বাঙালির বিজ্ঞান সাধনায় জগদীশচন্দ্র বসু

একটি দেশ জাতি রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে বিজ্ঞান চর্চা সাধনা গবেষণা বিজ্ঞানমনস্কতার গুরুত্ব অপরিসীম। এ কথা অনুস্বীকার্য ওই বিশেষ জ্ঞান শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে যুক্তি কারণ জানার অদম্য আগ্রহ চেতনার পরিপূর্ণ বিকাশ। দেশের আর্থসামাজিক প্রগতির ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের প্রভূত অবদান। বিজ্ঞান সাধনা ও চেতনাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের স্পষ্ট দিশা। বিজ্ঞান সাধনায় ব্রতী হয়ে যারা ভারত তথা বিশ্বকে উন্নতির চূড়ান্ত শিখরে প্রতিষ্ঠা করেছেন, মানবজাতিকে করে তুলেছেন ব্রহ্মান্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব, তাঁদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু । যিনি নিজের জ্ঞানের আলোয় ভারত তথা বিশ্বকে আলোকিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে যে কয়েকজন বৈজ্ঞানিকের কথা জানা যায়, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম তিনি তাঁর সময়ে বাঙালী বিজ্ঞানীদের মধ্যে পরীক্ষাভিত্তিক বিজ্ঞান চর্চায় ছিলেন অগ্রগণ্য। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। এখন একটি মজার বিষয় হল আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় মূলত পদার্থবিদ চর্চার জন্য। যদিও, সেই চর্চার প্রসঙ্গ এখন তোলা থাক। তবে, হঠাৎ তিনি এমন গাছ-গাছালি নিয়ে মেতে উঠলেন কেন? তিনি নিজেই এর উত্তর লিখে গেছেন। গাছের প্রতি তাঁর টান আশৈশব। তাঁরই কথায়, “গাছের জীবন মানুষের জীবনের ছায়া মাত্র”। তিনি আরও লিখেছেন, “গাছের প্রকৃত ইতিহাস সমাধান করতে হইলে গাছের নিকট যাইতে হইবে। বৃক্ষ লিখিত সাড়া দ্বারা তার জীবনের গুপ্ত ইতিহাস উদ্ধার হইতে পারি। তাই, তাঁর এই নিরলস ইতিহাস খুঁজে চলা, খুঁজতে খুঁজতে যা পেয়েছেন তাকে স্থাপন করা।

এবার এই বাঙালী বিজ্ঞানী, তাঁর জীবন ও আবিষ্কার নিয়ে জানা যাক। বাঙালির বিজ্ঞান সাধনায় সর্বাগ্রে স্মরণ করা হয়, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর নাম। তিনি বিজ্ঞানের নানাবিধ গবেষণা ও প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেন। ৩০ নভেম্বর ১৮৫৮ সালে অধুনা বাংলাদেশে জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রখ্যাত ডেপুটি কালেক্টর ভগবান চন্দ্র বসু, মাতা বামাসুন্দরী দেবী। ব্রিটিশ আমলে জন্ম নিয়েও জগদীশ চন্দ্রের শিক্ষা জীবন শুরু হয় স্বদেশী ভাষায় অর্থাৎ বাংলা ভাষায়। সেই সময়ে অভিভাবকেরা নিজের সন্তানকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ছিলেন সবসময় তৎপর। জগদীশ চন্দ্রের এই পারিপার্শ্বের থেকে উল্টো স্রোতে গা ভাসানোতে অর্থাৎ বাংলা ভাষায় শিক্ষাজীবন শুরু করতে তাঁর পিতার ভূমিকাই ছিলো বেশি। পিতা ভগবান চন্দ্র বসু বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষাগ্রহণের জন্য সর্বপ্রথম চাই নিজের মাতৃভাষাকে ভালোভাবে রপ্ত করা এবং দেশপ্রেমকে অন্তরে ধারণ করা। তারপর না হয় বিদেশী ভাষা শেখা যাবে। সেই যুগে এমন চিন্তা-ভাবনার কথা কেবল কোনো স্বদেশপ্রেমিকের মুখেই মানাতো।আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বন্ধু। রবীন্দ্রনাথ জগদীশ চন্দ্র বসুর তিন বছরের ছোট হলেও তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল আমৃত্যু। একজনের হাতে বিকশিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য আর একজন করেছেন বাংলায় বিজ্ঞান রেনেসাঁর সূচনা।

বাঙালিরাও বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে নিউটন-আইনস্টাইনের চেয়ে কম যায় না তিনি তা প্রমাণ করেন। জগদীশ চন্দ্র যে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী তার স্বীকৃতি দিয়েছিল লন্ডনের ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকা, ১৯২৭ সালে। আর আইনস্টাইন তার সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, ‘জগদীশচন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋষিতুল্য বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে বলেছেন, ‘ভারতের কোনো বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি হে আর্য আচার্য জগদীশ।’প্রফেসর হিসেবেও তাঁর কীর্তি কম নয়। তাঁর স্নেহধন্য ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সত্যেন্দ্র নাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, প্রশান্ত চন্দ্র, মহলানবিস, শিশির কুমার মিত্র, দেবেন্দ্র মোহন বসু সহ আরো অনেক। পরবর্তীতে এঁরা সবাই বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। বাঙালির বিজ্ঞান মনস্কতা ও চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে তার প্রতিষ্ঠিত বসু বিজ্ঞান মন্দির এখনো সেই  ধারাবাহিকভাবে তরুণ বাঙালির বিজ্ঞান মেধা উন্মেষে কাজ করে চলেছে। আজ থেকে প্রায় সোয়া শ বছর আগে একটি পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে জগদীশচন্দ্র বসু মানবসভ্যতাকে একটি বড় ঝাঁকুনি দিয়েছেন। সেই মাত্রায় না হলেও যদি আমরা তাঁর মতো বিজ্ঞানকে ভালোবেসে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলেই কেবল এই বিজ্ঞানীর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারব।আজকে দিনকে দিন যখন বাঙালি বিজ্ঞান চর্চা প্রসার ক্ষেত্রে তার গৌরব হারিয়ে ফেলেছে বিজ্ঞানকে আরও বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিজ্ঞান মনোভাব গড়ে তুলতে যুক্তিবাদী চেতনা নির্মাণে কুসংস্কার ধর্মান্ধতা দূর করতে বিজ্ঞনাচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর দেখানো পথেই আমাদের হাঁটতে হবে সেখানেই মিলবে উত্তরণ।তার বিজ্ঞান নিষ্ঠা বিজ্ঞান অনুরাগ বিজ্ঞান ভাবনা সর্বোপরি বিজ্ঞান চেতনা প্রত্যেক বাঙালির মধ্যে জাগ্রত হোক। এই বেদ বাক্যই মনে প্রানে আঁকড়ে ধরে স্মরণ করি তার জন্মদিবস পালনে। 

পাভেল আমান: হরিহরপাড়া, মুর্শিদাবাদ

আরও পড়ুন