অক্ষয়কুমার দত্ত সমাজবিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত : বিস্মৃতির অন্তরালে এক আলোকপুরুষ

বালির ‘শোভনোদ্যান’: এক মনীষীর নিভৃত সাধনক্ষেত্র

অক্ষয়কুমার দত্তের কর্মজীবনের শেষ পর্বটি যেমন নিভৃত, তেমনি অসাধারণ সৃজনশীল। শারীরিক অসুস্থতা ক্রমশ তাঁকে জনজীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মাথাব্যথা, স্নায়বিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক যন্ত্রণার কারণে তিনি সক্রিয় কর্মজীবন থেকে ধীরে ধীরে অবসর নিতে বাধ্য হন। কিন্তু কর্ম থেকে নয়—তিনি সরে যান কেবল জনসমাগম থেকে। গবেষণা, অধ্যয়ন এবং লেখালেখিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা।

১৮৫৬ সালের পর তিনি হাওড়ার বালি অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জি. টি. রোডের ধারে তাঁর বাড়ির নাম ছিল ‘শোভনোদ্যান’। নামটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল তাঁর সৌন্দর্যবোধ এবং প্রকৃতিপ্রেম। বাড়িটি ছিল না কেবল একটি বাসভবন; ছিল একটি গবেষণাগার, একটি গ্রন্থাগার এবং এক অর্থে একটি ব্যক্তিগত বিশ্ববিদ্যালয়। জীবনের শেষ প্রায় তিরিশ বছর—১৮৫৬ থেকে ১৮৮৬—তিনি এই বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন।

বিদ্যাসাগর একদিন এই বাড়িতে এসে চারদিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেছিলেন, “এ যেন অক্ষয়কুমারের ‘চারুপাঠ’-এর চতুর্থ খণ্ড।” কথাটি নিছক রসিকতা ছিল না। প্রকৃতির প্রতি অক্ষয়কুমারের ভালোবাসা এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশ দেখে বিদ্যাসাগরের এই মন্তব্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

শোভনোদ্যান ছিল প্রকৃত অর্থেই একটি জীবন্ত উদ্যান। এখানে প্রায় পঁয়ত্রিশ প্রজাতির বৃক্ষ, পনেরো রকমের ফুলের গাছ এবং ষোলো প্রকারের মসলাজাতীয় উদ্ভিদ তিনি নিজে সংগ্রহ করে লাগিয়েছিলেন। উদ্ভিদবিদ্যার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। গাছপালাকে তিনি শুধু সৌন্দর্যের উপাদান হিসেবে দেখতেন না; প্রকৃতির বিজ্ঞানকে বোঝার একটি জানালা হিসেবে বিবেচনা করতেন।

বাড়ির ভেতরে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা। সেখানে সংরক্ষিত ছিল জীবাশ্ম, প্রবাল, বিভিন্ন ধরনের শিলা, খনিজ, পশুর কঙ্কাল এবং নানা বৈজ্ঞানিক সংগ্রহ। সেই সময়ে কোনো সরকারি জাদুঘরের সুযোগ ছাড়াই একজন ব্যক্তির উদ্যোগে এমন সংগ্রহ গড়ে তোলা ছিল বিরল ঘটনা। তাঁর এই সংগ্রহশালা প্রমাণ করে, গবেষণা তাঁর কাছে পেশা ছিল না; ছিল জীবনযাপন।

