অক্ষয়কুমার দত্ত সমাজবিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত: বিস্মৃতির অন্তরালে এক আলোকপুরুষ

পর্ব : ০১
১৮২০ সালের ১৫ জুলাই। বর্ধমান জেলার (বর্তমান পূর্ব বর্ধমান) নবদ্বীপের অদূরে ছোট্ট গ্রাম চুপী। সেখানেই জন্ম নেন বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী অক্ষয়কুমার দত্ত। পিতা পীতাম্বর দত্ত, কলকাতা পুলিশের একজন কর্মচারী; মাতা দয়াময়ী দেবী। সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিশুটিই পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ, আধুনিক সমাজচিন্তার অগ্রদূত এবং বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ, আধুনিক সমাজচিন্তার অগ্রদূত এবং ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানচর্চার অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবেন—সেদিন তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস উচ্চারণ করতে গেলেই কয়েকটি নাম স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের মনে আসে—রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের অবদান নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, গবেষণা হয়েছে, স্মরণসভা হয়েছে। কিন্তু এই দীপ্ত নক্ষত্রমালার মধ্যেই এমন একজন মনীষী আছেন, যাঁর প্রভাব বাংলা ভাষা, বিজ্ঞানচর্চা, সমাজভাবনা এবং যুক্তিবাদের ভিত নির্মাণে এত গভীর, অথচ যাঁর নাম আজ বিস্মৃতির অন্তরালে প্রায় হারিয়ে গেছে। তিনি অক্ষয়কুমার দত্ত।
এ বছর তাঁর জন্মের দ্বিশতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে। ১৫ জুলাই শুধু একজন মনীষীর জন্মদিন নয়; বাংলা ভাষায় যুক্তিবাদী চিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনার দিন। তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, গড়ে তুলেছিলেন অসংখ্য বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, সমাজকে বুঝতে শিখিয়েছিলেন পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে। আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে তাঁকে বাংলা তথা উপমহাদেশের সমাজবিজ্ঞানচর্চার অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিস্ময়ের বিষয়, যে মানুষটি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রথম সুসংহত ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, যিনি বাংলা গদ্যকে যুক্তির ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন এবং ধর্ম, সমাজ, ইতিহাস ও দর্শনকে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আলোয় বিচার করেছিলেন, তাঁর নাম আজ সাধারণ শিক্ষিত বাঙালির কাছেও ততটা পরিচিত নয়। বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সমসাময়িক হয়েও তিনি জনস্মৃতিতে সেই মর্যাদা পাননি, যার তিনি প্রকৃত দাবিদার ছিলেন। অথচ বিদ্যাসাগরকে যেমন তাঁর সময়ের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হলে অক্ষয়কুমারকে জানতে হয়, তেমনি বাংলা নবজাগরণের প্রকৃত চরিত্র অনুধাবন করতেও তাঁর চিন্তাধারা অনিবার্য।
জ্ঞানসাধনার এক অনন্য অভিযাত্রা
অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন এমন এক মনীষী, যাঁর জীবন প্রমাণ করে—মহান হওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই শেষ কথা নয়; অদম্য জ্ঞানপিপাসা, কঠোর আত্মনিয়োগ এবং মুক্তচিন্তার সাহসই একজন মানুষকে ইতিহাসে অমর করে তোলে। তিনি ছিলেন একাধারে গ্রন্থকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সমাজচিন্তক, বাংলা গদ্যের নবনির্মাতা, বিজ্ঞানলেখক এবং আধুনিক যুক্তিবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার যে ভিত উনিশ শতকে নির্মিত হয়েছিল, তার প্রধান স্থপতিদের মধ্যে অক্ষয়কুমার দত্ত সর্বাগ্রে স্মরণীয়।
তিনি কেবল জ্ঞান আহরণ করেননি; জ্ঞানকে মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর চিন্তার জগতে সমকালীন ইউরোপীয় দর্শন, বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের গভীর প্রভাব ছিল। অগুস্ত কোঁতের প্রত্যক্ষবাদ, জেরেমি বেন্থাম ও জন স্টুয়ার্ট মিলের উপযোগবাদ, হারবার্ট স্পেন্সারের বিবর্তনবাদী সমাজচিন্তা—সবই তিনি আত্মস্থ করেছিলেন, কিন্তু অন্ধ অনুসরণ করেননি। ভারতীয় সমাজবাস্তবতার আলোয় সেগুলিকে বিচার করে নিজের স্বতন্ত্র চিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে কেবল একজন লেখক বা দার্শনিক নয়, আধুনিক ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানেরও অগ্রদূত বলা হয়।