শতায়ুতে লাঙল

কাজী নজরুলের বিভা বহুমুখী। সীমারেখা টেনে নজরুলকে নির্ণয় করা কঠিন। সাহিত্যের যে কাননেই যাই নজরুল সেখানে ফুটন্ত ফুল।শুধু বিস্ময় নিয়ে বিভোর হয়ে অবলোকন করতে হয়।
সাহিত্যের জমিনে কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, সংগীত ছাড়াও সাংবাদিকতায় নজরুলের অবদান আলোকোজ্বল। নজরুলের উপস্থিতিই যেন পত্রিকা শতবর্ষ পেরিয়ে ইতিহাসের স্মারক হয়ে আছে। পত্রিকার সঙ্গে নজরুলের সম্পৃক্ততা তার সর্বকালে সর্বময় হলেও ১৯২০-১৯২৫ পর্যন্ত সময়কাল ছিল স্বর্ণযুগ। নজরুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকার তালিকায় আছে নবযুগ (প্রকাশ ১৯২০), ধূমকেতু (প্রকাশ ১৯২২), লাঙল (প্রকাশ ১৯২৫)। নবযুগ ও ধূমকেতুর পর শতবর্ষের মাহেন্দ্রক্ষণে লাঙল। মোসলেম ভারত, দৈনিক সেবক, গণবাণী, বিজলী, বৈতালিক, নওরোজ-এর সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র থাকলেও সম্পাদকের দায়িত্বে নজরুল ছিলেন না।
পত্রিকায় নজরুলের লেখায় গতি, তেজ, জাতীয়চেতনা সর্বোপরি ভারতের স্বাধীনতার অমিয় বাণী যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে তা আজও বিপ্লব ও বিদ্রোহের বার্তাবাহী। নজরুলের লাঙলের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় শ্রেণিচেতনা। ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর নজরুল জেল থেকে মুক্ত হয়ে দমে যাননি বরং ভারতবাসীকে স্বাধীনতার জন্য তার সৃষ্টির অনল প্রবাহের বারুদ ছড়ান। এ ধারায় ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিকের দলের (স্বরাজ পার্টির) মুখপত্র হিসেবে লাঙল প্রকাশ শুরু হয়। নজরুল স্বরাজ পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। লাঙল পত্রিকার প্রধান পরিচালক হিসেবে নজরুল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের নাম মুদ্রিত হতো। অবৈতনিক প্রধান পরিচালক হিসেবে নজরুলকে পত্রিকার সবদিক সামলাতে হতো। [সূত্র: নজরুলের সাংবাদিক জীবন, রাশেদুল আনাম সম্পাদিত সাময়িকপত্র সম্পাদনায় নজরুল, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা ২০২৩ প. ৬৭]
লাঙল পত্রিকার জমিনে দৃশ্যমান সব লেখা, প্রতিবেদন ইত্যাদিসমেত ভারতীয়দের অধিকার ও স্বাধীনতার বার্তা দেওয়া হতো। বিশেষত মানবতা, মুক্তি, অধিকারের বিষয়ে সচেতন করতে লাঙল ছিল উৎকৃষ্ট দাওয়াই। প্রথম সংখ্যাতেই প্রকাশ পায় নজরুলের ‘সাম্যবাদ’ কবিতা। পত্রিকার আখ্যাপত্রে উৎকীর্ণ থাকত চণ্ডীদাসের বিখ্যাত শ্লোক-
‘শুনহ মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।’
নজরুল স্বাধীনতা অর্জনের কৌশল হিসেবে সমাজতান্ত্রিক শ্রেণিচেতনাকে ধারণ করে মানুষকে সজাগ করে মুক্তির সমরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্য লাঙল সম্পর্কে মুজফ্ফর আহমেদ বলেন- ‘এ পত্রিকা পাঠকের জন্য নয় শুধু, এক শ্রেণির কর্মী তৈরি করার জন্য প্রকাশিত হয়েছে।’ [সূত্র: সাময়িক পত্র সম্পাদনায় নজরুল, রাশেদুল আনাম, নজরুল ইনস্টিটিউট ২০২৩ পৃ. ৬৮]
লাঙলের প্রকাশকালীন সময়ে ভাববাদী আবেগের চাইতে ভারতীয় তরুণদের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুদ্ধংদেহী চরিত্রের প্রকাশ বেশি ছিল। এজন্য সোশ্যালিস্ট ধারণাকে লালন করে প্রকাশ লাঙল গণমানুষের মনে রেখাপাত করেছিল। পত্রিকার ‘সোশ্যালিস্ট’ নামীয় প্রবন্ধে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের রূপরেখার ধারণার বয়ান ছাড়াও বিভিন্ন সংখ্যায় ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুশিয়া’ (দেবব্রত বসু), ‘কার্ল মার্কসের শিক্ষা’ (কুতবুদ্দীন আহমদ), ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ (মুজফ্ফর আহমদ), ‘সোশ্যালিজম কাহাকে বলে’ (সুরেশ বিশ্বাস), ব্রিটিশ সোশ্যালিস্ট দল ও ভারতবর্ষ নামীয় প্রবন্ধে সোশ্যালিজমের সামগ্রিক রূপরেখায় আলোকপাত করে ভারতীয় সমাজে কেন সোশ্যালিজম কায়েম প্রয়োজন স্বাধীনতার জন্য- সে বিষয়ে তাগিদ ছিল। সোশ্যালিস্ট বিশ্বাসে বলিয়ান নজরুল লাঙল পত্রিকার বিন্যাস করেছিলেন। কৃষক ও শ্রমিকদের সংবাদ ছাপা হতো ‘খরকুটে’ শিরোনামে। সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় মন্তব্য থাকত ‘খবরদারী’ নামক শিরোনামে। সাপ্তাহিক লাঙল কলকাতা থেকে ১ আনা মূল্যে প্রকাশ হতো। পত্রিকার সাইজ ছিল ১২.৫ ইঞ্চি বাই ৯ ইঞ্চি। লাঙলের লেখা সংগ্রহ ও লেখকদের লেখার আমন্ত্রণে নজরুলের মুনশিয়ানার স্বাক্ষর মেলে।
