আন্তন চেখভের সাহিত্যজীবন ও `শ্রেষ্ঠ প্রেমের গল্প’ বইয়ের আলাপ

আন্তন পাভলোভিচ চেখভ (ইংরেজি: Anton Chekhov /২৯ জানুয়ারি ১৮৬০ – ১৫ জুলাই ১৯০৪) ছিলেন একজন রুশ চিকিৎসক, নাট্যকার ও ছোটগল্পকার। তাকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা ছোটগল্পকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ছোটগল্পগুলো লেখক, সমালোচক সমাজে প্রভূত সমাদর অর্জন করেছে। নাট্যকার হিসেবে পেশাজীবনে চেখভ চারটি ক্ল্যাসিক রচনা করেছেন। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে এমন নাট্যকারদের মাঝে শেকসপিয়ার ও ইবসেনের পাশাপাশি চেখভের নামও উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মঞ্চনাটকে প্রাক-আধুনিকতার উদ্ভবে অন্যতম তিনজন ব্যক্তিত্বের মধ্যে ইবসেন ও অগুস্ত স্ত্রিন্দবারির পাশাপাশি তার নাম উল্লেখ করা হয়।

শুরুতে চেখভের লেখক হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। প্রথমদিকের গল্পগুলো তিনি লিখেছিলেন জীবনযাপন ও পড়ালেখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগাড় করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু পরে তার মধ্যে শিল্পীসুলভ উচ্চাকাঙ্ক্ষা জন্ম নিলে ক্রমে তিনি সাহিত্যচর্চার ভিন্ন রীতি ও প্রবণতার উদ্ভাবন করেন যা আধুনিক ছোটগল্পের বিকাশে বিশেষ প্রভাব রাখে। চেখভের মৌলিকতা নিহিত আছে সাহিত্যচর্চায় তার স্ট্রিম অভ কনশাসনেস (কোনো ব্যক্তির বিরতিহীন চৈতন্যপ্রসূত অভিজ্ঞতা) আঙ্গিক ব্যবহারে, যা পরে গ্রহণ করেছিলেন জেমস জয়েস ও অন্যান্য আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিকরা, এবং সনাতন গল্পকাঠামোর নীতিঘটিত পরম অবস্থানকে অস্বীকারের মাঝে। তার মতে, একজন শিল্পীর ভূমিকা হলো প্রশ্নকারীর, প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায়িত্ব নেই তার।

চেখভ তার সাহিত্যিক জীবনের বেশিরভাগ সময়ে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, যদিও এ থেকে তিনি সামান্যই উপার্জন করতেন। তিনি অধিকাংশ রোগীর চিকিৎসা করতেন বিনামূল্যে। তাই জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আসতো তার লেখালেখি থেকে।

এর অনেক আগে থেকেই চেখভ সাধারণ মানুষের কাছে যেমন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন, জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তেমনি বিখ্যাত সাহিত্যিকদেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন তার লেখার সাহিত্যগুণের জন্য।

চৌষট্টি বছর বয়স্ক নামকরা প্রবীণ রুশ লেখক দিমিত্রি গ্রিগোভিচ চেখভের ছোটগল্প দ্য হান্টসম্যান পড়ে চেখভকে লিখেছিলেন, `তোমার সত্যিকারের প্রতিভা আছে- এমন এক প্রতিভা, যা তোমাকে নতুন প্রজন্মের লেখকদের সামনের সারিতে জায়গা করে দিতে পারবে।’
তিনি চেখভকে লেখালেখির পরিমাণ কমিয়ে লেখার সাহিত্যমানের প্রতি মনোযোগ দেয়ার উপদেশ দেন।

দিমিত্রি গ্রিগোভিচের চিঠির প্রতুত্তরে চেখভ লিখেছিলেন যে এ চিঠি তাকে আঘাত করেছে যেন বজ্রপাতের মতো এবং স্বীকার করেছেন, “আমি আমার গল্পগুলো লিখেছি এমন ভাবে, যেমন করে প্রতিবেদকরা কোথাও আগুন লাগলে তার বিবরণ লিখেন- যান্ত্রিক, অর্ধ-সচেতন এবং পাঠক ও আমার নিজের কোনো কিছুর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে।”

