ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং ‘বর্ণপরিচয়’

ভারতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার ধারায় ব্রিটিশ শাসনামলে ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিক শিক্ষার সূচনা ঘটে। পাশ্চাত্য চিন্তার প্রভাবে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলেও মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ছিল সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বাংলা ভাষা, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য মহীরুহ।

১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে তাঁর জন্ম। আজও তিনি স্মরণীয় তাঁর অসামান্য প্রজ্ঞা, মানবিকতা এবং যুগান্তকারী কর্মের জন্য। তাঁর বহু কীর্তির মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও অবিনশ্বর সৃষ্টি হলো ‘বর্ণপরিচয়’। ১৮৫১ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থ শুধু একটি শিশুপাঠ্য বই নয়; এটি বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর।

বর্ণপরিচয় প্রকাশের আগে বাংলা ভাষায় শিশুদের জন্য কোনো আদর্শ ও সুসংগঠিত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক ছিল না। ১৮৫১ সালের (১২৫৮ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ) এই গ্রন্থ প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মাত্র ২০ বছরের মধ্যে এর ৬০তম সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া সেই জনপ্রিয়তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। আজ শিশুদের জন্য অসংখ্য বই রচিত হলেও বর্ণপরিচয়-এর আবেদন, মর্যাদা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব এতটুকুও কমেনি।

এই গ্রন্থের সবচেয়ে বড় অবদান বাংলা বর্ণমালার একটি প্রমিত রূপ প্রতিষ্ঠা করা। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ছাপাখানার প্রচলন না থাকায় সমস্ত গ্রন্থ হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিতে সংরক্ষিত হতো। ফলে অঞ্চলভেদে একই বর্ণের একাধিক রূপ প্রচলিত ছিল। কোনো কোনো বর্ণের ১৫ থেকে ২০টি, এমনকি ৩০টিরও বেশি ভিন্ন রূপ পাণ্ডুলিপিতে দেখা যেত। এই বৈচিত্র্যের কারণে শিক্ষা, মুদ্রণ ও ভাষাচর্চায় একধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল।

এমন পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট, প্রমিত ও স্থায়ী বর্ণরূপ নির্ধারণ করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ কাজ। এর আগে ১৭৯৯ সালে পঞ্চানন কর্মকার শ্রীরামপুর মিশনের প্রেসে কাঠ ও ধাতুর ছাঁচে বাংলা মুদ্রণাক্ষর নির্মাণের মাধ্যমে একটি শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালাকে সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপ দেন।

তিনি দীর্ঘ ঋ-কার ও দীর্ঘ ৠ-কার বর্জন করেন, অনুস্বর ও বিসর্গকে ব্যঞ্জনবর্ণের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং চন্দ্রবিন্দুকে স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। পাশাপাশি ড, ঢ ও য়-এর সঠিক ব্যবহার এবং খণ্ড-ত-এর প্রয়োগও নির্ধারণ করেন। তাঁর এই সংস্কার বাংলা ভাষাকে আরও সহজ, বিজ্ঞানসম্মত এবং শিক্ষাবান্ধব করে তোলে। আজ আমরা যে প্রমিত বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করি, তার পেছনে বিদ্যাসাগরের অবদান অনস্বীকার্য।

তবে বর্ণপরিচয়-এর গুরুত্ব কেবল ভাষা-সংস্কারেই সীমাবদ্ধ নয়। এই গ্রন্থ শিশুদের নৈতিক শিক্ষা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। সহজ ভাষা ও ছোট ছোট পাঠের মাধ্যমে সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা, ভদ্রতা, অধ্যবসায় ও মানবিকতার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। শিশুদের মিথ্যা না বলা, ঝগড়া-বিবাদ ও গালিগালাজ থেকে বিরত থাকা, ঘরে উৎপাত না করা এবং নিয়মিত পড়াশোনা করার মতো মূল্যবোধ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বইটির ১৯তম ও ২০তম পাঠে অঙ্কিত ‘গোপাল’ ও ‘রাখাল’ চরিত্র। গোপাল সুবোধ, ভদ্র ও অনুকরণীয় বালকের প্রতীক। অন্যদিকে রাখাল চঞ্চল, দুরন্ত ও অমনোযোগী শিশুর প্রতিনিধি। এই দুই চরিত্র বাংলা সাহিত্যে চিরকালীন স্থান করে নিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর চারিত্রপূজা গ্রন্থের ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ প্রবন্ধে রাখাল চরিত্রটির ভিন্ন তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সমাজের অগ্রগতির জন্য শুধু শান্ত ও সুবোধ মানুষের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সাহসী, স্বাধীনচেতা এবং প্রচলিত নিয়মকে প্রশ্ন করার মানসিকতাসম্পন্ন মানুষেরও। সেই প্রাণশক্তিই জাতিকে নতুন পথের সন্ধান দেয়। বিদ্যাসাগরের মধ্যেও এমন এক দুর্বার সাহস ও স্বাধীনচেতা মন ছিল বলেই তিনি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পেরেছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে বাঙালি জাতি চিরঋণী। তিনি শুধু আমাদের বর্ণমালাকে সুসংগঠিত করেননি; মাতৃভাষাকে সহজ, প্রমিত ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপও দিয়েছেন। তাঁর হাতে বাংলা ভাষা পেয়েছে দৃঢ় ভিত্তি, আর বাঙালির প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছে একটি সুসংহত কাঠামো। তাই ‘বর্ণপরিচয়’ কেবল একটি পাঠ্যবই নয়; এটি বাংলা ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

আজ বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। স্মরণ করি তাঁর অমর সৃষ্টি ‘বর্ণপরিচয়’-কে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জ্ঞানের প্রথম আলোর সন্ধান দিয়েছে। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসা এবং আজীবন সাধনা আমাদের ভাষাকে দিয়েছে মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও শক্ত ভিত। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালা বেঁচে থাকবে, ততদিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং তাঁর অমর সৃষ্টি ‘বর্ণপরিচয়’ বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন