সাহিনা মিতার তিনটি কবিতা

পিতামহের পৈত্রিক উঠোনে
কখনো ডুবে যাই!
পরিচিত অঞ্চল যুরে সাড়িবদ্ধ দানবেরা
ক্রমান্বয়ে গিলে নেয় শক্তি ও শরীর!
ষষ্ঠইন্দ্রীয় ভর করে কুৎসিৎ দৈত্যগুলো
প্রতিদিন ঢুকে পরে অভ্যন্তরে, ঠেকােেনার সাধ্য নেই!
নিঃশ্বাসের সাথে সাথে তাদের অবাধ যাতায়াত!
ভেসে উঠি শৈশবের পৈত্রিক উঠোনে, যেখানে
প্রাণভরে শ্বাস নেই,
ইরির আল,খালের কিনারে ভেসেউঠা শোলপোনা
আবার গামছায় ধরি,
ডুমুর পাতার বাসায় টুনটুনির ছাঁ অথবা
মগডালে বসে বুঝে নেই পাকা আমের বৃত্তান্ত।
সে আমার বিদ্যালয়ের বারান্দা, পঞ্চাশ গুটির ঘর-
প্রতিবেশীর উঠোন, গোল্লাছুট বা বৌ-চোর খেলার মাঠ,
সে আমার দাদিকালের শীত সকাল,
ঢেকির ভানে আলাচালের গুঁড়িকুটা ভোর,
তিনচৌকা চুলার উনুনে ভাজা মুড়ির মৌ মৌ ঘ্রাণ।
এই বর্ষায়
এই বর্ষায় একদিন নীল শাড়ী পরতে চাই
তারপর চারুকলার রাস্তায় হুটখোলা রিকশায়
আপনার সাথে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে চাই….
হাত ছুঁয়ে থাকবো কিন্তু!
এই বর্ষায়, কে জানে আসছে বর্ষায় মরে যাই যদি!
এতো এতো অপূর্ণ সাধ বুকে নিয়ে মরে গেলে-
মরার পরেও কি মন তবু মরবে? না-তো!
নিশুতী রাতে, অথবা তিপ্রহরের সন্ধ্যায় নীল শাড়ী,
নীল চুড়ি পরে অতৃপ্ত আত্মা হয়ে আপনার চারপাশে
ঝমঝম ঝমঝম শব্দ করে হাঁটবো।
মাঝেমাঝে আসবো ঘুমের ঘোরে,
ঘুমন্ত আপনার বা-পাশে বসবো
বুকের মধ্যে আলতো রেখে হাত
কানের মধ্যে ঘ্যনঘ্যান ঘ্যানঘ্যান করেই যাবো-
‘চলেন বৃষ্টিতে ভিজবো,
চলেন পিচঢালা পথে হাঁটবো,
চলেন ছাতিমের ছায়ায় বশবো
স্বর্ণচাপা চাই, এনে দিন
বেলি কিনে দিন প্লিজ, বকুল কুড়াই চলেন,
দোলনচাঁপা বড্ড প্রিয়,গাজরা গুঁজে দিন খোপার চুলে’
এইসব পুরোনো বেহালা-
বাজতেই থাকবে,বাজতেই থাকবে ভোরঅব্দি!
ঘুমোতে পারবেন না মোটেই!
সকালে অফিসের হবে লেট! ব্যাস,
আপনার শান্তির হবে সাত-সদাই!
তো বাপু এত বিরম্বনা কে চায়! আপনিতো না-ই!
তাই মঙ্গলে মঙ্গলে এই বর্ষায়,
এই বর্ষায়-ই! কি বলেন মশাই? চাই তো? শান্তি?
গহীনের প্রেম
ধ্যানমগ্ন আটশত আটাশ বছর
ডুবে ছিলাম অরণ্যের অন্তস্থলে,
সেখানে বৃষ্টি হতাম,
শুকনো পাতা,কখনো বসন্ত হতাম
বাতাসের সাথে খুনসুটি করতে করতে
কতবার হারিয়ে ফেলেছি ধ্যানাসন!
কখনো হয়েছি ভাটফুল,
তেলাকুচির টকটকে পাকা ফল, আবার
রস্না লতায় জড়িয়ে ঝুলে থেকেছি বৃক্ষের গলায়
কতবার পদ্ম হয়েছি, লালপদ্ম, নীল পদ্ম!
আমারচে ঢের বেশি বয়সী বৃক্ষ ছিল-
তার গায়ের বাকল হয়ে ছিলাম কিছুকাল!
অবশেষে ধুলো হলাম, উড়তে উড়তে এসে
থিতু হলাম আপনার চোখের চশমায়!
মুছে মুছে যাকে করেন নি:চিহ্ন প্রতিবার!
মহোদয়, কতবার মুছবেন?
আপনার নিঃশ্বাস যেই বাতাসে-
ধুলো হলেও আমি মিশে আছি সেই বাতাসেই!
সাহিতা মিতা: কবি
