হৃদয়স্পর্শী এক নৈতিক পাঠ: ফারহানা মোবিনের ‘ধপাস’

শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ত্ব এবং তাদের নৈতিক শিক্ষার মেলবন্ধনে রচিত এক চমৎকার শিক্ষণীয় ও হৃদয়স্পর্শী গল্পগ্রন্থ ফারহানা মোবিনের ‘ধপাস’। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত এই বইটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সহজ-সরল শিশুতোষ গল্প মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনবোধ ও সামাজিক বার্তা।

গল্পের মূল চরিত্র ‘বিজয়’ এক চঞ্চল এবং কিছুটা কাণ্ডজ্ঞানহীন বালক। তার একটি অদ্ভুত ও ক্ষতিকর স্বভাব রয়েছে—রাস্তায় কেউ কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে গেলে বা বিপদে পড়লে সে সহানুভূতি দেখানোর বদলে খিলখিল করে হেসে ওঠে, আনন্দ পায়। একদিন আনন্দ পাঠশালা ছুটি হবার পর বাড়ি ফেরার পথে মসজিদের পাশে এক পথচারী কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে যেতে নিলে বিজয় বন্ধুদের নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে। বয়স্ক মানুষের বকাঝকাও তার এই অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে পারে না।

পরের দিন বিজয়ের বাসার পাশের পুকুর পাড়ে গ্রামের এক বধূ মাটির কলস নিয়ে পানি নিতে এলে তিনিও একইভাবে কলার খোসাতে পা পিছলে পড়ে যান এবং কলসটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বিজয় যথারীতি সেখানেও বন্ধুদের সাথে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরে তখন, যখন বিজয়ের পরম বন্ধু ‘পলাশ’ (যে কি না ক্লাসের সবচেয়ে ভদ্র ও পরোপকারী ছেলে) হঠাৎ পাঁচ দিন স্কুলে আসে না। বন্ধুর জন্য বিজয়ের মন অস্থির হয়ে ওঠে। খেলার মাঠেও তার মন বসে না। পরবর্তীতে রহমান চাচার মাধ্যমে বিজয় যখন জানতে পারে যে পলাশ শহরের এক হাসপাতালে দুই পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে কাতরাচ্ছে, তখন বিজয়ের সাজানো হাসির পৃথিবীটা ধপাস করে ভেঙে পড়ে। রহমান চাচা জানান, কে যেন রাস্তায় কলার খোসা ফেলে রেখেছিল এবং সেই খোসাতে একটি বড় পিন লাগানো ছিল। পলাশ যখন বিজয়কে একটি বল উপহার দিতে যাচ্ছিল, তখন সেই খোসায় পা পিছলে পিনটি তার পায়ের তলায় আটকে যায় এবং তার দুই পায়ের হাড় ভেঙে যায়।

হাসপাতালে প্রিয় বন্ধু পলাশের এই করুণ অবস্থা দেখে বিজয় কান্নায় ভেঙে পড়ে। আর ঠিক তখনই গল্পের সবচেয়ে বড় এবং হৃদয়বিদারক সত্যটি উন্মোচিত হয়— এতদিন ধরে দুষ্টুমি করে রাস্তার ওপরে সেই কলার খোসাগুলো আসলে আর কেউ নয়, স্বয়ং বিজয়ই ফেলে রাখত! নিজের ক্ষণিকের তামাশা আর অসচেতনতার কারণে যে তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে আজ এই পঙ্গুত্বের মুখোমুখি হতে হলো, এই নির্মম সত্যটি বিজয়কে এক চরম অপরাধবোধ ও অনুশোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

বইটি পড়ার সময় পাঠকের মনে একাধারে আনন্দ, বিরক্তি, এবং সবশেষে এক গভীর বিষাদ ও সহানুভূতির উদ্রেক ঘটে। শুরুতে বিজয়ের অসংবেদনশীল আচরণ পাঠককে ক্ষুব্ধ করতে পারে, কিন্তু গল্প যত এগোতে থাকে, লেখকের লেখনী পাঠককে এক অবধারিত শিক্ষণীয় পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। গল্পের শেষ অংশে বিজয়ের এই স্বীকারোক্তি, রহমান চাচার হাত ধরে ক্ষমা চাওয়া এবং ‘আমি আর কোনো দিন রাস্তায় কলার খোসা ফেলবো না, আমি তোমার মতো ভালো মানুষ হব’—এই প্রতিজ্ঞাটি প্রতিটি কিশোর পাঠকের মনের ভেতরের শুভ বুদ্ধিকে জাগ্রত করে।

বইটির একটি অন্যতম সুন্দর দিক হলো এর অলংকরণ। প্রীতি দেবের আঁকা সুন্দর ও রঙ-বেরঙের ছবিগুলো গল্পের প্রতিটি দৃশ্যকে জীবন্ত করে তুলেছে। হাসপাতালের দৃশ্য বা খেলার মাঠের দৃশ্যগুলো শিশুদের বই পড়ার আগ্রহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া লেখকের সহজ, সাবলীল এবং প্রাঞ্জল ভাষা গল্পটিকে অত্যন্ত গতিময় করেছে।

‘ধপাস’ কেবল বিনোদনের জন্য লেখা কোনো গল্প নয়, এটি একটি বড় সামাজিক সচেতনতামূলক বার্তা। পরিবারে ও বিদ্যালয়ে শিশুদের নৈতিকতা, পরোপকারিতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখানোর জন্য এটি একটি অত্যন্ত উপযোগী বই। প্রতিটি শিশুর মস্তিস্কে সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে এবং ‘কারো ক্ষতি করে আনন্দ পাওয়া কোনো বীরত্ব নয়’—এই সত্যটি বোঝাতে বইটি অনন্য ভূমিকা রাখবে।

মাসুম বিল্লাহ: গল্পকার

আরও পড়ুন