শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষা দান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়

‘ওঁস্তাদে প্রণাম করোঁ পিতা হন্তে বাড়,
দোসর জনম দিল তিঁহ সে আক্ষ্মার।’

শিক্ষক বা শিক্ষাগুরু ক্রমপর্যায়ে মানুষকে রূপান্তরিত হতে সহায়তা করে থাকে। মানবজীবনের শুরুতে শিক্ষাগুরুর সঙ্গে একজন শিশুর আত্মার মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়। শিশুর প্রথম শিক্ষক পিতামাতা; পরিবারের থেকেই শিশু শিক্ষাযাত্রা শুরু করে। এ শিক্ষা জীবনচলার পথে ক্রমবর্ধমান।

আমার জীবনে প্রথম শিক্ষাগুরু উন্নতদর্শন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন্ আমার বাবা এবং আমার ঋজু ব্যক্তিত্বের স্বল্পভাষী আম্মা। আমি ছোটবেলায় বোধবুদ্ধিতে সবে শান লাগছে সেই সময় তারা সামাজিক আদব-কেতা শিখিয়েছেন আমাকে। স্কুলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের সাহচার্য আমাকে এমন সমৃদ্ধ করেছে যে তা এ অবধি বয়ে চলছি। আব্বার কাছে প্রথম রোজ নিয়ম করে অক্সফোর্ড ডিকশনারি থেকে পাঁচটি করে বাক্য শেখা, বাংলা অভিধান থেকে পাঁচটি করে বাক্য শেখা, রোজ বাংলা পত্রিকা পড়া, রোববার ছুটির দিনে ইংরেজি পত্রিকা পড়ে শোনানো,সপ্তাহন্তে সেসবের উপর ঘরোয়া পরিবেশে পরীক্ষা দিয়ে পুরস্কার জিতে নেয়া,পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি দেশবিদেশের নানা বই পড়ার চলন -এসব অনুশাসনের মাঝে শিখতে শিখতে বড় হয়েছি। আম্মা শিখিয়েছেন মানুষ হওযার সাথে সাথে প্রাণে কীভাবে বাঙালি হওয়া যায় তার মূলমন্ত্র। একটা কথা বলতেন মানুষ হয়ে ওঠার জন্য অনেক কষ্ট করা দরকার।

আর মানবিকচর্চা দরকার সবচেয়ে বেশি। সদা সত্য কথা বলা, গুরুজনকে মান্য করা, কাউকে না ঠকানো,জীবে দয়া করা, সেই চর্চাগুলো আমরা ভাই-বোনরা চেষ্টা করেছি কথাগুলো মেনে চলার জন্য। আমাদের ভাই-বোনদের চলার পথে বাবা-মার সেই শিক্ষাগুলো গভীরভাবে কাজে লেগেছে। 

একজন শিক্ষক শুধু মাত্র শিক্ষা দান করেন না শিক্ষার্থীদের মানবিকতা নৈতিকতা চরিত্র গঠন সর্বোপরি যে বিষয়টা দরকার সেই ইথিকস বা মূল্যবোধ চর্চা সেগুলোকে করে তোলার জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন মানুষের চলার পথে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকের কথাই বলা নয়, নানাজন শিক্ষকের ভূমিকা অবতীর্ণ হন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম,সক্রেটিস, আর্নেস্ট হামিংওয়ে, কবি মাহমুদ দারবিশসহ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, মহাশ্বেতা দেবীসহ নানা ব্যক্তিত্ব শিক্ষাগুরুর কাঙ্খিত ফল প্রকাশে কাজে এসেছেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী-দুইটি সমার্থক শব্দ। শিক্ষক শুধুমাত্র একজন শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার কাজটা করে দিয়ে শুধু ক্ষান্ত হন না। শিক্ষার্থীর আর ব্যক্তিত্বে গভীর প্রভাব ফেলে যা পরবর্তী জীবনে ওই শিক্ষার্থীর জন্য। আমার অনতিদীর্ঘ সময়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি এমন অগ্রজদের জন্য।

