দশমাশ্চর্য

প্রিয়,
প্রকৃতি তোমায় এক অপার সমৃদ্ধতায় নির্মাণ করেছেন কিছু সৃষ্টি করার জন্য, কিছু ব্যাপ্তি ঘোষণার জন্য। এই বিরাট ব্যাপ্তির মাঝে কিছু প্রকাশ ক্ষুদ্র হয়ে দেখা দেয়। তোমার মহার্ঘ্য সম্পুর্নতায় তুমি সেই ক্ষুদ্রতাকে আড়াল করার ক্ষমতা রাখো। তোমার পবিত্র মন এবং মননকে আমি শ্রদ্ধা করি।
ইতি,
অধরা।
চিঠিটি পড়ে সামান্য চিন্তায় পড়ে গিয়েছে নিষাদ। অধরা নামে ফেসবুকে তাঁর কোনো ফ্রেন্ড নেই। ছদ্মনামের কোনো আইডির সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। তাঁর প্রোফাইলটি লক করা। গত কয়েকদিন যাবৎ ফেসবুকে চিঠি লেখার হিড়িক পড়েছে। চিঠি ডটকম অ্যাপে সহজে রেজিষ্ট্রেশন করে নির্ধারিত ইউজার অ্যাড্রেসে যে কেউ চিঠি লিখে পাঠাতে পারে নাম, ঠিকানা গোপন করে। তাঁতে চিঠি প্রেরকের সম্পুর্ন পরিচয় গোপন থাকে। এই সুবিধের জন্য ইদানীং প্রায় অনেকে অনেককে চিঠি লিখছে, আবার সেসব চিঠি এবং চিঠির উত্তর ফেসবুকে নিজেদের টাইমলাইনে শেয়ার করছেন সবাই। নিষাদও চিঠি ডটকমে রেজিষ্ট্রেশন করে ইউজার অ্যাড্রেসটি ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছিল- প্রেমপত্র পাওয়া হয়নি কখনো। অন্তত কেউ একজন আমাকে লিখুন।
ব্যাস! পোস্টের তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে চিঠি ডটকম অ্যাপের মেইলবক্সে একটি চিঠি এসেছে। চিঠিটি ওপেন করতে গিয়ে নিষাদের চোখে পড়ে তাঁতে লেখা— খুব জানতে ইচ্ছে করে তোমাকে এবং তোমার হৃদয়কে।
নিষাদ বিস্ময় নিয়ে চিঠিটি কয়েকবার পড়েছে। কোনো নাম ঠিকানা নেই, কে এই অদৃশ্য মানবী? প্রশ্ন জাগে নিষাদের মনে। চিঠি ডটকম অ্যাপে চিঠিগুলো রিল্পাই লেখার কোনো অপশন নেই। সবাই চিঠিগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে পোস্টের মাধ্যমে উত্তর লিখে। নিষাদও তাই করেছে। তাঁর ফেসবুকের টাইমলাইনে গিয়ে চিঠিটির স্ক্রিনশট শেয়ার করে লিখেছে- আমি জানিনে তুমি কোন অধরা আমার হৃদয়কে জানতে চেয়েছো। পৃথিবীতে এতো মানুষের হৃদয় থাকতে আমার হৃদয়কে কেন তোমার জানা ইচ্ছে হয়েছিল, জানাবে কিন্তু। তোমার চিঠির অপেক্ষায়।
