গোধূলির বেদনা

গোধূলির আকাশে পশ্চিম কোনে নেমে এসেছে রক্তিম সূর্য। দূরে নদীর পানি টগবগে লালছে রূপ ধারণ করেছে। সূর্যের আশপাশ যেন কমলা রঙের আকাশ। একটু পরেই সূর্য ডুবলে সব হয়ে যাবে অন্ধকার, আকাশ হবে কালচে বর্ণে একাকার। নদীর পাড়ে বট গাছটার নিচে বসা আরিফ ও লাবন্যের মাথার ঠিক উপরে থাকা আকাশটা এখনো নীল। এই নীল আকাশ কী লাল হয়ে বিপ্লব ঘটাবে? নাকি হবে বেদনার চিহ্ন? নীল থেকে কালো, আরও গাঢ় কালো। গোধূলির বেদনা বিধুর অন্তিম প্রণয়ের শোকসভা।

শান্ত নদীর দিকে চেয়ে দুজনে অনেক্ষণ চুপ থাকার পর লাবণ্য বলে উঠল, আর কতদিন এভাবে?
আরিফ তখনো চুপ!

আমাদের সম্পর্কের প্রায় পাঁচ বছর। ঠিক এমনি এক বিকেলে আমাদের প্রথম দেখা, প্রথম প্রণয়। তখন কারও জানাজানি ছিল না। এখন অনেকেই জানে। বাড়িতে মা-ও জেনে গেছে। বাবাকে বলেছে। বাবা আমাকে জিগ্যেস করেছে তোমার কথা। আমি বলেছি তার কাছে তোমার বর্তমান অবস্থা-উপাখ্যান। তিনি কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। এভাবেই গত তিন মাস ঘরে আমাদের মধ্যে কথা লেগেই আছে। বাবা ছেলে দেখছেন। একজনকে পছন্দও হয়েছে ঘরের সবার। আমাকে এখন জোর দেওয়া হচ্ছে। আমি…!

বাকিটা আর বলতে পারেনি লাবন্য। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। বাকি কথা সম্পূর্ণ করার আগেই এবার আরিফ মুখ খুলল, আমি আর কি করব? আমিতো চেষ্টা করছি। কিছুই হচ্ছে না। এর মাঝে এই মাসে দুইটা টিউশনও চলে গেছে। মানসিক অবস্থা কি বুঝতে পারছো? একটা চাকরি পর্যন্ত জোটাতে পারছি না। বিসিএসের জন্যেও তো কম প্রস্তুতি নিচ্ছি না। ৪২ তম বিসিএসের ভাইবা পর্যন্ত দিয়ে আসলাম। এটার এখনো কোনো ফলাফল আসেনি। এদিকে ৪৩, ৪৪তম-ও দিয়ে আসলাম! কিছু করতে পারছি না। এই সংকোচে বাড়িতেও যাই না। বাবা কথা বলেন না, অভিমান করে আছেন। মা মাঝে মধ্যে ফোন দিলেও টান টান সুরে কথা বলেন।

লাবন্য: তো আমি কি করব!
আরিফ: তুমি কি করব মানে?
লাবণ্য: তোমার তো আমার বিষয়টিও ভাবা উচিত নাকি? নাকি তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও না?
আরিফ: আমি কি কখনও বলেছি একথা?
এভাবে হঠাৎ করে তাদের কথার মাত্রা তির্যকভাবে বেড়ে যায়। কথা কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডা বাড়তে থাকে। শেষ আরিফ সিধান্ত দিল, তোমার যা ইচ্ছে সেটাই কর। বাবার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে কর। আমার কোনো বাধা নেই।
লাবণ্য: আচ্ছা এই ছিল তাহলে তোমার সিদ্ধান্ত?
আরিফ: তোমার যদি মনে হয়, তাই।
লাবণ্য: ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। ভালো থেকো।
দুজনের চরম তির্যক কথার পর্ব শেষে দুজন দুদিকে চলে যায়। কেউ কারও দিকে ফিরে থাকায় না। আকাশে তখন ঘন অন্ধকার।

২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় তখন। তিন মাসের উপরে হয়ে গেছে দুজনের আর কোনো যোগাযোগ নেই। আরিফ আছে তার মতো করেই। সে যেন এক প্রকার হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল এই সম্পর্কের ইতি টেনে। কিন্তু কেন? এই সময়ের মাঝে তার কোনো চাকরি হয়নি, বিসিএসের ফলাফলের কোনো হদিসও নেই। বাবা বলেছিল, গ্রামের বাড়িতে এসে জায়গা-জমির দেখাশোনা করতে। প্রয়োজনে একটা ব্যবসার ব্যবস্থাও করে দিবে তাকে। কিন্তু সে রাজি নয় এই শর্তে। সে এখানেই থাকতে চায়। বিসিএস ক্যাডার হয়েই নাকি সে দেখাবে। একদিন রাতে হঠাৎ পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। অভিযোগ সে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যারা কি না গোপনে দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড করতে চায়। অথচ আরিফ এক সময় রাজনীতি তো দূর, দেশের খবরও রাখতো না, রাজনীতির আশেপাশেও ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে। সংগঠনটিতে তাদের প্রকাশ্যে কোনো কাজ নেই। তাই আরিফের রাজনৈতিক পরিচয় কেউ জানতো না। লাবণ্য-ও না। সংগঠনের দুয়েকজন আরিফ ও লাবণ্যের বিষয়টি জেনে যায়। তাদের মধ্যে ভয় ছিল আরিফ যদি লাবণ্যকে কিছু বলে দেয়। তাই তারা আরিফকে এই সম্পর্ক বিচ্ছেদের কথা বলতে থাকে বারবার।

