বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২৭

এতো ভোরে কার ফোন! আহ্, ঘুমটা কী যে আরামের ছিল! চোখ দুটো বড় কষ্টে মেলল। একটা প্রশ্বাস ছেড়ে বালিশের পাশ থেকে মোবাইল সেটটা হাতে নিল পিন্টু। দেখে ইন্সপেক্টর জিলানীর কল। মুহূর্তেই বুকটা ধক্ করে উঠল তার। না জানি নতুন কী প্রশ্ন করতে চায় এই গোয়েন্দা?  নার্ভাস পিন্টু হড়বড় করে ফোন রিসিভ করতে গিয়ে সবুজটাতে চাপ না দিয়ে লালে চাপ দিয়ে বসলো। কল গেলো গেটে। হায়রে! এবার নিশ্চিত জিলানীর ধোলাই খেতে হবে !

‘পিন্টু ভালো আছেন?’ ইন্সপেক্টর জিলানীর ভারি কন্ঠস্বর।

‘জ্বি ভালো আছি। স্যরি স্যার, আসলে আমি চাপটা…’

‘জানি, গভীর ঘুমে থাকলে টেলিফোনের চাপ নেয়াটা কষ্টকর। কিন্তু ফোনটা আমাকে করতেই হলো।’

পিন্টু ভাবল কী আর হলো কী! এই কঠিন মানুষটা সৌজন্যে সত্যিই খুব সহজ। পিন্টু এতে প্রসন্ন বোধ করলো। বলল, ‘অবশ্যই ফোন করবেন। আপনি বলেন স্যার, আমার কোনো অসুবিধা নেই।’

‘শুনুন, আপনি ঠিক সাতটায় শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে থাকবেন। আমি আপনাকে এক জায়াগায় নিয়ে যাব।’ জিলানী বললেন।

‘কোথায়?’  পিন্টুর নার্ভাসনেস যেন আবার শুরু হলো।

‘সেটা গাড়িতে বলব। তবে জেলখানায় নয় এটা সিওর।’  জিলানী একটু কৌতুক করলেন।  তারপর আবার বললেন, ‘জাস্ট সাতটায়। ঠিক আছে ?’

‘ঠিক আছে স্যার। আমি থাকব।’

গতরাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে জিলানী ঠিক করে রেখেছিলেন যে ভোরবেলা পিন্টুকে রিং দেবেন। কারণ, জেরিনকে যদি সত্যিই পাওয়া যায় তাহলে তাকে সনাক্ত করার বিষয় রয়েছে। এই সকল ক্ষেত্রে সাধারণত নিকটাত্মীয়দের কেউ সনাক্ত করে থাকে। কিন্তু জেরিনের তো কোনো আত্মীয় নেই। পিন্টু জেরিনের গাড়িচালক। কাজেই পিন্টু তাকে সনাক্ত করার জন্য উপযুক্ত।

আজকের সকালটা বেশ ঝরঝরে। রোদটাও নরম। তাই মনটা হয়ে উঠলো ফুরফুরে। মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে হবে। বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে জিলানী জীপে উঠলেন। সামনের বাঁ দিকের জানালায় নতুন কাঁচ লাগানো হয়েছে। বুলেটের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচটা তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে আলামত হিসেবে সংরক্ষণের জন্য। জিলানী গাড়িতে একজন ওয়াচারকে সঙ্গে নিয়েছেন।

ড্রাইভার দীপক গাড়ি স্টার্ট দিলো। উপরে ব্যালকনি থেকে স্ত্রী সাজিয়া হাত নাড়লো। হাত নাড়লেন জিলানীও।

গাড়ি শ্যামলী সিনেমার সামনে পৌঁছুলো ঠিক সাতটা বেজে এক মিনিটে। পিন্টু দশ মিনিট আগে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। ওয়াচার দরজা খুলে দিলে সে উঠে পেছনে বসলো। এরপর ইন্সপেক্টর জিলানীকে সালাম করল। গাড়ির এ ড্রাইভার পিন্টুর অচেনা।

কিছুদূর যাবার পর জিলানী পিন্টুকে জিজ্ঞেস করলেন,‘নাস্তা করেছেন পিন্টু ?’

‘করেছি স্যার।’ পিন্টু জবাব দিলো। তার গায়ে স্ট্রাইপ টি-শার্ট।

গাড়ির ভেতরে বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা। পিন্টু ভাবছে জিলানী সাহেব তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন কিছুই বলছেন না। একটা অনিশ্চিত পথে যাত্রা। পিন্টুই না পেরে জিজ্ঞেস করল,‘আমরা কোথায় যাচ্ছি স্যার ?’

