প্রিয় আখতার ভাই, শান্তিতে থাকুন…

প্রিয় আখতার হুসেন ভাই হাসপাতালের আইসিইউতে শয্যাশায়ী। খবরটা শোনার পর থেকেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে ছিল। গত এক সপ্তাহ কেবল আল্লাহকে বলেছি, মাবুদ, মানুষটাকে তুমি সুস্থ করে দিও। পুত্রধন নিনাদকে ও আখতার ভাইয়ের লেখা সমুদ্র অনেক বড় বইটা দিয়ে বলেছিলাম, বইটা পড়ে ফেলো। আর লেখকের জন্য দোয়া করবে, যেন তিনি সুস্থ হয়ে যান। নিনাদ দুই বসায় বইটা পড়ে শেষ করেছে।

আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি চলে গেছেন পরপারে। এই খবরটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। মানুষটিই আজ আমাদের সব প্রার্থনার ওপারে চলে গেলেন। আজ আখতার ভাই আর কেবল রয়ে গেলেন তার বইয়ের পাতায়।

আখতার ভাইয়ের সাথে জমিয়ে গল্প করার দিনগুলো আজ খুব মনে পড়ছে। প্রথম আলোর অফিসে, প্রথমায় বসে আখতার ভাইয়ের সঙ্গে জমিয়ে গল্প করার দিনগুলোর কথা আজ খুব মনে পড়ছে। মাঝেমধ্যে তাঁকে আমাদের বন্ধুসভার ‘লেখার ইশকুলে’ নিয়ে আসতাম, শুধু তাঁর মুখ থেকে কিছু মূল্যবান কথা শোনার লোভে। কী চমৎকার করেই না তিনি কথা বলতেন! মিষ্টভাষী, হাসিমুখের মানুষ। তাঁর কথা শুনতে ভালো লাগত। তাঁর মধ্যে এমন এক সহজ সৌজন্য ছিল, যা খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নিত।

আমি আখতার ভাইকে পছন্দ করতাম। কারণ, ভালো মানুষকে আমি ভালোবাসি। ভালো মানুষকে শ্রদ্ধা করি। আর আখতার ভাই সত্যিই ভালো একজন মানুষ ছিলেন।

লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। অথচ নিজের লেখকসত্তাকে কখনো প্রচারের আলোয় নিয়ে আসার চেষ্টা করেননি। খুব সাদামাটা, নিভৃতচারীভাবেই চলেছেন। নিজের কাজকে সামনে রেখেছেন, নিজেকে নয়। এই সময়ে এমন স্বভাবের লেখক খুব বেশি দেখা যায় না।

তার অন্য সব পরিচয় ও কর্মের কথা বাদ রেখে যদি বলি, শিশুসাহিত্যে তাঁর অবদান মনে রাখার মতো। ছড়া, গল্প, অনুবাদ গল্প, কত চমৎকার সব লেখা! তাঁর লেখা পড়লে বোঝা যায়, শিশুদের জন্য লেখা মানে মোটেই হালকা করে লেখা নয়; বরং সহজ ভাষায় গভীর আনন্দ ও সৌন্দর্য পৌঁছে দেওয়া। অথচ দুঃখের বিষয়, তাঁর অনেক ভালো লেখা হয়তো আমাদের পাঠের পরিসরে যতটা থাকা উচিত, ততটা নেই। আমার মনে হয়, এখন তাঁকে নতুন করে পড়া দরকার। পাঠকদের তাঁর বই আরও বেশি করে পড়া দরকার।

তাঁর প্রথম বই ‘সমুদ্র অনেক বড়’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। ২০১৩ সালে প্রথমা থেকে বইটি আবার প্রকাশিত হয়। বইটি আমি নিজেও পড়েছি। ২০১৩ সালের ১৮ মে সুবাইতার জন্য আখতার ভাই নিজ হাতে বইটিতে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। সেই বইটিই আজ পরম আগ্রহ নিয়ে পড়েছে নিনাদ। বইয়ের পাতায় আখতার ভাইয়ের হাতের লেখা, আর পাশে বসে তাঁর বই পড়ছে নিনাদ—এই স্মৃতিটিও আজ থেকে আমাদের কাছে অন্যরকম হয়ে রইল।

কিছুদিন আগেও তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। কত পরিকল্পনা! তিনি খুলনায় আসবেন, আমি যেন তাঁকে সঙ্গ দিই, আমার বাসায় বেড়াতে আসবেন—কত কথা, কত কথোপকথন! কে জানত, সেসব কথাই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।

সেই মানুষটা আজ চলে গেলেন।

হয়তো আরও অনেক কথা বলতেন। আরও কিছু গল্প লিখতেন। আরও কিছু ছড়া, আরও কিছু অনুবাদ, আরও কিছু বই আমাদের হাতে তুলে দিতেন। হয়তো কোনো একদিন আবার ফোন করে বলতেন, ‘মাসুম বিল্লাহ, খুলনায় আসছি। আপনি আছেন তো?’ হয়তো আবার কোনো গল্পের আসরে বসে তাঁর মিষ্টি কথাগুলো শুনতাম।
আর হলো না।

একজন ভালো মানুষ চলে গেলেন। একজন নীরব, মেধাবী লেখক চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়ায় আমাদের যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা হয়তো কোনোদিনই পূরণ হবে না।

আখতার ভাই, আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না, আপনার ফোনও আর আসবে না। কিন্তু আপনার লেখা থাকবে। আপনার বই থাকবে। আপনার কথা মনে থাকবে। আর যারা আপনাকে চিনেছেন, ভালোবেসেছেন, তাঁরা আপনাকে তাঁদের নিজস্ব স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখবেন।

প্রিয় আখতার ভাই, শান্তিতে থাকুন।
আপনার জন্য গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আপনাকে কখনও আমি ভুলবো না।

মাসুম বিল্লাহ : শিশুসাহিত্যিক ও গল্পকার

আরও পড়ুন