বাংলা কবিতায় শক্তির অবস্থান ও জীবনানন্দ

আধুনিক বাংলা কবিতায় শক্তির অনন্য অবস্থান ও ভূমিকা
আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এক উজ্জ্বল ও বহুমুখী প্রতিভা। তাঁর কাব্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর হাত ধরে, এবং ষাটের দশকের শুরুতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘হাংরি আন্দোলন’ (Hungryalist Movement)-এর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ও তাত্ত্বিক রূপকার। ১৯৬১ সালের ১ নভেম্বর পাটনা ও হাওড়া থেকে মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের যৌথ উদ্যোগে ‘হাংরি আন্দোলন’ বা ‘হাংরি জেনারেশন’ আত্মপ্রকাশ করে। জিওফ্রে চসারের ‘In sowre hungry tyme’ বাক্যটি থেকে ‘হাংরি’ শব্দটি নিতেন মলয় রায়চৌধুরী। অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘The Decline of the West’ গ্রন্থের পচনশীল সভ্যতার তত্ত্বকে ভিত্তি করে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে। দেশভাগ পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের ভেঙে পড়া অর্থনীতি, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক disillusionment বা মোহভঙ্গ এবং মধ্যবিত্তের কৃত্রিম complacent বা সন্তুষ্ট জীবনযাত্রার বিরুদ্ধে এটি ছিল এক তীব্র চপেটাঘাত। এই আন্দোলনের সূচনালগ্নে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আন্দোলনটির পোয়েটিক লিডার বা কাব্যিক নেতৃত্ব প্রদান করা হয়েছিল। সে সময় প্রকাশিত বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা একপাতার বুলেটিনের সামনের সারিতে তাঁর নাম ও উপস্থিতি আন্দোলনকে গতিশীল করেছিল। যদিও মতাদর্শগত বা ব্যক্তিগত কারণে ১৯৬৪ সালের মধ্যেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং কৃত্তিবাসের অন্যান্য কবিরা হাংরি আন্দোলন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন।
হাংরি আন্দোলনের মূল মন্ত্রই ছিল প্রচলিত রীতিনীতি, ব্যাকরণগত শৈলী, ভব্যতা এবং ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের নৈরাজ্যবাদী ও অস্তিত্ববাদী বিদ্রোহ। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রাক-৬৪ পর্বের কবিতায় এই বিদ্রোহী চেতনা অত্যন্ত শাণিত রূপ লাভ করেছিল:
established নন্দনতত্ত্বের ভাঙন: হাংরি কবিরা চেয়েছিলেন পদ্য লেখার প্রথাগত ছক ও ছান্দসিক ভদ্রতা ভেঙে চুরমার করে দিতে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় নাগরিক বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং আদিম অস্তিত্বের ক্ষুধাকে এমন একরৈখিক ভাষার বাইরে নিয়ে আসেন, যা ছিল সেকালের পাঠকদের কাছে সম্পূর্ণ অভিনব।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অসন্তোষ: হাংরি আন্দোলনের ইস্তাহারগুলোতে সমাজের তথাকথিত শ্লীলতা, ভদ্রতার মুখোশ খুলে দেওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছিল। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় সেই সময়ে যে ক্ষোভ ও অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে ওঠে, তা মূলত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের প্রতি এক গভীর অনাস্থা এবং দ্রোহের প্রকাশ।
শরীরের ও অবচেতনের মুক্তি: হাংরি আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কবিতায় অবদমিত কামড়, ক্ষুধা এবং জৈবিক সত্তার উন্মুক্ত প্রকাশ। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় রোমান্টিক মায়াবী সুরের পাশাপাশি এই বিদ্রোহী ও খ্যাপাটে অবয়বটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল, যা তাঁকে অন্যান্য সমসাময়িক কবিদের থেকে আলাদা করেছিল।
