বিধ্বংসী প্রহর : পর্ব- ৩১

রাত গভীর। খস খস খট খট শব্দ আসছে ঘরের ভেতর থেকে। বাড়ির সবাই ঘুমে বিভোর। জেগে আছে শুধু একজন। দুই লেডি ওয়াচারের মধ্যে যে জন জুনিয়র, সে। কান দুটো ভীষণ সজাগ তার! শরীরটাও শক্ত পোক্ত। সে কারাটে এবং অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এমন কী দুর্দান্ত কমান্ডো অভিযানে সঙ্গ দেওয়ার বিরল অভিজ্ঞতাও রয়েছে। অবশ্য সিনিয়র জনেরও তাই।

সন্ধ্যার পর থেকে তারা দুজনই জেরিনের বেডরুমের দরজার সামনে অবস্থান নিয়ে আছে। জুনিয়র লেডি উঠে দাঁড়াল। ধীর পদক্ষেপে এসে জেরিনের রুমের দরজাটা ফাঁক করল। দেখল জেরিন ম্যাডাম শুয়ে আছে বিছানায়। আয়া ঘুমুচ্ছে নিচে, ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে। সে ভাবল— তাহলে এই খুট খাট শব্দ কোথায় থেকে আসছে! রাতের নৈশব্দে কোন অস্ফুট শব্দও স্পষ্টভাবে শোনা যায়। এ ঘরে কোনো বেড়াল নেই, অন্য কোনো পোষ্য প্রাণী কিংবা পাখিও নেই। তাহলে কী এসব ইঁদুর-চিকার শব্দ!

জুনিয়র লেডি ড্রয়িং রুমটা দেখল। না, ঠিক আছে। এবার পা টিপে টিপে পেছনদিকে গেস্টরুমে, অর্থাৎ নিধি যে রুমে থাকে সেদিকে গেল। রুমটা বারান্দার কাছে, আর বারান্দার ডান পাশে নিধির রুম। রাতে বারান্দার বাতি জ্বালানো থাকে। সে দেখল, বাম পাশের কিনারটায় টাঙানো রয়েছে মিস জেরিনের বিরাটকায় ছবির ফ্রেম। এ জায়গায় এমন ছবি! তার কাছে বেমানানই মনে হলো।

লক্ষ্য করল, নিধির রুমের ভেতরেই খুটখাট শব্দ হচ্ছে। কিন্তু কেন? এ রুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। ভাবল আওয়াজ দেবে, নাকি দরজায় নক করবে! শেষ পর্যন্ত আস্তে আস্তে দরজায় নক করল।

কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তারপর ভেতর থেকে আওয়াজ এল।

‘কে ?’ নিধির কন্ঠ।

‘আমি সিকিউরিটি। আপনি ঠিক আছেন?’

‘এত রাতে এ কথা জিজ্ঞেস করার মানে কী?’

‘গভীর রাতে খুটখাট শব্দ শুনে ভাবলাম আপনার রুমে চোর টোর ঢুকল কিনা।’

‘ইয়ার্কি করবে না। আমি ইয়ার্কি একদম পছন্দ করি না।’

‘বুঝলাম। এখন দরজাটা খুলুন।’

‘খোলা যাবে না। আমি পারসোনাল কাজ করছি।’

‘আমি বলছি দরজা খুলুন। তা নাহলে ধরে নেব সন্দেহজনক কিছু করছেন।’ লেডি ওয়াচার একটু জোরোলো কন্ঠে বলল।

‘এই মহিলা!  আমি আছি আমার রুমে। বললাম পার্সোনাল কাজ করছি। এখানে সন্দেহ পাও কোথা থেকে?’  নিধি কথাগুলো বেশ উচ্চস্বরে বলল।

‘পারসোনাল কী, সেটাই দেখতে চাই।’ লেডি ওয়াচার বলল।

‘দেখতে চাস? এই দ্যাখ!’

