মন ভালো তো সব ভালো — মনের যত্ন-মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ও আমাদের করণীয়

আজকের এই ব্যস্ত,জটিল ও চাপে ভরা সমাজে আমরা যতই উন্নত হই না কেন, আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখনও অবহেলিত রয়ে গেছে তা হলো মানসিক স্বাস্থ্য।
আমি একজন সমাজকর্মী এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট হিসেবে যখন মানুষের নানান রকম সমস্যা,সংকট, দৈনন্দিন সংগ্রাম দেখছি,তখন আমার উপলব্ধি হয়েছে যে,
মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের জীবনের এমন একটি দিক,যা অবহেলার কারণে আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আমরা যখন “স্বাস্থ্য” বলি,
তখন সাধারণত শরীরের কথাই মাথায় আসে—বুক ধড়ফড় করলে হার্ট,পেট খারাপ হলে লিভার বা পাকস্থলী,মাথাব্যথা হলে স্নায়ু। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, মনও শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বরং বলা যায়,মনই হলো সেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক,যার উপর নির্ভর করে আমাদের চিন্তা,অনুভূতি,সিদ্ধান্ত,এমনকি শারীরিক অবস্থাও।তাই মন ভালো না থাকলে,কিছুই ভালো থাকে না।
আজও আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাটা লজ্জার,অবমাননার বা দুর্বলতার বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
মানুষ আজও মনে করে—“ও তো পাগল হয়ে গেছে” এই ধরনের কথায় কাউকে অপমান করা যায়। অথচ কেউ যদি ডায়াবেটিসে ভোগে, কেউ যদি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়,
আমরা তাকে সেবা করি,সহানুভূতি দেখাই। তাহলে মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে আমাদের মনোভাব এত নেতিবাচক কেন?
আমরা শিখেছি কিভাবে শরীরের যত্ন নিতে হয়—হাতে কেটে গেলে ব্যান্ডেজ দেই,জ্বরে পড়লে ওষুধ খাই, কিন্তু কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে আমরা বলি—“অতিরিক্ত ভেবো না”, “এসব কিছু না”, “ভুলে যাও”। এই কথাগুলো বলতে যত সহজ,বাস্তবে মানসিক কষ্ট ভুলে যাওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া ততটাই কঠিন।
একজন সমাজকর্মী হিসেবে আমি বহু মানুষের জীবনের নানা দিক দেখেছি।
তাদের মধ্যে কেউ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন,কেউ চাকরির চাপ সহ্য করতে পারছেন না, কেউ নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন, কেউ আবার বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়েও সমাজের ভয়ে কিছু বলছেন না।বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী,বয়স্ক মানুষ ও মহিলারা মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।কিন্তু তারা নিজেদের অবস্থার কথা খোলাখুলি বলতে পারেন না।কারণ আমাদের সমাজ এখনও “মন খারাপ” বা “অবসাদ” কে দুর্বলতা হিসেবে দেখে।
আমরা ভাবি—এই তো মন খারাপ,ঘুরে আসলেই ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা,আতঙ্ক,আবেগের অস্থিরতা—এসব আস্তে আস্তে একজন মানুষকে ভেঙে ফেলে, কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, জীবন থেকে আনন্দ কেড়ে নেয়।অনেকে এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নেন,কারণ তারা ভাবেন,এই কষ্ট বুঝতে কেউ নেই।
তাই আমাদের বুঝতে হবে—মন যতটা সূক্ষ্ম, যতটা অনুভূতিপ্রবণ,তার যত্ন নেওয়াটাও ততটাই জরুরি।ঠিক যেমন হৃদপিণ্ড প্রতিনিয়ত রক্ত সঞ্চালন করে, লিভার শরীর পরিষ্কার রাখে,তেমনি মন আমাদের আবেগ, যুক্তি ও আত্মপরিচয় বহন করে। মন ভালো থাকলে আমরা উদ্যমী হই,ভালো কাজ করতে পারি,সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। আর মন খারাপ থাকলে, সব কিছুতেই নেগেটিভ ভাবনা আসে,কাজের উৎসাহ কমে যায়, চারপাশ বিষণ্ন মনে হয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে,আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা।