নদীর বাঁকে

ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। রওশন কান পেতে থাকে। ভোরের বাতাসে ভেসে আসা আজানের সুর ওর খুব ভাল লাগে।
দরজা খুলে নেমে আসে উঠোনে। প্রতিদিনের মতো আকাশে তাকায়। আধো আলোর নরম সময়টাকে কিযে ভাল লাগে ওর।
অঞ্জলি পেতে ধরে শুন্যে ওর মনে স্বর্গীয় পানীয় ভর্তি হয়, আঁজলা পেতে পান করে।
নিজের মনেই হাসে রওশন, ওদের জীবন যা কিছু পাওয়া সব তো এই গতর খাটিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তবেই সামান্য কিছুই পেলে ওদের জীবনে।
এমন দুহাত ভরে স্বর্গীয় পানীয়!
সেটাও কপালপোড়া রওশনের জীবনে।
তবুও প্রতিদিন লোকচক্ষুর আড়ালে এটা করে ও।
জানে না এটা ওর ইবাদত না চিরকামনা।
বদনা নিয়ে কলসী থেকে পানি ভরে কলাপাতার ছাউনি দেয়া সামনে সারের বস্তাকাটা আড়াল করা পায়খানায় যায়।
মাটিতে হাত ঘষে পরিস্কার করে অজু সেরে ঘরে যায়।
উঠোনের কোনে রাখা খোয়াড় খুলে দিলে গমগম ক ক করে হাঁসমুরগি বের হয়। দৌড়ে ঘরে গিয়ে ভুষি নিয়ে পানিতে মেখে হাঁস মুগরিকে আলাদা আলাদা পাত্রে খাবার দেয়।
ঝাড়ু হাতে ছোট্ট উঠোনটা ঝেড়ে একটু হাফ ছাড়ে। ম্য ম্যা করে ডাকতে থাকে ছাগল দুটো। ওদের চরে দিতে বাইরে যায় রওশন।

চরটা নদীর বুক থেকে উঠে এসেছে মাত্র কয়েক বছর আগে। ঠিক উঠে আসা নয়—নদী যেন একদিন ক্লান্ত হয়ে তার বুকের ভার নামিয়ে রেখে গেছে। বালির ওপর ঘাস জন্মেছে, ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে মানুষ। মানুষ মানে ঘর, ঘর মানে টিন, খড়, বাঁশ, আর জীবনের নিত্য লড়াই।
এই চরের নাম সরকারি কাগজে নেই। লোকমুখে নাম—মাঝির চর। কেউ বলে উত্তাল নদীতে নৌকা ডুবে মারা যেত মাঝিরা তাই এই চরের নাম মাঝির চর , কেউ বলে নদীর অভিশাপে চর।
এখানে জন্ম রওশনের । জন্ম বলতে—মায়ের জরায়ু ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল, কিন্তু জন্মের পরদিনই নদী তাদের ঘর ভেঙে নেয়। রওশনের শৈশব তাই কোনো উঠোন চেনে না, চেনে কেবল বালু আর ভাঙন।