উত্তেজিতভাবে কথাটা বলেই সে খাট্ করে দরজাটা খুলে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু এ কী! মূর্তিমান নিধি প্রায় নগ্ন!  নিম্নাংশ ছাড়া তার পুরো শরীর অনাবৃত!  তার বাম হাতে ধরা মুখ খোলা একটি অয়েন্টমেন্ট টিউব। ক্রোধে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে দুই চোখ।

এ অবস্থা দেখে লেডি ওয়াচার লজ্জায় তার চোখ বন্ধ করল। তারপর নিজের জায়গায় ফিরে এল। বেশ বিব্রত বোধ করছে সে। ভাবছে, নিধি মেয়েটা এ অবস্থায় কেন! তার হাতে মলমের একটা টিউব ছিল এবং সেটা ছিল খোলা অবস্থায়। তার মানে নিধি মলম লাগাচ্ছিল। তাহলে কী নিধির বুকে কোনো ক্ষত বা টিউমারের মতো আছে!

ইতিমধ্যে উচ্চস্বরে কথোপকথন শুনে সিনিয়র জনের ঘুম ভেঙে গেছে। জুনিয়র লেডি তাকে ঘটনাটা জানাল। সে প্রথমে একটু হেসে উঠল। এরপর বিষয়টা নিয়ে দুজনের মধ্যে মিথুষ্ক্রিয়া চলল বাকি রাত জুড়ে। অবশেষে তারা এই বিকল্প ধারণায় পৌঁছল— (এক) নিধির কোনো গোপন ব্যাধি বা সমস্যা আছে, (দুই) তার আদৌ এরকম কোনো সমস্যা নেই ; এটা প্রশ্নবোধক কোনো কর্ম বা বস্তুকে আড়াল করার কৌশল মাত্র। কেননা অল্প সময়েই তারা বুঝে গেছে নিধি কতটা ধূর্ত।

সকালে এসআই রাইস ঢুকল এ বাড়িতে। ফিজিওথেরাপিস্টকে দেখে সে জেরিনের অগ্রগতি জানতে চাইল। ফিজিওথেরাপিস্ট জানাল, মিস জেরিনের মুখ এভাবে বাঁকা হয়ে যাওয়াটা হচ্ছে ‘ফেসিয়াল পালসি’। তাকে রেড রে থেরাপি এবং ফেসিয়াল মাসকুলার ম্যাসাজ দেওয়া হচ্ছে। সে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলে যে মিস জেরিন ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাবেন। তাকে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকের দেওয়া ঔষধও নিয়মিতভাবে সেবন করে যেতে হবে।

ড্রাইভার পিন্টুও চলে এল। রাইস তাকে কাছে ডেকে বলল, রেজাউদ্দিন সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টা তার জেরিন ম্যাডামকে অবহিত করার জন্য। বলল, যেহেতু পিন্টু জেরিনের বিশ্বস্ত কর্মচারি, তাই পুলিশের কাছ থেকে না শুনে তার কাছ থেকে শুনলে জেরিন ম্যাডাম সহজে বুঝবেন এবং বিশ্বাসও করবেন।

পিন্টু তাই করল। ধীরে ধীরে শান্তকন্ঠে রেজাউদ্দিন সাহেবের বিষয়টা পূর্বাপর জেরিনের কাছে বর্ণনা করল। রাইস সাথে ছিল। শত হলেও বাবা! জেরিন ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বাবার রুমে যেতে চাইল। রাইসের সম্মতি পেয়ে আয়া হুইল চেয়ারে করে জেরিন ম্যাডামকে তার বাবার কক্ষে নিয়ে গেল। জেরিন বাবার বিছানায় হাত বুলালো। বাবার বালিশের কভার ছেঁড়া দেখে আশ্চর্য হলো। সেখানে সে আরেক দফা কান্নাকাটি জুড়ে দিল। এক পর্যায়ে জেরিনের মুখ থেকে বেশ স্পষ্টভাবে ‘বাবা’ ডাকটা বের হয়ে এলো।

