মাটির পাঁচালী

আমার ছেলেবেলা থেকেই মাটির প্রতি এক অমোঘ টান।

মা বলে সবেমাত্র যখন বসতে শিখেছি, তখন মহানন্দে বালি খেতাম তার চোখ এড়িয়ে। তা অবশ্য অনেক বাচ্চাই খেয়ে থাকে। এরপরে টলোমলো পায়ে জীবনে প্রথম পা রাখলাম কিশলয় নার্সারি ও কেজি স্কুলে।কিশলয় – কী সুন্দর না নামটা!গাছের কচি পাতাগুলোর মতোই শ্রদ্ধেয় দিদিমণিদের আদর, যত্ন ও ভালোবাসায় আমরাও বেড়ে উঠছিলাম একটু একটু করে।সেখানে প্রতি শনিবার মাটির কাজের ক্লাস হতো।কেউ বানাচ্ছে ছোট্ট পুতুল, কেউ বানাচ্ছে সাপ, কারোর হাতি থেবড়ে গেল – সে ভারী মজার ব্যাপার-স্যাপার।ক্লাসের শেষে কাদার ছিটে গায়ে মেখে যখন বাড়ি ফিরতাম, তখন মায়ের মুখে মিটিমিটি হাসি, অনেকটা ওই সার্ফ এক্সেলের বিজ্ঞাপনের মা-গুলোর মতো।আরেকটু বড় হওয়ার পর ব্রতচারীর ক্লাস নিতেন গীতা দিদিমণি। সবুজ মাঠে নাচতে নাচতে একে অপরের হাত ধরে আমরা গলা ছেড়ে মাটির মানুষের গান গাইতাম – “চল কোদাল চালাই/ ভুলে মানের বালাই/ ঝেড়ে অলস মেজাজ/ হবে শরীর ঝালাই ” আর আমাদের দিদিমণি সযত্নে শিখিয়ে দিতেন মানের বালাই ঝেড়ে ফেলে কোদাল চালানোর সঠিক ভঙ্গিমা, যা শুধু নাচের ভঙ্গিকেই নয়, মনকেও সমানভাবে সমৃদ্ধ করতে পারে।

পেশায় সরকারি স্কুল শিক্ষক, ঘোর কমিউনিস্ট বাবা, আরও সহজ করে চিনিয়ে দিয়েছিল মাটির কাছের মানুষগুলোকে।তারা কেউ দাঁড় বায়, কেউ মাঠে হাল টানে,কেউ ভোর না হতেই কয়েক ঝুড়ি সবজি নিয়ে ছুটে যায় বাজারের দিকে, কেউ আবার নদীতে মাছ ধরে।ভিন্ন জনের ভিন্ন পেশা, তবে ওই যে মাটির গন্ধ, তাদের সবাইকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে একসাথে।আজও মনে পড়ে, বাবা যখন বাজার যেত, বাড়ি ফেরার আর নাম নিত না। মা ভীষণ বিরক্ত হতো মাঝে মাঝে। তবে সময়ের সাথে বুঝলাম, আমাদের চার সদস্যের ছোট্ট মধ্যবিত্ত পরিবারের বাইরেও বাবার এক বৃহত্তর পরিবার ছিল, মাটির কাছের মানুষগুলোকে নিয়ে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, ক্লাসে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, জন কিট্‌স পড়ানো আমার রাশভারী, স্পষ্টবাদী বাবার গায়েও আজীবন মাটি মাটি গন্ধ পেয়েছি।

ছোটবেলায় অত ঋতু বুঝতাম না। নিদেনপক্ষে আঙুলের গাঁট গুনে গুনে একটু আধটু নাম বলতে পারতাম। তবে এটা বেশ লক্ষ্য করেছিলাম, প্রতি বছর যখন মাঠ ভিজিয়ে বর্ষা আসে, তখন মা-ও অফিস ফিরতি পথে একটা-দুটো চারাগাছ নিয়ে এসে হাজির হয়। আর এভাবেই কোনো এক বর্ষামুখর দিনে মায়ের হাত ধরে আমার গাছ লাগানোর হাতেখড়ি। এই গাছ লাগাতে গিয়েই মাটির সঙ্গে এক অন্যরকম সখ্যতা গড়ে উঠল। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, মাটি দিয়ে যে শুধু সাপ-ব্যাঙ তৈরি করা যায়, তা নয়; মাটি সুপ্ত বীজের ঘুম ভাঙায়, মাটি প্রাণের প্রতিষ্ঠা করে। যে সব ছোটখাটো পোকামাকড়কে আমরা নির্দ্বিধায় মাড়িয়ে যাই অহরহ, মাটি তাদেরকেও বুক পেতে আগলে রাখে, ঠিক যেভাবে আগলে রাখে গাছের সূক্ষ্ম মূলরোমগুলোকে।

সময়ের সাথে সাথে কিছু সম্পর্ক যেমন ক্রমশ নিবিড় থেকে নিবিড়তর হয়ে ওঠে, আমার সাথে মাটির সম্পর্ক ঠিক তেমনই। জীবনের একেক সময়ে তাকে একেক রূপে দেখতে পেলাম ; কখনো খেলার সঙ্গী, কখনো অফুরন্ত প্রাণের উৎস, কখনো নিরাপদ আশ্রয়, আবার কখনো পরম শান্তি। এই শান্তিকে আশ্রয় করেই আমার প্রাণাধিক প্রিয় কত মানুষ আজ মাটির কোলে চিরনিদ্রায় শায়িত। এই মানুষগুলোর মধ্যে কারো আঙুল ধরে প্রথম হাঁটতে শিখেছিলাম, কেউ চিনিয়ে দিয়েছিল আকাশের ওই সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটাকে। কেউ আবার তার জীবনদশায় বুঝিয়ে গেল কালের গভীরে তলিয়ে যেতেও যে মাটির আশ্রয় লাগে, সেই মাটিকে জীবনের কোন পর্যায়েই উপেক্ষা করা যায় না । প্রকৃতির বুকেও এ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নেই। তাই হয়তো আকাশের সবচেয়ে উঁচুতে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় যে চিল, তাকেও বাঁচার তাগিদে মাটিতে নেমে আসতে হয় বারবার। আমাদের জীবনের সবটুকুই ছুঁয়ে থাকে মাটি, তাই তাকে ঘিরেই এই জীবনচক্রের আবর্তন।

আরও পড়ুন