‘একটা দুপুর মরে গেল’ বইয়ে চারপাশের মানুষ, সম্পর্ক, নিঃসঙ্গতা, বার্ধক্য ও জীবনের নানা অদেখা দিককে নতুন করে দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে…

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে অবসর আসে, কিন্তু সব অবসর যে বই পড়ার জন্য যথেষ্ট সময় কিংবা মনোযোগ এনে দেয়, তা নয়। বরং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নানা ব্যস্ততা, শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং জীবনের নানা বাস্তবতা বই পড়ার অভ্যাসের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও সাহিত্যের প্রতি টানটা যদি একবার হৃদয়ে জন্ম নেয়, তা সহজে মরে না। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে। সাহিত্যের ভূতটা এখনো আমাকে ছাড়েনি। তাই সুযোগ পেলেই দু-একটি বই হাতে তুলে নিই, পড়ি এবং পড়ার আনন্দটুকু উপভোগ করি।
সম্প্রতি যে বইটি পড়লাম, তার নাম ‘একটা দুপুর মরে গেল’। বইটির লেখক তরুণ লেখক মাসুম বিল্লাহ। বইটি পড়তে গিয়ে সত্যি বলতে আমি বিস্মিত হয়েছি। একজন তরুণ লেখকের লেখায় যে পরিমাণ পরিপক্বতা, জীবনবোধ, মানুষের মনস্তত্ত্বের প্রতি মনোযোগ এবং সমাজকে দেখার সূক্ষ্ম দৃষ্টি থাকতে পারে—এই বইটি হাতে পেয়ে বুঝেছি।
অল্প বয়সে মানুষের মন, সম্পর্ক, নিঃসঙ্গতা, বার্ধক্য, আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনের ছোট ছোট বেদনার জায়গাগুলোকে এত গভীরভাবে উপলব্ধি করে সাহিত্যে তুলে ধরা সহজ নয়। মাসুম বিল্লাহ সেই কঠিন কাজটিই অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাঞ্জল ভাষায় করার চেষ্টা করেছেন এবং অনেকখানি সফল হয়েছেন।
বইটির ‘উঠোনের গল্প’ আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন কিশোর। তার জীবন, একাকিত্ব, কল্পনা এবং কৈশোরের অস্থির মনোজগতকে লেখক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন।
কিশোরটি একসময় নিরুপায় হয়ে শহরে তার চাচার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেও সে খুব একটা যত্ন-আদর পায় না। ফলে ধীরে ধীরে পাশের বাড়ির উঠোনটি তার কাছে হয়ে ওঠে একান্ত নিজস্ব একটি পৃথিবী। সেই উঠোনে কাপড় শুকানোর তারে ঝুলতে থাকা ভেজা শাড়ি কিংবা লুঙ্গির দিকে তাকিয়ে তার কিশোর মন নানা কল্পনায় ভেসে যায়।
পাশের বাড়ির বউটিকে সে এখনো দেখেনি। কিন্তু না দেখেই নিজের কল্পনায় তার একটি ছবি তৈরি করে নিয়েছে। হয়তো সে খুব সুন্দরী, এমন ভাবনাই তাকে ঘিরে থাকে। বাস্তব জীবনে যেখানে তার আনন্দের জায়গা খুব কম, সেখানে কল্পনার জগৎ তাকে সাময়িক সুখ দেয়।
এই জায়গাটিই গল্পটিকে বিশেষ করে তুলেছে। লেখক কিশোরের মনের ভেতরের সেই অস্থিরতা, কৌতূহল ও কল্পনার জগতকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে পাঠক সহজেই তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারেন।
কিন্তু একদিন হঠাৎ সেই কল্পনার পৃথিবীতেও আঘাত আসে। ভোরবেলায় উঠোনে আর ভেজা লুঙ্গি শুকাতে দেখা যায় না। কিশোরের মনে অস্থিরতা তৈরি হয়। সে জানতে চায় কী হয়েছে। একসময় মোড়ের মুদি দোকানে গিয়ে জানতে পারে পাশের বাড়ির বউটির স্বামীর কথা। তখন তার কল্পনার জগতে নেমে আসে বিষণ্নতা।
একটি ছোট্ট ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখক কৈশোরের মনস্তত্ত্ব এবং আমাদের সমাজের একটি বাস্তব অসঙ্গতিকে তুলে ধরেছেন। একজন সমাজসচেতন লেখকের কাজই হলো মানুষের জীবনের এমন অদৃশ্য জায়গাগুলো পাঠকের সামনে দৃশ্যমান করে তোলা। মাসুম বিল্লাহ সেটিই করেছেন।
‘পারাপার’ গল্পটি পড়ার সময় আমার নিজের বয়সের কথাও মনে হয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে এসে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, সমাজ ও সংসারের নানা বাস্তবতা যে দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়, গল্পটিতে সেই সত্যটি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উঠে এসেছে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ আসলে কী চায়? খুব বেশি কিছু নয়। একটু সঙ্গ, একটু কথা, একটু ভালোবাসা এবং পাশাপাশি থাকার সুযোগ। কিন্তু দীর্ঘ সংসারজীবনের নানা টানাপোড়েন, দায়িত্ব, অভ্যাস ও সামাজিক বাস্তবতা অনেক সময় সেই সহজ চাওয়াটুকুও কঠিন করে তোলে।
আরেকটি গল্প ‘উচ্চতর গার্হস্থ্যজীবন’, মাসুম বিল্লাহর লেখকসত্তার ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরে। ছোট পরিসরের এই গল্পে তিনি ভালোবাসা ও দাম্পত্যজীবনের গভীরতাকে যে দৃষ্টিতে দেখেছেন, তা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
