রসে বশে ভিন্নতা

আচ্ছা, আপনাদের জীবনে এমন কোনো শব্দ আছে কি যা শুনলেই মনটা কেমন আনচান করে ওঠে? যেমন ধরুন, আমার জীবনে সেই রকম কিছু শব্দের মধ্যে ‘ক্যাডবেরি জেমস’ একটি। আজও জেমসের প্যাকেট হাতে নিলেই কত স্মৃতি যে মনের মধ্যে ভিড় জমায়! আর সেই সব স্মৃতি হাতড়ে দেখি, ছেলেবেলার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির সঙ্গেও এই চকলেটের রং বাছাই নিয়ে বিস্তর লড়াই করেছি। ছোট ছোট হাতের তালুর ওপর রংবেরঙের জেমস! গোল বাধতো, মূলত শেষের দুটোকে নিয়ে। হয়তো একটা পড়ে আছে ঝকঝকে গোলাপি আর একটা উজ্জ্বল হলুদ। কিন্তু ছোঁ মেরে যেই নিয়েছি গোলাপিটা হাতের মুঠোয়, মুঠো খুলে দেখি, এমা রংটা তো ঠিক ততখানি ঝকঝকে নয়। পরে হলুদটাও বেশ ম্যাড়ম্যাড়ে ঠেকেছে। ক্রমে ক্রমে বুঝলাম, ম্যাজিক যে অন্য জায়গায়। গোলাপি জেমসটা যেমন অনেক বেশি ঝকঝকে হয়ে ওঠে হলুদটাকে পাশে পেয়ে, ঠিক তেমনি হলুদ জেমসটাও ভারী উজ্জ্বল দেখায় গোলাপিটার পাশে। আর্টের ভাষায় এটিকে কালার কনট্রাস্ট বলে ঠিকই, তবে আমার কাছে নিছক ভিন্নতার সহাবস্থান।
ধর্ম, ভাষা, জাতপাত, পার্টি-পলিটিক্স – ভিন্নতার ছোঁয়া লাগেনি এমন কোনো জায়গা আছে নাকি? শুধু কি তাই, আদর্শ, নীতি, জীবনদর্শন, খাদ্যাভ্যাস—সেখানেও রয়েছে ভিন্নতার বহিঃপ্রকাশ। তবে আমরা যেমন অনেকে শুধু বইয়ের মলাটটি দেখেই বিচার করে ফেলি, সেটি ভালো না মন্দ, তেমনি ভিন্নতার আভাস পেলেই রে রে করে তেড়ে যাই সেই মুহূর্তেই। তল অবধি আর পৌঁছতে পারি কোথায়। যে ম্যাজিক দেখব! কিন্তু এইতো আমাদের নমিতা দি বাড়ি বাড়ি ঘুরে সহায়িকার কাজ করেন। পুজো,ঈদ দুই এলেই তার চোখমুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে প্রতিবার। কই সে আনন্দের মধ্যে তো কোন রেষারেষি দেখিনি কোনদিন। চিরকাল বাবা-মাকে দেখেছি, নিজেরা চরম বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও বরাবর আগলে রেখেছেন যেকোনো রঙের উপর আস্থাশীল মানুষকে। মোগলাই পরোটা থেকে দক্ষিণী ধোসা কিংবা চিলি চিকেন থেকে গরমের পাতলা মাছের ঝোল—বাদের খাতায় ফেলা যায় না কাউকেই। আজও কোন নতুন জায়গায় গেলে সেখানকার মানুষজনের সাথে জমিয়ে গল্প করি। তাদের জীবনযাপন, পোশাক-আশাক, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান—সবকিছুই ভারী মন ছুঁয়ে যায়। কেন বলুন তো, ওই যে ভিন্নতা!
অনেক সময় প্রকৃতির পাশে বসে চুপচাপ লক্ষ্য করেছি গাছের পাতায় ভিন্নতা, ফুলের গন্ধে ভিন্নতা, আকাশের রঙে ভিন্নতা কিংবা বৃষ্টির ধারায় ভিন্নতা,দিন শেষে ঐক্যের মন্ত্রই শেখায়। কারণ তারা যে একে অপরের পরিপূরক। ভাবুন তো, যদি কখনো এমন হয়, সারা পৃথিবী জুড়ে একই রঙের গাছপালা, একই স্বাদের খাবার, একই স্বভাবের মানুষ। সর্বোপরি, আমার সেই ছেলেবেলার ক্যাডবেরি জেমস-এর প্যাকেটে সব কটা এক রঙা চকলেট! উফ, কী যে বোরিং! ভাবতেই তো ভয় লাগে।
এই ভিন্নতার হাত ধরেই আসে নিজস্বতা। তবে নিজের সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার হিড়িকে অপরের সত্তাকে আঘাত করলে তা শুধুই বিনাশ ডেকে আনে। তাতে ভিন্নতার স্বাদ আর উপভোগ করা যায় না। তাই জোর গলায় সব সময়ই বলবো, “ডাইভারসিটি জিন্দাবাদ!” মনে, প্রাণে, হাঁড়িতে ,বাড়িতে যতই বিপর্যয় আসুক না কেন, ওই পাশে বসা ভিন্ন মতাদর্শী মানুষটার দিকে যেন আমরা কখনোই বাঁকা চোখে না তাকাই। একটু মন দিয়ে তলিয়ে ঘটনার কারণগুলো খোঁজা আর এক চিমটে বাড়তি সহানুভূতি দিয়ে সমস্যাগুলোকে বোঝা—ব্যাস, এটুকুর বিনিময়েই জীবন বেশ খানিকটা সহজ হয়ে ওঠে। পরিশেষে বলি, এটা কখনোই ভুলে গেলে চলবে না, নীল আকাশের বুকে রামধনুর সাতটা রংই আজীবন কাম্য।