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন কঠোর নীতিবান, বিনয়ী ও মানবপ্রেমী। সত্যের প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল আপসহীন। দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ছিল গভীর। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাই যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন—”তিনিই বাঙালির সর্বপ্রথম নীতিশিক্ষক।” বিজ্ঞান ছিল তাঁর নেশা, গবেষণা ছিল তাঁর সাধনা। কলকাতায় বিজ্ঞানচর্চার যে বৌদ্ধিক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল এবং পরবর্তীকালে যার ধারাবাহিকতায় ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স (IACS)-এর মতো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই পরিবেশ নির্মাণে অক্ষয়কুমার দত্তের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো জাতি কুসংস্কারমুক্ত হতে পারে না যদি সেই জাতির মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে না ওঠে।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপনও ছিল সেই বিজ্ঞানচেতনার প্রতিফলন। বিচারপতি সদাচরণ মিত্রের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, তাঁর শয়নকক্ষে টাঙানো থাকত নিউটন ও ডারউইনের প্রতিকৃতি। ঘরের দেওয়ালে ছিল নক্ষত্রমণ্ডলের মানচিত্র, আর সংগ্রহে ছিল নরকঙ্কাল, পশুর কঙ্কাল, জীবাশ্ম ও বিভিন্ন শিলাখণ্ড। তাঁর গৃহ যেন ছিল এক ব্যক্তিগত গবেষণাগার—যেখানে ধর্মীয় অলৌকিকতার পরিবর্তে স্থান পেয়েছিল পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও যুক্তি।
অক্ষয়কুমার দত্তের কাছে জ্ঞান ছিল না কেবল ব্যক্তিগত সাধনার বিষয়; ছিল সমাজকে আলোকিত করার অস্ত্র। তাই তিনি আজও কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন—তিনি আধুনিক বাঙালির যুক্তিবাদী আত্মপরিচয়ের অন্যতম নির্মাতা।
স্বশিক্ষায় নির্মিত এক মহীরুহ
অক্ষয়কুমার দত্তের জীবনকাহিনি আসলে আত্মপ্রতিষ্ঠার এক অনন্য ইতিহাস। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা যে একজন মানুষের জ্ঞানচর্চার সীমা নির্ধারণ করতে পারে না, তাঁর জীবন তার উজ্জ্বল প্রমাণ। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে সংসারের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। অর্থাভাবে নিয়মিত শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটলেও জ্ঞানসাধনার পথ থেকে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও সরে আসেননি। বরং প্রতিকূলতাকেই তিনি নিজের শিক্ষক করে তুলেছিলেন।
গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে ভর্তি হন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই পিতা পীতাম্বর দত্তের মৃত্যু তাঁর জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে। নিয়মিত পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়। অনেকের জীবন সেখানেই থেমে যায়; অক্ষয়কুমারের জীবন সেখান থেকেই যেন সত্যিকার অর্থে শুরু হয়।
দিনে জীবিকার সংগ্রাম, রাতে বই—এই ছিল তাঁর জীবনযাত্রা। নিজের উদ্যোগে তিনি এমন এক অধ্যয়ন শুরু করেন, যার বিস্তার সে যুগের বহু বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত মানুষেরও ছিল না। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির শিক্ষক, বহুভাষাবিদ জেফ্রয়ের উৎসাহে তিনি গ্রিক, লাতিন, জার্মান, ফরাসি ও হিব্রু ভাষা শেখেন। শুধু ভাষা নয়, পদার্থবিদ্যা, গণিত, ভূগোল, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, মনোবিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাও গভীর আগ্রহ নিয়ে অধ্যয়ন করেন। অন্যদিকে আমিরউদ্দীন মুন্সির কাছে শেখেন ফারসি ও আরবি ভাষা। জ্ঞানের প্রতি তাঁর এই অদম্য আকর্ষণই তাঁকে সমসাময়িক বাঙালি শিক্ষিত সমাজে এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
পরবর্তীকালে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালীন তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে নিয়মিত ছাত্র হিসেবে নয়, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী হিসেবে উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, রসায়ন এবং প্রকৃতিবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন। একটি বিষয়ে সামান্য জ্ঞান অর্জন করে সন্তুষ্ট হওয়া তাঁর স্বভাব ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত জ্ঞান কখনও বিচ্ছিন্ন নয়; বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ভাষা ও সমাজ—সবই এক বৃহৎ মানবসভ্যতার পরস্পর-সংযুক্ত অধ্যায়।