আসলে একটা ট্র্যাকের মধ্যে বাবা মা তার প্রতিটি সন্তানকে গড়ে তোলেন, প্রথমকার শিক্ষাগুরু তাঁরাই। পরবর্তী সোপান তৈরি করেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। শিশু থেকে বড়  হওয়ার পথ পরিক্রমায় শিক্ষকের ভূমিকাতে আছে। কেননা পরিবারের পর দীর্ঘসময় শিশু প্রতিষ্ঠানে থাকায় শিক্ষককে ফলো বা অনুসরন করে বড় হয়। শিক্ষকদের আচরণ নীতিকথা নৈতিকতা এবং সাহচার্যে তারা বেড়ে ওঠে  প্রতিটি শিক্ষক তাদের কাছে একজন শিক্ষাগুরু এবং দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। আমার জীবনেও শিক্ষাগুরুর গুরুত্ব কম নয়। আমি যখন আজিমপুর গার্লস সরকারি স্কুলে পড়তে শুরু করি সেই সময় যে শিক্ষক দুইজনের সাহচার্য পেয়েছি তারা হলেন সিতারা ম্যাডাম ও ফুলবানু ম্যাডাম। তারা আমার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিলেন নেপথ্যে থেকে। আরেকজন ম্যাডাম আমাদের সেলাই-ফোঁড়াইয়ের কাজ শেখানোর পাশাপাশি নানা নৈতিকশিক্ষা দিয়েছেন। এই মুহূর্তে তাঁর নাম স্মরণ করতে পারছি না। তিনি নানা দিক নির্দেশনা দিতেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলছি, এ তিনজন শিক্ষক আমার জীবনে আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করেছেন। তারা ক্লাসের শিশুদের ভীতি কমিয়ে দিতেন তাদের স্নেহজাড়িত মায়ায়।  আরেকজন গুণী শিক্ষকের সাহচার্য পেয়েছিলাম। তিনি বাংলা পড়াতেন। নবম-দশম শ্রেণীতে তাকে পেয়েছিলাম। ম্যাডাম আমার স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে পারার কারণে দ্রুতপঠন করাতেন। একবার ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আমাকে দিয়ে তার সিলেক্ট করা একটা কবিতা আবৃত্তি করিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত তার নামটা মনে করতে পারছি না। কলেজে এসে আমাকে বাংলার শিক্ষক বদিউজ্জামান স্যারের ক্লাসে পাঠদান পদ্ধতিতে আপ্লুত করেছিলেন। আমি পরবর্তী জীবনে শিক্ষকতা পেশায় তা অনুসরণ করেছিলাম।

বলতে দ্বিধা নেই যে, সর্বোপরি যে মানুষটি শিক্ষাগুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের এই পুরাধা ব্যক্তিত্ব পরবর্তী জীবনের যখন আমি শিক্ষকতায় প্রবেশ করেছি তার শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর ধরন ও পদ্ধতি ফলো করেছি। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আজও আমার শিক্ষাগুরু। শিক্ষকতা পেশায় আমার অন্তর্ভূক্তি ছিল একেবারেই নাটকীয়। যে শিক্ষাগুরুর হাত ধরে বগুড়ায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষক হিসেবে প্রবেশ করলাম। সেখানে দুইজন ব্যক্তিত্ব আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। একজন তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার(সিও) আ ফ ম মাসুম রাব্বানী ও প্রিন্সিপাল তোফাজ্জল হোসেন। আমি মনে করি এই প্রতিষ্ঠানের স্বর্ণসময় ছিল সেসব বছরগুলো। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজসেবার কাজ করতাম। স্যার তিনি মনে করলেন আমি যদি শিক্ষক হই তাহলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবার পর যথারীতি স্যার একটি টিম গঠন করে শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে নানা কার্যিক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। সংস্কৃতিচর্চা, দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ , নাট্যাভিনয়, বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ, বন্যার্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসা, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংকটে কাউন্সিলিং করাসহ নানাকাজ করেছিলাম।  দুই একটি কাজের কথা বলা যেতে পারে।