আরিফ জেলে। তার বাবা-মা কেউ জানে না। জানে না লাবণ্য-ও। কোনো এক মাধ্যমে তার জামিন হয়। কিভাবে, কার মাধ্যমে হয়েছে সে নিজেও জানে না। তবে জেল থেকে বেরিয়ে এই সংগঠনের ভয়াবহ পরিণতি সে বুঝতে পারে। অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের মতো নয় এখানে। তাদেরকে যে স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল তার কিছুই এখানে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা গ্রামের সহজ-সরল ও ধর্মভীরু ছেলেদেরকে টার্গেট করে তারা। এখন সে এই পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। সংগঠনকে সে একথা জানায়। তারা প্রথমে তাকে বুঝাতে চেষ্টা করে। সে আর থাকতে চাচ্ছে না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। প্রেমিকা চলে গেছে, জীবনটাকে এভাবে চলে যেতে দিতে চায় না। যেখানে পরিচয় গোপন রাখতে হয়। জীবন নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। এক পর্যায়ে তারা তাকে নানা ভয়ভীতি দেখায় এর পরিণতি ভালো হবে না বলে।

আজ সেপ্টেম্বর মাসের ৯ তারিখ, লাবণ্য’র বিয়ে। আরিফের ঠিকানায় অবশ্য বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছে লাবণ্য। কিন্তু আরিফ যাবে না। কিভাবে যাবে আরিফ? একটি মুহুর্তও কি সহ্য হবে সেখানে গিয়ে তার! সেদিন যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল অরিফ, সেটা কি সত্যিই মন থেকে দিতে পেরেছিল? হয়তো পারেনি। কিন্তু বাধা যে দিবে না বলেছে! সত্যিই যে তার বাধা দেওয়ার মতো কোনো কিছুই তার পক্ষে ছিল না। সংগঠনেরও চাপ ছিল তার উপরে। টিউশন চলে যাবার পর এই এক মাসে তাকে নতুন টিউশনও খোঁজতে হচ্ছে। একটা পেয়েছে। এটায় চলবে না। আরও দুটো হলে মোটামুটি চলার উপযোগী হয়। এদিকে তার বাড়িওয়ালা সামনে মাসে বাসা ছাড়ার কথা বলেছে। বাসাও খোঁজে বেড়াচ্ছে কদিন ধরে। এই শহরে ব্যাচেলারদের সহজে বাসা মিলে না। ম্যাচে উঠবে, ম্যাচেও বর্ডার খালি পাচ্ছে না। বিপদের উপরে বিপদ তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে চতুর্দিকে। প্রতিদিনের ন্যায় আজও বিকেলে বাসা খোঁজতে বেরিয়েছে আরিফ। তারপর আটটার সময় যে টিউশন আছে সেটায় যাবে।

ঐদিন রাতে ৪২ তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশিত হয়। আরিফ ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। ফলাফল শুনে আরিফের মায়ের কান্না আরও বেড়ে যায়। নির্বাক তার বাবা। কারণ ততক্ষণে আরিফ আর বেঁচে নেই। সে তার সারাজীবনের চাওয়া-পাওয়া, এই ফলাফল শুনে যেতে পারেনি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! সেদিন বিকেলে যখন ও বাসা দেখতে বের হয়, তখন চৌরাস্তায় সড়ক পারাপার হবার সময়ে হঠাৎ একটা মাইক্রোবাস এসে আরফিকে ধাক্কা দেয়। আরিফ সেখানে পড়ে যায়। মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। রাস্তার আশেপাশে থাকা লোকজন ছুটে আসে তার কাছে। আরিফ সেই যে চোখ বুজেছিল আর খোলেনি। লোকজন একটা রিকশায় তোলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার জানায় সে সড়কেই মারা গেছে। তখনও সেদিন ছিল আকাশে গোধূলিক্ষণ। আর ঐদিকে লাবন্য বিয়ের গাড়িতে চড়ে যাচ্ছিল স্বামীর বাড়ি। তার কয়েক ঘন্টা পর বিসিএসের ফল প্রকাশ হয়। এই ফলাফলে পাস করতে পারলেই জীবনের একটা সফলতা ভেবেছিল আরিফ। এই ফলাফল কী আসলেই তার জীবনের সফলতা এনে দিতে পেরেছিল সেদিন? লাবণ্যের আর কিছুই জানা হলো না!

লেখক: মনোয়ার পারভেজ

আরও পড়ুন