হাংরি আন্দোলন থেকে সরে আসার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায় উগ্র বা ধ্বংসাত্মক হাংরি স্লোগানধর্মী কবিতা থেকে দূরে সরে আসেন এবং বাংলা ভাষার শেকড়সন্ধানী, নিসর্গপ্রবণ ও গভীর অন্তর্মুখী এক স্বতন্ত্র কাব্যশৈলী গড়ে তোলেন। তাঁর পরবর্তীকালের কাব্যগ্রন্থ যেমন— ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’, ‘ধরমতলার ষাঁড়’, বা ‘চতুরঙ্গ’-এ সেই বিদ্রোহী চেতনা রূপান্তরিত হয় জীবনবোধ, নিঃসঙ্গতা এবং প্রকৃতির অপার রহস্যের এক শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ উপলব্ধিতে।
আধুনিক বাংলা কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থান অত্যন্ত উঁচুতে। হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক যুক্ততা ছিল উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলার স্থবির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসিক ও তারুণ্যদীপ্ত দ্রোহ। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ভেঙে কবিতাকে রক্তমাংসের কাঁচা জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে হাংরি আন্দোলনকর্মী শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অবদান বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
প্রেম, মদ্যপান ও অবিনাশী বিষাদ
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান পুরোহিত শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যচেতনাকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে হলে যে তিনটি মূল স্তম্ভ অপরিহার্য—তার মধ্যে প্রেম, মদ্যপান ও অবিনাশী বিষাদ হলো তাঁর জীবনদর্শন ও সৃষ্টিশীলতার চালিকাশক্তি। হাংরি আন্দোলনের উন্মত্ত দ্রোহ, কৃত্তিবাসী আধুনিকতা এবং পরবর্তীতে উত্তর-ষাট বা সত্তরের দশকের শান্ত অথচ গভীর অন্তর্মুখী যাত্রার ভেতর এই তিনটি উপাদান ওতপ্রোতভাবে মিশে রয়েছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় প্রেম কোনো গতানুগতিক রোমান্টিকতা বা বয়বীয় কল্পনা নয়; বরং তা রক্তমাংসের মানুষ, নৈকট্যের আকুতি এবং চিরন্তন একাকিত্বের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মাধ্যম। তাঁর কবিতায় প্রেম যেমন নারী ও পুরুষের চিরায়ত আকর্ষণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই তা পরিব্যাপ্ত হয়েছে নিসর্গ, নদী, মাঠ ও বৃক্ষরাজির প্রতি গভীর মায়ায়। ‘অবনী বাড়ি আছো?’ তাঁর এই বিশ্বখ্যাত পঙক্তিটি কেবল একটি ঘরের দরজা খোলার ডাক নয়, এটি মূলত মানুষের বিচ্ছিন্নতার যুগে একটি প্রিয় মুখ ও সম্পর্কের জন্য অন্তহীন প্রতীক্ষার আকুলতা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে প্রেম একাধারে আশ্রয় এবং এক চিরকালীন আশ্রয়হীনতার নাম।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জীবন এবং কাব্যপটে মদ্যপান এক গভীর রূপক ও অভিশাপ হয়ে একসঙ্গে উপস্থিত ছিল। মদ্যপানকে তিনি কেবল নেশা হিসেবে নেননি; এটি ছিল তাঁর কাছে মধ্যবিত্তের কৃত্রিম ভব্যতা, সমাজতান্ত্রিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে এক ধরনের নিঃশব্দ অবাধ্যতা। চারপাশের অবক্ষয় ও যন্ত্রণাকে অস্বীকার করতে তিনি যেন স্বেচ্ছায় এক আত্মধ্বংসী পথে হেঁটেছিলেন। তাঁর অনেক কবিতায় মদের পেয়ালা, বার বা মাতালের রাত্রিযাপনের উল্লেখ সোজাসাপ্টা কোনো বোহেমিয়ান বা লম্পট জীবনযাপনের বয়ান নয়; বরং তা হলো এক নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনের গভীর রিক্ততা এবং নিয়তির সঙ্গে আপস না করার এক অদ্ভুত জেদ।