‘মানিকগঞ্জ।’ জিলানী গম্ভীর গলায় বললেন।

পিন্টু বুঝতে পারছে না মানিকগঞ্জে তাকে নিয়ে কেন যেতে হচ্ছে। আবার এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করবে সে সাহসও পাচ্ছে না।

গাড়ি দ্রুতবেগে যাচ্ছে। এখন সাভারের কাছাকাছি। হঠাৎ ঠা…স্ করে বিকট শব্দ ! ড্রাইভার নেমে পড়লো জীপ থেকে। পেছন পেছন নামলো ওয়াচারও। পিন্টু উদ্বেগ নিয়ে তার মাথাটা উঁচু করে দেখতে চেষ্টা করলো। জীপের সামনে দাঁড়িয়ে ড্রাইভার উচ্চস্বরে বলে উঠল,‘স্যার, সামনের চাকাটা বার্স্ট হয়ে গেছে।’

‘জলদি চেঞ্জ কর।’  জিলানী নির্দেশ দিলেন। কথাটা বলেই জিলানী জীপ থেকে নেমে গেলেন। পিন্টু কি আর একা গাড়িতে বসে থাকতে পারে ! সেও নেমে এলো। একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে জিলানী হাতের ইশারায় পিন্টুকে ডাকলেন। পিন্টু কাছে এসে দাঁড়ালো। কাছাকাছি রয়েছে একটা চা-দোকান।

‘কিছু খাবেন ?’  জিলানী পিন্টুকে জিজ্ঞেস করল।

‘না স্যার। মানিকগঞ্জ গিয়ে খাওয়া যাবে।’  পিন্টু বলল।

‘আচ্ছা পিন্টু, আপনার জেরিন ম্যাডাম কেমন ছিলেন ?’

‘ম্যাডাম খুব ভালো ছিলেন। যেমন শিক্ষিতা তেমনই ভদ্র। মানুষকে খুব বিশ্বাস করতেন। বাসায় বেশির ভাগ সময় পড়াশুনা করে কাটাতেন। বাড়ির কাজকর্ম নিধিই দেখতো। আহা! এমন একটা মানুষ প্লেন অ্যাক্সিডেন্টে মরে গেলেন!’

জিলানীর ইচ্ছে করছে একটা সিগারেট ধরাতে। কিন্তু তিনি প্রকাশ্য জায়গায় ধূমপান করেন না। সে কারণে চেপে গেলেন। ড্রাইভারের জিজ্ঞেস করলেন,‘আর কতক্ষণ লাগবে ?’

‘আর তিন-চার মিনিট স্যার।’ দীপক জবাব দিল।

জিলানী পিন্টুর দিকে মুখটা ফেরালেন। তারপর বললেন,‘জেরিন ম্যাডাম প্লেন ক্রাশে মারা যান নি।’

‘জ্বি !!’  পিন্টু যেন আকাশ থেকে পড়ল ! এক রাজ্যের বিস্ময় তার চোখে। সে জিলানীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে স্যার ?’

‘তাকে এয়ারপোর্টেই নেয়া হয় নি। পথেই মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে।’

একথা শুনে পিন্টু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার বুকে কষ্ট হচ্ছে। চোখে ফেটে জল আসছে। তারপর জিলানীকে বলল, ‘স্যার, ম্যাডাম কি বেঁচে আছে না মরে গেছে ?’

‘জানি না। সেই খোঁজেই যাচ্ছি।’

পিন্টু জিলানীর কাছে আরও কিছু জানতে চাইছিল, তখনই ড্রাইভার বলল, ‘স্যার গাড়ি রেডি।’

‘চলেন পিন্টু।’ জিলানী বলেই সামনে এগুলেন।

জিলানী ও পিন্টু গাড়িতে উঠলো। গাড়ি ছুটে চললো ঢাকা-আরিচা রোড ধরে।

নিধি বাইরে যাবে। চুলটা পরিপাটি করেছে। অনেকদিন পর শাড়ি পরেছে, ফিরোযা রংয়ের টাঙ্গাইল সুতী শাড়ি। পায়ে নিচু হিলের জুতো। শারীরিক উচ্চতায় লম্বা বিধায় নিধি হাই হিল তেমন একটা পরে না।

বাড়ির গেটে এসে বাধল বিপত্তি। রুস্তম যেতে দিচ্ছে না। বলছে উপরের হুকুম নেই যেতে দেওয়ার। নিধি বলল যে সে রেজিস্টারে এন্ট্রি করেই যাবে। এরপরও যখন রুস্তম বাধ সাধল তখন নিধি রেগে গেলো। বলল,‘আমি এ বাড়ির কেয়ারটেকার। আমার বাড়ির গেট দিয়ে আমি যাবো আসবো এতে তোমরা বাধা দেওয়ার কে ?’

