লালনের ছেউড়িয়ায় একদিন…

একদিন হুট করে প্ল্যান করলাম কুষ্টিয়া যাওয়ার। এই ভেবে উল্লাসিত হয়ে গেলাম। অনেক দিনের একটা ইচ্ছা পূরণ হতে যাচ্ছে এবার। সকাল সকাল কমলাপুর রেলস্টেশনে আমরা চলে আসি। ট্রেন ছাড়বে ৮:১৫ মিনিটে। ঠিক সময়ে মতো ট্রেন চলে এল। আমরা কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ট্রেনের জানালা থেকে দেখছি, প্রকৃতি কী অপরূপ দৃশ্য! তা দেখে মনটা ভরে ওঠে। দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছালাম দুপুর ১২টায়। স্টেশন থেকে সোজা হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম খাওয়া-দাওয়া সেরে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম ছেউড়িয়ায়। সেদিন লালনমেলা দ্বিতীয় দিন। অর্থাৎ ১৮ অক্টোবর। শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে এত মানুষের ভিড় ছিল যে, তিল পরিমাণ জায়গা নেই। সেদিন লালন প্রাঙ্গন ছিল ভক্ত-শিষ্যদের মিলনমেলায় টুইটম্বুর।
বিকেল থেকে মানুষের ঢল লালনের আখড়ায়। আমরা মিশে গেলাম ভিড়ের মধ্যে। নিঃশ্বাস ফেলাও কোথাও একটু জায়গা নেই। মানুষ আর মানুষ। কী এক অপূর্ব মিলনমেলা।

লালন সাঁই মাজার প্রাঙ্গন। ছবি: লেখক
‘লালন’ যিনি লালন ফকির, লালন সাঁই, লালন শাহ, মহাত্ম লালন ইত্যাদি বহু নামে পরিচিত। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী গান্ধীরও ২৫ বছর আগে তাঁকে ভারত উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ‘মহাত্মা’’ উপাধি দেয়া হয়। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধকদের মধ্যে অন্যতম।
তিনি একাধারে একজন আধ্যাত্মিক সাধক, মানবতাবাদী এবং দার্শনিক। তাঁর অসাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং মানবাতাবাদী চিন্তা ভাবনা তাঁকে মানুষের হৃদয়ের শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর কাছে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও জাতির কোনো ভেদাভেদ ছিল না।
‘জাত গেলো জাত গেলো বলে
এ কী আজব কারখানা’
এই গানে তিনি এ কথাটাই বোঝাতে চেয়েছেন। ধর্ম বা জাত নিয়ে মানুষের যে গোঁড়ামি তা তিনি দূর করতে চেয়েছেন সব সময়। তিনি ছিলেন বহুমুখী চিন্তার অধিকারী। অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক।
লালন তাঁর ব্যক্তিজীবনে জাতি ধর্ম সমাজ এসব থেকে বরাবর দূরেই থাকতে চেয়েছেন। হিন্দু কিংবা মুসলমান দুই সমাজেই বসবাসের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। শেষ পর্যন্ত তিনি তার চিন্তা-চেতনাকে ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সবার উপরে তিনি মানব ধর্মকেই স্থান দিয়েছেন।

লালন সাঁই মাজার প্রাঙ্গনে লেখক
লালন সাঁইয়ের বিশ্বাস ছিল মানুষের ভেতর বাস করে এক মনের মানুষ। আর সেই মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় আত্মসাধনার মাধ্যামে। তাঁর মতে আত্মাকে জানলেই সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়।
মানুষ ভজনই ছিল লালন সাঁইয়ের মূলতত্ত্ব। ‘মানুষের মধ্যেই-ঈশ্বর’ এটাই ছিল লালন দর্শনের অন্যতম প্রধান মতাবাদ। তাঁর বাণী লালন ভক্তদের কাছে এক সাধনার বিষয়। সেজন্য প্রতিবছর এই সময়টায় ভক্ত শিষ্যরা এসে মিলিত হয় এই আখড়ায়।

কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে লেখক
প্রচণ্ড ভিড়ের সেই আমরা মাজার প্রাঙ্গনে বিকেলে আর ঢুকতে পারিনি। তাই আমরা ছুটে যাই কালীগঙ্গা নদীর ধারে, সেখানে হাজার হাজার ভক্ত-শিষ্যরা তাঁবু গেড়ে আশ্রয় নিয়েছে। বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন খাবার দাবার আর হরেক রকমের জিনিসপত্র।
সন্ধ্যার পর মূল মাজার প্রাঙ্গনে আমরা গেলাম। চিক্চিক্ আলোকসজ্জায় পুরো আখড়া আলোকিত। শিল্পীদের গানে গানে মজে গেলাম ভক্ত আর দর্শনার্থীদের মধ্যে। সেই স্মৃতিটুকু মনে ভেতরে জিয়ে রবে আজীবন।