প্রেম এবং মদ্যপানের তীব্র আলোড়নের পেছনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সমগ্র সৃষ্টিজুড়ে যে সুরটি সবচেয়ে বেশি বেজে চলে, তা হলো এক অবিনাশী বিষাদ (Inexorable Melancholy)। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মূলত একজন চিরপথিক, যাঁর কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। তাঁর এই অবিনাশী বিষাদ এসেছে জীবনকে খুব কাছ থেকে চেনার ফলে এবং সম্পর্কের ভঙ্গুরতা অনুধাবন করার মধ্য থেকে। তাঁর শেষ জীবনের কবিতাগুলোতে এই বিষাদ আরও ঘনীভূত হয়েছে। জীবন নদীর মতো বয়ে চলে, আর কবি তার তীরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করেন মানুষের তুচ্ছতা ও মহাকালীন নিরবতা। এই বিষাদ কোনো হতাশাগ্রস্ত বা পলায়নপর বিষাদ নয়, বরং জীবনের সমস্ত আনন্দ ও বেদনার সুষম সারসংকলন—যা কবির কন্ঠকে ঋদ্ধ ও প্রজ্ঞাবান করে তুলেছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় প্রেম ছিল বাঁচার একমাত্র অবলম্বন, মদ্যপান ছিল সেই বাঁচার তীব্রতাকে টিকিয়ে রাখার বা পুড়িয়ে ফেলার এক দাহ্য মাধ্যম, আর এই দুয়ের মিশ্রণে জন্ম নেওয়া অবিনাশী বিষাদই তাঁর কবিতাকে দিয়েছে ধ্রুপদী মহিমা। তিনি ছিলেন একাধারে ভবঘুরে এবং বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ পঙক্তিগুলোর স্রষ্টা, যাঁর জীবন ও কবিতা মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
সহজ ভাষায় গভীর জীবনদর্শন
শক্তির কবিতার সবচেয়ে বড় মুন্সিয়ানা হলো, তিনি কখনোই দুর্বোধ্য বা ভারিক্কি তাত্ত্বিক শব্দজালের আড়ালে নিজের কাব্যভাবনা লুকিয়ে রাখেননি। তাঁর শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত সহজ, কথ্য ভাষার খুব কাছাকাছি এবং ঋজু। কিন্তু সেই আপাত-সহজ বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকত মানবজীবনের গভীরতম অস্তিত্ববাদী সংকট, একাকিত্ব ও দর্শন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় জীবনকে বইয়ের পাতা থেকে নয়, বরং সরাসরি যাপন করেছিলেন—রাস্তার ধারের আড্ডা, বোহেমিয়ান ঘোরাঘুরি, মদের পেয়ালা এবং চারপাশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ থেকে। ফলে তাঁর উপলব্ধিগুলো কোনো কৃত্রিম ফিলোসফি ছিল না, ছিল রক্তমাংসের অভিজ্ঞতা।
তিনি খুব সাধারণ শব্দ দিয়ে এমন এক দার্শনিক আবহ তৈরি করতেন যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করত। যেমন তাঁর সেই বিখ্যাত উচ্চারণ— ”অবনী বাড়ি আছো?” মাত্র এই তিনটি সাধারণ শব্দ। কোনো জটিল রূপক নেই। অথচ এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আধুনিক মানুষের চরম নিঃসঙ্গতা, ঘরে ফেরার আকুলতা এবং সম্পর্কের ফাটল ধরার এক অবিনাশী বেদনা। এটাই শক্তির পঙক্তির আসল মুন্সিয়ানা—যা যত সহজ শোনায়, তার ভেতরকার শূন্যতা ততটাই অতলস্পর্শী।
তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ও মহিমান্বিত
সাধারণত উচ্চমার্গীয় কবিতায় বড় বড় ইতিহাস, মিথ বা মহাজাগতিক বিষয় আশার একটা প্রচলন থাকে। কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঠিক এর উলটো পথে হেঁটেছেন। তাঁর কাছে একটি অবহেলায় ফেলে দেওয়া ঘাস, একটি ক্লান্ত কাক, বা রাস্তার ধারের সাধারণ কুকুরও হয়ে উঠেছে মহাবিশ্বের রহস্য বোঝার চাবিকাঠি। তিনি প্রকৃতির তুচ্ছ উপাদানগুলোকে এমনভাবে দেখতেন যা সচরাচর কারোর চোখে পড়ত না। বাংলার বুনো ফুল, মেঠো পথ, কিংবা সাধারণ এক ফালি রোদ তাঁর কলমে হয়ে উঠত অমূল্য সম্পদ। তিনি যখন লেখেন—
