নজরুল চেতনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য চেতনায় নজরুল বইটি এক অনন্য সম্ভার

১৪৩৩ বঙ্গাব্দে নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রোহিনী নন্দন প্রকাশনা ছায়ানট (কলকাতা) -র সভাপতি, নজরুল গবেষক সোমঋতা মল্লিক ও নাট্যকার, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক ড. পার্থপ্রতিম পাঁজার যৌথ সম্পাদনায় চেতনায় নজরুল বইটি প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে যে মহান সাহিত্যিকরা মণিমুক্ত দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা, যৌবনের জয়গান, প্রান্তিক মানুষের জন্য সাম্যের গান যাঁর লেখায় ফিরে ফিরে আসে। ব্রিটিশ শাসন কালের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর একাধিক কবিতা ও গান তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ থেকে বিপ্লবীদের মধ্যে শিহরণ সৃষ্টি করেছিল এবং ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জয়পতাকা উড়িয়েছিল। তাঁর গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। এ ছাড়াও রয়েছে কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট গল্প, কাব্যানুবাদ, পত্রাবলী, শিশুসাহিত্য, চলচ্চিত্রের কাহিনি প্রভৃতি। বাংলা সাহিত্যে চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ধূমকেতুর মতো। মাত্র তেইশ বছরের সৃষ্টিশীল জীবন ছিল কবির। তাঁর মৃত্যুর পর আমরা পেরিয়ে এসেছি বহু বছর। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও জীবনদর্শন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখার প্রাসঙ্গিকতাই তাঁকে কালোত্তীর্ণ করে তুলেছে। ইতিহাসের ধারায় অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ বাঙালির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। নজরুলের জীবনের নানা দিক আজও সাহিত্য এবং ইতিহাস সচেতন মানুষকে তাঁর সম্পর্কে জানার জন্য উৎসাহিত করে। ১৪৩২ বঙ্গাব্দে ‘রোহিণী’ পত্রিকার উৎসব সংখ্যায় বাংলা সাহিত্যের দুই প্রাণপুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশের বিভিন্ন সৃষ্টি ও সেই সম্পর্কিত দীর্ঘ আলোচনা প্রকাশিত হয়। সেখানে কলম ধরেছিলেন বর্তমান সময়ের বিদগ্ধ প্রাবন্ধিকরা। এই পত্রিকাটি বিশেষ ভাবে পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়।

প্রবীণ ও নবীন নজরুল গবেষক,চিন্তকদের দ্বারা তথ্যসমৃদ্ধ, মননশীল, বৈচিত্র্যময় ২৯টি প্রবন্ধের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এই বইটি। বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক পবিত্র সরকারের কলমে বইটির প্রথম প্রবন্ধ ‘নজরুল কবিতায় ছন্দ ও শব্দের কারুকর্ম’। বিষয়ের পাশাপাশি নজরুল ভাষা ব্যবহারে ও শব্দ চয়নে নিজস্বতার পরিচয় দিয়েছেন। এই প্রবন্ধে কবির ধ্বনি ও‌ নৈঃশব্দের উপর অবিশ্বাস্য দখলের কথা বিভিন্ন কবিতার অংশ উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রাবন্ধিক। উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলা ভাষার তিনটি ছন্দকে ভেঙে কী বিচিত্র তরঙ্গ সৃষ্টি করেছিলেন নজরুল। ছন্দের চাহিদা অনুযায়ী কেমন ভাবে সংস্কৃত, বাংলা, আরবি, ফারসি, ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে ছন্দ ও রস এই দুয়ের পূর্ণ সুঠাম মূর্তি তৈরি করতেন নজরুল। ড. বাঁধন সেনগুপ্তর কলমে উঠে আসে নজরুলের জীবন নিয়ে নানান বিতর্কের কথা। নজরুলের জন্মতারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি থেকে শুরু করে নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণা করা নিয়ে নানা ঐতিহাসিক ঘটনা ও বিভ্রম নিয়ে আলোচনা এই লেখাটির প্রতিপাদ্য ।

ড. রতনকুমার নন্দীর কলমে নজরুলের জীবনের বিচিত্র ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ১৯২২ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’র প্রকাশের ঘটনা, ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রকাশের ঘটনা ইত্যাদি প্রাঞ্জল ভাষায় আলোচিত আছে। অজস্র ছবি সহযোগে এই প্রবন্ধটি যেন ইতিহাসের দলিল। বইটিতে রয়েছে ছায়ানট (কলকাতা) – র সংগ্রহ থেকে বেশ কিছু দুর্লভ ছবি যা পাঠকদের কাছে উপরি পাওনা। ওয়াসিম কাপুরের আঁকা অসাধারণ প্রচ্ছদটি বইটির গ্রহণযোগ্যতা যেন দ্বিগুণ করেছে। নজরুলের বিভিন্ন কবিতায় আবেগ, উদ্যম ও নাটকীয়তা নিয়ে কলম ধরেছেন ড. সুমন গুণ।