চিঠি ডটকম অ্যাপের নোটিফিকেশন এসেছে। নিষাদ মেইলবক্সের নতুন চিঠিটি ওপেন করে পড়ছে— কি লিখবো জানিনে। না লিখেও পারছিনে। কারণ, তুমি অপেক্ষা করছো আমার চিঠির জন্য। তুমি আমার জন্যে অপেক্ষায় থাকো, তা আমি চাইনে। অপেক্ষার যন্ত্রণা মৃত্যুর যন্ত্রণার মতো। জানি তোমার ধৈর্য্য আছে, কিন্তু আমার কোনো ধৈর্য্য নেই। মানুষ ভাবে, ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ধৈর্য্য বেশি। মানুষের এ ভাবনা সম্পুর্নই ভুল। মানুষ তো কত কিছুই ভাবে। ধৈর্য্য হচ্ছে একটি গুন। গুন যিনি অর্জন করেন, তিনিই গুনী। গুনের কোনো বিশেষ জাত-লিঙ্গ নেই। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, গোরবে পদ্মফুল ফুঠে। পদ্মফুল মূলত গুন। গুনের বিকাশ যেকোনো পরিবেশে পরিস্ফুটিত হতে পারে। পদ্মফুল গোরবে ফুটুক কিংবা জলে, দিনশেষে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হতে থাকে। গুনের সঙ্গে আগুনের শাব্দিক একটা যোগসূত্র রয়েছে। আগুন জ্বলে যেমন সকলকে আকর্ষণ করে, তেমনি গুনও। মাটির চুলোয় আগুন নিভে যাওয়ার উপক্রমের আগেই প্রতিনিয়ত তাঁতে প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে আগুন ক্রমস উর্ধ্বমুখি করে নিতে হয়। তেমনই গুন। গুন থাকতে গুনের কদর করতে হয়, নতুবা একবার বেগুন হয়ে গেলে তা আর ফিরে পাবার সম্ভাব্য পথ থাকে না।
ইতি,
অধরা।
নিষাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ক্রিনশটটি ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছে— গুন সম্পর্কে তোমার লেখাটি পড়লাম। চমৎকার লিখেছ তুমি। তুমি নিজেও একজন গুনী। তোমার এ গুন প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু আমার চিঠির সঠিক উত্তর আমি এখনো পাইনি। আশা করি শীঘ্রই পেয়ে যাবো।
‘আবারও লিখছি। প্রতিটি মানুষের মাঝে ষড়রিপু বাস। ষড়রিপু বলতে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য বাদেও আবেগ নামের স্বতন্ত্র একটি ক্রিয়া রয়েছে। আবেগ সর্বদা নদির তরঙ্গের মতো। তরঙ্গ অধীর, অশান্ত প্রকৃতির। সর্বদা প্রফুল্লচিত্তে ছুটে চলে। এই আবেগ তরঙ্গে যখন মনমাঝি তাঁর দেহতরণী চালাতে চায়, তখনই তরঙ্গের তালে দেহতরণীতে ঝাঁকুনি আসে। মায়া নদিতে নৌকা ডুবে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। মনমাঝি যদি আবেগ তরঙ্গের দুর্গম যাত্রা থেকে দেহতরণীকে সুকৌশলে বিবেকের কিনারায় ঝাপ্টা মেরে থেমে যেতে পারে, তবেই সে সুদক্ষ মাঝি। বলা বাহুল্য, একজন বিবেকবান মানুষ স্বয়ং জাগ্রত ঈশ্বর। বিবেক সম্পন্ন ব্যাক্তি একটি মানবিক সত্তা। মানুষকে ‘মানবিক’ হতে হবে। ধার্মিক হওয়ার চেয়ে মানবিক হওয়া জরুরি। সমগ্র বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, শিখ, আস্তিক-নাস্তিক, সহ নানাবিধ ধরনের মানুষ রয়েছে। কিন্তু মানবিক কতজন বলতে পারো?
ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ, আমি বরাবরে মতো তোমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছি। অন্য সময় লিখবো। এখন আমার ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাব। শুভরাত্রি।’
ইতি,
অধরা।
নিষাদের মেইলবক্সে অনেকগুলো চিঠি এসেছে জমেছে। প্রতিটি চিঠির প্রেরক আলাদা। কেউ নাম মেনশন করছে না। শুধু লিখে যাচ্ছে। আচ্ছা, মানুষ নাম প্রকাশে এতো ভয় পায় কেন? মেসেঞ্জারেও কথা বলায়। কিন্তু কেউ তো এভাবে তাঁকে মেসেঞ্জারে নক করেনি। ছদ্মনাম ব্যবহার করে নির্দ্বিধায় যা বলা যায়, তা নাম প্রকাশ করে করা যায় না। একদিন একটি পোস্টের কমেন্টের রিপ্লাইয়ে ফারজানা আলহামদুলিল্লাহ নামের মধ্যবয়স্কা মহিলা নিষাদকে মেনশন করে লিখেছিল— যারা চিঠি ডটকমে চিঠি লিখছে নিজের পরিচয় গোপন করতে পারছে বলেই লিখছে। একই ব্যক্তি ইনবক্সে চিঠির মতো রোমান্টিক ভাষায় লিখবে না পরিচয় জেনে যাবে বলে।
প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই একজন ক্রিমিনাল বাস করে। এই বেনামি চিঠি মেসেজ দেয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এরা ফুলেফেঁপে আরো বেড়ে উঠছে। কোন অসুখ বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করে পরামর্শ চাওয়া দোষের নয় কিন্তু ফেসবুকে যাদের চিঠি লেখা হয় এরা কেউই প্রফেশনাল বা বিশেষজ্ঞ নন। Jism সিনেমায় একটি সুন্দর কথা বলেছিলো, ‘প্রত্যেক মানুষের ভেতরে দুইটি কুকুর বাস করে। একটি ভালো অপরটি মন্দ,তুমি কোনটাকে খাবার দিয়ে পুষ্ট করবে সিদ্ধান্ত তোমার!’
নিষাদ জানে না কে বা কারা তাঁকে এতো চিঠি লিখছে। অথচ আজ পর্যন্ত অপরিচিত কেউ মেসেঞ্জারে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে নক করেনি। কিন্তু চিঠি লিখছে। প্রতিটা চিঠির ভাষা, শব্দের গঠন ও বাক্যের ব্যবহার বারংবার মুগ্ধ করছে নিষাদকে। কেউ একজন নিষাদকে চিঠি লিখতে গিয়ে লিখেছে:
প্রেম কি আমার জানা নেই। তবে তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছি অজান্তেই। তোমার প্রতিটা ছবিতে আমি নিষ্কাম স্পর্শ করি। কয়েকদিন আমার মোবাইলের প্রোফাইলেও তুমি ছিলে। তোমার আমার বয়সের পার্থক্য অনেক। ওটা ব্যাপার না।
ইতি,
দশমাশ্চর্য।
নিষাদ কৌতূহল নিয়ে চিঠিটি স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছে- দশমাশ্চর্য, আপনার বয়স কত?
এর কিছুক্ষণের মধ্যে আরেকটি চিঠি এসেছে চিঠি ডটকম অ্যাপের মেইলবক্সে। চিঠিতে লেখা:
বয়স বাড়তে থাকুক। প্রতি দিনই বয়সের সংখ্যা বাড়ছে। সংখ্যার যোগফল করে কোনো লাভ নেই।
লেখাটি পড়ে শেষ না করতেই আরেকটি চিঠি এসেছে মেইলবক্সে। নিষাদ ঐ চিঠিটিও পড়ছে:
নিষাদ,
জানিনা কোন অভিযোগের কাঠগড়ায় আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন পিঞ্জিরাবদ্ধ পাখিদের মতো। কোন অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে আমার হৃদয়কে প্রসারিত করছেন দিন দিন। আমার অখন্ড প্রেম, নিষ্কাম ভক্তির বদৌলতে আমাকে যে উপেক্ষা আপনি করছেন, তা কি সত্যিই আপনার স্বইচ্ছায়? নাকি মনের বিরুদ্ধে শুধু শুধু অভিমানী হয়ে আছেন? আমি তো আপনাকে কোনো বাঁধনে আবদ্ধ করতে চায়নি; আপনার স্বপ্ন নির্মাণে বাঁধ হতে আসিনি; জাগতিক কলুষিত সম্পর্কে জড়াতে বলিনি; শুধু প্রার্থনা করেছিলাম আপনার একটু আশ্রয়। তাহলে কিসের এতো সংকোচ? আমাকে বঞ্চিত করে হতভাগীর হৃদয়কে অনুগ্রহ করে আর প্রসারিত করবেন না, আর ক্ষত বাড়াবেন না। তাহলে সেই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে গিয়ে আপনি নিজেই পড়ে যাবেন।
