চিরকালের নজরুল: সমকালীন সংকট, সম্প্রীতি ও উত্তরাধিকার

পরাধীন ভারতের অপশাসনের বিরুদ্ধে নজরুল গর্জে উঠেছিলেন, তেমনি দেশের অনাচার শোষণ পীড়ন বৈষম্য অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধেও তিনি কলম ধরেছিলেন। কিন্তু আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, তবু কোথাও কি আমাদের সেই আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা উপলব্ধি হয়? কিংবা দেশের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িকতা শোষণ পীড়ন অনাচার তার কি অবসান ঘটেছে? কোথাও যেন অন্তরায় থেকে গেছে, অথচ স্বাধীনতার আশি বছর পেরিয়ে এলাম। এই পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলের ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা কতখানি এই বিষয়টিই আজকের উপস্থাপনা।
নজরুল প্রাসঙ্গিকতা
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিশ শতকের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধের কণ্ঠস্বর ছিলেন না; সমকালীন বিশ্ব ও সমাজব্যবস্থার সংকট যত জটিল হচ্ছে, তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ততই তীব্র হয়ে উঠছে। বর্তমান সময়ে নজরুলের অপরিহার্যতা মূলত কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে স্পষ্ট:
১. ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিরুদ্ধে অখণ্ড মানবতাবাদ
বর্তমান বিশ্বে ও উপমহাদেশে যখন ধর্মকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের হাতিয়ার করা হচ্ছে, তখন নজরুলের অসাম্প্রদায়িক মানবদর্শনই সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ একথা আমাদের সর্বদাই মনে রাখতে হয়। ধর্ম বা জাতের চেয়ে মানুষের অস্তিত্বই তাঁর কাছে পরম সত্য ছিল:
“মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”
“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”
মন্দির-মসজিদের প্রাতিষ্ঠানিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে নজরুলের ‘মানুষ ধর্ম’ বর্তমানের ধর্মীয় চরমপন্থা নিরসনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
২. বৈষম্যমূলক অর্থনীতি ও কর্পোরেট পুঁজিবাদের যুগে ‘সাম্যবাদ’
বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রমিকের অধিকার খর্ব এবং পুঁজিপতিদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে নজরুলের ‘কুলি-মজুর’ ও ‘সর্বহারা’ আজও প্রতিবাদের প্রধান ভাষা।
তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছিলেন কীভাবে শ্রমজীবী মানুষের ঘামে সভ্যতা গড়ে ওঠে অথচ তারাই শোষিত থাকে। পাথর কেটে যারা রাস্তা তৈরি করেছে, হাড় পড়ে আছে তারাই তো সেই সব শ্রমজীবী মানুষ। অথচ তাদেরই স্থান হয়নি সমাজে :
“বেতন দিয়াছ? —চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোড় পেলি বল?”
৩. লিঙ্গসমতা ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা
নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকারের আধুনিক ধারণায় নজরুলের ‘নারী’ কবিতা আজও অগ্রণী দলিল। পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নারীর গৃহকর্ম ও আত্মত্যাগের অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন:
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় বারাঙ্গনা বলে নারীকে ঘৃণা করাও যায় না, হয়তো সেই বারাঙ্গনাই দুগ্ধ পান করিয়েছে ‘সীতাসম সতী মায়ে’।
৪. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ, বাক্স্বাধীনতা হরণ এবং যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নজরুলের কলম শাশ্বত হাতিয়ার। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ বা ‘ধূমকেতু’র সম্পাদকীয়তে তিনি যে নির্ভীক উচ্চারণ করেছিলেন, তা বর্তমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়:
“আমি চির-দুরন্ত দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম্ হ্যায়্ হর্দম্ ভর্পুর মদ।”
ব্রিটিশ সরকার তাঁর লেখনীকে ‘রাজদ্রোহ’ হিসেবে আখ্যা দিলে নজরুল তার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা রাজার চোখে বিদ্রোহ হতে পারে, কিন্তু তা পরম সত্যের প্রকাশ। তিনি বলেন, “আমার ওপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজদণ্ডে দণ্ডিত এবং রাজকারাগারে রুদ্ধ। রাজার পক্ষে নিযুক্ত রাজবেতনভোগী রাজকর্মচারী। আর আমার পক্ষে— অন্তর্যামী সত্য-বিধাতা।”
এখানেই তিনি তার লেখক সত্তার স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছেন।
৫. তরুণ সমাজের আত্মজাগরণ ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়
হতাশাগ্রস্ত, দিকভ্রান্ত তরুণ প্রজন্মকে স্থবিরতা ভেঙে সক্রিয় করার জন্য তাঁর তারুণ্যের জয়গান এবং তাঁর সৃষ্টিশীলতায় লোকায়ত ও শাস্ত্রীয় সুরের যে সমন্বয়—তা একমুখী ও বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতির যুগে বহুত্ববাদের প্রতীক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় লিখেছিলেন:
“বল বীর—
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!”