এই স্বশিক্ষিত মনীষীর জ্ঞানপিপাসা দেখে আজও বিস্মিত হতে হয়। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসর ছিল সীমিত, কিন্তু তাঁর আত্মশিক্ষার পরিধি ছিল বিশ্বব্যাপী। সেই কারণেই তিনি শুধু একজন পণ্ডিত নন; তিনি ছিলেন এক চলমান বিশ্ববিদ্যালয়।
পরবর্তী সময়ে এই অসাধারণ আত্মপ্রস্তুতির ফলই প্রতিফলিত হয় তাঁর লেখনীতে। মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী গ্রন্থ—‘ভূগোল’। সেই বই শুধু একটি পাঠ্যপুস্তক ছিল না; বাংলা ভাষায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক গদ্যেরও এক নতুন সূচনা।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ
১৮৪০ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ববোধিনী পাঠশালায় অক্ষয়কুমার দত্ত মাসিক মাত্র আট টাকা বেতনে ভূগোল ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বিদ্যালয়টির একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল—পাঠদান হবে মাতৃভাষা বাংলায়। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্যত্র। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বা ভূগোল শেখানোর মতো উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তক তখন কার্যত ছিল না। শিক্ষকেরা ইংরেজি বইয়ের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হতেন, আর ছাত্রদের কাছে বিজ্ঞান রয়ে যেত দুর্বোধ্য ও দূরবর্তী।
অক্ষয়কুমার এই সংকটকে কেবল একটি শিক্ষাগত সমস্যা হিসেবে দেখেননি; তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার উপযোগী ভাষা গড়ে না তুললে কোনো জাতির প্রকৃত বৌদ্ধিক বিকাশ সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই মাত্র একুশ বছর বয়সে, ১৮৪১ সালে তিনি রচনা করেন বাংলা ভাষায় প্রথম আধুনিক ভূগোল গ্রন্থ—‘ভূগোল’। উল্লেখযোগ্য বিষয়, তখনও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। বাংলা গদ্যের ইতিহাসে এটি এক যুগান্তকারী ঘটনা।
‘ভূগোল’ শুধু একটি পাঠ্যপুস্তক ছিল না; এটি ছিল বাংলা ভাষাকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাহন করে তোলার প্রথম সফল প্রয়াস। ভাষা ছিল সহজ, যুক্তিনিষ্ঠ এবং প্রাঞ্জল। অক্ষয়কুমার অপ্রয়োজনীয় সংস্কৃতঘনতা পরিহার করে এমন একটি গদ্য নির্মাণ করেছিলেন, যা ছাত্রদের কাছে বিজ্ঞানকে সহজবোধ্য করে তোলে। শুধু তাই নয়, বাংলা গদ্যে যতিচিহ্নের নিয়মিত ও সচেতন ব্যবহারেরও অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। বাংলা ভাষার আধুনিক গদ্যরীতির বিকাশে এই অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বইটির ভাষার একটি অংশ আজও বিস্ময় জাগায়— “পৃথিবীর আকৃতি প্রায় গোল; যেমন কমলালেবু গোলাকার। অথচ তাহার বোঁটার নিকট কিঞ্চিৎ নিম্ন; সেইরূপ পৃথিবীও গোল, কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণে কিঞ্চিৎ চাপা।” এই কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর অসাধারণ শিক্ষাদর্শ। কঠিন বৈজ্ঞানিক বিষয়কে তিনি পরিচিত উদাহরণের সাহায্যে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে সাধারণ ছাত্রও সহজে বিষয়টি বুঝতে পারে। বিজ্ঞানকে ভয় নয়, কৌতূহলের বিষয় করে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
অক্ষয়কুমারের কাছে মাতৃভাষা কখনও কেবল আবেগের বিষয় ছিল না; ছিল জ্ঞানসৃষ্টির প্রধান মাধ্যম। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যে ভাষায় মানুষ চিন্তা করে, সেই ভাষাতেই সর্বোচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। আজ মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, তখন প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি আগে তাঁর উচ্চারিত এই দর্শন নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসে।
‘ভূগোল’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে অক্ষয়কুমার দত্ত শুধু একটি বই লেখেননি; বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার এমন এক দ্বার খুলে দিয়েছিলেন, যার ফলে বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার একটি সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও মনীষীরা মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন।