এই স্বীকারোক্তি হয়তো চেখভের জন্য ক্ষতিকর ছিল, কারণ তার পূর্ববর্তী পাণ্ডুলিপিগুলো এটাই প্রকাশ করে যে তিনি বেশিরভাগ সময়েই লিখেছেন অত্যন্ত যত্নের সাথে, লেখার পরিমার্জনা করেছেন বারবার।

তথাপি গ্রিগোভিচের উপদেশ ছাব্বিশ বছর বয়সের তরুণ চেখভকে আরো গভীর, শৈল্পিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৮৮৭ সালে গ্রিগোভিচের গোপন প্রভাবের সামান্য প্রয়োগে চেখভের ছোটগল্প সংকলন অ্যাট ডাস্ক বহু আকাঙ্ক্ষিত পুশকিন পুরস্কার জিতে নেয় “সর্বোৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মের জন্য, যা উচ্চ শৈল্পিক মূল্যগুণে স্বতন্ত্র।”

ক্লাইম্যাক্সবিহীন গল্প লেখায় সিদ্ধহস্ত চেখভ। নিস্তরঙ্গ, কিন্তু একইসাথে প্রচণ্ড বাস্তবমুখী সমস্যার গল্প। বস্তুত আমাদের জীবনে ক্লাইম্যাক্স আর কতখানিই বা আছে? বেশিরভাগ ঘটনাই তো সাদামাটা, বিশেষত্বহীন। চেখভের মুন্সিয়ানা হচ্ছে এই সাদামাটা, বিশেষত্বহীন জীবনকেই ছোটগল্পে স্থান দেওয়া। কোনো ক্লাইম্যাক্স ছাড়াই সার্থক ছোটগল্প। অবশ্য এর ব্যত্যয়ও দেখা যায়। কিন্তু চেখভের ক্লাইম্যাক্স তার গল্পের মতোই জীবনমুখী ও স্বাভাবিক। পড়ে চমক লাগে না, অথচ গল্পটিও অসাধারণ থাকে।

আরেকটি অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য আছে চেখভএর, যা তাকে খোদ তলস্তয়ের কাছ থেকেও অকৃপণ প্রশংসা এনে দিয়েছে। চেখভের চরিত্রগুলো নিজেই গল্প বলে। লেখকের উপস্থিতি ঢাকা পড়ে চরিত্রগুলোর নিখুঁত জীবন্ত আচরণে। চেখভের বিখ্যাত ছোটগল্পগুলো পড়লে মনে হয়, চরিত্রগুলো জীবন্ত, সেখানে লেখকের কল্পনাশক্তির কোনো ছাপ নেই; বাস্তবে বরং এমনটাই ঘটে থাকে। ব্যক্তি চরিত্র (এক্ষেত্রে লেখক চরিত্র) এর ঊর্ধ্বে উঠে চরিতায়নের এই অস্বাভাবিক ও একইসাথে অসাধারণ কাজটি সুনিপুণভাবে করে দেখিয়েছেন চেখভ।

১৯০৪ সালের মে মাসের মধ্যেই চেখভ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্ষয়রোগ চরম অবস্থায় পৌঁছে যায়। সেই অবস্থার কথা মিখাইল চেখভ এভাবে স্মরণ করেছেন, “যারা তাঁকে দেখতো তাদের প্রত্যেকেই গোপনে ভাবতো যে শেষ সময়ের আর বেশি দেরী নেই, কিন্তু শেষ সময়টা যতই নিকটবর্তী হচ্ছিলো তিনি যেন এটি ততটাই কম হৃদয়ঙ্গম করছিলেন।” চেখভ শেষ বয়সে ১৯০১ সালের ২৫ মে ওলগা নিপারকে বিয়ে করেন। ১৯০৪ সালের ১৫ জুলাই মাত্র ৪৪ বছর বয়সে ক্ষয় রোগেই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

গল্প সূচি :
ভালোবাসা | কুকুরসঙ্গী মহিলা | বউ বিক্রি | শিকারী | আগাফিয়া | সুসাফির | স্ত্রী | আরিয়াদনে | রূপ | ভেরোচকা | দোকানীর বউ | গাংচিল | একজন শিল্পীর কাহিনী | ইয়োনিচ | সম্মোহন | দুটি মর্মান্তিক ঘটনা

আরও পড়ুন