বন্যার পানিতে অন্তিম যাত্রা

দীর্ঘ ছয় মাস রুস্তমের আব্বা অসুস্থ। এক প্রকার ঘরে পড়া। তাদের বাড়ি রাঙামাটি জেলা থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে। রুস্তম মাসে একবার ভ্যান গাড়ি চালিয়ে তার আব্বাকে নিয়ে জেলা হাসপাতালে যায়। হঠাৎ দু-তিন দিন ধরে প্রবল বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢল শুরু হয়েছে। বাড়ি থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। রুস্তম তার আব্বাকে ডাক্তারও দেখাতে পারছে না। বৃষ্টি বাড়ার সাথে সাথে বুড়োর অসুস্থতাও যেনো বাড়ছে। রাঙ্গুনিয়ার হালদা, ইছামতী নদীসহ ছোট বড় শতাধিক জলাশয় পানিতে থই থই।
সকাল ৮ টায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা এলো- ‘কাপ্তাই বাঁধের ১৬ টি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে। কর্ণফুলীর পানি প্রবল বেগে হালদা নদীতে আঁচড়ে পড়ছে। সম্মানিত এলাকাবাসী, আপনারা সবাই হুঁশিয়ার হয়ে যান।’হ্রদ, বিল, পুকুরপাড়, ফসলি জমি পেরিয়ে বন্যার পানি যখন রুস্তুমের ঘরের মধ্যে উঠে এল তখন তার বৃদ্ধ পিতা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
খাটের উপর লাশ নিয়ে বসে রয়েছে পরিবারটি। ঘরের মেঝেতে বুক সমান বন্যার পানি। বিদ্যুৎ নেই, অন্ধকার ঘর। বাড়ির মানুষ চিৎকার করে কাঁদছে। গোরস্থান থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, জমি-জমা সব বন্যার পানিতে সাদা হয়ে গেছে। কোথায় তার আব্বার কবর হবে রুস্তুম মনে মনে ভাবে! মৃত্যুর সংবাদ যখন মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলো তখন- সন্ধ্যা। পাড়ার মানুষ কলার ভেলা আর নৌকা নিয়ে রুস্তুমের বাড়িতে এল। জানাজার নামাজ শেষে প্রতিবেশির নৌকায় চার-পাঁচজন লোক সাথে নিয়ে রুস্তম বেরিয়ে পড়লো কবর খোড়ার জন্য।
এশার আজান হলো কিন্তু কোথাও তারা শুকনো মাটির সন্ধান পেলো না। এলাকার সবখানেই বন্যার পানিতে থই থই। কোন উপায় দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে তারা বাড়ি ফিরে এলো। কিছুক্ষণ পর পিতার লাশ নৌকায় তুললো রুস্তম সাথে দুটি মাটির কলস নিয়ে এবার তারা রওনা দিলো গুমাই বিলের দিকে। বন্যার পানিতে গুমাই বিল যেন অথই সমুদ্র। কোন কূলকিনারা নেই। ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। লাশের দেহে মাটির কলস দুটি দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলো তারা। তারপর সাদা কাফনে ঢাকা নিহর দেহখানা আস্তে করে নৌকা থেকে তুলে গুমাই বিলের বন্যার পানিতে ভাসিয়ে দিল এবং সঙ্গে থাকা মাটির কলস দুটিও পানিতে বুড়িয়ে দিল। মুহুর্তে বন্যার পানি অ্যামিবার মতো গিলে নিল সাদা কাফনে ঢাকা নিথর দেহখানা। পিতার অন্তিম যাত্রা শেষে রুস্তুমের দুচোখের জল সবার অলক্ষ্যে মিশে গেলো বন্যার পানিতে।
মাহফুজ রিপন : কবি ও গল্পকার