‘তত্ত্ববোধিনী’ ও বাংলা নবজাগরণের বৌদ্ধিক বিপ্লব
অক্ষয়কুমার দত্তের জীবন ও কর্মের ইতিহাসে যদি একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রবিন্দু বলা যায়, তবে তা নিঃসন্দেহে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ এবং তার মুখপত্র ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’। এই পত্রিকার সম্পাদকের আসনে বসেই তিনি কেবল একজন লেখক হিসেবে নন, উনিশ শতকের বাংলা সমাজের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় তত্ত্ববোধিনী শুধু একটি সাময়িকপত্র ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল বাংলা নবজাগরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মের আদর্শ প্রচার ও সমাজে যুক্তিবাদী চেতনা বিস্তারের উদ্দেশ্যে তত্ত্ববোধিনী সভা প্রতিষ্ঠা করেন। অক্ষয়কুমার প্রথম থেকেই এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৮৪০ সালে তিনি তত্ত্ববোধিনী পাঠশালায় শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বাংলা ভাষার সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকপত্রে পরিণত হয়।
যদিও পত্রিকার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ব্রাহ্মধর্মের আদর্শ প্রচার, অক্ষয়কুমার দত্তের হাতে তার চরিত্র দ্রুত প্রসারিত হয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি সমাজকে বদলাতে হলে ধর্মীয় আলোচনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, ভাষা, সমাজনীতি এবং শিক্ষার মুক্তচর্চা। ফলে তত্ত্ববোধিনী এক নতুন যুগের সূচনা করল। বাংলা ভাষায় এমন বহুমাত্রিক বৌদ্ধিক পত্রিকা এর আগে কার্যত দেখা যায়নি।
এই সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে অক্ষয়কুমারের বন্ধুত্ব ও বৌদ্ধিক সহযোগিতা আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। দু’জনের চিন্তার ধরন ছিল ভিন্ন, কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক—সমাজকে যুক্তির আলোয় আলোকিত করা। বিদ্যাসাগর যেখানে শিক্ষা, নারী-অধিকার ও সামাজিক সংস্কারের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, সেখানে অক্ষয়কুমার যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মুক্তচিন্তার ভিত নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই দুই মনীষীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তত্ত্ববোধিনী বাংলা নবজাগরণের এক অনন্য বৌদ্ধিক মঞ্চে পরিণত হয়।
অক্ষয়কুমারের সম্পাদনায় পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস, দর্শন, প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান, সমাজসংস্কার এবং শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধ। স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, বিধবাবিবাহের সমর্থন, বাল্যবিবাহের বিরোধিতা, জাতিভেদ ও কুসংস্কারের সমালোচনা—এসব বিষয় তিনি নির্ভীকভাবে তুলে ধরেছিলেন। শুধু মতপ্রকাশ নয়, প্রতিটি লেখায় তিনি তথ্য, যুক্তি ও বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আবেগ নয়, যুক্তিই ছিল তাঁর প্রধান অস্ত্র।
শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও তাঁর কলম সমান দৃঢ় ছিল। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার, জমিদারদের প্রজাপীড়ন এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। এমন এক সময়ে, যখন ক্ষমতার সমালোচনা করা সহজ ছিল না, তখন তাঁর এই নির্ভীক সাংবাদিকতা বাংলা সংবাদজগতেও এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
দীর্ঘ বারো বছর তিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাতেই বাংলা সাময়িকপত্র প্রথম সত্যিকার অর্থে জ্ঞানচর্চা, সমাজসমালোচনা এবং জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে বঙ্গদর্শন, ভারতী, প্রবাসী কিংবা সবুজপত্র-এর মতো যে সব সাময়িকপত্র বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, তাদের পূর্বসূরি হিসেবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার অবদান অনস্বীকার্য।
অক্ষয়কুমার দত্ত বুঝেছিলেন, একটি জাতির নবজাগরণ কেবল কয়েকজন মহাপুরুষের বক্তৃতায় ঘটে না; তা গড়ে ওঠে মুক্ত চিন্তার অবাধ আদান-প্রদানের মাধ্যমে। তত্ত্ববোধিনী সেই মুক্ত চিন্তারই বিদ্যালয় ছিল, আর অক্ষয়কুমার ছিলেন তার প্রধান স্থপতি।
সমাজসংস্কারক অক্ষয়কুমার: যুক্তির পক্ষে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে
অক্ষয়কুমার দত্তের পরিচয় কেবল বিজ্ঞানলেখক বা দার্শনিক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক। তবে তাঁর সংস্কারের পথ ছিল অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের স্থায়ী পরিবর্তন কেবল আইন করে বা আবেগ দিয়ে সম্ভব নয়; মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আর সেই পরিবর্তনের একমাত্র পথ—শিক্ষা, যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতা।
এই কারণেই স্ত্রীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি কিংবা সামাজিক কুসংস্কার—প্রতিটি বিষয়েই তিনি নির্ভীকভাবে কলম ধরেছিলেন। তাঁর লেখা কখনও উত্তেজনাপূর্ণ নয়, কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মকও নয়। বরং তথ্য, ইতিহাস, যুক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে তিনি সমাজকে আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন। এই সংযত অথচ দৃঢ় যুক্তিবাদই তাঁকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে।
বিধবাবিবাহ প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের প্রতি তিনি শুধু নৈতিক সমর্থনই জানাননি, ব্যক্তিগত জীবনেও সেই আদর্শের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর পৌত্র, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা জীবনীতে একটি ঘটনা উল্লেখ আছে। অক্ষয়কুমারের এক কর্মচারী কয়েক হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। পরে চিঠি লিখে তিনি যখন কর্মচারীকে অর্থ ফেরত দিতে বলেন, উত্তরে সেই ব্যক্তি জানান—আপনিই তো বলেছিলেন, আমি যদি একজন বিধবাকে বিবাহ করি, তবে আমাকে পুরস্কৃত করবেন। আমি একজন বিধবাকেই বিয়ে করেছি।
অক্ষয়কুমার বিষয়টি যাচাই করে জানতে পারেন, কথাটি সত্য। তিনি আর অর্থ ফেরত চাননি। বরং উত্তর লিখেছিলেন—”তোমার সকল অপরাধ ক্ষমা করলাম।” এই ঘটনাটি কেবল তাঁর উদারতার পরিচয় নয়; এটি দেখায়, তিনি নিজের বিশ্বাসকে কেবল লেখায় নয়, জীবনেও ধারণ করতেন।
সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর আর-একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কোনো বিষয়কে ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে নয়, মানবকল্যাণের বিচারে মূল্যায়ন করতেন। তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদা ছিল সর্বাগ্রে। নারী-পুরুষের সমান শিক্ষার অধিকার, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, সমাজে যুক্তিবাদী পরিবেশ এবং কুসংস্কারমুক্ত জীবন—এসবই ছিল তাঁর সমাজদর্শনের অপরিহার্য অংশ।
তাঁর লেখায় বারবার ফিরে আসে একটি মৌলিক বিশ্বাস—অজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় ভয়, আর ভয় থেকেই কুসংস্কার। তাই সমাজকে মুক্ত করতে হলে প্রথমেই জ্ঞানের আলো পৌঁছে দিতে হবে মানুষের ঘরে ঘরে। তিনি মনে করতেন, যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে না, সেই সমাজ কখনও উন্নত হতে পারে না।
এই কারণেই অক্ষয়কুমার দত্তকে কেবল একজন সংস্কারক বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি ছিলেন সমাজকে যুক্তির ভিত্তিতে পুনর্গঠনের এক নিরলস সাধক। তাঁর কাছে সংস্কার মানে ছিল না প্রাচীন সবকিছু বর্জন করা; বরং যা যুক্তিসঙ্গত, মানবকল্যাণকর এবং সত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, তাকে গ্রহণ করা এবং যা অন্ধবিশ্বাস, অবিচার ও বৈষম্য সৃষ্টি করে, তাকে নির্ভয়ে প্রত্যাখ্যান করা।
আজ, যখন সমাজে নানা ধরনের গুজব, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং অন্ধবিশ্বাস নতুন নতুন রূপে ফিরে আসছে, তখন অক্ষয়কুমার দত্তের এই যুক্তিনিষ্ঠ মানবতাবাদ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত শক্তি তার বিশ্বাসে নয়, তার প্রশ্ন করার সাহসে।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার স্থপতি
অক্ষয়কুমার দত্তের নাম উচ্চারণ করলেই যে অবদানের কথা সর্বাগ্রে স্মরণ করতে হয়, তা হলো বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ভিত্তি নির্মাণ। তিনি শুধু বিজ্ঞান বিষয়ে কয়েকটি বই লেখেননি; বাংলা ভাষাকেই বিজ্ঞানচর্চার উপযোগী করে তুলেছিলেন। আজ আমরা অনায়াসে যে বৈজ্ঞানিক পরিভাষাগুলি ব্যবহার করি, সেগুলির একটি বড় অংশই তাঁর মেধা, শ্রম ও ভাষানির্মাণের ফল।
