একজন শিল্পীর চোখে প্রেম, জীবন ও ক্ষমার গল্প—‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’

কিছু বই পড়া শেষ হয়ে যায়, কিন্তু বইটি শেষ হয় না। শেষ পৃষ্ঠাটি উল্টে রাখার পরও তার কিছু চরিত্র, কিছু প্রশ্ন, কিছু অনুভূতি মনের মধ্যে থেকে যায়। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ আমার কাছে তেমনই একটি বই।
আলাউদ্দিন আল আজাদের এই উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। এত বছর পেরিয়ে এসেও বইটির অনুভূতিগুলো পুরোনো মনে হয় না। বরং পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে যে, মানুষের প্রেম, সংশয়, অভিমান, অহংকার, ক্ষমা আর ভালোবাসার জায়গাগুলো বোধহয় সময়ের সঙ্গে খুব বেশি বদলায় না।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহেদ একজন চিত্রশিল্পী। তার চোখ দিয়ে আমরা শুধু একটি প্রেমের গল্প দেখি না; দেখি একজন শিল্পীর ভেতরের পৃথিবীকে। রং, ছবি, সৌন্দর্য, প্রেম এবং সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ধীরে ধীরে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
জাহেদের সঙ্গে ছবির পরিচয়, তাদের ভালো লাগা, প্রেম এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ে; সবকিছুই যেন খুব স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যায়। কিন্তু বিয়ের পর জাহেদের সামনে এমন একটি সত্য এসে দাঁড়ায়, যা মুহূর্তের মধ্যে তার বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং সম্পর্কের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। এখান থেকেই উপন্যাসটি আমার কাছে অন্যরকম হয়ে ওঠে। কারণ প্রশ্নটা শুধু এই নয়—জাহেদ ছবিকে ক্ষমা করবে কি না?
আরও বড় প্রশ্ন হলো: আমরা কি এমন কোনো ঘটনার জন্য একজন মানুষকে দোষী করতে পারি, যার ওপর তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না?
ছবির অতীতের যে ঘটনা জাহেদের সামনে আসে, সেটি জানার পর তার ভেতরে যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, লেখক সেটিকে খুব গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। একদিকে আহত পুরুষের অহংকার, অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষটির অসহায়ত্ব। একদিকে সমাজের প্রচলিত বিচারবোধ, অন্যদিকে একজন মানুষের অন্তর্গত সত্য।
জাহেদের সামনে তখন দুটি পথ: সে চাইলে প্রতিশোধ নিতে পারে, সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে, অথবা নিজের ভেতরের সংকীর্ণতার সঙ্গে লড়াই করে ভালোবাসাকে বড় করে তুলতে পারে। সে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাকেই বেছে নেয়।
এই জায়গাটিই উপন্যাসটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক বলে আমার মনে হয়েছে।
ক্ষমা এখানে দুর্বলতার প্রকাশ নয়; বরং এক ধরনের মানসিক মহত্ত্ব।
জাহেদ বুঝতে পারে, মানুষকে শুধু তার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা দিয়ে বিচার করা যায় না। ভালোবাসা যদি সত্যিই ভালোবাসা হয়, তাহলে সেখানে বোঝাপড়া থাকবে, সহমর্মিতা থাকবে, ক্ষমা করার শক্তি থাকবে। আর এই উপলব্ধিই জাহেদের শিল্পীসত্তাকেও যেন নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
মায়ের কোলে শিশুকে জড়িয়ে থাকার যে গভীর মমতা, জাহেদের চোখে সেটিই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। ছবি ও তাদের সন্তান টুলটুলকে ঘিরে তার শিল্পীসত্তা নতুন অর্থ খুঁজে পায়। সেই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় তার বিখ্যাত ছবি ‘মাদার আর্থ’ বা ‘বসুন্ধরা’।
তখন মনে হয়, একজন শিল্পীর সৃষ্টি শুধু রং, রেখা আর ক্যানভাস থেকে জন্ম নেয় না। তার নিজের জীবন, ভালোবাসা, বেদনা, ক্ষমা, প্রাপ্তি, এই সবকিছু মিলিয়েই হয়তো একটি শিল্পকর্মের জন্ম।
এই জায়গায় এসে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ আর শুধু প্রেমের উপন্যাস থাকে না। এটি হয়ে ওঠে শিল্প ও জীবনের সম্পর্কের একটি গভীর অনুসন্ধান।