ড.ইমানুল হক নজরুল রচিত বিভিন্ন গদ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে বিভিন্ন বছরে নজরুলের লেখা বাদ পড়ে যাবার জন্য তাঁর নিজের ক্ষোভের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘নজরুলের গানে সুর বিকৃতি’ — এই নিয়ে কলম ধরেছেন স্বপন সোম। ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হবার পর তাঁর গানে সুর বিকৃতি উত্তরোত্তর বেড়ে চলে — এই সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন তিনি। পরবর্তীতে রেকর্ডে জনপ্রিয় শিল্পীদের ভুল সুরে গাওয়া গানের প্রভাব সঙ্গীত জগতে পড়তে বাধ্য বলে মত পোষণ করেছেন স্বপন সোম। ড. সুমনপাল ভিক্ষুর ‘কবি নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা এবং অগ্নিবীণা কাব্য’ একটি দীর্ঘ আলোচনা মূলক রচনা যা এই বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে।

ঋজুরেখ চক্রবর্তীর কলমে ‘কাজী নজরুল ইসলাম: ধর্মসত্তা পরিচয়: গ্রহণ ও বর্জন’ প্রবন্ধটি বইটির একটি নাতিদীর্ঘ অথচ অমূল্য সম্পদ। তিনি লিখেছেন — “আমরা নজরুলকে দাগিয়ে দিচ্ছি শুধু একজন কবি রূপে নয়, বরং একজন ‘মুসলিম কবি’ রূপে, নিজের যে ধর্মসত্তা পরিচয়টিকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতেন স্বয়ং নজরুল।” ‘ব্যথার দান গল্পগ্রন্থের ভাষিক কাব্যময়তা ‘ লিখেছেন সাগর রশিদ। এই গল্পগ্রন্থে নজরুলের ব্যথাতুর ভাবনার শৈল্পিকতা, সহজ সরল কাহিনীর সাযুজ্যে তাঁর কাব্যিক শৃঙ্খলার রূপকে লেখক আবিষ্কার করেছেন নতুন করে। নজরুলের কবিতায় মিথ ও পুরাণ নিয়ে লিখেছেন ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী। লিখেছেন নজরুলের কবিতায় মিথ ও পুরাণের প্রয়োগ আজও বহুবিধ পাঠ ও ব্যাখ্যার উপযোগী এবং গবেষণার জন্য এক অশেষ ক্ষেত্র।

মানবতার কবি নজরুলের বজবজে কাটানো বেশ কিছু দিন নিয়ে কলম ধরেছেন রঞ্জন প্রামাণিক। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় কবি একাধিকবার বজবজে এসেছিলেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্দেশে। ‘সম্পাদক নজরুল: সাংবাদিক নজরুল’ নিয়ে একটি ভিন্নধর্মী প্রবন্ধ লিখেছেন ড. সুরঞ্জন মিদ্দে। মানবতার কবি, বিদ্রোহী কবি, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবিকে নিয়ে আলোচনা হলেও, সাংবাদিক নজরুল ও সম্পাদক নজরুল কিছুটা রয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালে। তাই এই লেখাটি পাঠকের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করবে নিঃসন্দেহে। নজরুলের প্রথম জীবনের কিছু জানা-অজানা কথা নিয়ে কলম ধরেছেন কাজী রেজাউল করিম, যিনি সম্পর্কে নজরুলের ভ্রাতুষ্পুত্র। নজরুলের আপন পরিবারের সদস্যর কাছ থেকে কবির বিষয়ে জানা পাঠকদের কাছে সৌভাগ্যের ব্যাপার। ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে নজরুল যোগ দিয়েছিলেন ১৯১৭ সালে। সেই সময়কার কিছু মুল্যবান তথ্য উঠে এসেছে সৈয়দ হাসমত জালালের লেখায়।

কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজীর লেখা এই বইটির একটি অমূল্য সংযোজন, যেখানে তিনি কবির জীবনের কিছু ব্যক্তিগত মুহূর্ত পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই বইটি কল্যাণী কাজীকে উৎসর্গ করা হয়েছে যিনি ১৯ বছর বয়স থেকেই নজরুল পরিবারের সদস্য হয়ে কবিকে খুব কাছ থেকে পেয়েছিলেন এবং আমৃত্যু নিজেকে নজরুল চর্চায় নিয়োজিত রেখেছিলেন।

বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সত্য চৌধুরীর সাথে নজরুলের পরিচয়, সম্পর্ক, গানের তালিম সম্পর্কিত তথ্য উঠে এসেছে সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্রপরমানন্দ চৌধুরীর লেখার মধ্য দিয়ে। বাংলা নাটকে নজরুলের অবদান নিয়ে লিখেছেন ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা, যিনি এই বইটির যুগ্ম সম্পাদকও। অত্যন্ত তথ্য সমৃদ্ধ এই প্রবন্ধটি। প্রথম জীবনে লেটোর দলে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা কবির পরবর্তী সৃষ্টি কর্মকে বিশেষ ভাবে সমৃদ্ধ করেছিল। নজরুলের কবিতা ও গানের প্রাবল্যে দু-একটি প্রবন্ধ ছাড়া, কবির সামগ্রিক নাট্য প্রতিভা বা অবদান নিয়ে কোন মৌলিক কাজ হয়ে ওঠেনি এবং বাংলা নাটকের বিভিন্ন ধারায় এই নিয়ে গবেষণা করার অগাধ ক্ষেত্র আছে বলে জানিয়েছেন লেখক। বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীত শিল্পী, নজরুলের স্নেহধন্যা ও শিষ্যা শৈলদেবীর সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন কাকলী সেন।

রাশেদ রউফের কলমে নজরুলের অনবদ্য শিশুসাহিত্য নিয়ে আলোচনা উঠে এসেছে। বহুমাত্রিক, বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী, সঙ্গীতস্রষ্টা নজরুলের সঙ্গীতের ক্ষেত্রে অবদান সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখেছেন শেলু বড়ুয়া। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় একই গানে একাধিক রাগের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি অসাধারণ সুরের মায়াজাল সৃষ্টি করতেন। নজরুলের প্রকৃতি প্রেম নিয়ে লিখেছেন পীযূষ কুমার ভট্টাচার্য। প্রদ্যোত বিশ্বাসের কলমে রয়েছে ‘ নজরুল-কবিসঙ্গীতসত্তার অনন্যরূপ কথাসাহিত্য’। প্রেমিক কবি নজরুলকে নিয়ে লিখেছেন মোস্তফা কামাল।

এ এফ এম হায়াতুল্লাহর কলমে রয়েছে নজরুলের পরিচ্ছদ নিয়ে একটি চিত্তাকর্ষক প্রবন্ধ। পোশাক পরিধান মানুষের মনের সৌন্দর্য, রুচি, ব্যক্তিত্ব , সামাজিক সচেতনতা প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। নজরুল দেশি ও বাঙালি পোশাকেই বেশি স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল ছিলেন এবং কোনো কোনো সময়ে রঙচঙে পোশাক পরলেও পরিধানের রঙ হিসেবে গেরুয়াই পছন্দ করতেন বলে জানা যায়। কণ্ঠশিল্পী ধীরেন দাসের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কের কথা লিখেছেন গোপাল দাস। গ্ৰামোফোন কোম্পানিতে নজরুলের যোগদান, সেই কোম্পানির সঙ্গে তাঁর শর্ত, ধীরেন দাসের সঙ্গে তাঁর গানের যাত্রাপথ সমস্ত উঠে এসেছে এই লেখায়। গ্ৰামোফোন কোম্পানি ছাড়াও টুইন ও মেগাফোন নামে দুটি কোম্পানিতে নজরুল যে গান রেকর্ড করেন এই তথ্যটি পাঠকদের অভিভূত করে। নজরুলের কাব্যে ফুল নিয়ে আলোচনা করেছেন মৃত্যুঞ্জয় রায়। কবির কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র ও সেগুলো তোলার স্থান, কাল ও প্রেক্ষাপট নিয়ে কলম ধরেছেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী সাহাদাত পারভেজ।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও নজরুলকে নিয়ে লেখা বইটির শেষ প্রবন্ধটি এক অনবদ্য সংযোজন। লিখেছেন ছায়ানট (কলকাতা) – র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। ভারত তথা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বর পারস্পরিক সম্পর্ক এই লেখাটির মূল বিষয়। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা নানান ঘটনা দিয়ে সাজানো এই লেখাটি বাঙালির আবেগকে দোলা দিয়ে যায়। দেশবন্ধুর সাথে নজরুলের একাধিকবার সাক্ষাৎ, কবির প্রতি দেশবন্ধুর সহধর্মিনীর স্নেহ এবং তাঁরই অনুরোধে নজরুলের বিখ্যাত ‘কারার ঐ লৌহ কপাট ‘ গান রচনা, নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ গানের পরিপ্রেক্ষিতে নেতাজি বক্তব্য সবই ধরা আছে এই প্রবন্ধে।

এমন একটি বই প্রকাশের জন্য ‘রোহিণী নন্দন’ প্রকাশনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। যাঁরা নজরুল চর্চা করেন, বাংলা সাহিত্য ভালোবাসেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস চর্চা করেন, নজরুলের কবিতা ও গান কণ্ঠে ধারন করেন তাঁদের সকলের কাছে বইটি একটি অমূল্য সম্পদ। নজরুল চেতনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই বই এক অনন্য সম্ভার।

লেখক: রাজশ্রী বসু

আরও পড়ুন