এম আর আলম ঝন্টুর কবিতাগুচ্ছ

নিভৃতচারী মানুষ
এক নিভৃতচারী মানুষ অকল্যাণ যাত্রায় পিছলে পা
সারেগামা সুর অন্তর্জল নিস্তরঙ্গ।
জলতরঙ্গ ব্যাঞ্জনায় ছলছল আঁখি তার।
বীণার তারে আমি জড়িয়ে গেছি সেই কবে!
আমি জড়িয়ে যাই দিগন্তের কাছে গোধূলি বেলায়।
তুমি বলেছিলে, অবিবেকী আমি
পারিনি স্পর্শ দিতে স্পর্ধায়। ছিড়ে ফেলে বীণার তার।
ভৈরবী বৈভবে। অশনিসংকেত। কাটেনি আঁধারিয়া
সুপ্রভাত। আমি এমনই! এমনই আমি নির্বাক।
হতবাক ধরিত্রীতে বিছিয়ে দিই লালজমিন। সুখময়।
দুঃসংবাদ বয়ে আনা বহতা নদী গভীরতর। গভীরে।
আমি তো দিক ভুলে যাই, ফেরাও নতুন পথ
সমূখে মেলে ধর নবনীতার শাড়ির আঁচল। একরকম
সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। বেমালুম মাদকতায় নিশাচরী
আবেগময় চোখে বাঁধ ভেঙে যায়। অহম বিতশ্রদ্ধা।
তুমি ছুঁয়ে দিলে হারায় সন্যাস। সুদূরে হই সুদূরপরাহত।
তবু ছুঁয়ে দিতে চাই উদোম পিঠে বুলিয়ে হাত। নির্ঘাত
অপমৃত্য থেকে! তুমি ফিরিয়ে আনো বন্ধ দুয়ার খুলে।
দেখি তমসাবৃত দিন, নীলাকাশ শরত মেঘের ভেলা।
নেমে আসে অঝোর কান্না, মেঘমালায়। আমি মেঘ
হয়ে যাই, তোমাকে নিবিড়ভাবে পেতে অসময়ে সময়।
আমি ফুল হতে চাই! ফুলবাগানে তোমারই
সুবাস খুঁজি, নিরপেক্ষ বিভোর।
বিভক্ত বলিরেখা কপালে ভাজ ফেলে অসাড় দেহজ
কথন। কথামালায় আজ তাকেই খুঁজে নিই, বসন্ত
এসে যায়। প্রণয় অভিধানে একটি নামই জ্বলজ্বল করে।
কেমন আছো তুমি?
তেপতির এই পথটাকে তেপান্তরের বিরানভূমি মনে
হয়। আমি নিশ্চিত হয়ে দেখি অবয়ব অবন্তিকার।
সংগীতের কোনো ভাষা হয় না, বাণীর অনুপ্রবেশে তা হয়ে
ওঠে কাব্যকথা। হৃদয় সে অনুক্ষণ খুঁজে দিগন্তরেখায়
ডুবে যাওয়া সূর্যটার মত। একসময় আধার হতে থাকে।
তুমি হারিয়ে যাও। হারিয়ে যায় পেন্ডামিক কাল। অথর্ব
কোভিডসময় জীবনপথ স্থবির করে দেয়। চুপিসারে
একদিন বলেছিলে, ‘যতই দুঃসময় আসুক পাশে পাবে
চৌপথির মোড়ে।’ আজ কি মরে যাইনি আমি? আমার
শবযাত্রায় অনুপস্থিত তারা। যারা সার্বক্ষণিক পাশে ছিল,
সুসময় ছিল। বড় বাজারের স্ট্রিট লাইটে আমি দেখেছি
তাদের উজ্জ্বল উচ্ছ্বল মুখাবয়ব। আজ ম্লান স্থবিরতা।
রেডবুল বারে রঙিন গ্লাসে চুমুক দিয়েছে জয়ন্ত। অনন্ত
পরিশ্রান্ত। তবু পরিপাটি বেশভূষা। বেশ গুছিয়ে কথা বলে।
বলতে চায়, কেমন আছো তুমি? কেমন আর থাকা!
চৌহদ্দি জুড়ে অক্টোপাস আমার গতি রুখে দেয়। ওপার
দেখিনা কতশত দিন। আমি কাগজের নৌকো ভাসাই
ভাগিরথীর বুকে। কলকাতার হৃদয়ে আমি চোখ ভেজাই।
উদ্দামতা দেখি ওদের আচরণে।
আমি অসুরের কান্না শুনি শারদে।
পারদ উন্মাদ হয় ব্যারোমিটারের। নিয়ন্ত্রণহীন খাদে
পড়ে থাকা। একাই এগিয়ে চলার শপথ নেয় ওরা!