তরুণ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘চল চল চল’ ছিল নবযুগের সংগীত :
“চল চল চল!
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী-তল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল—
চল রে চল রে চল!”
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কোরাস গানটি রণ সংগীতের রূপ নিয়েছিল :
“ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!”
সব মিলিয়েই ছিল সমকালীন সংকটে নজরুলের দিক নির্দেশনা ও প্রাসঙ্গিকতা। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভাজনমিলনকামী মানবধর্ম ও জাতিভেদহীন চেতনা সাম্যবাদীর রূপায়ন। অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও ন্যায্য পাওনার দাবি। নারীর অবমূল্যায়ন ও বঞ্চনা, নারী-পুরুষের সমমর্যাদা ও যৌথ অংশীদারিত্ব। কর্তৃত্ববাদ ও মতপ্রকাশে বাধার আপসহীন দ্রোহ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আজকের দিনেও এইসব সংকট থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। আর তখনই নজরুলকে চিরন্তন মানবতাবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে আমাদের মাঝে তুলে আনতে চাই। কারণ নজরুল কোনো নির্দিষ্ট যুগ বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নন; যেখানেই অন্যায়, বৈষম্য এবং ধর্মান্ধতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, সেখানেই নজরুল প্রতিরোধের অনিবার্য প্রতীক হিসেবে প্রাসঙ্গিক থাকবেন।
সম্প্রীতির কারিগর
উল্লেখ্য কাজী নজরুল ইসলাম কেবল সম্প্রীতির প্রচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমন্বিত সংস্কৃতির মূর্ত প্রতীক। বিংশ শতকের প্রথমার্ধে যখন ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ (Divide and Rule) নীতির কারণে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ চরমে পৌঁছায়, তখন নজরুলের সাহিত্য, সঙ্গীত ও ব্যক্তিগত জীবন ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ।
১. ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা
নজরুল ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে মানুষের আত্মিক পরিচয়কে শীর্ষে স্থান দিয়েছেন। মন্দির ও মসজিদের দেওয়াল তুলে যারা মানুষকে আলাদা করত, তাদের তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন:
“‘কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কনফুসিয়াস? চার্বাক-চেলা? ব’লে যাও, বল আরো!’
বন্ধু যা-খুশি খাও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বাও…”
—‘মানুষ’ (সাম্যবাদী)
তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, মানুষের বুকের ভেতরের ভালোবাসাই হলো পরম তীর্থক্ষেত্র।
২. যৌথ উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়
তিনি বাংলার দুই প্রধান ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মিলনকে একটি বৃন্তের দুটি ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন:
“মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”
তাঁর এই মিলনতত্ত্ব কেবল ভাবাবেগ ছিল না, ছিল ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের গভীর উপলব্ধি। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন:
“একই বৃন্তে দুটি কুসুম, একটি শুকায় একটি হাসে—
এ যে পরম অবিচার!”
নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মিলনের প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে তিনি দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক “গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন”
৩. সঙ্গীত ও সাহিত্যের অভিন্ন অঙ্গন
নজরুল একই সঙ্গে ইসলামিক গান ও গজল রচনা করেছেন, আবার সমান দক্ষতায় শ্যামাসংগীত ও ভক্তিগীতি রচনা করেছেন। তাঁর শ্যামাসংগীত (‘বল রে জবা বল’, ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল’) এবং ইসলামি গান (‘রমজানের ওই রোজার শেষে’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’) বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের হৃদয়কে এক সুরে বেঁধেছে। তিনি হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও ইসলামি ঐতিহ্যের অনায়াস মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তাঁর কাব্যভাষায়।
৪. চরম সংকটে অখণ্ড জাতীয়তাবোধ
১৯২৬ সালে কলকাতায় যখন রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধে, তখন নজরুল লিখলেন কালজয়ী কবিতা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’:
“‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!”