দেশে তখন ইভটিজিং এর কারণে অনেক মেয়ে আক্রান্ত হচ্ছিল এবং আত্মহত্যার খবর পাওযা যেতো। তোফাজ্জল স্যারের প্রচেষ্টায় গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর বিজ্ঞাপন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান থেকে নাট্য ব্যক্তিত্ব আলোক বসু’র স্ক্রিপ্ট রাইটিং ও রেজাউর রহমান পিপলু’র পরিচালনায়
ইভটিজিং নিয়ে একটা বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল। আমিসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী সেই বিজ্ঞাপন চিত্রে অংশ নিয়েছিলাম। আরেকটি ঘটনার কথা বলতে হয়, মেয়েদের অনেকেই মাসিক হরে আযার সাথে বাসায় চলে যেতো। তাতে সাময়িক ড্রপআউট হতো, এটা রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটারী প্যাড সংরক্ষন করার সিদ্ধান্ত নিযেছিলেন তোফাজ্জল স্যার। তাঁর নির্দেশনায় আমরা কয়েকজন এ দায়িত্ব পালন করতাম।, পাঁচ টাকার বিনিময়ে মেয়েরা স্যানিটারি প্যাড পেতো। তোফাজ্জল স্যারের তত্ত্বাবধানে বছরে একবার দফায় দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বনভোজনের আয়োজন করা হত।

বাসভর্তি করে শিক্ষার্থীরা হৈ হৈ করতে করতে যেত আর আসত। দেখেছিলাম যে শিক্ষার্থীদের যে ধরনের এবং মানসিক গঠনের জন্য পড়ালেখায় তুলনামূলক পেছিয়ে থাকত তাদের আমরা বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করে সাহস জোগাতাম। মুখচোরা শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিখতে উদ্বুদ্ধ হতো। সেই সময়গুলোয় এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করত এপিবিএন।

এছাড়া স্যারের স্যারের নেতৃত্বে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা একটা সুশৃংখল প্রতিষ্ঠানকে চালাতে সক্ষম হয়েছিলাম। স্যার যেদিন বিশেষ কোনো ক্লাস নিতেন তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শোনার জন্য শ্রেণিকক্ষ উপচে বাইরেও শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। তিনি সবসময় শিক্ষার্থীদের মানবিক শিক্ষার চর্চা করতে বলতেন।

প্রমথ চৌধুরীর একটি উদ্ধৃতি আমি আমার জীবনে ধারণ করেছি। সেইটুকু উল্লেখ করবার তাগাদা অনুভব করছি ভেতর থেকে। তা হলো, ‘শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষা দান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন। তার কৌতুহল উদ্রেক করতে পারেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারেন, মনোরাজ্যের ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন, তার জ্ঞানপিপাসাকে জ্বলন্ত করতে পারেন, এর বেশি আর কিছু পারেন না। যিনি যথার্থ গুরু,তিনি শিষ্যের আগ্রহকে উদবোধিত করেন এবং তার অন্তর্নিহিত সকল প্রচ্ছন্ন শক্তিকে মুক্ত এবং ব্যক্ত করে তোলেন। সেই শক্তির বলে সে মন নিজে গড়ে তোলে,নিজের অভিমতবিদ্যা নিজে অর্জন করে। বিদ্যার সাধনা শিষ্যকে নিজে করতে হয়। গুরু উত্তরসাধক মাত্র।’

আমি যখন শিক্ষক হলাম তখন আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাদের শিক্ষা পদ্ধতি আমি বেছে নিয়েছিলাম এবং আমার মনে হয়েছিল যে এ ধরনের শিক্ষা এদের প্রদান করলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক শিক্ষা ও চর্চা করতে পারবে। সে কারণে আমি প্রচলিত পঠন-পাঠনের বাইরে গিয়ে অগ্রজ ও উল্লেখিত ব্যক্তিত্বদের পড়ানোর ধরনকে ধারন করেছিলাম। শিক্ষার্থীদের মনোজগতের খবর শিক্ষক রাখতে পারলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে যে বন্ধন তৈরি হয় তা পরবর্তীতে একজন শিক্ষার্থীকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে থাকে।

চলার পথে অগুনতি মানুষ পেযেছি যারা আমাকে সমৃদ্ধ করেছেন। মনে করি তাঁরাই নমস্য, তাঁরাই আমার শিক্ষাগুরু।

সেলিনা শিউলী সিনিয়র রির্পোর্টার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

আরও পড়ুন