আধা ঘণ্টা পর ঘরের ভেতরে হৈ চৈ শুনে রাইস আবার ভেতরে ঢুকল। দেখল নিধি ভীষণ উত্তোজিত। তার হাতে বড়সড় একটা সুটকেস। সে উচ্চস্বরে বাক বিতণ্ডাব করছে দুই মহিলা ওয়াচারের সাথে। তারাও নিধিকে শাসাচ্ছে এবং তাকে তার রুমে যেতে বলছে। রাইসকে দেখে সিনিয়র লেডি বলল,‘স্যার, এই দেখুন, সুটকেসটা নিয়ে সে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছে। এখানে নাকি থাকবে না। যতই নিষেধ করছি ততই সে বেয়াদবি করছে। সহ্যের তো একটা সীমা আছে!’

‘আমিও সেকথা বলি, সহ্যের একটা সীমা আছে। সারাক্ষণ বলা হচ্ছে এটা করা যাবে না ওটা করা যাবে না, সন্দেহবাতিকতা নিয়ে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে, আমার প্রাইভেসি নষ্ট করা হচ্ছে, আমাকে অপমানিত করা হচ্ছে। কেন? কী অপরাধ আমার? আজ দুই বছর ধরে এ বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চিতে শ্রম দিয়ে আসছি আমি। খেয়ে না খেয়ে এ বাড়িটা দেখে রেখেছি। আর আমাকেই কিনা বন্দির মতো থাকতে হচ্ছে! অসুস্থ ম্যাডামের সাথে আমাকে দেখা পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না। আমি এ ঘরে আর থাকবো না।’  নিধি উত্তেজিত হয়ে জবাব দিল।

‘একটু শান্ত হোন। আপনি কোথায় যেতে চান শুনি?’  রাইস জিজ্ঞেস করল।

‘তিন তলাটা খালি আছে। কযেকদিন ওখানে থাকব। এরপর চাকরি পেলে অন্য কোথাও চলে যাবো।’  নিধি বলল।

‘একটু দাঁড়ান আমি উপরে কথা বলে জানাচ্ছি।’ রাইস ইন্সপেক্টর জিলানীর সাথে বিষয়টা নিয়ে মোবাইলে আলাপ করে নিল। তারপর নিধিকে বলল,‘উপরের সিদ্ধান্তে পাওয়া গেছে। আপনাকে যেতে দেওয়া হবে, তবে আজ নয় তিন দিন পর। যেখানে খুশি যেতে পারবেন। এই তিন দিন আপনাকে একটু মানিয়ে চলার জন্য রেকুয়েস্ট করছি। আপনি বুদ্ধিমতি। আশা করি কোঅপারেট করবেন।’

নিধি একবার রাইসের দিকে তাকাল। তারপর লেডি ওয়াচারদের দিকে তাকাল। এরপর সুটকেসটা নিয়ে হন হন করে নিজের রুমে চলে গেল।

সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে পিন্টু সব দেখল। তার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

আজ বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে জেরিনকে ফিরে পাওয়ার খবর, সেই সাথে ইন্সপেক্টর জিলানীর আকস্মিক বদলির সংবাদটাও। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত শিরোনামগুলো এ রকম :

একটি হত্যা প্রচেষ্টা : বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান নি অধ্যাপক জেরিন।

মৃত জেরিনকে জীবিত উদ্ধার:  উদ্ধারকারী সিআইডি কর্মকর্তার উদ্দেশ্যমূলক বদলি।

ইন্সপেক্টর জিলানীর দুরদর্শিতায় নিখোঁজ জেরিনকে ফিরে পাওয়া গেছে:  অতপর জিলানীর ষড়যন্ত্রমূলক বদলি।