এই নিভৃত পরিবেশেই তিনি রচনা করেন তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’। বছরের পর বছর তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এই মহাগ্রন্থের জন্ম হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন, এই একটি গ্রন্থের জন্যই অক্ষয়কুমার দত্তের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সত্যিই, বাংলা ভাষায় সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার এমন বিস্তৃতি এবং গভীরতা তার আগে দেখা যায়নি।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এখানেই। যে বাড়িতে বসে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণাগ্রন্থ রচিত হয়েছিল, যে বাড়িতে এক মনীষী তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় উৎসর্গ করেছিলেন জ্ঞানসাধনায়, সেই শোভনোদ্যান আজ প্রায় বিস্মৃত। হাওড়ার বালি, ৩৬৭ জি. টি. রোডের ঐতিহাসিক বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলা, অযত্ন এবং ভগ্নদশার সাক্ষী। ২০০৬ সালে রাজ্য সরকার এটিকে হেরিটেজ ভবন হিসেবে চিহ্নিত করলেও কার্যকর সংরক্ষণের উদ্যোগ আজও পর্যাপ্ত নয়। সময়ের আঘাতে ভবনের বহু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; অথচ এটি কেবল একটি পুরোনো বাড়ি নয়, বাংলার নবজাগরণের এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ।

অক্ষয়কুমার দত্তের মতো একজন মনীষীর স্মৃতিকে সম্মান জানাতে হলে শুধু জন্মদিনে মাল্যদান যথেষ্ট নয়। শোভনোদ্যানকে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা-কেন্দ্র, সংগ্রহশালা ও স্মৃতি-জাদুঘরে রূপান্তর করা আজ সময়ের দাবি। সেখানে তাঁর গ্রন্থ, পাণ্ডুলিপি, চিন্তাধারা, বিজ্ঞানচর্চা এবং সমাজতাত্ত্বিক গবেষণাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা গেলে সেটিই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

কারণ অক্ষয়কুমার দত্ত শুধু অতীতের একজন মনীষী নন; তিনি এমন এক আলোকবর্তিকা, যার আলো আজও যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মুক্তচিন্তার পথকে আলোকিত করে চলেছে।

বিস্মৃতির অন্তরালে কেন অক্ষয়কুমার দত্ত?

একটি প্রশ্ন আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়—যে মানুষ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ভিত্তি নির্মাণ করলেন, সমাজবিজ্ঞানের প্রথম সুসংহত গবেষণাগ্রন্থ রচনা করলেন, বাংলা গদ্যকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে দিলেন, যুক্তিবাদী চিন্তার ভিত স্থাপন করলেন, সেই অক্ষয়কুমার দত্ত আজ কেন বাঙালির স্মৃতিতে প্রায় অনুপস্থিত? কেন তাঁর জন্মদিন সমাজজীবনে তেমন আলোড়ন তোলে না? কেন বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জনপরিসরে তাঁর আলোচনা এত সীমিত?

এই বিস্মৃতির কারণ একমাত্রিক নয়। অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন এমন এক মনীষী, যাঁকে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক, আবার ভারতীয় দর্শনের গভীর গবেষক; সমাজসংস্কারক, আবার ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানী; ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বাধীন চিন্তার কারণে কোনো মতবাদের সীমারেখায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। ফলে তাঁকে কোনো একক রাজনৈতিক বা বৌদ্ধিক পরিসর সম্পূর্ণভাবে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে পারেনি।

আরও একটি কারণ তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যেই নিহিত। বিদ্যাসাগর ছিলেন এক মহান কর্মবীর; তাঁর জীবনের বহু ঘটনা মানুষের আবেগকে স্পর্শ করে। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন সামাজিক বিপ্লবের প্রতীক। বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ঔপন্যাসিক। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। কিন্তু অক্ষয়কুমার দত্তের প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল চিন্তার জগৎ। তিনি মানুষের মননকে বদলাতে চেয়েছিলেন। তাঁর সংগ্রাম ছিল কলমের, যুক্তির এবং গবেষণার। এই ধরনের অবদান চোখে কম পড়ে, কিন্তু সভ্যতার ভিত নির্মাণে তার গুরুত্ব অনেক গভীর।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বাধীনতার পরও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং বৌদ্ধিক পরিসরে অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর প্রাপ্য স্থান পাননি। বাংলা ভাষার ইতিহাস পড়ানো হয়েছে, কিন্তু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার স্থপতি হিসেবে তাঁর অবদানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাস পড়ানো হয়েছে, কিন্তু ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’-এর মতো যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থকে প্রয়োজনীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। বাংলা নবজাগরণের আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তার অন্যতম প্রধান বৌদ্ধিক স্তম্ভ অক্ষয়কুমার দত্তকে অনেক সময় প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে।