”চতুর্দিকে জড়িয়ে রয়েছে গাছপালা, ঘাস, লতা—”
অথবা নিসর্গ নিয়ে তাঁর অন্যসব পঙক্তি, সেখানে তুচ্ছাতিতুচ্ছ নিসর্গ উপাদানগুলোই কবির জীবনের একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে। একটি সাধারণ মরা নদী বা এক টুকরো মেঘ তাঁর কাছে জীবন্ত মানুষের চেয়েও বেশি আপন হয়ে ধরা দেয়। সাধারণ বিষয়কে তিনি তাঁর জাদুকরী ছান্দসিক কৌশলে এমনভাবে মুড়ে দিতেন যে তা মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা লাভ করত। যেমন:
“বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে”
সাধারণভাবে বৃষ্টি একটি ঋতুকেন্দ্রিক বা সাময়িক প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু এই পঙক্তিতে বৃষ্টিকে বর্ষার গণ্ডি পেরিয়ে ‘বারোমাসি’ বা চিরকালীন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি অবিরল, স্নিগ্ধ অথচ মন্থর বিষাদে ঘেরা আবহাওয়া ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা সময়ের ঘড়িকে থামিয়ে দেয়। “এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে”. এটি এই কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও মৌলিক রূপকল্প (Metaphor)। মেঘ সাধারণত আকাশে ভেসে বেড়ায়, যা গতিশীল ও অদৃশ্য এক সত্তা। কিন্তু কবি মেঘকে মাটিতে নামিয়ে এনেছেন এবং তাকে ঘাস বা লতাপাতা খাওয়া শান্ত, ধীরস্থির ‘গাভী’ বা গরুর সঙ্গে তুলনা করেছেন।একটি চরে বেড়ানো গাভী যেমন শান্ত, নির্বিরোধ ও গৃহস্থালির চেনা জীবনের প্রতীক, তেমনি মেঘের চরে বেড়ানোও এক অদ্ভুত গ্রামীণ স্থায়িত্ব ও শান্তি নির্দেশ করে।
মেঘ একটি অমূর্ত বা বায়বীয় বিষয়, আর গাভী অত্যন্ত মূর্ত ও পরিচিত একটি প্রাণী। কবি এই দুইয়ের মধ্যে এক অপূর্ব সখ্য গড়ে তুলেছেন। মেঘ যেন আকাশে বা দিগন্তে আপন মনে চরে বেড়াচ্ছে— এই দৃশ্যকল্প পাঠকের মনে এক শান্ত, স্নিগ্ধ এবং স্নিগ্ধ রূপকথার মতো পরিবেশ তৈরি করে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় একধরনের চিরকালীন নিঃসঙ্গতা এবং আত্মমগ্নতা কাজ করে। “এখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস” বলবার মধ্যে একধরনের অবরুদ্ধ বা দীর্ঘায়িত অপেক্ষার সুর রয়েছে। বাইরের অবিরাম বর্ষণ এবং মেঘের মন্থর চলাফেরা কবির ভেতরের পরিমণ্ডলকেও যেন একাকী ও শান্ত করে তোলে। সাধারণ কয়েকটি শব্দের গাঁথুনিতে নিসর্গের একটি অতি পরিচিত দৃশ্যকে সম্পূর্ণ নতুন ও অলৌকিক মাত্রায় উন্নীত করার জন্যই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই পংক্তি দুটি বাংলা কবিতায় চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
ছান্দসিক হিসেবে তাঁর হাত ছিল অত্যন্ত পাকা। কিন্তু তিনি ছন্দের শাসনকে সবসময় নিজের মনের মতো করে বাঁকিয়ে নিয়েছেন। কথ্য ভাষার লয়ে পদ্য লেখার এই যে জাদুকরী ক্ষমতা, তা বাংলা কবিতায় খুব কম কবিরই ছিল। অদ্ভুত এক আত্মমগ্নতায় নিঃসঙ্গ মানুষের একান্ত উচ্চারণ যেন আপন মনে কথা বলার মতো পাঠকের অন্তরে এসে বাজে। মায়ামোহকে ভেদ করে আত্মবিশ্লেষণ এবং অস্তিত্বের সংকটকে এমনভাবে তিনি প্রকাশ করেন, যা কালপ্রবাহের সীমানা ছাড়িয়ে চিরকালীন আবেদন হয়ে ওঠে । যেমন—
”ভাবছি; ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।
এত কালো মেখেছি দু’হাতে
এত কাল ধরে
কখনো তোমার করে, তোমাকে ভাবিনি।”
