মোস্তফা মোহাম্মদের পাঁচটি কবিতা

শোভনা নিখোঁজ
পরাজিত নই আমি—
প্রেমিক আর কবি পরাজিত হয় না কখনো,
মৃতদেহের ভাঁজে কবরের শিয়রের কথকতা,
রক্তজবা অথবা গোলাপ-পাঁজর-ভেদী বুলেট,
শাশ্বত সুন্দর শ্মশানচিতার অনলে দাঁড়িয়ে যায়,
অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকীর্তি দেখে রীতিমতো হাসি পায়;
মাটিচাপা শীর্ণদেহ—
অজীর্ণ আর উদরাময়ের করাল গ্রাস,
নদীর চরে জেগে ওঠা মানুষের হাড়গোড়,
মৃত-নির্বিকার ঘুণেধরা সমাজ-রাষ্ট্র-সংঘ;
ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠে চুম্বন,
আহত আমার হারানো প্রেম—
গ্রাম-গঞ্জ-হাট-বাজার, বাল্যকালের,
খেলার মাঠ;
রামপ্রসাদী টপ্পা, ভাটিয়ালি সুর,
সুবেহ-সাদিকের টুকটুকে লালসূর্য,
পবিত্র আজানের বাণী—
আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম,
পাখির কিচির মিচির,
নদীর কলতান, মন্দিরের ঘণ্টাকাঁসর;
এই প্রভাতে চলো ঘুরে আসি—
বিষণ্ণ দুপুর আর নির্ঘুম রাতের প্রহর,
আমার কাঙ্ক্ষিত রবিবার আর আসে না,
চিরকুট হাতে দাঁড়িয়েই আছি—
বিশ-তিরিশ-চল্লিশ কী একশো বছর!
মাথার মধ্যে কোলকাতার ট্রামের গুরগুর,
লজ্জার মাথা খাই—হোস্টেলের দারোয়ান নিরুত্তর,
অনেক অপেক্ষার পরও—
তোমার দেখা পেলাম না, শোভনা!
চিরচেনা ডাহুকীর গান
বর্ণ নয়, অক্ষর নয়,
কুমারী চুম্বনের মদিরাক্ষী প্রভাত,
বুকের মধ্যে তোলপাড় তোলা কালো,
গানের কোকিল তুমি—
আমার ভোরের মুনিয়া পাখি,
বুকের মধ্যে রাখি—শব্দের সাথে মাখামাখি;
বসন্তে না এসে কেন শ্রাবণে কাঁদাও!
চিবুক-তরী ভাসাও—
সান্ধ্যপ্রদীপ নও তুমি লজ্জাবতী!
শব্দের ভিতর থেকে ডুকরে ওঠো নিধুয়া পাথার,
আমি জেগে দেখি—সে আর কেউ নয়,
শোভনা নামের চিরচেনা ডাহুকী আমার!
প্রার্থনায় নতজানু হই আপ্রাণ—
রাতের অন্ধকারের চেয়েও গভীর—
কালোজামার পাখি,
কোকিলকণ্ঠী তাও—এর বেশি আর চাও কী?
বানভাসি হাওরের আসমানী জীবনের গান;
আকাশপ্রদীপ নও তুমি কলাবতী!
শব্দের ভিতর থেকে ডেকে ওঠা ময়ূরী,
আমি জেগে দেখি—সে আর কেউ নয়,
আমার চিরচেনা ডাহুকী—
রাতের অন্ধকারের চেয়েও কালোজামার পাখি,
কোকিলকণ্ঠী তাও—এর বেশি আর চাও কী?
বানভাসি হাওরের শুদ্ধতমা কেতকী;
তুমি একটা মধুবন্তী পাখি,
গান গাও, ঘুম ভেঙে জেগে দাও,
বুকের মধ্যে তোলপাড় তোলা একটা সমুদ্র।
শোভনার চোখে শ্রাবণের বৃষ্টি
তুমি আমার হয়ে থেকো,
প্রথম দেখার মতো—
ধূলিধূসর পৃথিবীর ম্লানিমা-বিধুর,
অথবা আলোফোটা জ্যোৎস্নার ভিতর;
নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও—
স্বার্থের রথচক্র—মোহ আর মায়া,
ছায়াহীন রৌদ্রতপ্ত প্রশান্তি-পুকুর,
উপুড় হয়ে ঘোরলাগা মানুষের জীবন,
চোখের চাহনিতে দিগন্ত বরাবর—
মোমের আলোয় ঋতুবতীর পায়ের নূপুর;
গালিবের গজলের কায়ায়—
মেঘের ঘাগড়া তুলে ধরা দাও যদি,
তোমার পায়ে আমার শুধুই মিনতি—
প্রণোদিত বর্ষার বিদায় প্রায়—
শূন্য থালায় ধানের চারা রুয়ে দিতে এসো,
দিনশেষে আরেকবার বোসো আমার পাশে—
শাশ্বত বাংলার চিরন্তনী নারী,
শুক আর সারিরা যুগলবন্দী বাজাক ঘুঙুর;
তুমি আজ দূরে—
সুদূর—কতদূর জানা নাই!
