স্থায়ী ঠিকানা: শেকড়, স্মৃতি ও এক মানবিক উপন্যাসের প্রতিধ্বনি

মানুষের জীবন চলমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় তার পোশাক, বাসস্থান, প্রযুক্তি, জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা। পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম, আর সেই পরিবর্তনই সভ্যতাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সব পরিবর্তনই কি উন্নয়ন?

শুধু পুরোনোকে ভেঙে নতুন কিছু গড়ে তোলাই কি অগ্রগতি? নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং শিকড়কে বিসর্জন দিয়ে যদি আধুনিকতার নামে কেবল অন্যের অনুকরণ করা হয়, তাহলে সেটি কি সত্যিই বিকাশ? নাকি নিজের পরিচয় হারিয়ে আমরা এমন এক অচেনা জগতে প্রবেশ করি, যেখানে দালান থাকে, মানুষ থাকে, কিন্তু থাকে না আত্মার কোনো ঠিকানা?

এই গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই পাঠককে আহ্বান জানায় শওকত আলীর ‘স্থায়ী ঠিকানা’। মাত্র ছিয়ানব্বই পৃষ্ঠার এই ছোট্ট উপন্যাসটি শেষ করার পর উপলব্ধি হয়, বইয়ের আকার নয়, ভাবনার গভীরতাই একটি সাহিত্যকর্মকে বড় করে তোলে।

কিছু কিছু বই পড়া শেষ হয়, কিন্তু বইয়ের ভেতরের মানুষগুলো শেষ হয় না। তারা পাঠকের ভেতর বাসা বাঁধে, প্রশ্ন করে, অস্বস্তিতে ফেলে, কখনো চোখ ভিজিয়ে দেয়, কখনো আবার নিজের চারপাশটাকেই নতুন করে দেখতে শেখায়। ‘স্থায়ী ঠিকানা’ ঠিক তেমনই একটি উপন্যাস।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পৃথিবীর সব সত্যিকারের লেখকের বুকের বেদনাই এক। একজন প্রকৃত সাহিত্যিক কখনো তাঁর সময়ের কাছে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। সমাজের অসঙ্গতি, রাষ্ট্রের অনিয়ম, মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয়, সংস্কৃতির অবমাননা—এসবই সবার আগে এসে আঘাত করে লেখকের হৃদয়ে। সাধারণ মানুষ যেখানে অনেক কিছু দেখে না, লেখক সেখানে দেখেন; আমরা যেখানে অনেক কিছু অনুভব করি না, লেখক সেখানে রক্তক্ষরণ অনুভব করেন। সেই রক্তক্ষরণই একসময় শব্দ হয়ে ওঠে, বাক্য হয়ে ওঠে, উপন্যাস হয়ে ওঠে।

‘স্থায়ী ঠিকানা’ পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে, মুহিব হাসান কেবল একটি চরিত্র নন; তিনি যেন লেখক শওকত আলীরই আরেকটি মুখ। তাঁর দৃষ্টিতে, তাঁর প্রশ্নে, তাঁর বেদনায়, তাঁর প্রতিবাদে আমি লেখকের নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পেয়েছি।
আজ আমরা উন্নয়নের নামে কত সহজে গাছ কেটে ফেলি, পুকুর ভরাট করি, শিউলীতলা উধাও করে সেখানে কংক্রিটের অট্টালিকা দাঁড় করাই। অনেকে এটিকে আধুনিকতার জয়গান বলবেন। কিন্তু একজন লেখক সেই দৃশ্য দেখে শুধু নতুন দালান দেখেন না; তিনি দেখেন হারিয়ে যাওয়া শৈশব, মুছে যাওয়া স্মৃতি, বিলীন হয়ে যাওয়া মানুষের শেকড়। তিনি শুনতে পান কেটে ফেলা গাছের নীরব আর্তনাদ, দেখতে পান ইতিহাসের ধীরে ধীরে মুছে যাওয়ার দৃশ্য।
এই জায়গাতেই মুহিব হাসান অন্যরকম। এই জায়গাতেই শওকত আলী অনন্য।

উপন্যাসটি আসলে শুধু একটি মানুষের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের গল্প, আমাদের সময়ের গল্প, আমাদের অস্তিত্বের গল্প। আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, আর সেই যাত্রাপথে কী কী হারিয়ে ফেলছি? এই প্রশ্নগুলো লেখক অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে, কিন্তু তীব্র শক্তিতে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

শওকত আলীর ভাষা আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে। কোথাও অযথা অলংকারের বাহুল্য নেই, আবার কোথাও আবেগের কৃত্রিম প্রদর্শনীও নেই। তাঁর বাক্যগুলো এতটাই স্বাভাবিক যে মনে হয় জীবন নিজেই যেন কথা বলছে। অথচ সেই সরল ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে গভীর দর্শন, ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস এবং মানুষের প্রতি অফুরন্ত মমতা।

উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে আমি দীর্ঘক্ষণ বইটি বন্ধ করতে পারিনি। শেষ দৃশ্যটি বুকের ভেতর এমনভাবে আঘাত করে যে চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। সেই কান্না কেবল কোনো চরিত্রের জন্য নয়; সেই কান্না নিজের জন্যও, নিজের সময়ের জন্যও, হারিয়ে যেতে থাকা মানবিকতার জন্যও।

একজন লেখক তখনই সফল হন, যখন তাঁর লেখা শেষ হওয়ার পরও পাঠক বইটির ভেতর থেকে বের হতে পারেন না। ‘স্থায়ী ঠিকানা’ আমার কাছে তেমনই একটি উপন্যাস। এটি শেষ হয় শেষ পৃষ্ঠায় নয়; বরং পাঠকের ভেতরে শুরু হয় নতুন এক চিন্তার যাত্রা।
শওকত আলী আমার অন্তরের প্রিয় লেখকদের একজন। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিকদের তালিকায় তাঁর নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, এ আমার বিশ্বাস। তাঁর প্রতিটি রচনায় আমি খুঁজে পাই মানুষের প্রতি গভীর দায়বোধ, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের মাটির প্রতি অসীম ভালোবাসা।

আজকের পাঠকদের প্রতি আমার আন্তরিক অনুরোধ, শওকত আলীকে পড়ুন। তাঁর সাহিত্য শুধু গল্প বলে না, মানুষকে ভাবতে শেখায়; শুধু বিনোদন দেয় না, বিবেককে জাগিয়ে তোলে; শুধু সময় কাটায় না, সময়কে বুঝতে শেখায়।

একবার তাঁর লেখার বিশাল সমুদ্রে ডুব দিন। দেখবেন, ফিরে আসবেন না শূন্য হাতে। ভাষার সৌন্দর্য, চিন্তার দীপ্তি, ইতিহাসের গন্ধ, মানুষের প্রতি গভীর মমতা আর অমূল্য জীবনবোধের অসংখ্য মণি-মুক্তোয় আপনার হৃদয় ভরে উঠবে।

বই শেষ হবে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি অনেক দিন ধরে আপনার ভেতরে বেঁচে থাকবে। আর তখনই হয়তো উপলব্ধি করবেন, মানুষের সবচেয়ে বড় ঠিকানা কোনো শহর নয়, কোনো বাড়ি নয়; মানুষের সবচেয়ে স্থায়ী ঠিকানা তার শিকড়, তার স্মৃতি, তার মানবিকতা।

মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা

আরও পড়ুন