জীবনের দীর্ঘ পথ চলায় নিজের অজান্তেই জমতে থাকা গ্লানি, ভুলত্রুটি এবং অহংকারকে তিনি “এত কালো মেখেছি দু’হাতে এত কাল ধরে”—এই রূপকটির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। মানুষ সাধারণত নিজের সুখ ও স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কবিও স্বীকার করেছেন যে তিনি প্রিয়জনকে বা পরম সত্তাকে নিজস্ব করে ভাবতে পারেননি। এই মোহগ্রস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য “ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো”—এই সিদ্ধান্তটি কেবল তাঁর নিজের নয়, বরং এটি জীবনের ভুলত্রুটি বুঝতে পেরে সঠিক পথে ফিরে আসার এক শাশ্বত আবেদন। আর একটি (নীল ভালোবাসায়) কবিতায় লিখেছেন :
”আমি সোনার একটি মাছি খুন করেছি রাতদুপুরে
তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, আঁধার-সমুদ্রে নৌকা
যেমনভাবে বেঁচে ফিরতো— তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম
আমি সোনার একটি মাছি খুন করেছি রাতদুপুরে।”
শক্তির চট্টোপাধ্যায়ের এই পংক্তি দুটির আবেদন মূলত মানুষের চিরন্তন মনস্তত্ত্বে নিহিত। মানুষ মাত্রই ভুল করে, স্বার্থপরতার জালে জড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হয়। কবি এখানে কোনো গুরুগম্ভীর উপদেশ দেননি, বরং নিজের ভেতরের না বলা কথাগুলো অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। যে মায়ামোহের আসক্তিতে তিনি ডুবেছিলেন তা একটি সোনার মাছির প্রতীকেই তুলে ধরেছেন। সোনার মাছি দেখতে যতখানি সুন্দর তাকে খুন করে সেই সৌন্দর্যই নষ্ট করা হয় অর্থাৎ তাকে চরিতার্থ করা যায় না। ব্যক্তিগত জীবনে যে প্রেম অধরা মাধুরীর মধ্যে ছিল সেই প্রেমকে লাভ করার পর তার আর সৌন্দর্য থাকে না। কবি খুব সূক্ষ্ম উপলব্ধির ভেতর তাঁর এই বোধের সঞ্চার ঘটিয়েছেন। চেনা শব্দের মধ্য দিয়েই গভীর এবং চিরকালীন এক উপলব্ধির সততা ফুটে উঠেছে। এই আত্মজিজ্ঞাসা এবং নিখাদ অনুতাপই কবিতা দুটিকে কালজয়ী ও চিরকালীন করে তুলেছে। তাঁর পঙক্তিগুলো পড়ার সময় মনে হয় কবি যেন ঠিক সামনে বসে আপন মনে কথা বলছেন, অথচ সেই কথাগুলোই একেকটি অমোঘ সত্য বা প্রবাদের মতো হয়ে ওঠে।
শক্তির কবিতার প্রধান শক্তি আসলে তাঁর আত্মিক সততা। জীবনের কোনো কিছুকেই তিনি ছোট বা হেয় মনে করেননি। তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর ধূলিকণা কিংবা জীবনের গভীরতম বেদনা—সবকিছুকে তিনি তাঁর জাদুকরী কলমের ছোঁয়ায় অবিনাশী শিল্পে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন।
জীবনানন্দ ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়
জীবনানন্দ দাশ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করতে গেলে প্রথমেই আমরা দেখতে পাই: জীবনানন্দের কবিতার মূল সুর রূপসী বাংলার শাশ্বত রূপ, তীব্র নিঃসঙ্গতা, গভীর ইতিহাসচেতনা এবং এক অন্তর্মুখী প্রজ্ঞা। তিনি কেবল সমকালের কবি ছিলেন না, বরং বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, পুরাণ ও ধুলোবালিকে নিজের রক্তে ধারণ করেছিলেন। তাঁর মধ্যে পৃথিবীর বহু প্রাচীন সভ্যতার এক ক্লান্তি ও ব্যাকুলতা কাজ করত। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ বা ‘রূপসী বাংলা’-র কবিতাগুলোতে এই সুর স্পষ্ট। যেমন— “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,”—এই পঙক্তিতে কেবল ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসচেতনাই মূর্ত হয়ে উঠেছে।