গবেষক আশীষ লাহিড়ী আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ যদি বহু আগেই ইংরেজিতে অনূদিত হতো, তবে বিশ্ব জানতে পারত অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর সময়ের তুলনায় কতখানি অগ্রসর চিন্তার অধিকারী ছিলেন। একই সুর শোনা যায় বাংলাদেশের গবেষক ড. সাইফুল ইসলামের বক্তব্যেও। তাঁর মতে, “আমরা যাঁদের চিন্তাকে আত্মস্থ করতে পারি না, তাঁদের অনেক সময় বিস্মৃতির অন্ধকারে ঠেলে দিই।” এই মন্তব্য শুধু অক্ষয়কুমার দত্তকে নয়, আমাদের সমাজের আত্মবিস্মৃতিকেও সামনে নিয়ে আসে।

আরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার কথা বলতে গিয়ে আমরা বহু আন্তর্জাতিক চিন্তাবিদের নাম উচ্চারণ করি, কিন্তু নিজেদের মাটির এমন একজন মনীষীকে কতটা স্মরণ করি? বিনয় ঘোষ, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট গবেষকেরা ভারতীয় দর্শন ও সমাজচিন্তা নিয়ে অসামান্য কাজ করেছেন। তবু অক্ষয়কুমার দত্তের চিন্তার ব্যাপকতা এবং ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’-এর মৌলিক গুরুত্ব জনপরিসরে যে পরিমাণ আলোচিত হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। এর কারণ নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার; তাড়াহুড়ো করে কোনো একক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।

আজকের সময়ে অক্ষয়কুমার দত্তকে নতুন করে ফিরে দেখা জরুরি। কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে, তথ্যকে সম্মান করতে এবং মাতৃভাষাকে জ্ঞানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। ভুয়ো তথ্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং অযুক্তিকতার এই সময়ে তাঁর চিন্তা কেবল ঐতিহাসিক স্মৃতি নয়; এটি বর্তমানেরও দিশারি।

অক্ষয়কুমার দত্তকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন মনীষীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বাঙালির যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক এবং মানবিক ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করা। যে জাতি তার এমন পথপ্রদর্শকদের ভুলে যায়, সে জাতি নিজের বৌদ্ধিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেই হারিয়ে ফেলে।

তাই সময় এসেছে তাঁকে পাঠ্যপুস্তকের কয়েকটি লাইনের গণ্ডি থেকে বের করে আবার জনজীবনে ফিরিয়ে আনার। গবেষণায়, শিক্ষায়, বিজ্ঞানচর্চায় এবং সমাজভাবনায় অক্ষয়কুমার দত্তকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়াই হবে তাঁর জন্মের দুই শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

উপমহাদেশের এক বিস্মৃত আলোকস্তম্ভ

১৮৮৬ সালের ১৮ মে জ্ঞানতাপস অক্ষয়কুমার দত্ত প্রয়াত হন। তাঁর জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে বাংলা নবজাগরণের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের পর যে বৌদ্ধিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা আজও সম্পূর্ণ পূরণ হয়নি। সময়ের প্রবাহে তাঁর রচিত গ্রন্থের পাতা ধুলোয় ঢেকেছে, তাঁর নাম পাঠ্যপুস্তকের সীমিত পরিসরে বন্দি হয়েছে, আর তাঁর স্মৃতি বহনকারী বালির ‘শোভনোদ্যান’ আজও অবহেলা ও অযত্নের সাক্ষী। ইতিহাসের এই বিস্মৃতি কেবল একজন মনীষীর প্রতি অবিচার নয়; এটি বাঙালির আত্মবিস্মৃতিরও নির্মম দলিল।

