জোছনা ও জননীর গল্প: মুক্তিযুদ্ধের এক অসামান্য উপাখ্যান

২০১৩ সালের আগস্টের শুরুতে, (ঈদের ঠিক দুদিন আগে) ঢাকার রাজপথে একা হাঁটছিলাম। চারদিকে ঈদে বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা। সবাই যেন নাড়ির টানে শহর ছাড়ার তাড়ায় ছুটছে। আর আমি?
নতুন জামা-কাপড় কেনার জন্য নয়, বই কেনার জন্য বের হয়েছিলাম।
আব্বাজান নতুন টাকা দিয়ে বলেছিলেন, “নতুন জামা কিনিস।” মুখে কিছু না বলে মাথা নেড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম, নতুন জামার বদলে বই কিনব। তাই মহাখালী থেকে হেঁটে শাহবাগে এলাম। উদ্দেশ্য ছিল পত্রিকার ঈদ সংখ্যা আর হুমায়ূন আহমেদের জোছনা ও জননীর গল্প সংগ্রহ করা।
ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য শপিং মল চোখে পড়ে, কিন্তু বইয়ের দোকান খুঁজতে হলে যেন আলাদা করে অভিযানে নামতে হয়। বই কেনার জন্য এতটা পথ হাঁটতে আমার একটুও কষ্ট হয়নি। বরং কষ্ট হয়েছিল অন্য জায়গায়, আমরা শপিং মল বানাতে যতটা আগ্রহী, বইয়ের দোকান বানাতে ততটা নই; কেনাকাটায় যতটা উৎসাহী, বই কেনা ও পড়ার ক্ষেত্রে ততটা নই।
সেদিন শাহবাগ থেকে জোছনা ও জননীর গল্প নিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখনও জানতাম না বইটি আমার কাছে কেবল একটি উপন্যাস হয়ে থাকবে না।
বাসায় ফিরে বইটির ভূমিকা পড়তে শুরু করলাম। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম পুরো ভূমিকাটি। সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের লেখা সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলোর একটি এটি। ভূমিকা পড়েই বইটির প্রতি এক ধরনের আলাদা টান অনুভব করলাম।
ইফতার শেষে বসে প্রথম দুই অধ্যায় পড়ে ফেললাম। তারপর বুঝলাম, আমি শুধু একটি উপন্যাস পড়ছি না, একজন লেখকের দায়বোধের গল্পও পড়ছি।
হুমায়ূন আহমেদ নিজেই বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাকে ধরে রাখার জন্য তিনি একটি উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলেন। দেশমাতার ঋণ একজন লেখক তাঁর লেখার মাধ্যমে শোধ করেন, এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর দীর্ঘদিনের এই লেখার যাত্রা শুরু।
কিন্তু লেখাটি সহজে শেষ হয়নি। ধারাবাহিকভাবে লিখতে গিয়ে বারবার থেমেছেন। অন্য লেখা, নাটক, সিনেমা, সবকিছুর ভিড়ে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসটি যেন বারবার পিছিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত যখন বুঝলেন, তাঁর হাতে আর সময় নেই, তখনই এই অসমাপ্ত কাজটি শেষ করার তাগিদ আরও প্রবল হয়ে উঠল।
এই জায়গাটিই আমার কাছে বইটির অন্যতম আবেগঘন দিক।
কারণ জোছনা ও জননীর গল্প শুধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস নয়; এর পেছনে একজন লেখকের ব্যক্তিগত দায়বোধ, স্মৃতি এবং সময় ফুরিয়ে যাওয়ার অনুভূতিও জড়িয়ে আছে।
সত্যি বলতে কী, ইতিহাসের বই পড়ার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ নেই। খুব প্রয়োজন না হলে ইতিহাসের বই পড়ি না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই তিনি এমন বিষয়ও গল্পের মতো করে বলতে পারেন, যেটি অন্য কারও হাতে নিছক ইতিহাসের বর্ণনা হয়ে উঠতে পারত।
জোছনা ও জননীর গল্প-এর ঘটনাগুলো পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, ১৯৭১ যেন শুধু একটি ইতিহাসের বছর নয়; এটি ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবন সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার একটি সময়।
একদিকে ভয়, অনিশ্চয়তা, পালিয়ে বেড়ানো, বন্দিত্ব ও মৃত্যুর আশঙ্কা; অন্যদিকে ভালোবাসা, সম্পর্ক, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার অদম্য চেষ্টা, সবকিছু পাশাপাশি চলেছে।
লেখকের নিজের অভিজ্ঞতার কথাগুলোও এই অনুভূতিকে আরও গভীর করে। তিনি নিজেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়ে বেড়িয়েছেন, বেঁচে থাকার জন্য নানা পরিচয়ের আশ্রয় নিয়েছেন, বন্দিশিবিরে থেকেছেন এবং মৃত্যুর ভয়কে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
তাই তাঁর বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধ শুধু বাইরের কোনো ঘটনা নয়। এটি একজন প্রত্যক্ষদর্শী মানুষের স্মৃতি ও অনুভবেরও অংশ।
