মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যে প্রথাবিরোধিতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র‍্যবাদ ও দ্রোহ

১.

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ (Bengal Renaissance) কেবল একটি সামাজিক বা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন নয়; এটি মূলত বাঙালির মনন, চিন্তা এবং সাহিত্যের এক অভূতপূর্ব রূপান্তর। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত অনন্য ও অনিবার্য একটি নাম। এই শতকে মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষা, ছন্দ, কাব্য-রীতি, নাট্যরূপ এবং সাহিত্যিক আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। মধুসূদনের সৃষ্টিকর্ম কীভাবে প্রচলিত প্রথাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে, কীভাবে উনিশ শতকীয় ইউরোপীয় রেনেসাঁর ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র‍্যবাদ’কে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করে এবং কীভাবে তাঁর সাহিত্যে ‘দ্রোহ’ বিদ্রোহের আখ্যান রচিত কওে প্রভৃতি ভাবনার উদ্রেক করে। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য যেখানে ছিলো দেবদেবীনির্ভর, ভাগ্য-চালিত এবং নিয়তিবাদী; সেখানে মধুসূদন দত্ত ঘোষণা করেন মানুষের জয়গান। তাঁর সাহিত্যিক অভিযাত্রাকে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যার নাম প্রথাবিরোধীতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র‍্যবাদ এবং দ্রোহ।

২.
উনিশ শতকে বাঙালি সমাজে রক্ষণশীলদের উদ্যোগ ও নব্যপন্থীদের ঘোষণা নামে ভারতীয় সমাজে দুইটি বিপরীতমুখী ভাবধারার জন্ম হয়। পরস্পর বিপরীতমুখী দুই ভাবধারার ফলে সৃষ্টি হয় হয় নবজাগরণের। নবজাগরণের ফলে বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় বৃদ্ধি পেয়ে নিজের অস্তিত্বের প্রতি অনুসন্ধিৎসু হয়ে ওঠে। এই যুগপ্রেক্ষিতেই মধুসূদন দত্তের আর্বিভাব ঘটে। সেকালের বাংলা সাহিত্যের সীমায় বাংলা কাব্যে প্রথম বিপ্লবের শুরুই হয় মধুসূদনকে দিয়ে। বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের এই বিপ্লবী মানসরূপটি কী বিষয় ও চেতনাগত অভিনবত্ব? তা কী মানবতাবাদ সৃষ্টি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তি সচেতনতা, দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবোধের জাগরণ, মৌলিকতা আনয়ন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যভাবের সমন্বয়? মধুসূদন দত্ত কী সত্যিকার অর্থেই মধ্যযুগের কাব্য-ঐতিহ্য ও সংস্কারকে ভেঙে বাংলা সাহিত্যের সবকটি উৎসমুখ খুলতে চেয়েছিলেন? মধুসূদনের এই প্রতিক্রিয়ার নাম কী প্রথাবিরোধীতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র‍্যবাদ ও দ্রোহ?

৩.
মধুসূদন দত্তের প্রথাবিরোধিতার প্রথম প্রকাশ ঘটে তাঁর সাহিত্যের আঙ্গিক বা ফর্মে (Form)। তিনি বাংলা সাহিত্যে বাংলা কবিতার পয়ারের শৃঙ্খল ভেঙে দেন। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ বা কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’ পয়ারের একঘেয়েমিকে মধুসূদন ভাঙার সংকল্প গ্রহণ করেন। প্রথমেই কবিতায় দীর্ঘদিনের অনুশাসিত মিল-নির্ভর ছন্দকে ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন করে সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন ঘটান।

মধুসূদনের প্রথাবিরোধিতা প্রথমেই ধরা পড়ে বাংলা কবিতার ভাষা ও ছন্দে। ‘পদ্মাবতী’ নাটকে এই ছন্দের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। পরে তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০) ও মেঘনাদবধ কাব্য-এ (১৮৬১) কাব্যিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ কেবল লাইনের শেষে মিল বর্জন করা ছিল না, এটি ছিল যতিচিহ্নের স্বাধীন ব্যবহার। এটি ছিল আঙ্গিকগত এক বিরাট বিদ্রোহ।