অপরদিকে শক্তির মূল সুর নাগরিক একাকিত্ব, প্রেম, দ্রোহ (হাংরি আন্দোলনের সময়কালীন), এবং বাংলার গ্রামীণ ও মর্ত্যজীবনের ঘ্রাণ। তিনি মূলত বর্তমান মুহূর্তের তীব্রতাকে জ্যান্ত করে তুলতে চেয়েছেন। তাঁর কবিতায় নাগরিক বোধের জটিলতা যেমন আছে, তেমনই শেকড়ের টানে মেঠো পথে ফিরে যাওয়ার আকুলতাও রয়েছে। যেমন, ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ বা ‘চতুরঙ্গ’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ— “অবনী বাড়ি আছো?” নাগরিক বিচ্ছিন্নতা ও ঘর হারানোর গভীর আকুলতার এক অনন্য দলিল। আবার আত্মঅন্বেষণের ভেতরও এই উচ্চারণ নিজ অস্তিত্বেরই জাগরণকে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। ‘অবনী’ আসলে কবির নিজ সত্তা, নিঃসঙ্গতার পর্যায়গুলি অতিক্রম করে তিনি আত্মস্থিত বোধের কাছেই সেই আধ্যাত্মিক লোকের দরজা খুলতে চেয়েছেন।
দুই কবির ভাষা ও শৈলী
জীবনানন্দের ভাষা অত্যন্ত প্রতীকধর্মী, বহুস্তরীয় শব্দচয়ণে সমৃদ্ধ এবং জটিল বাক্যবিন্যাসের জন্য পরিচিত। তিনি এমন সব শব্দ ও চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন যা চট করে সাধারণ পাঠকের কাছে উন্মোচিত হয় না। তাঁর ব্যাকরণ ও বাক্যগঠনে এক নিজস্ব আবহ রয়েছে যা বাংলা কবিতাকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছে। যেমন, ‘শিকার’ কবিতায় তাঁর শৈলীর পরিচয় মেলে:
“সূর্যের আলোয় তার রং কুঙ্কুমের মতো নেই আর;
হ’য়ে গেছে রোগা শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো।
সকালের আলোয় টলমল শিশিরে চারিদিকের বন ও আকাশ ময়ূরের
সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে।”
—এখানে রূপক ও প্রতীকের জাদুকরী বুনন লক্ষ করা যায়। বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতা’ আলোচনায় জীবনানন্দের এই অনন্য শব্দশৈলীর মুন্সিয়ানা তুলে ধরেছেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভাষা আপাত সরল, কথ্যভাষার খুব কাছাকাছি, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে গভীর ব্যঞ্জনা। তিনি জটিল কোনো শব্দজালের আশ্রয় না নিয়েও মুখের বুলিকে কীভাবে কবিতার উঁচুমার্গে নিয়ে যেতে হয়, তা জানতেন। তাঁর পঙক্তিগুলো পড়ার সময় মনে হয় কবি ঠিক সামনে বসে কথা বলছেন। তাঁর কথনভঙ্গির অনন্যতায় পাঠক সহজেই আত্মস্থ করতে পারেন। যেমন:
“অধর্মের কথা আজ ভাবো নাকো তুমি
মানুষ কি কখনো পারে অধর্ম হইতে?
ধর্মেও আছো—জিরাফেও আছো তুমি”
ধর্ম আর জিরাফকে একসঙ্গে মিলিয়ে কবি মানুষের অবস্থানকে কত সহজেই বোঝাতে পেরেছেন। সামগ্রিক বোধের এই সঞ্চরণ থেকেই কবির সহজিয়া ও গভীর জীবনদর্শন, অবচেতন মনের প্রকাশ এবং প্রকৃতি ও মানুষের একাত্মতার এক অপূর্ব নিদর্শন ফুটে উঠেছে। আর একটি কবিতায় বলেছেন :
“এখন আমার কোনো অভিমান নেই।
অভিমান আগে ছিলো, অতল জলের
অভিমান আগে ছিলো, আজ জলওৎ নেই।”
মাটির কলসিতে যতক্ষণ জলভরা থাকে ততক্ষণই তার অভিমান থাকে। স্বপ্নের পূর্ণবতী ইচ্ছেরা অভিমান করতে ভালোবাসে বলেই কলসির গায়ে জলের ফোঁটা ফোঁটা কান্নার রূপ দেখা যায়। ঠিক মানুষের জীবনে যতক্ষণ যৌবন থাকে ততক্ষণই মানুষের মনে রাগ, ক্ষোভ, অভিমান ও প্রত্যাশার পাহাড় জমে থাকে। সে চায় পৃথিবী তাকে বুঝুক, আপনজন তাকে মূল্য দিক। কিন্তু বয়স বাড়লে, জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে করতে এবং দীর্ঘ পথ চলতে চলতে মানুষের ভেতরকার সেই তীব্র আকুলতা বা হাহাকার ফুরিয়ে আসে। সব চাওয়ার হিসাব যখন চুকে যায়, তখন মনে আসে এক অদ্ভুত নির্মোহ শান্তি—যেখানে আর কোনো অভিযোগ থাকে না, থাকে কেবল পরম শূন্যতা ও পূর্ণাঙ্গ মুক্তি। কবি এই সহজ অথচ গভীর দর্শনটি একটি রূপক চিত্রে তুলে ধরেছেন। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত—প্রত্যাশার মোহ, আঘাত পাওয়ার বেদনা পেরিয়ে আত্ম উপলব্ধির যে স্তরে মানুষ পৌঁছায়, এই কবিতাটি তারই নিখুঁত ও কাব্যিক প্রতিচ্ছবি।
