Belief and Reflective Knowledge. Oxford University Press, 2007.

২০.Tipton, I. C. Berkeley: The Philosophy of Immaterialism. Methuen, 1974.

আরও পড়ুন