আকাশের ওপারে নাগালের বাইরের কেউ,
দূরত্ব দিয়ে মাপি না দেহের ঠিকানা,
আলিঙ্গনের চেয়েও আপন—
আমার কবিতার তুমি ভিন গাঁয়ের শোভনা;
নিরঞ্জনের কড়চা
চৌরাস্তার মোড়ে নিরঞ্জন আমার জন্য দাঁড়ায়,
দাঁড়িয়ে থাকবে হাড্ডিসার সময়ের হাতঘড়ি,
শেভনা—ওই পারের তুমি, এই পারের আমি,
অনন্ত লোকোযাত্রার পথিক অসিত, আরও অনেকেই;
দ্বিখণ্ডিত কাঁটাতারের ওপারের রথীন,
দেশভাগের ব্যবধানের বিস্তর বিদীর্ণ পথ,
ভাগ্যবিড়ম্বিত শারীরিক দূরত্বের চেয়েও বহুদূর,
মনের অজান্তেই ভেসে ওঠে হারানো শৈশব— নারায়ণগঞ্জ-রায়গঞ্জ-কালিয়াগঞ্জ-শেরপুর;
ক্লান্ত মনে আমার ফিরে আসার পথ দীর্ঘ হয়,
কল্পনা নয়! জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং,
বাড়বাড়ন্ত সময়ের কামাল উদ্দিন হলের ৪৪২,
বেলা শেষে হিলিতে বিরতির পর রথীন কেঁদে দেয়—
দ্বিখণ্ডিত অনড় পাথর পায়ে আমরও চোখভরা জল,
পদ্মার স্রোত উত্তাল—ফারাক্কার মরণ বাঁধের উপর বাড়ি দেয়,
মাথার খুলি খুবলে খায় আমার মরুময় পদ্মার বালুচর;
হিলি, বালুরঘাট, কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ,
পশ্চিম বাংলার রেলপথ সুদীর্ঘ হয়—
রথীনের বাঁশির সুরে দুলে ওঠে সুবোধের ভস্তার বিল,
ব্যবধান ঘুৃঁচে নেচে ওঠে আমার জন্মভিটা ফুলবাড়ি—
রথীন আর সুকুমারের সবুজ-শ্যামল প্রিয় গ্রাম হুসনাবাদ;
করতোয়ার পাড় ধরে গলাগলি হেঁটে যাই,
রানুদের বাড়ি—ঘোষপাড়া-দত্তপাড়া-সান্ন্যালপাড়া—
দিনমান নির্বিকার পথ চলি আমি আর রথীন,
চেয়ে দেখি শেরপুর শ্মশানের এপারের ঈদগাঁ উধাও,
ঘুমের ঘোরে অজানায় জেগে উঠি অকস্মাৎ,
রথীনের বারান্দায় কালিয়াগঞ্জের শ্রীমতি নদীর পাড়,
শ্মশানের বটতলার চিতায় শান বাঁধানো ঘাট—
চিরচেনা শেরপুর শ্মশানের পাকুড় তলায় বাঁশি বাজায় রথীন;
চিঠি
শরতের চিঠির উত্তর বর্ষায় আসে,
যদিও এলো—
শোভনা, তবুও চোখের জলে পদ্ম ভাসে—
আসা-যাওয়ার চার বছর—বড়ই আপেক্ষিক সময়;
দেহের ঘড়িতে নয়—
মনের ভিতর তোলপাড় জাগাও,
শারদীয় কাশের বনে শুভ্র আঁচল ওড়াও;
একটা কবিতা লিখবো—
ভাবছি দীর্ঘ চার বছর পর,
শরতের সৌরভে তোমাকে পেলাম—
খররোদে জাফলং-পিয়াইনের পাথুরে প্লাবন,
দীঘল পায়ের ওপারে সবুজ পাহাড়ের হাতছানি—
কালিদাস্য বেদনার নীল ময়ূরী তুমি—
গোয়ালিনী বৃন্দাবনী তোমার প্রতীক্ষার পথ;
তোমাকে পাই আর না পাই,
পালাবার কোনো পথ জানা নাই—
বহুপ্রজ কোলকাতা, পাহাড়ি ডিব্রুগড়-শিলং,
চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিস্নাতা বুকের আগুন আমার,
অনাঘ্রাতা সোনালি শস্যের ক্ষেত—
ধানীমরিচ মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর-বরিশাল;
পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-ধলেশ্বরীর বুকফাটা আর্তনাদ,
ধানসিঁড়ির ওপারের ছনে-ছাওয়া ঘর,
ফসলী জমিনের মালিকানা নয়—
চাই তোমার প্রতীক্ষার শেষ প্রহরের চুম্বন;