১৮৪১ সালে প্রকাশিত ‘ভূগোল’-এর পর প্রায় পনেরো বছর পরে তিনি রচনা করেন ‘পদার্থবিদ্যা’—বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ পদার্থবিজ্ঞানের গ্রন্থ। এর পাশাপাশি ‘চারুপাঠ’-এর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড বাংলা শিক্ষার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এগুলি কেবল পাঠ্যপুস্তক ছিল না; ছিল যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার প্রথম সুসংহত পাঠক্রম। শিশুর কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে যুগান্তকারী অবদান ভাষা নির্মাণে। বিজ্ঞানকে মাতৃভাষায় শেখাতে হলে নতুন শব্দভাণ্ডার তৈরি করা ছাড়া উপায় ছিল না। অক্ষয়কুমার সেই অসম্ভব কাজকেই সম্ভব করেছিলেন। তিনি একের পর এক বাংলা বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নির্মাণ করেন, যেগুলি আজ এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা অনেকেই জানি না, এগুলির স্রষ্টা কে।
মাধ্যাকর্ষণ, আহ্নিক গতি, অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, বিষুবরেখা, চুম্বক, তড়িৎ, বিকিরণ, স্থিতিস্থাপকতা, আপেক্ষিক গতি, ভারকেন্দ্র, দূরবীক্ষণ, অণুবীক্ষণ, জ্যোতির্বিদ্যা, সৌরজগৎ, ধ্রুবতারা, গ্রহণ, জোয়ার, বাষ্প, বজ্র, আগ্নেয়গিরি, জ্বালামুখী, মানমন্দির—এমন অসংখ্য শব্দ তাঁর হাত ধরেই বাংলা ভাষায় স্থায়ী স্থান পেয়েছে। এগুলি শুধু শব্দ নয়; এগুলি বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।
অক্ষয়কুমার বুঝেছিলেন, ভাষা কেবল সাহিত্য রচনার মাধ্যম নয়; জ্ঞান উৎপাদনেরও মাধ্যম। যে ভাষায় বিজ্ঞান শেখানো যায় না, সেই ভাষা কখনও একটি জাতির পূর্ণাঙ্গ চিন্তার ভাষা হয়ে উঠতে পারে না। তাই তিনি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, যাতে বাংলায় বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস—সবকিছু নিয়েই উচ্চমানের আলোচনা সম্ভব হয়।
তাঁর এই কর্মযজ্ঞের গুরুত্ব আজ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আজও যখন দেশে বিতর্ক চলছে, তখন অক্ষয়কুমার দত্ত প্রায় দেড়শো বছর আগে দেখিয়ে দিয়েছিলেন—বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চা মাতৃভাষাতেই সম্ভব, যদি সেই ভাষাকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যায়।
বিজ্ঞানকে তিনি কখনও কেবল তথ্যের সমষ্টি হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল চিন্তার পদ্ধতি, যুক্তির অনুশীলন এবং মুক্তির পথ। সেই কারণেই তাঁর লেখা পাঠ্যপুস্তক পড়ে ছাত্ররা শুধু বিষয় শেখেনি; শিখেছিল প্রশ্ন করতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং যুক্তির সাহায্যে সত্যকে খুঁজে নিতে।
বাংলা ভাষা আজ যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষার ভাষা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, তার ভিত নির্মাণে অক্ষয়কুমার দত্তের অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর শ্রমে নির্মিত সেই ভাষাভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ বিজ্ঞানচর্চার এক নতুন যুগের সূচনা করেন। অক্ষয়কুমার দত্ত তাই কেবল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের প্রথম লেখক নন; তিনি বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক স্থপতি।
ধর্ম, যুক্তি ও সমাজচিন্তা: প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক নির্ভীক মনীষী
অক্ষয়কুমার দত্তের চিন্তার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি ছিল তাঁর ধর্মবোধ। তিনি ধর্মকে কখনও অন্ধবিশ্বাস বা অলৌকিকতার বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং ইতিহাস, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের আলোয় বিচার করার চেষ্টা করেছিলেন। উনিশ শতকের বাংলায়, যখন ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন অক্ষয়কুমার যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং প্রমাণকে সত্য নির্ণয়ের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সাহস দেখিয়েছিলেন। এই কারণেই তিনি শুধু একজন সমাজসংস্কারক নন, আধুনিক ভারতীয় যুক্তিবাদী চিন্তারও অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর।
১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ এবং আরও একুশজনের সঙ্গে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁরা ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রথম দীক্ষিত সদস্যদের অন্যতম। ব্রাহ্মধর্মের একেশ্বরবাদ, মূর্তিপূজাবিরোধিতা এবং সামাজিক সংস্কারের আদর্শ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু অক্ষয়কুমারের স্বভাবই ছিল প্রশ্ন করা। কোনো মতবাদকে তিনি চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নিতেন না।