দাঙ্গার উন্মাদনার মুখে দাঁড়িয়ে মানুষকে কেবল ‘মানুষ’ এবং ‘ভারতজননীর সন্তান’ হিসেবে দেখার এমন বলিষ্ঠ আহ্বান সে যুগে বিরল ছিল।
৫. ব্যক্তিগত জীবনে সম্প্রীতির বাস্তব অনুশীলন
নজরুল সম্প্রীতিকে কেবল কাব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নিজের জীবনেও চর্চা করেছেন:
তাঁর স্ত্রী ছিলেন প্রমীলা দেবী (আশালতা সেনগুপ্ত); পরিবার ও তৎকালীন সমাজের বাধা সত্ত্বেও তিনি নিজের ধর্ম যেমন ত্যাগ করেননি, প্রমীলা দেবীর ধর্মীয় বিশ্বাসেও হস্তক্ষেপ করেননি। পুত্রদের নাম রেখেছিলেন উভয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণে—কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ।
নজরুলের সম্প্রীতিভাবনা কোনো আপসমূলক বা সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল ছিল না; তা ছিল রক্তে মাংসে মিশে থাকা এক অখণ্ড মানবিক বিশ্বাস।
নজরুলের উত্তরাধিকারী
বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের কোনো একক, সরাসরি ‘ক্লোন’ বা প্রতিরূপ উত্তরাধিকারী তৈরি হয়নি; বরং তাঁর উত্তরাধিকার ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক ধারায়—গণমানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, রাজনৈতিক প্রতিরোধ, আরবি-ফারসি মিশ্রিত শব্দপ্রয়োগ এবং লোকজ ও রোমান্টিক আবেগের মধ্যে ও ভাবনায়।
নজরুল যে সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন রবীন্দ্রবলয় ভেঙে নিজস্ব পথ তৈরি করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নজরুল এনেছিলেন উচ্চকণ্ঠ উচ্চারণ, ছন্দ-ভাঙার উল্লাস এবং শ্রেণিসংগ্রামের ডাক। পরবর্তী কবিরা নজরুলের সামগ্রিক রূপটি না পেলেও তাঁর বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে নিজেদের মতো করে ধারণ করেছেন।
১. বিপ্লবী ও প্রতিবাদী কাব্যের উত্তরাধিকার: সুকান্ত ভট্টাচার্য
নজরুলের দ্রোহ ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তরাধিকারী কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬–১৯৪৭)। নজরুলের ‘সর্বহারা’ ও ‘সাম্যবাদী’ ভাবনার রাজনৈতিক বিস্তার ঘটেছে সুকান্তের কাব্যে।
নজরুল: “গাহি সাম্যের গান— / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”
সুকান্ত: “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়: / পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।” সুকান্ত নজরুলের উচ্চকিত দ্রোহকে আরও বেশি মার্কসবাদী বাস্তবতা ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলার মধ্যে সংহত রূপ দিয়েছিলেন।
২. শব্দভাণ্ডার ও ঐতিহ্যচেতনার উত্তরাধিকার: ফররুখ আহমদ
নজরুল বাংলা কবিতায় আরবি, ফারসি ও দেশজ শব্দের যে সাবলীল মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন (যেমন: ‘খুন’, ‘শহীদ’, ‘খঞ্জর’), সেই ভাষারীতির প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার দেখা যায় ফররুখ আহমদ-এর (১৯১৮–১৯৭৪) কাব্যে। তাঁর ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে নজরুলের সিন্ধুপারের ডাক ও নবজাগরণের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে:
“পালে তোর লাগিয়াছে রক্তিম তুফান,
উঠেছে দামামা বাজি, উঠেছে নিশান।”
৩. নাগরিক প্রতিবাদ ও গণমানুষের জাগরণ: শামসুর রাহমান
ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শামসুর রাহমান নজরুলের প্রতিবাদী চেতনার আধুনিক নাগরিক রূপকার হয়ে ওঠেন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ যেখানে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ছিল, শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ বা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ ছিল স্বৈরাচার ও পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে নজরুলি প্রতিরোধেরই আধুনিক বিস্তার।
৪. ক্ষোভ, প্রেম ও অকাল-দ্রোহ: রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও হেলাল হাফিজ
আশির দশকের সামাজিক অবক্ষয় ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলের সেই চাবুকের মতো ভাষা ফিরে আসে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ-র কবিতায়।
রুদ্র: “বাতাসে লাশের গন্ধ,
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর ছন্দ।”
নজরুলের মতো ক্ষোভ ও গভীর বেদনার যুগলবন্দি রুদ্রের কাব্যে প্রবলভাবে দৃশ্যমান। একই ধারায় হেলাল হাফিজ-এর ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ (“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”) সরাসরি নজরুলের তরুণদের প্রতি আহ্বানের উত্তরসূরি।
নজরুলের মতো একই দেহে গান, গজল, শ্যামাসংগীত, ইসলামি গান ও বিপ্লবী কবিতার একচ্ছত্র সমাবেশ পরবর্তী আর কারও মধ্যে পাওয়া যায়নি। তাঁর উত্তরাধিকার ব্যক্তি-নির্দিষ্ট না হয়ে বাংলা সাহিত্যের প্রতিবাদী ও গণমুখী মননের চিরস্থায়ী প্রবাহ হয়ে টিকে রয়েছে।
তৈমুর খান: কবি ও শিক্ষক