লাঙলে নজরুল ভারতের মানুষের অধিকার হরণের কেবল গড়পড়তা বয়ানের সমাহার করেনি কিংবা তাত্ত্বিক বুলি আওড়াননি বরং বাস্তবসমত উপাত্ত দিয়ে তৃণমূলের চালচিত্র তুলে আনার প্রয়াস ঘটিয়েছেন। শ্রী কুমার চক্রবর্তী রচিত প্রবন্ধে একজন শ্রমিকের বছরের খাদ্যের পরিমাণের একটি সারণিতে দেখানো হয়-
খাদ্যদ্রব্য- যুক্তরাজ্য- জাপান- ভারতবর্ষ-
মাংস ১৪০ ২১.৫ –
মৎস্য ২১ ৫০.৫ –
ডাল ২৮ ৩১.৪ ১১.৪
ভাত/রুটি ৩৪০ ৩০৯ ৪৬.৪
শাক-সবজি ৪২০ ৪৫৯ ৯৪.১
[পাউন্ড এককে বিবেচ্য] বি.দ্র.-(ড্যাশ) চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে নগণ্য বিবেচনায়।
উল্লিখিত সারণির মাধ্যমে ভারতবর্ষের মেহনতি মানুষের দৈন্যদশার চিত্র তুলে ধরতে এ ধরনের সারণিতে তথ্যের বিন্যাস করে প্রবন্ধকে অধিক পাঠকের কাছে গ্রহণের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান।
লাঙলের স্বল্পকালের জীবনে চারজন নেতার ছবি ছাপা হয়। এরা হলেন- কার্ল মার্কস, সুভাষচন্দ্র বসু, লেনিন ও সানইয়ং সেন। এদের প্রতি নজরুলের আবেগ ও ঝোঁক উভয়ই ছিল।
লাঙলের কমিউনিজম বা কমিউজমের ভাবানুষঙ্গী মনের স্বাক্ষর নজরুলের রচিত কবিতার প্রেক্ষাপট ও পঙ্ক্তিতেও সততা মেলে। লাঙলে নজরুলের সাম্যবাদ (প্রথম সংখ্যা), কৃষাণের গান (দ্বিতীয় সংখ্যা), শ্রমিকের গান (নবম সংখ্যা), জেলেদের গান (দ্বাদশ সংখ্যা) প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত কবিতার আঙ্গিক, প্রকরণে ভিন্নতা থাকলেও নানা মেরুকরণে মোটাদাগে মানুষের অধিকার ও নায্যতার বিষয় দৃঢ়ভাবে তুলে এনেছেন। লাঙল যেহেতু গণমানুষের মুখপাত্র হিসেবে প্রচারের অভিপ্রায় ছিল; সঙ্গত কারণেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে কৃষক-শ্রমিকের সম্মেলনের সংবাদ গুরুত্বসহকারে প্রচার হতো।
লাঙলের মোট ষোলোটি সংখ্যা প্রকাশ হয়েছিল। সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশ হয় ১৯২৬ সালের ১৫ এপ্রিল [সূত্র: আনিসুজ্জামান, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র পৃ. ৩৯৯] ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট থেকে লাঙল নাম পরিবর্তন করে ‘গণবাণী’ রাখা হয়। তখন মুজফ্ফর আহমদ পত্রিকার কার্যভার গ্রহণ করেন।
কালের খেরোখাতার হিসাবে লাঙলের শতবর্ষের বয়সে নজরুল ও লাঙল যেন সমার্থক। সেই সময়কালের ভারতের সমাজচিত্রের কালিকবিচারে লাঙল যেন গুণবিচারে যুগচাহিদার নিরিখে জ্বলজ্বলে। উনিশ ও বিশ শতকের মাঝে বাংলায় যেসব যুগন্ধর সম্পাদক এসেছেন তাদের মধ্যে অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, প্রমথ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সজনীকান্ত, সুধীন দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, মোজাম্মেল হক, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন প্রমুখের সঙ্গে নজরুলের বহুমাত্রিক সৃজনকর্ম ছাড়াও সাংবাদিক কিংবা সম্পাদক নজরুল অনন্য। ‘লাঙল’ পত্রিকা সে বিবেচনায় আলোচনার শীর্ষে আছে এবং থাকবে।
নজরুলের সৃষ্টির বড় প্রতিপাদ্য উদার জাগরণ, সত্যানুসন্ধান, সংস্কারমুক্তি, আধুনিকতা, শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্তির প্রয়াস। এসব অনুষঙ্গে রিভাইভালের মাধ্যামে ভারতবাসীকে মুক্তির পথে যাত্রার পথিক ছিলেন নজরুল। লাঙল শুধু একটা পত্রিকা নয় একটা দিকনির্দেশক। পত্রিকায় আদলে মুলত পথ বাতলে দিয়েছে বৃটিশ তাবেদারী থেকে মুক্তির। এই মুক্তিই ছিলো সেই সময়ে ভারতবাসীর স্বপ্ন। লাঙল স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে এটাই বড় স্বার্থকতা।
খান মাহবুব : লেখক ও প্রাবন্ধিক
