মধ্যবিত্ত জীবনের অমোঘ গোলকধাঁধা—মঈনুল আহসান সাবেরের ছোটগল্প ‘বৃত্ত’

আমার দেশের গল্প, আমাদের বাংলা সাহিত্যের একটা ছোট গল্পের নাম—‘বৃত্ত’।
গল্পটি অ-নে-ক বার আমার পড়া, তবুও কয়েকদিন পর পরই পড়ি।
প্রতিবারই প্রথম পড়ার অনুভূতি হয়।
অদ্ভুত!
গল্পটি কেন পড়ি, তা গুছিয়ে বলার মতো শক্তি প্রকৃতি আমাকে দেয়নি।
তবে যতবার পড়ি ততোবারই মুগ্ধ হই।
বেশকিছু সময় মুগ্ধতা আমাকে ঘিরে রাখে।
মুগ্ধতা নিয়ে আমি বাসা থেকে বের হয়ে সোজা গন্তব্যহীন হাঁটতে থাকি।
আশংকা, পাছে মু্গ্ধতা অন্যের চোখে পড়ে।
কারণ, সব মুগ্ধতার ছবি সবসময় দেখাতে নেই।
তবে গল্পটির লেখকের সঙ্গে নয়, গল্পের নায়ক আলমের সাথে এই মুগ্ধতা নিয়ে আলাপ করতে চাই।
‘বৃত্ত’ গল্পটি প্রথম পড়ি আমি সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায়। গল্পটি লেখা হয়েছে ১৯৭৯ সালে, অথচ গল্পটি আজও কত প্রাসঙ্গিক! হয়ত গল্পটি চিরকালের। বিশেষকরে বাংলাদেশ নামক দেশটিতে যতদিন মধ্যবিত্তেরা থেকে যাবে, ততদিন বৃত্তের আবেদন কখনও ফুরোবে না।
মঈনুল আহসান সাবেরের ছোটগল্প ‘বৃত্ত’ বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল সৃষ্টি, যা সময়কে অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক। গল্পটি কেবল বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনের দৈনন্দিনতার খতিয়ান নয়, বরং এটি বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত, যন্ত্রণাদায়ক ও বাস্তবধর্মী রূপক।
গল্পের মূল চরিত্র আলম এবং তার স্ত্রী ফিরোজা। দশ বছরের সংসার, অভাবের তাড়না, নোটন-টৌটনের মতো সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর অফিসের রুটিন—এই নিয়েই আলমের জীবন। প্রতিদিন সকালে মশারির ছিদ্র গোনা থেকে শুরু করে রেশনের লাইন, বাজার, আর অফিসের ফাইলের স্তূপ—এই ঘানি টানতেই আলমের যৌবন ফুরিয়ে যায়।
গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর ‘বৃত্ত’ রূপকটি। আলম যখন তার পুরনো মোটরসাইকেলে করে স্ত্রীকে নিয়ে জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে বের হয়, তখন তারা আক্ষরিক অর্থেই এক বৃত্তের ভেতরে আটকে পড়ে। তারা যতবারই নতুন পথে যাওয়ার চেষ্টা করে, ততবারই তাদের মোটরসাইকেল ঘুরে ফিরে সেই একই জায়গায়—রেশন শপ, বাজার, বাচ্চাদের স্কুল, আর অফিসের সামনে এসে থামে। এটি আলমের সীমাবদ্ধ জীবনের এক চরম ট্র্যাজিক সত্য।
লেখক এখানে কোনো অতি নাটকীয়তা ছাড়াই মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাসকে তুলে ধরেছেন। অভাবের সংসারে ভালোবাসার নোনা ধরা দেয়াল বা রান্নার ছোটখাটো ঝগড়াও যেন জীবনেরই অংশ। মোটরসাইকেলটি এখানে কেবল একটি বাহন নয়, এটি আলমের জীবনের অচলপ্রায় অবস্থাকেই যেন বহন করছে। আর বারবার একই গন্তব্যে ফিরে আসা মধ্যবিত্তের মুক্তিহীন জীবনের এক নিষ্ঠুর প্রতিফলন। আলমের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের কান্না এবং ফিরোজার সাথে মুহূর্তের সেই সূক্ষ্ম মান-অভিমান পাঠককে ভীষণভাবে স্পর্শ করে।
‘বৃত্ত’—গল্পটি শুধু একবার পড়ার জন্য নয়, বরং বারবার ফিরে দেখার মতো। আলমের কান্নার কারণ কেবল অভাব নয়, বরং তার স্বপ্নের মৃত্যু এবং সীমাবদ্ধতার খাঁচায় বন্দি থাকা।
‘বৃত্ত’ গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা সবাই হয়তো কোথাও না কোথাও আমাদের নিজস্ব বৃত্তে বন্দি। এই গল্পটি পড়লে পাঠক নিজের জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তের সাথে অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাবেন। যারা জীবনকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ‘পরাস্ত সহিস’ বইটিতে থাকা ‘বৃত্ত’ একটি অবশ্যপাঠ্য গল্প।
‘বৃত্ত’ গল্পটি ছাড়া মঈনুল আহসান সাবেরের ‘পরাস্ত সহিস’ বইটিতে ‘বৃত্ত’ ছাড়াও রয়েছে আরও বেশ কিছু জীবনধর্মী গল্প যেমন—হন্তারক, গ্রাস, মুখোস, দুই বোন, প্রাকৃতিক, জীবনযাপন। যারা মঈনুল আহসান সাবেরের লেখনশৈলীর গভীরতা বুঝতে চান, তাদের জন্য এই বইটি অবশ্য পাঠ করা জরুরি বলে মনে করি।
আমি আবারও বলছি— বাংলা ভাষার অন্যতস সেরা গল্প ‘বৃত্ত’। গল্পটি আপনি পড়তে চাইলে আপনাকে পড়তে হবে ‘পরাস্ত সহিস’ নামক বইটি!
‘পরাস্ত সহিস’ প্রথম বের হয় জানুয়ারি ১৯৮২ তে, প্রকাশক ছিলেন ‘পূর্বা’।
প্রচ্ছদ করেছিলেন মাসুক হেলাল।
তারপর কেটে গেছে ৪০ বছর। ‘পরাস্ত সহিস’ আবার বের হয় ২০২১ সালের বইমেলায় নতুন করে দিব্যপ্রকাশ থেকে, সঙ্গে সুধীজনের ঋদ্ধ আলোচনাসহ। নতুন পাঠকের জন্য যা বিশেষ পাওয়া বলে মনে করছি। দীর্ঘ ৪০ বছর পরেও এই গল্পটি নতুন করে পাঠক মহলে ফিরে এসেছে, যা প্রমাণ করে ভালো সাহিত্য কখনো পুরোনো হয় না।
বর্তমান সংস্করণের প্রচ্ছদটি করেছেন স্বয়ং লেখক মঈনুল আহসান সাবের। সাড়ে ১০ ফর্মার বইটির গায়ের মূল্য ৩০০ টাকা।
বইটি পাওয়া যাচ্ছে ‘দিব্যপ্রকাশ’ এ ৩৮/২ক বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০। এছাড়াও রকমারি.কম থেকে অমূল্য এ বইটি পাঠক সংগ্রহ করতে পারবেন।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