রওশন বড় হয়েছে নদীর শব্দ শুনে, নদীপাড়ের জীবন দেখে। আজো নদীর পাড়েই দাঁড়িয়ে থাকে।
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়িতে আসে রওশন।
ঘরে শুয়ে আছে তার দুই সন্তান রাবেয়া আর ছোট্ট মুনা। স্বামী হারুন তিন বছর আগে নদীতে গেছে—ফিরে আসেনি। নদী কিছু ফেরত দেয় না। শৈশবে ওর বাবামায়ের সংসার ওর শৈশব কৈশোর তারুণ্য অস্তিত্ব ঠিকানা আত্মীয় স্বজন পরিচয় সব নিয়েছে, কিছুই ফেরত দেয়নি।
রওশন ছাগলের খোটা বড় দড়ির সাথে বেঁধে মাটিতে পুতে বাড়ি ফেরে
চুলায় আগুন জ্বালাতে হবে। আগুন না জ্বললে ভাত হবে না।
চরের মেয়েরা জানে—দিন মানে কাজ, কাজ মানে টিকে থাকার জন্য প্রাণপণ লড়াই করা।
সে হাঁড়িতে চাল ধুতে ধুতে ভাবে, বেলা চড়ে গেলে বড়ছেলে জামিল মাছ বিক্রির টাকা নিয়ে ঘরে ফিরে গোসল করে খেয়ে ঘুমাবে বেশ কিছুক্ষণ।
সারারাত জেগে নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরে, সকালে বেচাবিক্রি করে ঘরে ফেরে, কোনদিন হাতে থাকে অবিক্রীত কিছু মাছ, বেশিরভাগ দিনই মাছ ছাড়া বাড়ি ফেরে, তাতে মন খারাপ করে না রওশন, সব মাছ , বিক্রি হলে টাকা পাওয়া যায়।
ছোট ছেলেমেয়ে দুটো জামিলের হাতে মাছ দেখলে খুশি হয়। মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে পছন্দ করে ওরা।
নইলে সেদ্ধ পোড়া লতাপাতা কচু ঘেচু দিয়ে ভাত খেতে হয়।
রওশন জামিলের হাতে মাছ না দেখলে খুশি হয়, যাক চাল কেনার জন্য কয়টা বেশি টাকা পাওয়া যাবে।
পাতিলে ভাত না থাকলে মাছের ঝোল দিয়ে কি করবে। ঘরে চাল থাকলে বাড়ির চারপাশের শাকপাতা তুলেও পাতে ভাত দেয়া যায়।
রওশনের মনটা খারাপ হয়ে যায়।
আজকাল রওশনের চোখে পানি আসে না। পানি তার চোখে বিলাসিতা শুধু অকারণে চোখ জোড়া জ্বলে ওঠে,

চরের নারীরা পুরুষের চেয়েও বেশি নদীকে চেনে । পুরুষ নদীতে জীবীকা নির্বাহ করে নারী নদীর ফল ভোগ করে—ভাঙন, অভাব, অনাহার, বেদনা বিচ্ছেদ ঠিকানা পরিচয় হারানোর অপমান সব সব।
জন্মের পর রওশনরা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বলরামপুরে একজন ধনী মানুষের পরিত্যাক্ত জমিতে আশ্রয় নিয়েছিলো, বাবামা উদরস্থ পরিশ্রম করতো পেটের ভাত যোগার করার জন্য। রওশনকে জমির মালিক ফ্রী প্রাইমারিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলো। স্কুল থেকে বই দিয়েছিলো বিনামূল্যে, মালিক খাতা পেন্সিল জামা স্যান্ডেল কিনে দিয়েছিলো। রওশনও নাচতে নাচতে সবার হাতে স্কুলে যেত, মালিকের বড়মেয়ে ওর পড়া দেখিয়ে দিতো। রওশন
স্কুলে গিয়েছিল। প্রাইমারি পাঠ শেষ করলো। তারপর বাবা নদীতে গেল, আর ফিরলো না,
মা অসুস্থ হলো, সংসার কাঁধে পড়ল রওশনের। ও বুঝেছিল—চৈরা মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা সহজ নয়।
ওদের কাজ করে বাঁচতে হয় সব সহ্য করতে হয় টিকে থাকার জন্য।
তার বিয়েটা হয়েছিল ষোলো বছর বয়সে। বিয়ে মানে একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা। শরীরি সুখ বিনিময়ে সন্তান।
ভালোবাসা সে কখনো আলাদা করে ভাবেনি।
হারুন খারাপ মানুষ ছিল না। কিন্তু অভাব ভালো মানুষকেও পরিবর্তন করে তোলে। কখনো রেগে যেত, ওকে পেটাতোও আবার রাতে শরীরি সুখের ঢল নামাতো।
। রওশন সব মেনে নিত। কারণ চর মেনে নেওয়া শেখায়।
পাঁচ ক্লাস পড়ার ফলে ও বুঝতে পারে ভালবাসা মানে অন্যকিছু। তবুও মুখ ফুটে ভালবাসার কথা বলতে পারতো না, ভালবাসা আর শরীর সব মিলিয়েই হিসাব করতে গিয়েও অসম্পূর্ণ থাকতো কিছুটা।
হারুন চলে গেলে রওশনের খুব কষ্ট হতো। কেন?
ভালবাসা, না, শরীর, না, তিন সন্তান নিয়ে পেটের ক্ষুধা।
কিসের এতো কষ্ট রওশনের এটার হিসাব মেলার আগেই ওর সামনে থাকে তিন সন্তান নিয়ে জীবন ধারণ।