মৃতপ্রায় মেয়েকে উদ্ধার : বাবা এখনও নিখোঁজ : তদন্ত কর্মকর্তার প্রশংসনীয় ভূমিকা।

মরতে মরতে বেঁচে গেলেন অধ্যাপক জেরিন: দক্ষ সিআইডি অফিসার জিলানী গোপন রহ উন্মোচন করে নিজেই রহস্যজনক বদলির শিকার।

আকাশে এতক্ষণ মেঘের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ ছিল। এখন দেদারছে বৃষ্টি হচ্ছে। জিলানীর অফিসরুমে ভ্যাপসা গরম কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে এক ধরনের ভালো লাগা শীতল ছোঁয়া। বৃষ্টির একটা আঁচলা এসে তার টেবিলের এক পাশ ভিজিয়ে দিল। জিলানী উঠে জানালাটা বন্ধ করলেন। জানালা বন্ধ রাখলে আরেক সমস্যা। রুমটা গুমোট হয়ে যায়। পুরনো ভবন, তাই রুম থেকে উৎকট গন্ধও আসে। শ্বাস প্রশ্বাস আয়াসসাধ্য হয়ে ওঠে। তাঁর রুমে তো আর এসি নেই!

জিলানীর কাগজপত্র মোটামুটি রেডি। খসরুর জবানবন্দির ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী অ্যাকশন। সেটা তদন্তের মোড়ও ঘুরিয়ে দিতে পারে! তবে যাই হোক না কেন, দুই সপ্তাহ সময় পেলে জিলানী মামলার চার্জশিট দাখিল করতে সমর্থ হবেন এ প্রতীতি তাঁর রয়েছে।

সকাল থেকে বিভিন্ন লোকজনের ফোন আসছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট দেখেই ফোনগুলো করা হচ্ছে। ফোন দিয়ে দিয়ে জিলানীর প্রশংসা করা হচ্ছে, আবার তাঁকে অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়েছে এ কথা বলে কর্তৃপক্ষকে তুলোধনাও করা হচ্ছে। জিলানী শুনছেন ঠিকই কিন্তু বলছেন খুব কম।

সিআইডি’র ফরেনসিক বিভাগের ইন্সপেক্টর পীর আলী হচ্ছেন জিলানীর কোর্সমেট। সব সময় ডাঁটফাটে চলার চেষ্টা করেন। জিলানীর নাম দিয়েছেন রাজা হরিষচন্দ্র। পীর আলী এসে জিলানীর রুমে ঢুকলেন। বললেন, ‘তোমার তো খুব নাম হয়ে গেলো দোস্ত!’

‘আগে কি বদনাম ছিল?’ জিলানী বললেন।

‘তা না, আজকের পেপারগুলো যেভাবে তোমার প্রশংসা করে লিখেছে সেটার প্রেক্ষিতে বললাম। রাজা হরিষচন্দ্রের আবার বদনাম আছে নাকি!’

‘থ্যাংকস।’  জিলানী মৃদু হাসল।

‘একটা কথা বলি শোনো। তোমার পোস্টিংটা আমি ক্যানসেল করাতে পারি। কিভাবে এটা জিজ্ঞেস করো না। আমার কোথায় কোথায় লিয়াজোঁ আছে তুমি তো জানো।’

‘তারপর ?’

‘তারপর তেমন না, তিন লাখ টাকা ম্যানেজ করো, আমি সেখানে টাকাটা দিয়ে কাজটা করিয়ে আনব। টাকা দিলে সব হয়।’

‘তাই? আমি বিশ্বাস করি না যে টাকা দিলে সব হয়। আচ্ছা পীর আলী, তিন লাখ লাগবে বদলি ক্যানসেলের জন্য? তাহলে প্রমোশন করানোর জন্য কত লাগবে?’ জিলানী বিদ্রূপ করে বললেন।

‘হাল্কাভাবে নিচ্ছো মনে হয়। তুমি কি মনে কর, যে পক্ষ বদলিটা করিয়েছে তারা বড় অংকের টাকা না ঢেলে করিয়েছে?’