নিষাদ শরীর থেকে কাঁথা সরিয়ে রুমে আলো জ্বালিয়েছে। বিছানার একপাশে তাঁর মোবাইল। মোবাইলের স্ক্রিনে তখনো লেখাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সে নির্বিকার তাকিয়ে আছে দেয়ালের দিকে। ভাবছে, কে সে? কাকে সে নিরপরাধ ভাবে অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এমন কারোর সঙ্গে তো তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। লাস্ট যে মেয়েটি তাঁকে প্রপোজাল পাঠিয়েছিল, তাঁরও বিয়ে হয়ে গিয়েছিল কোভিডের সময়। এরপর তো কারোর কোনো প্রস্তাব তাঁকে বিমোহিত করেনি। বরং সে নিজে একবার প্রপোজাল পাঠিয়েছিল বরিশালের অপুকে। মেয়েটিকে ইমপ্রেস করার জন্য নিষাদ তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলের নাম নিষাদ মোহাম্মদ থেকে নিষাদ শাহ করেছিল। কিন্তু মেয়েটি রাজি হয়নি। মেয়েটি একবার তাঁকে বলেছিল, আপনি একশো দিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রাখুন, দেখবেন আমাকে আপনি নিশ্চয় ভুলে যাবেন। আর যদি না হয় তবে একশো দিন পর আবারও আমাদের কথা হবে।
নিষাদ মেয়েটির কথাটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। কথামতো একশো দিন অপেক্ষা করার পরেও মেয়েটি তাঁকে বুঝতে চায়নি। হরিশংকর জলদাস বলেছিলেন, নারী বিবর্জিত পুরুষেরা ভয়াল হয়ে থাকে। নিষাদ এটি জেনেও নারী বিবর্জিত থাকে। নারীরা কখনোই পুরুষের ভালোবাসার কদর বুঝেনি। বুঝলেও দেরি করে। তাঁর মানে অপু? অপু তাঁকে বুঝতে পেরে অতীতের তলহীন সংশয়ে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে? কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি নিষাদ।
প্রিয়,
কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।’
প্রতিটা হৃদয়ই আল্লাহর আরশ। প্রচলিত ধর্ম মানুষ এবং আল্লাহর মধ্যে পৃথিবী থেকে সাত আসমান সমান দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে। আমি এ-ও জানি, আমরা প্রত্যেকেই সত্য(আল্লাহময়)! কিন্তু সত্যি করে বলো তো, কখনো কি হৃদয়ে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে? কোন এক পূর্ণিমার রাতে, ধূপের গন্ধে আলো নিভিয়ে পূর্ণিমার জোছনায় নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে কি?
হৃদয়কে জানা, স্বয়ং নিজকে নিজে জানা। মহানবি বলেছিলেন— যে নিজেকে জেনেছে, সে তাঁর আল্লাহকে জেনেছে। সক্রেটিস বলেছিলেন— নিজেকে জানো। নজরুল বলেছেন— আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি তোমাকে এবং জানতে চাই তোমার হৃদয়কে। কারণ, তুমিও মহান স্রস্টার একজন সৃষ্টি। তোমার হৃদয়ের মন্দির-কাবায় আমি দর্শন করতে চাই।
আমি জানি, যা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তা আছে মানব দেহে। নিজেকে জানলেই সমগ্র সৃষ্টিকে জানা হয়। কেননা, তুমি-আমি আমরা সবাই এক। তোমার থেকে আমি আলাদা নই, আবার আমার থেকে তুমি আলাদা নও। আমি-তুমি মাঝের লীলারহস্য ভেদ করতে পারলেই তৌহিদ কিংবা একত্মাবাদে পৌঁছানো যায়।
তোমায় আবারও চিঠি লিখবো। এখন আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। চা বানিয়েছি, চা পান করবো। তোমার আশেপাশে চা-য়ের সুযোগ থাকলে একটু চায়ে চুমুক দাও। ভালো লাগবে।
ইতি,
অধরা
