‘দেয়াল’ ইতিহাসের দেয়াল ভাঙারই এক সাহিত্যিক প্রয়াস

ইতিহাস না জানার দায় মেটাতেই যেন তিনটি রাত বিনিদ্র কেটেছে, বলতে একটুও দ্বিধা নেই, হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল উপন্যাসটি না পড়লে হয়তো কোনোদিনই এই দায়বোধ থেকে মুক্ত হতে পারতাম না। জোর দিয়েই বলতে পারি, হুমায়ূন আহমেদ এবং তাঁর ‘দেয়াল’ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতি আমাদের যে দায়, তার কিছুটা হলেও শোধ করে গেছে।
প্রিয় লেখক তাঁর নিজস্ব ‘হুমায়ূনি স্টাইলে’ ইতিহাসের কিছু কঠিন ও জটিল অধ্যায়ের তথ্যকে করেছেন আকর্ষণীয়। ইতিহাসকে তিনি বর্ণনা করেছেন অনেকটা ঘরোয়া ভঙ্গিতে—সহজ, সাবলীল এবং গল্পের মতো করে। ‘দেয়াল’ পড়ে একদিকে মন ভরে গেছে মুগ্ধতায়, অন্যদিকে বুকের গভীরে জেগেছে এক ধরনের হাহাকার। বারবার মনে হয়েছে—হায়, লেখক কি আরও কিছুদিন পারতেন না এই নশ্বর পৃথিবীতে থাকতে?
জীবনের চরম সত্যকে মেনে নিয়েই হুমায়ূন আহমেদ পাড়ি জমিয়েছেন অজানার পথে। রেখে গেছেন অসংখ্য সৃষ্টির পাশাপাশি এমন কিছু লেখা, যেগুলো আমাদের ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং ইতিহাসের দিকে নতুন করে তাকাতে বাধ্য করে।
একটি দেশের সঠিক ইতিহাস জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সেই ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যাদের এই দায়িত্ব নেওয়ার কথা, তারা কেন অনেক সময় তা করেন না, সাধারণ মানুষের কাছে তার উত্তর সবসময় স্পষ্ট নয়। ইতিহাসবিদেরা তাঁদের সীমিত সামর্থ্য ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দায়িত্ব পালন করে যান। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের নানা অধ্যায়কে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার প্রবণতাও আমাদের সমাজে নতুন নয়।
একজন সৃষ্টিশীল লেখক অবশ্য অনেক সময় অন্যভাবে সত্যকে পাঠকের সামনে হাজির করেন। সরাসরি ইতিহাসের ভাষায় না লিখেও ইতিহাসের সত্য ঘটনাকে গল্পের মোড়কে পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারেন। ‘দেয়াল’ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ তেমনই একটি কাজ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় এবং কয়েকটি অস্থির বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তিনি গল্পের আবরণে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ছিল মূলত ক্যান্টনমেন্ট ও বঙ্গভবনকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষের জীবনে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব হয়তো সবসময় দৃশ্যমান ছিল না, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব যে আজও আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বহমান, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষ এ বিষয়টি সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
‘দেয়াল’-এর মূল উপজীব্য ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বঙ্গবন্ধুর শাসনামল, বাকশাল গঠন, রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রম, হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া, জেলহত্যা, মেজর রশীদ, মেজর ফারুক, খন্দকার মোশতাক আহমদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের ভূমিকা, এসবই উপন্যাসের পটভূমিতে এসেছে। পাশাপাশি খালেদ মোশাররফের কর্মকাণ্ড, মেজর জিয়াউর রহমানের আটকাবস্থা, কর্নেল তাহেরের ভূমিকা, জিয়ার ক্ষমতায় আসা, তাহেরের ফাঁসি এবং পরবর্তী শাসনামলের নানা ঘটনাও উপন্যাসের কাহিনিতে স্থান পেয়েছে।
মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী এক বিষণ্ন ও ঘটনাবহুল ইতিহাস থেকেই রসদ নিয়ে ‘দেয়াল’ লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ।
‘দেয়াল’ নিয়ে শত শত আলোচনা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনাগুলো হবে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু আমি ইতিহাসের ছাত্র নই, ইতিহাস বিশ্লেষণেরও কোনো দাবি আমার নেই। বাংলাদেশের সেই ক্রান্তিকাল কিংবা হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচার করার যোগ্যতাও আমার নেই। আমি শুধু একজন মনোযোগী পাঠক হিসেবে বলতে পারি, হুমায়ূন আহমেদ নিজে ১৯৭৫ ও পরবর্তী সময়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তাই ঘটনাগুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি কতটা সৎ ছিলেন, সে বিষয়ে পাঠক হিসেবে আমার আস্থা রয়েছে।