বইটির ভূমিকায় হুমায়ূন আহমেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, যারা যুদ্ধ দেখেনি, তাদের কাছে উপন্যাসের অনেক ঘটনাই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। সত্যিই, বইটি পড়তে গিয়ে এমন অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেগুলো এতটাই অস্বাভাবিক যে স্বাভাবিক সময়ে বসে সেগুলো কল্পনা করাও কঠিন।
কিন্তু ১৯৭১ ছিল এমনই এক সময়।
স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন পাশাপাশি চলেছে। পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ অপরিচিত হয়ে গেছে। নিরাপদ ঘর ছেড়ে মানুষকে পালাতে হয়েছে। আপনজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। কখন কোথায় মৃত্যু অপেক্ষা করছে, কেউ জানত না।
এই ভয়াবহ সময়টিকে হুমায়ূন আহমেদ কেবল যুদ্ধের বড় বড় ঘটনা দিয়ে দেখাননি। তিনি দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ এখানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের গল্প হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে ঘর, পরিবার, সম্পর্ক এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প।
সেকারণেই উপন্যাসটির ভূমিকাপত্র থেকে কিছু অংশ তুলে দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না:
‘‘একসময় মনে হলো, মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে রাখার জন্য একটা উপন্যাস লেখা উচিত। মানুষকে যেমন পিতৃঋণ-মাতৃঋণ শোধ করতে হয়, দেশমাতার ঋণও শোধ করতে হয়। একজন লেখক সেই ঋণ শোধ করেন লেখার মাধ্যমে। লেখা শুরু করলাম। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ ধারাবাহিকভাবে ভোরের কাগজে ছাপা হতে লাগল। আমি কখনোই কোন ধারাবাহিক লেখা শেষ করতে পারি না। এডিও পারলাম না। ছয়-সাত কিস্তি লিখে লেখা বন্ধ করলাম। দু’বছর পর আবার শুরু করলাম। আবারোকয়েক কিস্তি লিখে লেখা বন্ধ। আর লেখা হয় না। অন্য লেখা লিখি, নাটক বানাই, সিনেমা বানাই, মুক্তিযুদ্ধের লেখাটা আর ধরা হয় না। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে-তখন নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেই যে, লিখব একদিন লিখব। ব্যস্ততা কমলেই লেখা শুরু করব। এখনো সময় আছে। অনেক সময়। একদিন হঠাৎ টের পেলাম সময় আমার হাতে নেই। সময় শেষ হয়ে গেছে। জোছনা ও জননীর গল্প আর লেখা হবে না। তখন আমি শুয়ে আছি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে একটা ট্রলিতে…
উপন্যাসে (জোছনা ও জননীর গল্প) বর্ণিত প্রায় সব ঘটনাই সত্যি। কিছু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। কিছু অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে ধার নেওয়া। প্রকাশিত হওয়ার আগেই এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি অনেককে পড়েছি। যারা যুদ্ধ দেখে নি (এই প্রজন্মের কথা বলছি) তারা পড়ার পর বলেছে- উপন্যাসের অনেক ঘটনাই তাদের কাছে কাল্পনিক বলে মনে হচ্ছে, এমনও কি হয়? তাদের কাছে আমার একটাই কথা- সে বড় অদ্ভুত সময় ছিল। স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের মিশ্র এক জগৎ। সবটাই বাস্তব, আবার সবটাই অবাস্তব। আমি সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর সুররিয়্যালিস্টিক সময় পার করে এসেছি। তার খানিকটাও যদি ধরে রাখতে পারি, তাহলেই আমার মানবজীবন ধন্য।
আমার সাজানো অতি পরিচিত ভুবন পুরোপুরি ভেঙে পড়ল ১৯৭১ সনে। যে পরিস্থিতিতে আমি পড়লাম, তার জন্য কোনরকম মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না। ছায়াঘেরা শান্ত দিঘির একটা মাছকে হঠাৎ যেন নিয়ে যাওয়া হলো চৈত্রেম দাবদাহে ঝলসে যাওয়া স্থূলভূমিতে। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা! ভাইবোন নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালাচ্ছি। জীবন বাঁচানোর জন্য মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি হতে গেছি শর্ষিনার পীর সাহেবের মাদ্রাসায়। পাকিস্তান মিলিটারী মাথায় গুলির বাক্স তুলে দিয়েছে। অকল্পনীয় ওজনের গুলির বাক্স মাথায় নিয়ে সৈন্যদের সঙ্গে বারহাট্টা থেকে হেঁটে হেঁটে এসেছি নেত্রকোনায় পর্যন্ত। মিলিটারীর বন্দীশিবিরে কাটল কিছু সময়। কি ভয়ঙ্কর অত্যাচার! এক সকালে মিলিটারিদের একজন এসে আমার হাতে বিশাল সাইজের একটা সাগর কলা ধরিয়ে দিয়ে বলল তোমাকে কাল সকালে গুলি করে মারা হবে। এটা তোমার জন্য ভালো। তুমি যদি নিরপরাধ হও, সরাসরি বেহেশতে চলে যাবে। আর যদি অপরাধী হও, তাহলে মৃত্যু তোমার প্রাপ্য শাস্তি।’’