বিশেষ করে আমাদের মতো বয়সে পৌঁছানো মানুষদের নিয়ে লেখকের ভাবনা আমাকে নাড়া দিয়েছে। ভালোবাসা যে শুধু যৌবনের বিষয় নয়, বরং বয়স পেরিয়ে গেলেও তার প্রয়োজন ও গভীরতা মানুষের জীবনে থেকে যায়, গল্পটি যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
গল্পটির শেষভাগে লেখক পাঠককে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা ধাক্কা এবং অনেকখানি ভাবনার অবকাশ তৈরি হয়। একজন লেখকের সার্থকতা এখানেই—তিনি শুধু গল্প বলবেন না, গল্প শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে গল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখবেন।
‘আবার রোদ্দুর’ গল্পটিও আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে। মনে হয়েছে, গল্পটি যেন শুধু আমার জন্য নয়, আমাদের সবার জন্য লেখা।
জীবনের অনেকগুলো বসন্ত পেরিয়ে যখন মানুষ শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখনও কি সে বাঁচতে চায় না? অবশ্যই চায়। জীবনের প্রতি মানুষের যে অমোঘ টান, মৃত্যুর অনিবার্যতার মাঝেও বেঁচে থাকার যে আকাঙ্ক্ষা, গল্পটি সেই অনুভূতির কাছে নিয়ে যায়।
জীবন যতই শেষের দিকে এগিয়ে যাক, মানুষের মনে আবার রোদ্দুরের প্রত্যাশা থেকে যায়। এই সহজ অথচ গভীর সত্যটিকে লেখক সুন্দরভাবে ধারণ করেছেন।
‘একা একা একদিন’ গল্পের বৃদ্ধ ছবেদ আলি যেন আমাদের সমাজের অসংখ্য একাকী মানুষের প্রতিনিধি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যে কীভাবে ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ে, তার বাস্তব চিত্র এই গল্পে পাওয়া যায়।
এখানে লেখক কোনো কৃত্রিম আবেগ তৈরি করেননি। বরং বাস্তবতাকে সামনে রেখেই গল্প বলেছেন। আর এই জায়গাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে।
তরুণরা সাধারণত বৃদ্ধদের জীবন নিয়ে খুব একটা ভাবতে চায় না। তাদের ব্যস্ততা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সবকিছুর কেন্দ্রেই থাকে নিজেদের বয়স ও নিজেদের পৃথিবী। কিন্তু মাসুম বিল্লাহ তাঁর অল্প বয়সেই আমাদের মতো মানুষদের জীবন, নিঃসঙ্গতা এবং অনুভূতির দিকে যেভাবে তাকিয়েছেন, তাতে আমি সত্যিই আশাবাদী।
একজন তরুণ লেখকের মধ্যে এমন মানবিক দৃষ্টি থাকা বাংলা সাহিত্যের জন্য নিঃসন্দেহে আশার কথা।
‘একটা দুপুর মরে গেল’ পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, মাসুম বিল্লাহর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বিষয় নির্বাচনে। তিনি খুব বড় কোনো ঘটনা কিংবা অসাধারণ কোনো চরিত্রের ওপর নির্ভর না করেও মানুষের জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত থেকে গল্প তৈরি করতে পারেন।
একজন কিশোরের কৌতূহল, একজন বৃদ্ধের একাকিত্ব, স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব, বয়সের শেষ প্রান্তে ভালোবাসার প্রয়োজন কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জীবনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ, এসবই তাঁর গল্পের উপাদান।
তাঁর ভাষা প্রাঞ্জল। গল্প বলার ভঙ্গি সহজ। কিন্তু সেই সহজতার আড়ালে রয়েছে পর্যবেক্ষণের গভীরতা। পাঠককে জটিল শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য বাক্যের ভারে ক্লান্ত না করে তিনি গল্পের ভেতরে টেনে নেন। কোথাও কৌতূহল তৈরি করেন, কোথাও আবেগ, কোথাও বিষণ্নতা, আবার কোথাও মৃদু হাসির আবহ।
সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর গল্প পড়ে মনে হয়, তিনি মানুষকে দেখেছেন, মানুষের কাছাকাছি গেছেন এবং মানুষের মনের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন।
আমি সব শ্রেণির পাঠকের প্রতি আহ্বান জানাব, তরুণ লেখক মাসুম বিল্লাহর ‘একটা দুপুর মরে গেল’ বইটি পড়ুন। তাঁর গল্পের ভেতর দিয়ে আমাদের চারপাশের মানুষ, সম্পর্ক, নিঃসঙ্গতা, বার্ধক্য ও জীবনের নানা অদেখা দিককে নতুন করে দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে।
আমি এখনই তাঁর লেখার মধ্যে একজন বড় সুসাহিত্যিকের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। তাঁর লেখায় আছে সাবলীলতা, কৌতূহল, মানবিকতা এবং পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা।
আবু আহমেদ শিকদার : কবি ও লেখক
বই: একটা দুপুর মরে গেল
লেখক: মাসুম বিল্লাহ
প্রচ্ছদ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশন: দিব্যপ্রকাশ
প্রথম প্রকাশ: একুশে ফেব্রুয়ারি বইমেলা ২০২১খ্রি.
