লিপিকা: মণি-মুক্তোয় সাজানো রবীন্দ্রনাথের এক অন্তহীন অনুভূতির ক্যানভাস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেননি; গৃহশিক্ষক রেখে বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-য় তাঁর ‘অভিলাষ’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা।
১৮৭৮ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান। ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৮৯০ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন। ১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯০২ সালে তাঁর পত্নীবিয়োগ হয়। ১৯০৫ সালে তিনি বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।
১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন। ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি ‘শ্রীনিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘজীবনে তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সমগ্র বিশ্বে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেন। ১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর কলকাতার পৈত্রিক বাসভবনেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
‘লিপিকা’ থেকে কিছু ভালো লাগার কথা, চলুন পড়ে নিই—
“মানুষ সমুদ্র পার হলো, পর্বত ডিঙিয়ে গেল, পাতালপুরীতে সিঁধ কেটে মণি-মাণিক্য চুরি করে আনলে, কিন্তু একজনের অন্তরের কথা আর-একজনকে চুকিয়ে দিয়ে ফেলা— এ কিছুতেই পারলে না।
আজ মেঘলা দিনের সকালে সেই আমার বন্দী কথাটাই মনের মধ্যে পাখা ঝাপটে মরছে। ভিতরের মানুষ বলছে, ‘আমার চিরদিনের সেই আর-একজনটি কোথায়, যে আমার হৃদয়ের শ্রাবণমেঘকে ফতুর করে তার সকল বৃষ্টি কেড়ে নেবে!'” (পৃষ্ঠা- ৪)
“গাড়িতে ওঠবার সময় একটুখানি মুখ ফিরিয়ে সে আমাকে তার চাউনিটি দিয়ে গেছে।
এই মস্ত সংসারে এইটুকু আমি রাখি কোনখানে?”
“পৃথিবীতে রাজার প্রতাপ, ধনীর ঐশ্বর্য, হয়েছে মরবারই জন্যে। কিন্তু চোখের জলে কি সেই অমৃত নেই, যা এক নিমিষের চাউনিকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে পারে?” (পৃষ্ঠা- ১২)
“এমন সময় গায়ে-হলুদের দিনে মেয়েটিকে দেখা গেল না, আর পাশের বাসার সেই ছেলেটিকেও না।
খবর এল, তারা লুকিয়ে বিবাহ করেছে। তাদের জাতের মিল ছিল না, ছিল কেবল মনের মিল। সকলে নিন্দা করল।” (পৃষ্ঠা- ২৬)
“সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট।”
(পৃষ্ঠা- ৩৬)
“কৌশিক পড়ে বটে, কিন্তু এক মনে নয়। তার সাঁতার কাটতে মন, তার বনে বেড়াতে মন; সে গান করে, সে যন্ত্র বাজায়!
অধ্যাপক তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন, ‘বিদ্যায় তোমার অনুরাগ নেই কেন?’
সে বলে, ‘আমার অনুরাগ শুধু বিদ্যায় নয়, আরও নানা জিনিসে।’
অধ্যাপক বলেন, ‘সে-সব অনুরাগ ছাড়ো।’
সে বলে, ‘তবে বিদ্যার প্রতিও আমার অনুরাগ থাকবে না।’ “(পৃষ্ঠা- ৪৭)
পুনশ্চ:
এই চমৎকার বইটির কথা তেমন একটা শুনতে পাই না। অথচ বইটি কোনো গল্প-উপন্যাসের চেয়ে কম কিছু নয়, বরং ছোট ছোট মণি-মুক্তোয় ভরা। যারা সত্যিকারের পড়ুয়া, তাদের জন্য এটি একটি ভালোলাগার মতো বই হতে পারে।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