অথচ আধুনিক যে মূল্যবোধগুলিকে আমরা আজ সভ্যতার ভিত্তি বলে মনে করি—বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ, মাতৃভাষায় শিক্ষা, তথ্যনির্ভর গবেষণা, সামাজিক সংস্কার, মানবিকতা এবং মুক্তচিন্তা—এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন পথিকৃৎ। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, জ্ঞান কখনও অন্ধবিশ্বাসের শত্রু নয়; জ্ঞানই মানুষের মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। সমাজকে বদলাতে হলে প্রথমে বদলাতে হবে মানুষের চিন্তাকে। আর সেই চিন্তার ভিত্তি হতে হবে যুক্তি, প্রমাণ এবং মানবকল্যাণ।

আজ যখন সমাজে নানা ধরনের গুজব, কুসংস্কার, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং তথ্যবিকৃতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তখন অক্ষয়কুমার দত্তকে নতুন করে পড়া শুধু ইতিহাসচর্চার প্রয়োজন নয়, সামাজিক প্রয়োজনও। তাঁর রচনা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে মতের ভিন্নতাকে সম্মান জানিয়েও সত্যের অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হয়, কীভাবে মাতৃভাষাকে বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত মাধ্যম করে তুলতে হয়।

তাই এখন সময় এসেছে তাঁর স্মৃতিকে শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করার। বালির ঐতিহাসিক ‘শোভনোদ্যান’-কে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কেন্দ্র ও সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করা, তাঁর সমগ্র রচনাবলি নতুনভাবে সম্পাদনা ও প্রকাশ করা, ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’-এর আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চিন্তাধারা নিয়ে বিশেষ গবেষণা প্রকল্প চালু করা এবং বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে তাঁর অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া—এসব আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। একজন মনীষীকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় তাঁর চিন্তাকে আগামী প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়া।

অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন না কোনো জননেতা, কোনো রাজশক্তির প্রতিনিধি কিংবা জনপ্রিয়তার মোহে বিভোর ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন এক নিভৃত জ্ঞানসাধক। তাঁর যুদ্ধ ছিল অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, তাঁর অস্ত্র ছিল কলম, তাঁর শক্তি ছিল যুক্তি, আর তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি মুক্ত, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক সমাজ। সেই কারণেই তাঁর কীর্তি সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করেছে।

রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা জগদীশচন্দ্র বসুর মতোই বাংলা নবজাগরণের আকাশে অক্ষয়কুমার দত্ত একটি স্বতন্ত্র নক্ষত্র। শুধু পার্থক্য এই যে, তাঁর আলো আজ কিছুটা মেঘে ঢাকা। সেই মেঘ সরিয়ে তাঁকে আবার বাঙালির চিন্তাজগতে ফিরিয়ে আনা আমাদেরই দায়িত্ব।

আমরা প্রায়ই ইতিহাসের আলো খুঁজি সেই মানুষদের মধ্যে, যাঁরা জনসমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন। অথচ অনেক সময় সভ্যতার ভিত নির্মাণ করেন সেই নীরব মানুষরা, যাঁরা বই লেখেন, ভাষা গড়ে তোলেন, প্রশ্ন করতে শেখান এবং নতুন চিন্তার পথ খুলে দেন। অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন সেই বিরল নির্মাতাদের একজন। অক্ষয়কুমার দত্ত তাই ইতিহাসের একটি নাম নন। তিনি এক অনির্বাণ আলোকশিখা—যার আলো আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে, যদি আমরা সেই আলোর দিকে ফিরে তাকাতে শিখি।

দীপক সাহা: লেখক ও শিক্ষক

প্রথম পর্ব পড়ুন : অক্ষয়কুমার দত্ত সমাজবিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত: বিস্মৃতির অন্তরালে এক আলোকপুরুষ

আরও পড়ুন