অন্ধকারের ভেতর এক নিষ্পাপ আলোর গল্প ‘অলিভার টুইস্ট’

অলিভার টুইস্ট বইটি পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, অলিভারের কষ্টগুলো শুধু একজন অনাথ শিশুর কষ্ট নয়; এর ভেতর দিয়ে উনিশ শতকের সমাজের নিষ্ঠুরতা, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং মানুষের প্রতি মানুষের অবহেলার একটা নির্মম ছবি ফুটে উঠেছে।
সত্যিকারের দুর্ভাগ্য নিয়েই যেন জন্মেছিল অলিভার। জন্মের পরপরই সে তার মা’কে হারায়। হারিয়ে ফেলে তার সত্যিকারের পরিচয়। কেননা, যে হাসপাতালে তার অসুস্থ মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পথ থেকে কুড়িয়ে। কেউ তাকে চিনত না, জানত না। তাই তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেল তার শিশু পুত্রের নাম ও বংশ পরিচয়। এরপর শিশু অলিভার স্থান পেল এক এতিমখানায়। সেখানে একদল দামাল ছেলের সাথে অযতে্ন, অবহেলায় বেড়ে উঠতে থাকে।
অলিভারের বয়স যখন নয় বছর পূর্ণ হলো তখন তাকে নিয়ে আসা হলো এতিমখানার প্রধান কেন্দ্রে। কেন্দ্রের অন্যতম কর্মকর্তা মিঃ বাম্বল অলিভারের নাম রাখলেন— অলিভার টুইস্ট। এতিমখানায় পেট পুরে খেতে দেওয়া হতো না, আধপেটা খেয়ে সে একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গেল।
একদিন আরেকটু খেতে চাইবার কারণে অলিভারকে মিঃ সোয়ারবেরী নামে এক কফিন ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়া হলো। মিসেস সোয়ারবেরী কিশোর অলিভারকে দেখে খুশি হতে পারলেন না। তাদের বাড়িতে তাকে কাজের ছেলে হিসেবে থাকতে হতো। সবার খাওয়া হলে যা বাঁচতো তাই তাকে খেতে হতো। শুতে হতো টেবিলের নিচে, আর পান থেকে চুন খোয়া গেলেই শুনতে হতো কটুকথা। মারধর করা হতো। কয়েকমদিনের মধ্যে অলিভারের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো।
একদিন ভোরবেলা সেখান থেকে পালিয়ে পায়ে হেঁটে লন্ডন যাত্রা করলো। দীর্ঘ সাতদিন পায়ে হেঁটে একদিন সকালে ক্লান্ত, অবশন্ন ও ক্ষুধার্ত অলিভার লন্ডন শহরের কাছাকাছি এসে পৌঁছলো। সেখানে সে একটি দুষ্টু তরুণের পাললায় পড়ে। এই তরুণের নাম ডকিয়। সে তাকে পকেটমার ও চোরদের আড্ডায় নিয়ে যায়। এখানে অলিভারের সাথে পরিচয় ঘটে দুষ্টুর সরদার ফ্যাগিনের সাথে। প্রথমে অলিভার বুঝতে পারেনি যে সে অপরাধী চক্র সাথে জড়িয়ে পড়েছে। সে বসে বসে লক্ষ্য করতো ফ্যাগিন বেশিরভাগ সময় তার শিষ্যদের পকেটমারের কৌশল শিখিয়ে থাকে।
একদিন ‘ডজার’ ও চার্লিবেটস নামে দুই চোরের সাথে অলিভারকে বাইরে পাঠানো হলো। তারা যখন একটি বইয়ের দোকানের সামনে এক বৃদ্ধতার পকেট মারছিল তখন অতঙ্কে পালাতে গিয়ে নির্দোষ অলিভার ধরা পড়ে প্রহৃত হল এবং থানায় গেল। অলিভার নির্দোষ জেনে বৃদ্ধ ভদ্রলোক মিঃ ব্রাউন অলিভারকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেলেন পোষ্য-পুত্র রূপে পালনের উদ্দেশ্যে। দিনগুলো ভালই কাটছিল। কিন্তু এখানে দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়লো না।
একদিন কয়েকটি বই এবং ৫ পাউন্ডের একটি নোট হাতে নিয়ে অলিভারকে বইয়ের দোকানে পাঠানো হল। পথিমধ্যে ন্যাসি নামের এক দুষ্টু মেয়ে ও বিল সাইন্স তাকে জোর করে ফ্যাগিনের কাছে নিয়ে গেল এবং সেখানে আটকে রাখলো। কিছুতেই সে অলিভারকে মুক্তি দিতে রাজি হলো না।
…বাকি কাহিনী বই পড়ে পাঠক জানুক… এই আশা করছি।
বইটির ভালো দিক হলো, অলিভারের জীবনে যখনই মনে হয় এবার হয়তো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, তখনই নতুন কোনো বিপদ এসে হাজির হয়। ফলে গল্পের প্রতি আগ্রহ ধরে থাকে। একই সঙ্গে পাঠকের মনে একটা প্রশ্নও তৈরি হয়, অলিভার কি শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচয় খুঁজে পাবে? সে কি এই অন্ধকার জীবন থেকে বের হতে পারবে?