‘আমি কিছুই মনে করি না। আর এসব মনে করতে চাইও না। যা কিছু হয় ভালোর জন্য হয়, যা হবে তাও ভালোর জন্যই হবে। অবশ্য একেক জনের ভালো একের রকম।

তুমি কি চা খাবে?’

‘না, চা খেয়েছি। আচ্ছা যাই দোস্ত। আমাকে যদি দরকার পড়ে বল।’

ইন্সপেক্টর পীর আলী চলে গেলেন। সাথে সাথে জিলানীর বস এসএস (ক্রাইম)এর ফোন এল।

‘শোনো জিলানী। কাল সন্ধ্যায় আমি এবং এসএস(সায়েন্স) একসাথে আইজি সাহেবের সাথে দেখা করেছি। স্যার কী বললেন জানো ?’

‘কী বললেন স্যার?’

‘বললেন—ইন্সপেক্টর জিলানীকে আমি চিনি। আমার সাথে কাজ করেছে। এফিসিয়েন্ট ছেলে। একটু স্বাধীনচেতা। তার এ পোস্টিংটা আমার নলেজে নেই। ইন্সপেক্টরদের বদলি তো আসলে অ্যাডিশনাল আইজি (অ্যাডমিন) করে। এ্যানি ওয়ে ,আমি তাকে বলবো জিলানির জয়েনিং টাইম পনের দিন বাড়ানোর জন্য।’

‘ভালো লাগলো শুনে স্যার। ভরসা পেলাম। আইজিপি স্যার যখন জেলার এসপি তখন আমি এসআই পদে তাঁর আন্ডারে কাজ করেছি।’

‘তুমি বলো নি তো !’

জিলানী নিরুত্তর। এসএস (ক্রাইম) বললেন,‘কাজ চালিয়ে যাও। আই হোপ তুমি আরও দুই সপ্তাহ সময় পেয়ে যাবে। আজকের পত্রিকাগুলোও দেখলাম তোমার সাপোর্টে লিখেছে। আই অ্যাম হ্যাপি।’

‘থ্যাংক ইউ স্যার।’

এরপর এসআই সোহরাব এলো। জিলানী বসতে বললেন।

‘স্যার লেটেস্ট খবর। আসামি বাইট্টা বকশী স্বীকার করেছে সে আপনাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। এবং তার সাথে কন্ট্যাক্ট করেছে স্যান্ডো আর মি: টিটি’র লোকজন।’ সোহরাব জানালেন।

‘আমার আন্দাজ এটাই ছিল। বাসটারড্ কোথাকার ! এখন এর উপর ভিত্তি করে থানার পুলিশ মি: টিটিকে গ্রেফতার করুক। স্যান্ডোকে গ্রেফতার দেখাক। কী বলো?’ জিলানী বললেন।

‘এটাই করতে হবে স্যার। কিন্তু এই ওসি কি মি: টিটিকে অ্যারেস্ট করবে ? আপনার মতো কারেজ কি আছে ওনার !’

‘কিভাবে থাকবে যদি আগেই কেউ বেনিফিটেড হয়ে থাকে !’

