ও হেনরিকে বলা হয় গল্পের প্লটের আবিষ্কারক

বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় অন্যতম সর্বাধিক জনপ্রিয় ও বহুল পঠিত গল্পকার ও হেনরি (O. Henry)। তাঁর আসল নাম উইলিয়াম সিডনি পোর্টার (William Sydney Porter), তবে বিশ্ববাসীর কাছে তিনি তাঁর কালজয়ী এই ছদ্মনামেই চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন; এই নামের আড়ালেই যেন ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর প্রাত্যহিক জীবনের আসল পরিচয়।
১৮৬২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার গ্রিনসবরো শহরে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভাবান কথাশিল্পী ছিলেন এক অনন্যসাধারণ জীবনের অধিকারী।
মাত্র ৪৭ বছর বয়সে, ১৯১০ সালে যক্ষ্মা রোগের সঙ্গে লড়াই করে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চিরবিদায় নেন তিনি।
স্বল্পায়ু জীবনে তিনি ৬০০-র বেশি গল্প রচনা করেছেন। তাঁর এই সুবিশাল গল্পের ভান্ডার থেকেই বাছাই করা কিছু রত্ন নিয়ে সাজানো হয়েছে আলোচ্য গল্পগ্রন্থটি।

ও হেনরিকে বলা হয় গল্পের প্লটের আবিষ্কারক। তাঁর গল্পগুলোর অদ্ভুত ও জাদুকরী পরিবেশের মধ্যে চরিত্রগুলো কেবল জীবন্তই হয়ে ওঠে না, মনে হয় যেন তারা খুশিতে ও বেদনায় সমানভাবে নৃত্য করে চলেছে।

তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাঠকদের নিছক আনন্দ দেওয়া। তাই পাঠকদের মনে কৌতূহল সদা জাগ্রত রাখতে তিনি চরিত্রগুলোর নিজস্ব গতিপ্রকৃতি ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই চমৎকার সব ঘটনার জন্ম দিতেন।

তিনি তাঁর চরিত্রগুলোকে বৈচিত্র্যের সন্ধানী বলে কল্পনা করতেন। চরম দুর্ভাগ্যের মধ্যেও তাঁর চরিত্রগুলো হয়ে উঠত অসম সাহসী; বিত্তবানদের অনুকরণ করতে গিয়ে কখনও কখনও তারা প্রবেশ করত যেন কোনো আরব-উপন্যাসের মায়াবী জগতে।
ও হেনরি চরিত্রের সবিস্তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বা মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করায় খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তিনি তাদের নিছক ব্যক্তি-মানুষ হিশেবেই দেখতে ভালোবাসতেন। তাঁর গল্পের একেকটি চরিত্র যেন আধুনিক ও যান্ত্রিক বিরাট শহরের জীবনধারায় একেকটি বিচ্ছিন্ন কিন্তু জীবন্ত দ্বীপের মতো।

বইটির পাতার পর পাতা ছড়িয়ে আছে জীবনের গভীর উপলব্ধি, প্রেম, কৌতুক এবং বিশ্বজনীনতার বাণী। নিচে এর কিছু বিশেষ অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো:

‘মেয়েটাকে আমার পেতেই হবে বাবা, নইলে চিরদিনের জন্য আমার দুনিয়া আঁধার হয়ে যাবে।’ (পৃষ্ঠা-৩৭)

‘টাকা দিয়ে এক মিনিট সময়ও কেনা যায় না। তা যদি যেত, তবে ধনীলোকেরা অনেক বেশিদিন বাঁচতে পারত।’ (পৃষ্ঠা-৩৭)

কারো পরিচয় বা ঠিকানা দিয়ে তাকে বিচার করার সংকীর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে ও হেনরির একটি দারুণ ভাবনা উঠে এসেছে বইটিতে:

‘মাফ করবেন, এ-ধরনের প্রশ্ন কেউ কাউকে করে, এটা আমি পছন্দ করি না। কোনখানে তার বাড়ির সে কথা শুনে কী লাভ? কারু ঠিকানা শুনে তাকে বিচার করাটা কি ন্যায় সঙ্গত? জীবনে কত রকমের লোক দেখেছি। কেনন্টাকিয়ানরা হুইস্কি ঘৃণা করে, ইন্ডিয়ানার কেউ একজনও উপন্যাস লেখেনি, রুপোর টানা-সেলাই-করা ট্রাউজার পরে না কোনো মেক্সিকান—কত বিচিত্র মানুষ। হাস্যকর ইংরেজ, অমিতব্যয়ী ইয়াংকি, খুনে দক্ষিণে লোক, ক্ষুদ্রমনা পশ্চিমবাসী— এমনি কত বিচিত্র এরা। এই ধরুন-না নিউইয়র্কের লোক—এত ব্যস্ত যে এক মিনিটও রাস্তায় দাঁড়াতে চায় না। এমনি কত। মানুষ মানুষই। তাকে কোনো অঞ্চলের লেবেল এঁটে খাটো করে দেখা অন্যায়।”

“পৃথিবীটা বড্ড ছোট বুঝলেন? এখানে কে কোন দেশের লোক, কোন শহরের নাগরিক, কী তার ঠিকানা, এসব জিজ্ঞেস করার কি মানে হয়? আমাদের এই ক্ষুদ্রমনা ভাবনা কাটাতে পারলে পৃথিবীর কোনো উন্নতি নেই।’

‘আমরা সবাই ভাই ভাই। চীনে, ইংরেজ, জুলু পাটাগোনিয়ান, সকলেই ভাই। এমন দিন আসবে যেদিন পৃথিবীর সমস্ত রাজত্ব এক হয়ে যাবে, আমরা সবাই এক পৃথিবীর নাগরিক বলে পরিচিত হব। আর সেটাই কাম্য।’

‘কোনো বিশেষ শহর নয়, সম্পূর্ণ পৃথিবী, গোল, উত্তর-দক্ষিণে কমলালেবুর মতো চাপা, এই গ্রহই আমার বাসস্থান।’ (পৃষ্ঠা-৪২, ৪৩)

প্রেমের ক্ষেত্রে সরলতা ও আকুলতার চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে পরবর্তী পংক্তিগুলোতে:

‘এমন কোনো ওষুধ নেই, মানে এমন কোনো গুঁড়ো যা কোনো মেয়েকে খাওয়াতে পারলে তার ভালোবাসা আরও বেশি করে আকর্ষণ করা যায়?’ (পৃষ্ঠা-৭৯)

‘মনে-মনে নিজেকে বললাম— দেখো, তুমি যদি মেয়েটাকে পেতে চাও, সোজাসুজিই পেতে চেষ্টা কর। ওর মতো মেয়ের সাথে কোনো ছলের আশ্রয় নিও না।’ (পৃষ্ঠা-৮০)

এই গল্পগ্রন্থে ঠাঁই পাওয়া চমৎকার গল্পগুলোর তালিকা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:

উপহার
সুর ও বেসুর
শেষপাতা
বিশ বছর পর
প্রেম, ঘড়ি ও খলিফা
সাজানো ঘর
কুবের ও ফুলসর
বিশ্বনাগরিক
প্রথম প্রেম
প্রকৃতির বিধান
জাত শহুরে
দালালের প্রেম
একটি অসমাপ্ত কাহিনী
সবুজ দরোজা
প্রেমের পূজায়
গরম অমিয় ভেল

কৈফিয়ত: আমি বইয়ের রিভিউ নয় বইয়ের খোঁজ দিতে চেয়েছি, যাতে পাঠক কিছু ভালো লেখক ও তাঁদের বইয়ের নাম জানতে পারে, বই কিনতে পারে, বই পড়তে পারে।

আরও পড়ুন