সময় চেতনা
সময় নিরীক্ষার ভেতর দুই কবিই পথ হেঁটেছেন। সেখানে প্রকৃতি, মানুষের জীবন, ইতিহাস সবই উঠে এসেছে। মানুষের ভাবনার ভেতরেও এই পরিক্রমা কখনো থেমে থাকেনি। উপলব্ধির এই নিরন্তর রূপচিত্র কাব্যিক প্রতিসাম্যে রূপান্তর ঘটেছে। সবাইকে নিরীক্ষণ করেই জীবনানন্দ দাস একটি কবিতায় লিখেছেন :
“আবার বিকেল বেলা নিভে যায় নদীর খাড়িতে;
একটি কৃষক শুধু খেতের ভিতরে
তার বলদের সাথে সারাদিন কাজ ক’রে গেছে;
শতাব্দী তীক্ষ্ণ হ’য়ে পড়ে।
সমস্ত গাছের দীর্ঘ ছায়া
বাংলার প্রান্তরে পড়েছে;
এ-দিকের দিনমান— এ-যুগের মতো শেষ হ’য়ে গেছে,
না জেনে কৃষক চোত-বোশেখের সন্ধ্যার বিলম্বনে প’ড়ে
চেয়ে দেখে থেমে আছে তবুও বিকাল;
উনিশশো বেয়াল্লিশ ব’লে মনে হয়
তবুও কি উনিশশো বেয়াল্লিশ সাল।”
(খেতে প্রান্তরে)
কবিতার শুরুতেই কবি বাংলার চিরকালীন গ্রামীণ জীবনের এক অপরিবর্তিত রূপ এঁকেছেন—যেখানে নদীর খাড়িতে বিকেল নামে এবং কৃষক সারাদিন বলদ নিয়ে খেটে চলে। এখানে সময় কোনো যান্ত্রিক ঘড়ির কাঁটা নয়, বরং তা প্রকৃতি ও মানুষের শ্রমের সঙ্গে আবর্তিত হয়। যুগ-যুগান্ত ধরে কৃষকের এই অবিরাম পরিশ্রম যেন বাংলার শাশ্বত সত্তারই প্রকাশ। কবিতায় কবি সুনির্দিষ্টভাবে ‘উনিশশো বেয়াল্লিশ সাল’-এর উল্লেখ করেছেন। ১৯৪২ সাল মানেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তৎকালীন ঔপনিবেশিক শোষণ, এবং বাংলার বুকে আসন্ন মন্বন্তর ও সামাজিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। খেটে খাওয়া সাধারণ কৃষক হয়তো জানে না ক্যালেন্ডারের পাতায় কোন সাল চলছে বা বিশ্ব রাজনীতিতে কী ঘটে চলেছে (“না জেনে কৃষক চোত-বোশেখের সন্ধ্যার বিলম্বনে প’ড়ে”), কিন্তু তার যাপিত জীবনের কষ্ট ও থমকে থাকা বিকেলটি সমগ্র মানবজাতির সেই সংকটাপন্ন ঐতিহাসিক সময়কেই প্রতিফলিত করে। একটি বছরের গণ্ডি পেরিয়েও মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তা আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে—এই উপলব্ধিই কবির প্রখর সময়-সচেতনতার পরিচয় দেয়। কবি কেবল প্রকৃতির রূপকার নন, বরং তিনি সময়ের এক গভীর দ্রষ্টা। সাধারণ কৃষকের দৈনিক ক্লান্তি এবং একটি উত্তাল ঐতিহাসিক বছরকে (১৯৪২) এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বহির্জগতের ইতিহাসের প্রভাব অজান্তেই গ্রামীণ মানুষের শাশ্বত জীবনে ছায়া ফেলে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রকৃতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক মগ্ন ও অবিনাশী মিতালিকেই তুলে ধরেন। তাঁর সময় ও প্রকৃতিতে কোনো দূরহ রহস্যবাদ নেই, বরং তা রক্তমাংসের মানুষের সুখ-দুঃখ, রোদ-বৃষ্টি ও মেঠো পথেরই অংশীদার। গাছপালা, নদী, ঘাস—সবকিছুর সঙ্গেই তাঁর এক অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। ’কলকাতায় ভােরে’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন :
“ভােরের ট্রামের মতাে প্রেমের সঞ্চার
মানুষের দেহে-মনে।
শীত সরে গেছে
দক্ষিণে ধানের বােঝা নামিয়ে গােলায়
ট্রাক ছুটে চলে যায় দুঃখভরা খড় নিয়ে শুধু
উত্তরের দিকে
ক্রমাগত।
ধীর আলাে ফুটে ওঠে ফুলের মতন
টবে, বারান্দায়।
কলকাতা-কলুষ মেখে ফুলগুলি তবু ফুটে ওঠে,
ফুটে ওঠে ঝরে যায় এ মুহূর্তে কতশত শিশু….