‘ম্যাডাম আপনি তো জানেন আমরা শুধু আদেশ পালন করি।’  রুস্তম বলল। এতে নিধি আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ল। বলল,‘নিকুচি করি তোমাদের আদেশের ! এই আমি বের হচ্ছি। কী করবে তোমরা ?  অ্যারেস্ট করবে নাকি  গুলি করবে ?  আমিও দেখি কতোখানি বুকের পাটা ! একদম ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে ছাড়ব।’

জীপটা ধলেশ্বরী ব্রীজের উপর দিয়ে যাচ্ছে। জিলানী ব্রীজের নিচের দিকে, ডানে বাঁয়ে দেখছেন। নদীতে এখন পানি বেড়েছে। তাই আকারে আরও বড় দেখাচ্ছে।

এসময় তাঁর সহযোগী রাইসের ফোন এলো।

‘রাইস কী খবর ?’

‘স্যার রুস্তম ফোন করেছে।’

‘কেন ?’

‘নিধির সাথে ঝগড়া বেঁধেছে। সে বাইরে যাবেই। তার নাকি জরুরি কাজ আছে। ‘আমি যাবোই, তোমরা যা পারো করো’ বলে রুস্তমকে শাসাচ্ছে।’

‘যেতে দাও। সে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে সাক্ষাত করছে এটা আমাদের দেখার দরকার আছে। তুমি তাকে ফলো করো। তারপর আমাকে জানাও।’

‘ওকে স্যার।’

জিলানীর জীপ এইমাত্র মানিকগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে গেছে। দর্শনীয় হাসপাতাল ভবনটি এক বিশাল ইমারত ! এখনো যেন নতুন !

সময় সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। আরেকটি বড়সড় জীপ এসে পেছনে থামল। জিলানী তাঁর গাড়ি থেকে নেমে এলেন। পেছনের গাড়ি থেকেও এক ভদ্রলোক নেমে দাঁড়ালেন। জিলানীর দিকে দেখলেন। জিলানীও তাঁর দিকে তাকালেন। ভদ্রলোক যুবা বয়সের। জিলানী আন্দাজ করলেন ইনিই হবেন ইঞ্জিনিয়ার জাভেদ।

‘আপনি কি জাভেদ সাহেব ?’  জিলানী জিজ্ঞেস করলেন।

‘জী। আমিই জাভেদ ইকবাল। সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার, ডাব্লিউডিবি।’ তিনি জবাব দিলেন।

জাভেদ ইকবালের সাথে জিলানী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গেলেন। সেখানে জাভেদ দেখালেন সেদিন মহিলাকে তাঁর গাড়িতে তুলে এখানে নিয়ে আসার পর কোন্ সিটে রাখা হয়েছিল। তারপর জাভেদ বললেন, ‘চলুন মহিলা ওয়ার্ডে যাই।’

দুজনে চললেন মহিলা ওয়ার্ডের দিকে। পিন্টু রয়েছে জিলানীর পেছনে। জিলানীর ভেতরে এক ধরনের থ্রিল কাজ করছে। মনে মনে বলছেন, যেন সত্যি সত্যি জেরিনকে পেয়ে যান।

জাভেদ সামনে জিলানী পেছনে। জাভেদ এবার মহিলা ওয়ার্ডের ভেতরে ঢুকলেন। সাথে জিলানী এবং পিন্টু। জাভেদ ১৯ নাম্বার বেডের কাছে থামলেন। বেডটা খালি। ভাবলেন, রুগী কি তাহলে রিলিজড হয়ে গেছে !

একজন নার্স ২৭ নাম্বার বেডে কাজ করছিল। জাভেদ ১৯ নাম্বার বেড দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন,‘এই বেডের পেশেন্ট কোথায় বলতে পারেন ?’

নার্স মাথা তুলে তাকালো। জিলানী অধীর আগ্রহ নিয়ে তার দিকে দৃষ্টি মেলে দিলেন যে জবাবটা সে কী দেয়। নার্স নির্বিকারভাবে বলল,‘ওনাকে এক্স-রে করাতে নিয়ে গেছে।’

‘কতক্ষণ হয়েছে ?’  এবার জিলানী জিজ্ঞেস করলেন।

নার্স জবাব দিল,‘একটু পরেই চলে আসবে। অপেক্ষা করেন।’

{চলবে}

আরও পড়ুন