বিজ্ঞানচর্চা যত গভীর হয়েছে, তাঁর চিন্তাও তত স্বাধীন হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন—বেদ মানুষের রচনা; অতএব তা অভ্রান্ত বা ঈশ্বরপ্রদত্ত গ্রন্থ বলে মেনে নেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই। এই বক্তব্য সে সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে ছিল অত্যন্ত সাহসী। কারণ ব্রাহ্মসমাজের ভেতরেও বেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কিন্তু অক্ষয়কুমার সত্যের অনুসন্ধানকে কোনো সম্প্রদায়ের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখতে রাজি ছিলেন না।
ব্রাহ্মসমাজে সংস্কৃত ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষায় উপাসনা চালুর ক্ষেত্রেও তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের মাতৃভাষাই তার আত্মপ্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। শেষ জীবনে তিনি প্রার্থনার প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান এবং ক্রমশ অজ্ঞেয়বাদী (Agnostic) দৃষ্টিভঙ্গির দিকে অগ্রসর হন। তাঁর কাছে মানুষের নৈতিকতা ধর্মীয় আচার থেকে নয়, বিবেক, যুক্তি ও মানবকল্যাণের চেতনা থেকেই উৎসারিত হওয়া উচিত।
এই স্বাধীন চিন্তাই তাঁকে অনেক সময় একাকী করে দেয়। ব্রাহ্মসমাজের একটি অংশ তাঁর মতামতকে অস্বস্তির চোখে দেখতে শুরু করে। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁর অবস্থানও ক্রমে জটিল হয়ে ওঠে। সমাজের রক্ষণশীল অংশ তো বটেই, অনেক প্রগতিশীল বলয়ও তাঁর প্রশ্নের তীব্রতা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য, যুক্তির দৃঢ়তা এবং আপসহীন মনোভাব তাঁকে সমীহ যেমন এনে দিয়েছিল, তেমনি বিচ্ছিন্নও করেছিল।
কিন্তু অক্ষয়কুমার কখনও জনপ্রিয়তার জন্য নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যের প্রতি আনুগত্যই একজন চিন্তকের প্রথম এবং শেষ কর্তব্য।
ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, এই দেশের বৌদ্ধিক ঐতিহ্য কেবল ঈশ্বরবাদী নয়; এর মধ্যে শক্তিশালী যুক্তিবাদী, বস্তুবাদী এবং নিরীশ্বরবাদী ধারাও বিদ্যমান। সাংখ্য, পূর্বমীমাংসা, চার্বাকসহ বিভিন্ন দর্শনের বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ভারতীয় চিন্তার ইতিহাস বহুমাত্রিক। ফলে ভারতীয় ঐতিহ্যকে একরৈখিক ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা ইতিহাসসম্মত নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর সময়ের তুলনায় বহু দূর এগিয়ে। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করতে হলে তাকে আগে জানতে হবে; আর জানার একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। আবেগ নয়, তথ্য; বিশ্বাস নয়, বিচার—এই ছিল তাঁর মননের মূলমন্ত্র।
আজকের সময়ে, যখন ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভাজন, গুজব এবং অন্ধবিশ্বাস নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন অক্ষয়কুমার দত্তের চিন্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি ধর্মের বিরোধিতা করেননি; তিনি বিরোধিতা করেছিলেন অন্ধ অনুসরণের। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে ধর্ম মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, সে ধর্ম মানুষের মুক্তির পথ হতে পারে না।
এই কারণেই অক্ষয়কুমার দত্ত কেবল উনিশ শতকের একজন মনীষী নন; তিনি একবিংশ শতকেরও প্রাসঙ্গিক চিন্তক। তাঁর যুক্তিবাদ আমাদের শেখায়—সভ্যতার অগ্রগতি ঘটে তখনই, যখন মানুষ বিশ্বাসের পাশাপাশি প্রশ্ন করার সাহসও অর্জন করে।
‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’: ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানের এক অমর দলিল
অক্ষয়কুমার দত্তের সমগ্র জীবনকর্মের মধ্যে যদি একটি গ্রন্থকে তাঁর মনীষার সর্বোচ্চ শিখর বলা যায়, তবে নিঃসন্দেহে সেটি ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’। বাংলা ভাষায় এমন বিস্তৃত, তথ্যনিষ্ঠ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রচিত সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতির ইতিহাস এর আগে কখনও লেখা হয়নি। শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, ভারতীয় সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব এবং ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও এই গ্রন্থ এক অনন্য মাইলফলক।