বর্ষাকালে চর বদলে যায়। নদী ফুলে ওঠে। তখন নারী আর নদীর যুদ্ধ শুরু হয়। পুরুষেরা তখন নৌকায়, নারীরা ঘরে—ঘর বলতে ঘর ছন বাঁশ কখনো টিনের ছাউনি।
নারীরা ঘর বলতে সংসার গুছিয়ে রাখা সন্তানদের দেখভাল করা।
এক রাতে নদী ভাঙতে শুরু করে
রওশন তিন সন্তানকে কোলে কাঁখে হাতে নিয়ে দৌড়াতে থাকে। দৌড়ে একেবারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সড়কের উপর এসে দাঁড়ায়।
চারদিকে অন্ধকার, কেবল নদীর গর্জন। সেই রাতে সে ভয় পায়নি—ভয় পেলে বাঁচা যায় না।
সে শুধু ভাবছিল—“এই বাচ্চাগুলা বাঁচলে আমি সব পারবো।”
সেই রাতেই সে বুঝেছিল—সে শুধু মা না, সন্তানের ভাগ্য গড়ে দেবার জন্য পাহাড়।
বর্ষার নদী ভাঙন শেষে ওরা ফিরে আসে ওদের ভেজা ভাঙা ঘরবাড়িতে। আবার সাজায় বাড়ি গোছায় ঘরসংসার ।
চরের নারীদের সবচেয়ে বড় বঞ্চনা হলো—তাদের কষ্টের কোনো সাক্ষী নেই। শহরের মানুষ চরের গল্প শোনে সহানুভূতি দিয়ে, কবিরা কবিতা লেখে গল্পকাররা গল্প লেখে নিজেদের নাম করে।

,এতে ওদের পেট ভরে না।
রওশন কখনো এনজিওর লোকদের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা ছবি তুলেছে, কাগজে নাম লিখেছে। রওশন ভেবেছিল—হয়তো এবার কিছু হবে। কিন্তু নদী যেমন বারবার ভাঙে, তেমনি আশাও ভেঙে যায়।
সে কাজ করে ধান কাটার। পুরুষের চেয়ে কম মজুরি।
কাশেম ভাই আমিও যতহন কাম করি মফিজ বাইও ততোহন কাম করে আমি যতডি আডি কাঠি মফিজ বাইও ততোডি আডি কাডে তাহলে আমার ট্যাহা কম ক্য।
তুই তো ম্যায়াছাওয়াল। তর নগে কি ব্যাডা ছাওয়ালের তুলনা হয়, ম্যায়াছাওয়ালের মুজুরি কমই থাহে। ম্যায়াছাওয়ালের গতরে শক্তি কম।
কাশেম বাই কতাটা ঠিক না, ব্যাডাছাওয়াল কামের পর বাড়িতে গিয়া গাওগুসল ধুইয়া বিড়ি টানব বইয়া বইয়া, আর আমরা বেডিরা বাইত গিয়া ঘরদুয়ারের কামকাইজ করুম রান্ধনবাড়ন ধুয়াপাকলা করুম তারপর যুদি বিছনার নাগাল পাই। গাওগতরে শক্তি কইলাম আমাগোই বেশি।

কতা কইস না কাম কর।
প্রতিবাদের ভাষা থামিয়ে দেয় কাশেম মিয়া।
সেই দিন সে চুপ করেছিল। কিন্তু চুপ থাকা মানে হার নয়—চুপ থাকা মানে শক্তি জমানো।