শুনে সোহরাব মাথা নাড়লো। জিলানী তাকে বললেন,‘তুমি এক কাজ কর।’

‘বলেন স্যার।’

‘মি: টিটির জামিন বাতিলের পিটিশন তৈরি করে দিয়ে আসো কোর্ট ইন্সপেক্টরের কাছে। এখনই যাও।’

‘ঠিক আছে স্যার।’

‘আর শোনো। সন্ধ্যায় ইন্টাররোগেশন সেলে থেকো। আমি আসবো। খসরু কথা দিয়েছে আজ আমাকে ডিটেইলস বলবে। আমাদের নেক্সট অ্যাকশন এই আসামির বক্তব্যের উপর।’

‘রাইট স্যার।’

সাজিয়া বিকেলের নাস্তায় বুটের হালুয়া আর লুচি করেছে। এটা জিলানীর পছন্দ।

সন্ধ্যা হয় হয় অবস্হা। দুজনে একসাথে বসে খাচ্ছে। খাচ্ছে ছেলে নাভিদও।

‘চলো ড্রইংরুমে বসি।’  জিলানী বললেন।

‘কেন আব্বু ?’  নাভিদ বললো।

‘তোমার আম্মুর গান শুনবো।’  জিলানী বললেন।

এমন সময় জিলানীর মোবাইল বেজে উঠলো। এসএস (ক্রাইম) সাহেবের ফোন। জিলানী কল রিসিভ করতেই এসএস (ক্রাইম) সাহেব বললেন,

‘গুড নিউজ জিলানী !’

‘কী স্যার ?’  জিলানী জানতে চাইলেন।

‘তোমার বদলি আদেশ বাতিল হয়েছে।’

শুনে জিলানী আকাশের দিকে মুখ করলেন, মুচকি হেসে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন,

‘সো কাইন্ড অফ ইউ স্যার। সত্যের জয় হয়েছে।’

রাত দশটা। খসরুর সামনে ইন্সপেক্টর জিলানী। বিভিন্ন উপায়ে মোটিভেট করার পর এতক্ষণে আসামি খসরু তার বক্তব্য দিতে রাজী হয়েছে। জিলানী বললেন,

‘তুমি রাজমিস্ত্রীর কাজ করো তাই না ?’

‘আমি রাজমিস্ত্রী এখনো হই নাই, হেলপার। তয় রাজমিস্ত্রীর সব কামই পারি।’

‘তোমাকে দূরে সরে থাকার জন্য কতো টাকা দিয়েছিল ?  দুই লাখ ?’

‘না স্যার, পাঁচশ’ টাকার দুইটা বান্ডিল।’

‘তার মানে এক লাখ। কে দিয়েছিল ?’

‘নিধি ম্যাডাম।’

‘এমন কি গোপন কাজ তুমি করেছো বা এমন কি গোপন কথা তুমি জানো যে তোমাকে নিধি এতগুলো টাকা দিলো ?

‘বলতাছি স্যার।’

‘রেজাউদ্দিন সাহেবকে কোথায় রাখা হয়েছে জানো তো ?’

‘জানি স্যার। আমি সবই বলতাছি। এক্কেরে গোরার থেইকা। এইখানে আর কেউ নাই তো স্যার ?’

‘না। নেই।’

‘দরজাডা আটকাইয়া দিলে ভালো হয় স্যার।’

জিলানী গিয়ে রুমের দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিলেন। তারপর এসে বললেন,

‘এবার বলো।’

খসরু একটু একটু করে বলা শুরু করলো। বলছে ভয় পাচ্ছে, বলছে কেঁদে উঠছে। এভাবে যখন বলা শেষ করলো তখন রাত প্রায় বারোটা।

সব শুনে জিলানীর দুই চোখ বিস্ফারিত হলো। কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলেন। তারপর স্যান্ট্রিদের ডেকে বললেন খসরুকে নিয়ে রাতের খাবার দেওয়ার জন্য।

জিলানী মোবাইলে বেশ কয়েক জায়গায় জরুরি কথা বললেন। সবশেষে কল দিলেন তাঁর সহযোগী সোহরাবকে এবং রাইসকে। উভয়কে একই নির্দেশনা দিলেন।

‘খসরুর বক্তব্য পেয়েছি। সকাল আটটায় রেডি হয়ে এসো। মিশন আছে। মোস্ট মোস্ট ইম্পরট্যান্ট মিশন !

[চলবে]

আরও পড়ুন