‘জোছনা ও জননীর গল্প’ এর শুরুটা ফাল্গুন মাসের শুরুতে, তার মানে ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে যখন নীলগঞ্জ হাইস্কুলের আরবি শিক্ষক মাওলানা ইরতাজউদ্দীন কাশেমপুরীর ছোটভাই শাহেদ, ভাইয়ের বউ আসমানী আর ভাইয়ের মেয়ে রুনিকাকে দেখতে ঢাকা আসে।
এরপর ধীরে ধীরে কাহিনি প্রবেশ করে সেই উত্তাল সময়ে, যখন একটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিতে শুরু করেছে।
এই উপন্যাসের বিশেষত্ব এখানেই, মুক্তিযুদ্ধকে কেবল যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে দেখা হয়নি। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, ভয়, ভালোবাসা, বিশ্বাস, দ্বিধা এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে সময়টিকে অনুভব করানো হয়েছে।
… না, উপন্যাসটি সম্পর্কে আর কিছু বলতে চাইছি না। এই উপন্যাসটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলা বা লেখা আমার কর্ম্ম নয় সাজেও না।
হুমায়ূন আহমেদের লেখার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তাঁর সহজ ভাষা। কঠিন বিষয়কেও তিনি এমনভাবে বলতে পারেন যে পাঠক গল্পের ভেতরে ঢুকে যায়।
জোছনা ও জননীর গল্প-এ সেই সহজ ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি ভয়াবহ সময়ের ভার। ফলে বইটি একদিকে সহজপাঠ্য, অন্যদিকে গভীরভাবে আবেগময়। যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশে প্রকৃতি আছে, মানুষের সম্পর্ক আছে, ভালোবাসা আছে, হাসি-কান্না আছে। এই বৈপরীত্যই উপন্যাসটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
সত্যিই এই বই নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার সাহস আমার নেই। কারণ জোছনা ও জননীর গল্প এমন একটি বই, যার কাহিনি বলে শেষ করার চেয়ে বইটি নিজে পড়ে অনুভব করাই বেশি জরুরি।
বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তাদের জন্য এই বইটির গুরুত্ব আরও বেশি। ইতিহাসের তারিখ, ঘটনা কিংবা পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে একটি যুদ্ধ কীভাবে সাধারণ মানুষের ঘর-সংসার, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনকে বদলে দেয়, এই বই তার একটি সাহিত্যিক অনুভব তৈরি করে।
আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে, বইটি আমাকে কোথাও ইতিহাসের ক্লাসে বসিয়ে দেয়নি। বরং একজন পাঠক হিসেবে সেই সময়ের মানুষের পাশে দাঁড় করিয়েছে।
কখনো মনে হয়েছে আমি তাদের ভয় দেখছি, কখনো তাদের অপেক্ষা অনুভব করছি, আবার কখনো মনে হয়েছে, এই মানুষগুলো যে সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে, সেই সময়কে আমরা আজ কত সহজে কয়েকটি তারিখ আর ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি!
জোছনা ও জননীর গল্প পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকে জানার জন্য শুধু ইতিহাস পড়াই যথেষ্ট নয়; সেই সময়ের মানুষের জীবন, ভয়, ভালোবাসা ও স্বপ্নকেও অনুভব করা দরকার।
হুমায়ূন আহমেদ সেই অনুভূতির জায়গাটিই তৈরি করেছেন।
বইটির শেষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে এটি বইটির একটি মূল্যবান সংযোজন, উপন্যাসের আবেগময় জগত থেকে বাস্তব ইতিহাসের দিকে পাঠককে আবার ফিরিয়ে আনে।
যারা এখনো বইটি পড়েননি, তাদের প্রতি আমার একটাই অনুরোধ, সময় করে বইটি পড়ুন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের পড়া উচিত। কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুধু আমাদের ইতিহাস নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ।
আর জোছনা ও জননীর গল্প সেই ইতিহাসকে একজন কথাসাহিত্যিকের চোখ দিয়ে অনুভব করার এক অসাধারণ সুযোগ।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
বই: জোছনা ও জননীর গল্প
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাশক: অন্যপ্রকাশ
প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০০৪
প্রচ্ছদ: মাসুম রহমান