উপন্যাসে জামিল চরিত্রটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তার ধারণা সংসারের বন্ধন একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার পথে বাধা হতে পারে। অন্যদিকে জাহেদের জীবন যেন ধীরে ধীরে সেই ধারণার বিপরীত একটি উত্তর হয়ে দাঁড়ায়। প্রেম, সংসার কিংবা সন্তান সবসময় শিল্পীর সৃষ্টিকে থামিয়ে দেয় না; কখনো কখনো তারাই শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
বইটি পড়তে গিয়ে আরেকটি বিষয় ভালো লেগেছে তা হলো লেখক মানুষের মনকে একেবারে সাদা-কালো করে দেখেননি। এখানে কেউ পুরোপুরি ভালো নয়, কেউ পুরোপুরি খারাপও নয়। প্রত্যেকের ভেতরেই আছে দ্বিধা, দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা, ভুল এবং নিজেকে অতিক্রম করার চেষ্টা।
এই কারণেই চরিত্রগুলো কাগজের মানুষ মনে হয় না। তাদের অনুভূতিগুলো জীবন্ত লাগে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র ৮৭ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস এত অল্প পরিসরে এতগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারে! বইটি দ্রুত পড়ে ফেলা যায়, কিন্তু পড়া শেষ হওয়ার পর দ্রুত মুক্তি পাওয়া যায় না। বরং কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতে হয়। ভাবতে হয়—ভালোবাসা আসলে কী? একজন মানুষকে ভালোবাসা মানে কি তার অতীতকেও গ্রহণ করা? ক্ষমা করা কি ভালোবাসারই আরেকটি রূপ?
আর একজন শিল্পীকে কি তার শিল্প থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব?
‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না। বরং পাঠককে নিজের মতো করে উত্তর খুঁজতে দেয়। আর সেখানেই হয়তো একটি ভালো উপন্যাসের সার্থকতা। আলাউদ্দিন আল আজাদের ভাষা খুবই প্রাঞ্জল, অথচ তার মধ্যে কবিতার কোমলতা আছে। কোথাও কোথাও মনে হয়েছে, আমি যেন উপন্যাস পড়ছি, না কোনো শিল্পীর মনের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। রং, প্রেম, বিষণ্নতা, মানুষের দুর্বলতা আর ভালোবাসার উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো মিলেমিশে বইটিকে একটি স্নিগ্ধ আবহ দিয়েছে।
এই বই পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, মানুষের জীবনে শিল্প আর ভালোবাসা আলাদা কোনো বিষয় নয়। দুটিই মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে যেতে পারে। আর হয়তো এ কারণেই ষাটের দশকে লেখা একটি ছোট উপন্যাস আজও পাঠকের কাছে এতটা জীবন্ত।
‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ শেষ করে বইটি বন্ধ করার সময় মনে হলো, একটি ছবি যেমন ক্যানভাসে শেষ হয়ে গিয়েও দর্শকের মনে নতুন নতুন অর্থ তৈরি করে, এই উপন্যাসটিও তেমন। গল্প শেষ হয়েছে, কিন্তু প্রশ্নগুলো শেষ হয়নি।
যারা মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, যারা শিল্প ও জীবনের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে চান, কিংবা এমন একটি প্রেমের গল্প পড়তে চান যেখানে প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষকে বোঝার এবং ক্ষমা করার শক্তি, তাদের জন্য ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ নিঃসন্দেহে পাঠযোগ্য।
উল্লেখ যে, ১৯৭৭ সালে বরেণ্য পরিচালক সুভাষ দত্ত আলাউদ্দিন আল আজাদের এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘বসুন্ধরা’। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এটি একটি অনন্য মাইলফলক।
এই ছবির মাধ্যমেই ঢাকাই চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে কিংবদন্তি অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন-এর। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন রূপসী অভিনেত্রী ববিতা। এই জুটির অনবদ্য রসায়ন এবং নান্দনিক নির্মাণশৈলীর কারণে ছবিটি ভিন্ন ভিন্ন সাতটি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি আজও দর্শকদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।
বই: তেইশ নম্বর তৈলচিত্র
লেখক: আলাউদ্দিন আল আজাদ
ধরন: মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস
প্রকাশক: মেছবাহউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস
মুদ্রণ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪খ্রি. অষ্টম মুদ্রণ: ২০১৭খ্রি.
মূল্য: ১৫০ টাকা।