রাবেয়ার বয়স এখন ছয়, সে মায়ের মতো হতে চায় না। সে স্কুলে যেতে চায়। রওশন ভয় পায়—স্বপ্ন দেখলে যদি ওদের চর আবার ভাঙে।
তবু একদিন সে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যায়। চরের স্কুল বলতে—একটা টিনের ঘর, একজন শিক্ষক, অনেক স্বপ্ন।
শিক্ষক বলেছিল—“আপনের মেয়ে খুব মেধাবী।”
রওশনের বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠে। সে প্রথমবার ভাবল—হয়তো নদীর বাইরেও জীবন আছে।
চরের বাইরের জীবনটা দেখা যায়, চর পেরিয়ে নদী। নদী পেরিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সড়ক, সড়ক পেরিয়ে বলরামপুর গ্রাম। ওখানে প্রাইমারি স্কুল আছে হাই স্কুল আছে। হাই স্কুল পার হলেই কলেজের আমন্ত্রণ আছে।
রওশন স্বপ্ন দেখে ওর ছেলেমেয়ে কলেজে পড়বে। যত পরিশ্রম করতে হয় হাসতে হাসতে সেটুকু করবে।

চরের নারীরা হাসে , খলখল হাসিতে ওরা কথা বলে অপ্রাপ্তি বেদনা ঝরিয়ে ফেলে। ওদের হাসিতে প্রতিবাদের দীপ্ত শিখা জ্বলিয়ে রাখে অন্তরে।
চরে প্রায়ই ঝড় হয়,
একদিন বড় ঝড় এলো। নদী আবার ভাঙল। অনেক বাড়ি ঘর নদীতে তলিয়ে যায়। রওশনের ঘরটাও হেলে পড়ে। সে দাঁড়িয়ে দেখল গাছপালা মুরগির খোয়ার গরুর গোয়াল নদীর কিনারায় হেলে আছে
কেউ নিরবে কাঁদছিল, কেউ চিৎকার করছিল। রওশন বালুর ওপর স্থির বসে ছিল। মুনা তার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল।

রাবেয়া আর মুনা আবার স্কুলে যাচ্ছে। জামিল নদীতে মাছ ধরে, কিন্তু পড়তেও চায়। রওশন জানে—সবাই সবকিছু একসাথে করতে পারে না, তবু চেষ্টা থামালে চর চিরকাল চরই থাকবে।
জামিলকে সংসারের জন্য পরিশ্রম করতে হবে।
রওশনের বুকের ভেতরটা হাপুস কেঁদে ওঠে।
আহারে জীবন তর নিগা কত জীবন বলি অয় ।

সকালে নদী শান্ত ছিল। সূর্য উঠছিল ধীরে। রওশন নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। এই নদীই তার সব নিয়েছে, আবার দিয়েছে লড়াই করার শক্তি।
এনজিওর লোকদের সাথে কথা বলে রওশন।
চরের নারীদের সংগঠিত করে।
এনজিওর লোকেরা ওদের ট্রেনিং দেয়। ভাল বীজ দেয় গরু ছাগল হাঁস মুরগি পালন করার সঠিক পদ্ধতি শেখায়, গরু দেয় ছাগল দেয়।
ভাল বীজে ওদের জাংলা জুড়ে ফলন হয়, নিত্যদিন সবজি তুলে চর পেরিয়ে নদী পাড় হয়ে বলরামপুর বাজারে বিক্রি করে।
পয়সা গুনতে গুনতে শুনতে পায় ভুঞাপুর বাজারে নিয়ে গেলে আরো দাম হতো সবজিগুলোর।
মিয়াবাড়ির ভাবি ঢাকা থেকে এলে তিনি বলেন ঢাকার বাজারে চারগুণ বেশি দামে কেনে তারা ।
ওরা ভুঞাপুর সমাজ কল্যাণ অফিসে আসে।
শুনতে পায় নদীর পাড়ে অর্থনৈতিক জোন তৈরি হবে, পাড় বাঁধানো হবে, নদী ড্রেজিং হবে।

ওরা ওদের ভাগ্য ফেরাতে চায় কর্মে।
তবুও নদী ওদের চোখ রাঙায় , ওরা নদীর পাড়ে এসে বসে। সবাই একসাথে গান ধরে।

“আমরা যারা চরে জন্মাই,
আমাদের পা বালুতে,
চোখ থাকে আকাশে।”

রোকেয়া ইসলাম : কবি, লেখক ও সমাজসেবী

আরও পড়ুন