‘দেয়াল’ হয়তো ইতিহাসের পাঠ্যবই নয়। ইতিহাসের নির্ভুল দলিল হিসেবেও একে পড়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বইটির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বরং বলা যায়, কয়েকটি বছরের জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসকে হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে পাঠযোগ্য করে তুলেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, তিনি পাঠকের অনুভূতিতে নাড়া দিতে পেরেছেন। চিন্তার জগতে প্রশ্ন তুলতে পেরেছেন। একজন আগ্রহী পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে—উপন্যাসটির ব্যাপ্তি যদি আরও কিছুটা বড় হতো, তাহলে পাঠক এবং আগামী প্রজন্মের জন্য তা আরও উপকারী হতে পারত।
‘দেয়াল’ ইতিহাস অবলম্বনে লেখা একটি উপন্যাস। তবে এখানে ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে আসেনি; এসেছে মানবিকতা ও অমানবিকতার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। আছে পাত্র-পাত্রীর জীবন, আছে ঘটনা-উপঘটনা, আছে সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে ইতিহাসের গল্প।
হুমায়ূন আহমেদের পাঠক মাত্রই জানেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ। লেখক হিসেবেও তাঁর সেই সংবেদনশীলতা বারবার প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর চরিত্রগুলোও তাই কেবল গল্পের চরিত্র হয়ে থাকে না, পাঠকের অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠে। ‘দেয়াল’-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শফিক, সত্যবাদী, তবে কিছুটা ভীতু। সে ষোলো বছর বয়সী অবন্তীর গৃহশিক্ষক। শফিক ও অবন্তীর মধ্যকার সম্পর্কটি উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক ধরনের অসম্পূর্ণতার আবহ তৈরি করে। তাদের কথোপকথনের সহজ-সরল ভঙ্গি, না-বলা অনুভূতি এবং দূরত্ব পাঠকের মনে আলাদা একটি জায়গা করে নেয়।
অবন্তীর জীবনে পরবর্তীতে হাফেজ জাহাঙ্গীর নামের এক তরুণ পীরের আগমন ঘটে। পাঠক ধীরে ধীরে তাকেও আপন করে নেন। অন্যদিকে অবন্তীর বাবা নিরুদ্দেশ। তার মা ইসাবেলা দূরে থাকেন এবং কালেভদ্রে মেয়েকে চিঠি লেখেন। অবন্তী থাকে তার দাদা সরফরাজ খানের সঙ্গে, এক কঠিন হৃদয়ের মানুষ, যার সঙ্গে খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের ঘনিষ্ঠতার সূত্রও রয়েছে।
মূলত শফিক, অবন্তী, হাফেজ জাহাঙ্গীর ও সরফরাজ খানকে ঘিরেই উপন্যাসের গল্প এগিয়ে যায়। কিন্তু এই ব্যক্তিগত গল্পের আড়ালে সবসময়ই উপস্থিত থাকে ১৯৭৫-এর সেই কালো অধ্যায়।
‘দেয়াল’-এ পাঠক বঙ্গবন্ধুকে তাঁর নিজস্ব মহিমায় খুঁজে পান। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে থাকা চাটুকার ও সুবিধাভোগী শ্রেণির কথাও এসেছে। রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়েও লেখক তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে কথা বলেছেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাও উপন্যাসের পটভূমিতে এসেছে। এসব ব্যক্তিগত স্মৃতি বইটির ঘটনাগুলোকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
গল্পের ভেতরে আবির্ভূত হয়েছেন খন্দকার মোশতাক আহমদ, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহের ও জিয়াউর রহমানসহ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। হুমায়ূন আহমেদ তাঁদের প্রত্যেককে উপন্যাসের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে কর্নেল তাহেরের চরিত্রে তিনি যে বীরত্বের ছাপ রেখেছেন, তা পাঠকের মনে দাগ কাটে।
এই উপন্যাসে কোথাও কোথাও লেখক নিজেও যেন উপস্থিত হয়ে যান, নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও সময়কে সঙ্গে নিয়ে।
সব মিলিয়ে ‘দেয়াল’ শুধু একটি উপন্যাস নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অস্থির ও অন্ধকার সময়কে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সাহিত্যিক প্রয়াস। ইতিহাসের দেয়ালে যে অধ্যায়গুলো অনেক সময় ধুলোর নিচে চাপা পড়ে থাকে, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর লেখনী দিয়ে সেই দেয়ালেই যেন একটি জানালা খুলে দিয়েছেন।
সেই জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যায়—একটি দেশ, একটি সময়, কিছু মানুষ, কিছু স্বপ্ন, কিছু বিশ্বাসঘাতকতা এবং অসংখ্য না-বলা গল্প।
হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ তাই ইতিহাসের দেয়াল ভাঙারই এক সাহিত্যিক প্রয়াস।