আমার কাছে অলিভার টুইস্ট-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর মানবিক আবেদন। ডিকেন্স শুধু একজন অনাথ ছেলের গল্প লেখেননি; তিনি দেখিয়েছেন, সমাজের দুর্বল মানুষগুলো কীভাবে ক্ষমতাবান ও স্বার্থপর মানুষের হাতে নিপীড়িত হয়। আবার একই সঙ্গে এটাও দেখিয়েছেন, অন্ধকারের মধ্যেও কিছু মানুষের সহানুভূতি একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
আমি ২৬ এপ্রিল ২০০৭ থেকে ২৭ এপ্রিল ২০০৭—দুই বৈঠকে বইটি শেষ করেছিলাম। পড়ার সময় ভালো লেগে যাওয়া কয়েকটি জায়গা লাল কলম দিয়ে দাগ দিয়েছিলাম। এখন এত বছর পরও সেই দাগ দেওয়া কথাগুলো মনে পড়ে। তেমনই ৫টি লাইন এখানে তুলে দিলাম। ভালোলাগা থেকে।
উপকারী বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার মতো খারাপ কাজ আর হয় না। ৬২ পৃষ্ঠা
গোপন কথা যত গোপন থাকে ততই মঙ্গল। ৬৫ পৃষ্ঠা
অলিভার যতটা না বেঁচে আছে তার চেয়ে বেশি মরে গেছে। ৭৩ পৃষ্ঠা
প্রত্যেকটা মানুষেরই সবচেয়ে বড় বন্ধু সে নিজে। ১২৭ পৃষ্ঠা
কিন্তু শুভেচ্ছা যেখানে ব্যর্থ হয় ঘৃণা সেখানে কখনো কখনো পথ খুঁজে পায়। ১৫৬ পৃষ্ঠা
আর বইয়ের ভাষা ও অনুবাদ নিয়েও আলাদা করে বলার আছে। নিয়াজ মোরশেদের অনুবাদে কাহিনিটি সহজে এগিয়ে যায়। পুরোনো ক্লাসিক উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও কিশোর পাঠকের জন্য গল্পটি বেশ উপভোগ্য মনে হয়েছে। কোথাও কষ্ট, কোথাও ভয়, কোথাও রহস্য, আবার কোথাও মানবিকতার উষ্ণতা—সব মিলিয়ে বইটি একঘেয়ে লাগে না।
লেখক চার্লস ডিকেন্সের জন্ম ১৮১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি, হ্যাম্পশায়ারের পোর্টসমাউথে। তাঁর বাবা ছিলেন নৌ বাহিনীর কেরানী। অত্যন্ত টানাটানির সংসার ছিল বাবার। চার্লসের বয়স যখন বারো বছর তখন দেনার দায়ে কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। ছেলেবেলা থেকেই অর্থোপার্জনের জন্যে নানা পেশায় জড়িত হতে হয়েছে চার্লস ডিকেন্সকে। প্রথমে এক রুটির কারখানায় কাজ নেন, এরপর কাজ পান এক আইনজ্ঞের দপ্তরে। এখানে কিছু দিন কাজ করার পর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয় তাঁর। স্কুলজীবন শেষে নেন সাংবাদিকের কাজ। ১৮৩৬ সালে বিয়ে করেন ডিকেন্স।
১৮৩৩ সালে প্রথম উপন্যাসচনায় হাত দেন তিনি ‘বজ’ ছদ্মনামে। ১৮৩৬ সালে তাঁর ‘পিকউইক পেপার্স’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে থাকে পত্রিকায়। এসময়ই সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন তিনি। ১৮৪২ সালে প্রথমবারের মতো আমেরিকা যান ডিকেন্স। ‘৪৪ সালে ইতালিতে। ১৮৬৭-৬৮ সালে আবার আমেরিকায়। ১৮৪৬ সালে ‘ডেইলি নিউজ’র সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৮৭০ সালের ৯ জুন কেন্ট-এর গ্যাডস হিল-এ মারা যান তিনি।
‘অলিভার টুইস্ট’ ছাড়াও ডিকেন্সের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর ভেতর রয়েছে: ’নিকোলাস নিকলবি’, ‘ওল্ড কিউরিওসিটি শপ’, ‘ডেভিড কপারফিল্ড’, ‘আ টেল অভ টু সিটিজ’, ‘গ্রেট এক্সপেকটেশনস’ প্রভৃতি।
বই: অলিভার টুইস্ট
লেখক: চার্লস ডিকেন্স
অনুবাদ: নিয়াজ মোরশেদ
ধরণ: কিশোর ক্লাসিক উপন্যাস
প্রকাশন: সেবা প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৯খ্রি.