ইতালীয় কবি পেত্রার্কের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে ‘সনেট’ বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করেন। বিদেশে অবস্থানকালে অষ্টক এবং ষটকের কাঠামোর মধ্যে ‘কপোতাক্ষ নদ’ বা ‘বঙ্গভাষা’র সনেটগুলোতে  প্রথা ভাঙলেও বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রথাগুলোকে বাংলায় সফলভাবে রূপান্তর করেন। সনেটে মধুসূদনের এই স্বদেশানুরাগ বা স্বদেশের স্মৃতির পরিচয় সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬)-তে। কবি স্বদেশের কথা, দেশের ক্ষুদ্র-তুচ্ছ নানা বস্তু, উৎসব, দেশের কবিদের কথা, শৈশব স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদের কথা কথা ভুলতে পারেননি। জীবনে কপোতাক্ষের সমকক্ষ কোনো নদীই কবিকে সে তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। সেখানে কবি বলেন :

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে!

(কপোতাক্ষ নদ : চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী, ১৮৬৬)

বিশেষত সনেটগুলোতে কবির স্বদেশচেতনা কেবল আবেগ নয়; তা স্মৃতিনির্ভর আত্মবোধ। বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে নির্মিত কবির আত্মচেতনা।

মধুসূদনের প্রথাবিরোধিতা কেবল ছন্দে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলা নাটকেও এর প্রভাব পড়ে। তাঁর ‘শর্মিষ্ঠা’ (১৮৫৯) নাটকটিকে (১৮৫৯) আধুনিক পাশ্চাত্য রীতির প্রথম মৌলিক নাটক হিসেবে দেখা হয়। তিনি সংস্কৃত নাটকের ঐতিহ্য, লোকরঞ্জনের সহজপথ এবং নীতিশিক্ষামূলক ভঙ্গিকে অতিক্রম করে দ্বন্দ্ব-নির্ভর, চরিত্র-চালিত বিষয়কে নির্ধারণ করেন। তাঁর ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ (১৮৬০) ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০) প্রহসন দুটি সমাজের দুই বিপরীত মেরু তথা সেকালের ইংরেজি-শিক্ষিত নব্য বাবু এবং তথাকথিত রক্ষণশীল সমাজ উভয়ের ভ-ামিকে চিহ্নিত করে।

মধুসূদনের প্রহসন দুটিতে উনিশ শতকের নারীচরিত্রকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ হয়। বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০) প্রহসনে কুটনি পুঁটি সমাজের জীবন্ত নারী চরিত্র। পুঁটির নিজের শ্রেণিপরিচয় এবং কত্তা বাবু তথা ভক্তপ্রসাদের ভ-ামির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে অকপটে উন্মোচন করা হয়:

মিনসে যেন যমের দূত। … এত যে  বুড়ো, তবু আজো যেন রস উতলে পড়ে। … আজ না হবে তো ত্রিশ বছর ওর কম্ম কচ্যি, এতে যে কত কুলের ঝি বউ, কত রাঢ়, কত  মেয়ের পরকাল খেয়েছি তার কিছু ঠিকানা নাই।  বাবু এদিকে আবার পরম বৈষ্ণব, মালা ঠকঠকিয়ে  বেড়ান- (প্রথম অঙ্ক, দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক : বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ)

আবার কৃষ্ণকুমারী নাটকের পাঁচটি নারী চরিত্র, প্রতিটিই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে প্রতিষ্ঠিত। তপস্বিনী ও বিলাসবতী দুজনই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে উচ্চকিত। পদ্মাবতী নাটকে শচী ও মুরজা ক্রোধগ্রস্ত নারী হয়েও তাদের ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ উপেক্ষিত নয়।

(বাকি অংশ আগামীকাল পড়ুন)

জিএম মনিরুজ্জামান : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা।

আরও পড়ুন