মনে পড়ে গেলে আর সুন্দর লাগে না
মােহময় লাগে না এ-ভােরবেলা তিক্ত কলকাতার
রাতজাগা শেষ করে মানুষের শ্লথ পায়ে ফেরা
নিজের ঘরের দিকে
কেউ কেউ
ঘর থেকে বাহিরে।
বালকের হাত ধরে বৃদ্ধ যায় বাদাম কুড়ােতে!
বাদামের বুড়াে পাতা ঢুঁড়ে পায় দুচার বাদাম,
তার মধ্যে বাল্যকাল খলসে মাছের মতো নড়ে।
রোদ ওঠে, রোদ উঠে পড়ে,
কাজের কলকাতা তার পােশাক বদলায় ঘরে ঘরে।”
(কাব্যগ্রন্থ ::: ‘ও চিরপ্রণম্য অগ্নি’)
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সময়-চেতনা এক গভীর নগরজীবনের বাস্তবতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। এখানে সময় কেবল নিসর্গ বা ঋতুচক্রের পরিবর্তন নয়, বরং তা মানুষের যাপিত জীবন, ক্লান্তি, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং কলকাতার মতো মহানাগরিক জটিলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। কৃষির শাশ্বত রূপ ও আধুনিক যান্ত্রিক গতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায় পঙক্তিগুলোতে। দক্ষিণে ধানের বোঝা নামিয়ে গোলায় তোলার মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলার গ্রামীণ সময়ের চিরন্তন রূপ এবং অন্যদিকে উত্তরমুখী ট্রাকের ছুটে চলার মধ্য দিয়ে আধুনিক নগরের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক সময়কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কলকাতার কংক্রিটের মাঝে টবের ফুলে ধীর আলো ফোটার চিত্রটি যেমন স্নিগ্ধ, তেমনই তার ঠিক পরেই ‘ফুটে ওঠে ঝরে যায় এ মুহূর্তে কতশত শিশু….’ পঙক্তিটি সময়ের এক নিষ্ঠুর ও নির্মম সত্যকে সামনে আনে। রাতজাগা মানুষের ক্লান্ত পায়ে ঘরের দিকে ফেরা অথবা ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার দৃশ্যটি শহরের ঘড়িধরা কর্মব্যস্ত সময়ের সঙ্গে মানুষের নিঃসঙ্গ ক্লান্তিকে যুক্ত করে। বালকের হাত ধরে বৃদ্ধের বাদাম কুড়ানোর মতো সাধারণ ছবির আড়ালে সময় কীভাবে মানুষের শৈশব ও বার্ধক্যকে এক সুতোয় বাঁধে, তা প্রকাশ পায়। বাদামের বুড়ো পাতার মধ্যে বাল্যকালের স্মৃতির খলসে মাছের মতো নড়ে ওঠার ভাবনায় অতীত ও বর্তমান সময়ের এক সুক্ষ্ম মেলবন্ধন ঘটে। সকালের নরম আলো যখন পূর্ণ রোদে পরিণত হয়, তখন কলকাতা তার রূপ বদলে ফেলে। এটি মূলত আধুনিক মহানগরের ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেঁচে থাকার অবিরাম লড়াই এবং নিত্যদিনের রুটিনবদ্ধ সময়ের নির্মম বাস্তবতাকে নির্দেশ করে।
এই কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় সময়কে কোনো বিমূর্ত দার্শনিক ধারণায় আটকে রাখেননি। বরং বাংলার চিরকালীন ঋতুপ্রবাহ, কলকাতার যান্ত্রিক ব্যস্ততা, মানুষের ক্লান্তি এবং বেঁচে থাকার অনন্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সময়কে এক বাস্তব ও জীবন্ত অভিজ্ঞতারূপে ফুটিয়ে তুলেছেন।
জীবনানন্দ দাশ যেখানে ইতিহাসচেতনায় দীর্ণ, অন্তর্মুখী ও রূপকঘন প্রকৃতির সাধক, সেখানে শক্তি চট্টোপাধ্যায় হলেন শেকড়সন্ধানী, কথ্যভাষার জাদুকর এবং মর্ত্যের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রেম ও বিষাদের কবি। বাংলা কবিতার আধুনিকায়নে এই দুই দিকপাল দুটি ভিন্ন অথচ সমান্তরাল দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
তৈমুর খান : কবি