প্রথমেই দরকার মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলা। স্কুল-কলেজ,কর্মক্ষেত্র,পরিবার—সব জায়গাতেই আমাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে আলোচনা চালু করতে হবে।যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি,স্যানিটেশন,পুষ্টি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো হয়,তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশেষ করে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিযোগিতার দৌঁড়ে আজকের কিশোরেরা শৈশব হারিয়ে ফেলছে।পড়ালেখার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা,সামাজিক তুলনা—সব মিলে তাদের মনে অসহনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। অথচ তারা কাউকে বলতে পারে না।বললে আবার শিক্ষক বা অভিভাবকের ধমক খেতে হয়—“এত কিছু ভাবার সময় তোমার না”।
কর্মজীবী মানুষরাও আজ নানা ধরনের মানসিক চাপে ভুগছেন—চাকরির অনিশ্চয়তা,
সহকর্মীদের সাথে দ্বন্দ্ব, পারিবারিক ভারসাম্য রক্ষা করা ইত্যাদি। অথচ অফিসে মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা নেই, কাউন্সেলিং সুবিধা নেই।অনেকে নিজের সমস্যা নিয়ে মুখ খুলতে দ্বিধা বোধ করেন,কারণ তাঁরা ভাবেন এতে হয়তো তাঁকে দুর্বল মনে করা হবে।
আমাদের সমাজে মহিলারাও ভুগছেন একাধিক স্তরের মানসিক যন্ত্রণায়।গৃহস্থালি কাজ,সন্তান প্রতিপালন,সংসারের দায়িত্ব—সব কিছুর চাপে তাঁরা নিজেদের দিকে মনোযোগ দিতে ভুলে যান।postpartum depression বা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা আমাদের সমাজে প্রায় অচেনা।অথচ অনেক মা এই সমস্যায় ভুগছেন,শুধু কেউ তাদের কথা শোনে না।
একইভাবে বয়স্ক মানুষরা ভুগছেন একাকীত্বে, অবহেলায়।
সন্তানদের ব্যস্ত জীবন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা,অবসরজীবনের শূন্যতা—এসব কারণে তাঁদের মনে এক ধরনের হাহাকার জন্ম নেয়।
অথচ আমরা বলি—“বয়স হয়েছে,তাই এমন লাগে”।
প্রতিটি মানুষ,যেকোনো বয়সের,যেকোনো পেশার,
যেকোনো লিঙ্গের,মানসিক সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে।মানসিক স্বাস্থ্যকে যদি আমরা অন্য যেকোনো শারীরিক রোগের মতো স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি,তাহলেই পরিবর্তন আসবে।
আমাদের এখনই সময় হয়েছে একটি মানসিক স্বাস্থ্যবান সমাজ গঠনের।
এজন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি:
১. মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে
২. পরিবারে,বিদ্যালয়ে ও কর্মস্থলে মনোচিকিৎসার প্রাথমিক ব্যবস্থা রাখতে হবে
৩. মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে হবে
৪. কাউন্সেলিং সেন্টার ও হেল্পলাইন চালু করতে হবে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে
৫. মানসিক রোগীদের প্রতি সমাজের মনোভাব বদলাতে হবে
৬. নিজেদের অনুভূতি প্রকাশে উৎসাহিত করতে হবে
আমি বিশ্বাস করি,মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনই কথা না বললে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সংকটে পড়বে।সামাজিক উন্নয়নের জন্য যেমন অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়ন প্রয়োজন,তেমনি প্রয়োজন মানসিকভাবে সুস্থ নাগরিক।
এই সমাজে প্রতিটি মানুষ যদি অন্যের মন বুঝতে চেষ্টা করে,সহানুভূতি নিয়ে কথা বলে, সাহায্যের হাত বাড়ায়,তাহলেই আমরা একটি সহনশীল,শান্তিপূর্ণ ও সুখী সমাজ গড়ে তুলতে পারব।আর সেটাই হবে আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন।
তাই -আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন,অন্যের কথাও মন দিয়ে শুনুন।
মন ভালো থাকলে সব কিছু ভালো লাগবে। আর মন খারাপ থাকলে,পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটাও বিষাদময় মনে হবে।
আমাদের উচিত আজ থেকেই,এই মুহূর্ত থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবা,বলা ও কাজ শুরু করা।
কারণ,সুস্থ মনেই সুস্থ জীবন।
শ্রাবন্তী হাসান : সমাজকর্মী