শত শত মাইক থেকে উচ্চারিত হয় স্বাধীনতার গান।
এ গানে কোনো ভাষা নেই। আশা নেই। তবু আশায় বাঁচতে চাই একা নয় সবাই।
সেই দিনক্ষণ
কল্পতরুর সঙ্গে হয়নি সংহতি
চোখের কোণে একবিন্দু শিশির ঝলকে
ওঠে।
সহৃদয় হয়নি নিরংকুশ।
অবন্তির কুশপুতুলে মন বলে করি
এবার অগ্নিসংযোগ!
থেমে যায় জয়ন্ত।
শতবার প্রণতির একটু বেদনার্ত উচ্ছ্বাস
আবার উদ্বেল করে তাকে।
ফিরে পেতে চায়
সেই দিনক্ষণ।
আদিম সে যুগ খরায় পুড়ছে
তৃষ্ণার্ত হৃদয়।
দুর্গতিনাশিনীর অসুরঘাতন।
এর মাঝে বিভক্তি রেখা তার
তছনছ করে প্রান্তর।
সেখানেই দাঁড়ানো এখনও
জয়ন্ত হটেনি মোটেও একচুল।
পার্ক স্ট্রিটের ধবল পথআলোক পথে
এতটুকু চেনা মনে হয়েছিল চিরচেনাকে।
অবিনস্ত বস্ত্রায় লাজনিবারনীর
গোলক ঘুরনিরেখায়
কথা হয়নি।
তার চোখ এবার নিশব্দে কথা বলে,
কেমন আছো?
পরবাসের গুমট বাঁধা ইটপাথরে যেমন
থাকা যায়।
আছেই জানার অজান্তে কিছু জানা।
কল্পতরু এবার উঠে দাঁড়ায়
আস্তিনে মুছে চোখ
ঝলকে উদ্দাম নৃত্যপর অত:পর
বলে আজও অনুরূপ ভালোবাসি অবন্তিকা।
বিধ্বস্ত কবিমন
কবিতার চোখ আজ বড় লালচে দেখায়, অনল
ছড়িয়ে গেল। যেন শ্বাপদেরা ছিঁড়ে কুড়ে খায় বনজঙ্গলে
মায়া হরিণের দল। দলছুট আজ হলাম বুঝি!
আমি খুঁজে নিয়েছি বারবার চিত্রা নদীর বাঁক
নির্বাক চোখে অবনত অবয়ব। চিবুক ধরে
কতবার বলেছি, ভালোবাসি আজও অনুরূপ।
বুকের গীরিপথ আঁকাবাঁকা চন্দ্রবাঁক দিগন্ত ছুঁতে চায়।
স্পর্ধা স্পর্শের হাত বাড়ায়, খানিকদূর যেতেই বনাঞ্চল।
তুমি বলেছিলে ‘ আমি আছি নিদ্রাজড়তা ঠেলে
খুব কাছেই তোমার।’ অধীরতা পেয়ে বসে তাই। পেতে
চাই একজীবন অতিক্রম করে অনন্তকাল-সারাজীবন।
একদণ্ড সুখানুভূতি পেতে একদিন ছেড়েছি
জগতসংসার আর ফেরা হয়নি সুমেরুর পথ ধরে
গন্তব্যের মাধ্যাকর্ষণে।
নির্লিপ্ত আমি, লেখা হয়নি জীবনের গান অদেখা
মানবীকে নিয়ে। তুমি আজকাল হিসেব করে কথা বল!
নেই আবেগ কিংবা মননিবেশ মুগ্ধতা। আমি ম্লান হয়ে যাই এড়িয়ে চলায়।
তুমি ছুটে এলে অথচ কিছু বুঝে
ওঠার আগেই দূর তল্লাটে ড্রাগনের আগুনজ্বলা হাসি
ছড়িয়ে গেলে! বিতশ্রদ্ধা তবু বাহুমূলে খুঁজি কস্তূরী সুবাস।
কবিতার চোখ এবার ঝাপসা হতে থাকে। অতঃপর
বাঁধ ভাঙা নদী এলেবেলে প্রান্তর অতিক্রান্ত করে ভাঙে
লোকালয় মানববসতি।ছুটে চলা নদী সর্বনাশী রূপ নেয়।
লেখা হয়না কবিতা আর বিধ্বস্ত কবিমন। ভেঙে যায় প্রেম।
আমাদের কাছে লিখুন
বইয়ের আলোচনা, কবিতা, গল্প, ফিচার, লাইব্রেরি, প্রিয় গ্রাম, সাহিত্য সমালোচনাসহ নানা বিষয়ক। লেখা পাঠাবেন: boicharita@gmail.com