এই বই লেখার পেছনে ছিল বহু বছরের নিরলস সাধনা। অক্ষয়কুমার শুধু গ্রন্থাগারে বসে বই পড়ে তথ্য সংগ্রহ করেননি। তিনি দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, তাঁদের জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। আজ যাকে আমরা ক্ষেত্রসমীক্ষা (Field Study) বলি, উনিশ শতকে সেই পদ্ধতিরই সফল প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। এ কারণেই তাঁকে আধুনিক ভারতীয় সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বচর্চার অন্যতম অগ্রদূত বলা হয়।
গ্রন্থটির প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৭০ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৮৩ সালে। এই দুই খণ্ডে তিনি ভারতের প্রায় ১৮২টি উপাসক সম্প্রদায়ের উৎপত্তি, ইতিহাস, দর্শন, সামাজিক রীতি এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন। লক্ষণীয় বিষয়, তিনি বইটির নাম রেখেছিলেন ‘ধর্মীয় সম্প্রদায়’ নয়, ‘উপাসক সম্প্রদায়’। এই নামকরণের মধ্যেই তাঁর বৈজ্ঞানিক মনন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় নিহিত। তিনি কোনো সম্প্রদায়কে সত্য বা মিথ্যার মাপকাঠিতে বিচার করেননি; একজন গবেষকের নির্লিপ্ততা নিয়ে তাঁদের পরিচয় ও বিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন।
গ্রন্থটির আর-একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি কেবল তথ্যসংকলন নয়; তথ্যের বিশ্লেষণও বটে। ভারতীয় সমাজের ভেতরে বহমান নানা ধর্মীয় ধারা, দর্শনের পারস্পরিক প্রভাব, সামাজিক পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনকে তিনি যুক্তির আলোয় ব্যাখ্যা করেছেন। এই কারণে বইটি আজও গবেষকদের কাছে একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।
দ্বিতীয় খণ্ডে অক্ষয়কুমার আরও গভীরে প্রবেশ করেন। তিনি ভারতীয় দর্শনের নানা ধারা, বৈদিক সাহিত্য, সাংখ্য, মীমাংসা, চার্বাকসহ বিভিন্ন দার্শনিক মতের বিশ্লেষণ করেন। বিশেষভাবে তিনি দেখান, ভারতীয় চিন্তার ইতিহাস শুধু ঈশ্বরবিশ্বাসের ইতিহাস নয়; এখানে নিরীশ্বরবাদ, সংশয়বাদ এবং বস্তুবাদও সমানভাবে বিকশিত হয়েছে। তাঁর এই বিশ্লেষণ সে সময়ের প্রচলিত ধারণাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
বৈদিক সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য ছিল স্পষ্ট এবং নির্ভীক। তিনি লিখেছিলেন— “এখন বেদপ্রাণ হিন্দুমণ্ডলী! শ্রবণ কর! তোমাদের প্রাচীন মীমাংসকগণ অর্থাৎ বেদমন্ত্রের মীমাংসাকারী পূর্বকালীন আচার্যগণ না ঈশ্বরই মানিতেন, না দেবতাই স্বীকার করিতেন। তাঁহারা নির্দেব ও নিরীশ্বর।” এই বক্তব্য কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক সৃষ্টি করেনি; ভারতীয় দর্শনচর্চাকে নতুন করে ভাবতেও বাধ্য করেছিল।
গ্রন্থটির গুরুত্ব ভারতবর্ষের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিখ্যাত জার্মান ভাষাবিদ ও প্রাচ্যতত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলার বইটির কথা জেনে অক্ষয়কুমার দত্তকে প্রশংসাসূচক চিঠি লিখেছিলেন। বিদেশের একজন প্রখ্যাত পণ্ডিতের এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে, তাঁর গবেষণার মান আন্তর্জাতিক স্তরেও সমাদৃত হয়েছিল।
প্রখ্যাত গবেষক আশীষ লাহিড়ীর আক্ষেপ আজও আমাদের ভাবায়। তাঁর মতে, ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ যদি বহু আগেই ইংরেজিতে অনূদিত হতো, তবে বিশ্ব জানতে পারত—সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস, ধর্মচর্চা ও দর্শনের ক্ষেত্রে অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর সময়ের কতটা এগিয়ে ছিলেন। একই আক্ষেপ শোনা যায় বাংলাদেশের গবেষক অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের কণ্ঠেও। তাঁর কথায়, “আমরা যাকে আত্মস্থ করতে পারি না, তাকে বিস্মৃতির অন্ধকারে ঠেলে দিই। অক্ষয়কুমার দত্ত তারই শিকার।”
আজ, দেড়শো বছরেরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়েও ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ আমাদের শেখায়—গবেষণা মানে শুধু মতপ্রকাশ নয়; গবেষণা মানে তথ্য, পর্যবেক্ষণ, নিরপেক্ষতা এবং অক্লান্ত অনুসন্ধান। এই গ্রন্থের মধ্যেই অক্ষয়কুমার দত্ত শুধু একজন লেখক নন, একজন বিশ্বমানের সমাজবিজ্ঞানী এবং গবেষক হিসেবে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছেন।
দীপক সাহা: লেখক ও শিক্ষক
