‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটির প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব

কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী দেশাত্মবোধক কবিতা কাণ্ডারী হুঁশিয়ার বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ছিলেন এই কবিতার প্রেরণা। কাজী নজরুল ইসলামের সর্বহারা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল কবিতাটি।
কাণ্ডারী হুঁশিয়ার
—কাজী নজরুল ইসলাম
দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার!
দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।
তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ
কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার
গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ!
কাণ্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!
কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার।
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কাণ্ডারী হুশিয়ার!
কবিতাটি ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৬ জ্যৈষ্ঠ কৃষ্ণনগরে বসে নজরুল লিখেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। একদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়, অন্যদিকে সমাজে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িকতা, জাতিভেদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই জটিল সময়ে দেশের তরুণ সমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে এবং শোষিত জাতিকে জাগিয়ে তুলতে নজরুল এই কবিতাটি রচনা করেন।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ যখন দিশেহারা, তখন কবি অনুভব করেছিলেন যে দেশপ্রেম ও ত্যাগের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে সাম্প্রদায়িক পরিচয়। এই সংকটের মুহূর্তে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ও পথের দিশা দেখাতে কবি ‘কাণ্ডারী’ বা নাবিককে (নেতৃত্বদানকারীকে) সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ মূলত একটি রূপকধর্মী কবিতা। এর মূল দিকগুলো হলো:
১. ঐক্যের ডাক: কবি ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের বিভাজনকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কবিতাটির বিখ্যাত পঙক্তি— ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন? / কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!’—এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার শ্রেষ্ঠ দলিল। নজরুল এখানে ধর্ম বা জাতির চেয়ে ‘মানুষ’ ও ‘দেশপ্রেম’কে উপরে স্থান দিয়েছেন।
২. নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা: কবি এখানে এমন এক নেতার আহ্বান করেছেন যিনি সংকটের এই ‘তিমির রাত্রি’তে হাল ধরতে পারবেন। ঝড়ো আবহাওয়ায় তরী (দেশ) পার করার জন্য সাহসী ও অবিচল কাণ্ডারীর প্রয়োজন, যে পথ হারাবে না এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করবে।
৩. ইতিহাসের স্মৃতিচারণ: কবি পলাশীর প্রান্তরের কথা উল্লেখ করে বাঙালিদের মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, একদা স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল বিভেদ ও বেইমানির কারণে। তাই এবার স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের লড়াইয়ে কোনো দ্বিধা বা সংশয় থাকা চলবে না।
৪. তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান: কবি সব সময় তরুণদের শক্তির ওপর আস্থা রাখতেন। জাতির দুর্দিনে “জোয়ান” বা তরুণদেরই তিনি সামনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ ভবিষ্যৎ তাদেরই পথ চেয়ে আছে।
একথা বলার অপেক্ষায় রাখে না যে, “কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” কেবল একটি কবিতা নয়, এটি একটি জাতিকে আত্মপরিচয় রক্ষার এবং সর্বপ্রকার সংকীর্ণতা কাটিয়ে স্বাধীনতার পথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এক অগ্নিমন্ত্র। আজও যেকোনো ক্রান্তিকালে এই কবিতার আবেদন ও প্রাসঙ্গিকতা অম্লান।
সুতরাং কাজী নজরুল ইসলামের “কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” কবিতাটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন রাজনৈতিক ও সামাজিক এবং ঐতিহাসিক একটি রণসংগীত। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা কম নয়। এই কবিতাটি থেকেই পাই :
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা: ১৯২৬ সালে যখন ব্রিটিশ শাসিত ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করেছিল, তখন এই কবিতাটির মানবিক আবেদন এবং জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরেছিল। মানুষ পরিচয়টিই বড় হয়ে উঠেছিল, যা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের গালে সপাটে চপেটাঘাত ছিল।
২. স্বাধীনতা আন্দোলনের চালিকাশক্তি: ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় এই কবিতাটি জনমানসে তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনার সঞ্চার করেছিল। তৎকালীন মুক্তিপাগল তরুণদের কাছে এটি ছিল যুদ্ধের গান। এটি তাদের ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।
৩. জাতির সংকটকালীন দিকনির্দেশনা: পলাশীর ট্র্যাজেডির পর জাতি যখন আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল, তখন কবি এই কবিতার মাধ্যমে নেতৃত্বকে (কাণ্ডারী) সতর্ক করেছিলেন যাতে তারা কোনো সংকীর্ণতায় পা না দেয়। এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বের জন্য একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি ছিল।
৪. মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই কবিতাটি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নজরুলের এই বিপ্লবী গান ও কবিতা প্রচারিত হতো, যা যোদ্ধাদের সাহস ও মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
১. অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রতিকার: আজকের পৃথিবীতে ধর্মীয় ও জাতিগত অসহিষ্ণুতা এক বড় সমস্যা। যখনই কোথাও বিভেদের দেয়াল তৈরি হয়, তখনই নজরুলের এই ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার আহ্বান প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের সবার পরিচয় এক এবং বিভেদই আমাদের অগ্রগতির প্রধান বাধা।
২. মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা: বর্তমান সময়ে যখন মানবিকতা বা মনুষ্যত্ব হুমকির মুখে, তখন এই কবিতাটি আমাদের সংকীর্ণতা ভুলে মানবতার জয়গান গাইতে শেখায়। বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ানোর যে আকুতি কবি এই কবিতায় ব্যক্ত করেছেন, তা আজও সমাজসেবী ও তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
৩. সুষ্ঠু নেতৃত্বের চাহিদা: কবিতাটি মূলত যে ‘কাণ্ডারী’ বা নাবিকের ওপর নির্ভর করে, তা আজকের দিনের রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতৃত্বের জন্যও সমান প্রযোজ্য। যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে বা জাতীয় প্রয়োজনে নেতাকে যে ব্যক্তিগত বা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, তা এই কবিতার মূল শিক্ষা।
৪. সাংস্কৃতিক ও জাতীয় জাগরণ: এখনো যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ বা ক্রান্তিলগ্নে নজরুলকে নতুন করে পাঠ করার প্রয়োজন পড়ে। তাই তো শতবর্ষ পার হওয়ার পরেও এই কবিতাটি আজও সমানভাবে পাঠ্য, শ্রুত এবং প্রাসঙ্গিক।
একথা অনস্বীকার্য যে, নজরুল ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মাধ্যমে যে অসাম্প্রদায়িক, উদার এবং বিপ্লবী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আজও আমাদের জাতীয় আদর্শের মূল ভিত্তি। যতদিন পৃথিবীতে বিভেদ ও অন্যায় থাকবে, ততদিন এই কবিতার আবেদন ফুরিয়ে যাবে না।
তৈমুর খান: কবি ও লেখক
