বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২৫

গুলিটা এসে হিট করলো ড্রাইভার কায়েসকে। তার বাম বাহুর ঠিক উপরিভাগে। সাথে সাথে ব্যথায় উ..উফ্ করে উঠল সে।
জিলানী নিজের রিভলভার হাতে নিয়ে দ্রুত গাড়ি থেকে বের হলেন। তাঁর গেঞ্জির ভেতরে বুকের সাথে লেপটে আছে একটা বুলেটপ্রুফ বর্ম। এদিক ওদিক দেখলেন। কেউ নেই। পথচারীরা রয়েছে একটু দূরে। গুলির শব্দ শুনে তাঁদের সামনে পার্ক করা গাড়িটা তৎক্ষণাৎ চলে গেছে। আর একটি গাড়িও পার্ক করা অবস্থা নেই।
জিলানী হতভম্ব! ভাবলেন তাঁর পিঠটা সিটের সঙ্গে এলিয়ে দিয়েছিলেন বলেই হয়তো গুলিটা এসে তাঁর গায়ে লাগে নি। কায়েসকে দেখতে হবে। জিলানী টার্ণ নিয়ে ড্রাইভারের দরজার দিকে ছুটলেন।
গাড়ির ইঞ্জিন চালু অবস্থায়, কিন্তু গিয়ার নিউট্রালেই রয়েছে। ড্রাইভার কায়েসের বাম বাহু দিয়ে রক্ত ঝরছে। রক্তে তার শার্টের বাম হাতা এবং তার নিচের দিকটা ভিজে লাল হয়ে গেছে। রক্ত ড্রাইভিং সিটের ওপরে বাম প্রান্তেও পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা।
এ মুহূর্তে যতোটা সম্ভব রক্তক্ষরণ থামাতে হবে। জিলানী ভেতরে ঢুকেই বক্স থেকে বেশ কয়েকটা টিস্যুপেপার নিয়ে কোনো রকমে একটার পর একটা ভাঁজ করে জখমের ওপরে রাখলেন। গাড়ির ভেতরে ড্রাইভারের একটা গামছা খুঁজে পেলেন। গামছাটা তিনি টিস্যুপেপারগুলোর ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে জখমপ্রাপ্ত বাহুটা শক্ত করে বাঁধলেন।
‘স্যার আপনাকে বাসায় দিয়ে আসি।’ কায়েস বলে উঠল।
জিলানী তো অবাক! আকস্মিক গুলিব শব্দ শোনা, গুলিবিদ্ধ হওয়া, রক্তপাত, ব্যথা এসব সত্ত্বেও কায়েস সাহস হারায় নি ! যোগ্য সহকর্মী বটে !’
‘আমি জানি কায়েস, তুমি অনেক সাহসী। হাসপাতালে যাচ্ছি, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন সামান্য একটু হেল্প করো তো! তোমাকে আমার সিটে বসতে হবে।’ জিলানী কায়েসকে কিছুটা আলগোছে উঁচু করে ধরে বাম পাশের সিটে বসালেন। তারপর নিজেই জীপ স্টার্ট দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে ছুটলেন।
জিলানীর একহাতে গাড়ির স্টিয়ারিং আরেক হাতে মোবাইল। যেতে যেতে প্রথমে থানায় ফোন করে ঘটনাটা বর্ণনা করলেন। বললেন তাঁর মৌখিক তথ্যটা জিডিভুক্ত করে স্পটে চলে যেতে। তারপর সহযোগী সোহরাবকে কল দিলেন। বললেন দ্রুত ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে আসতে।
ইমার্জেন্সির পাশে গাড়ি থামল। জিলানী একজন ওয়ার্ডবয়কে ডাক দিলেন। ততক্ষণে সোহরাবও পৌঁছে গেছে মোটরবাইকে করে। কায়েসকে ভেতরে নিয়ে ইমার্জেন্সির বেডে শুইয়ে দেওয়া হলো।
ডিউটি ডাক্তার কায়েসের বাহু পর্যবেক্ষণ করে বললেন যে ভেতরে গুলি নেই, মাংসপেশী ছিটকে চলে গেছে, জখমটাতে স্টিচ দিতে হবে। কথাটা শুনে জিলানী কিছুটা সান্তনা পেলেন। কায়েসের রক্তপাত বন্ধে গৃহীত তাৎক্ষণিক ব্যাবস্হা দেখে চিকিৎসক জিলানীর প্রশংসা করলেন। জিলানীর অনুরোধে তিনি দ্রুতগতিতে ব্যাবস্থা নেয়া শুরু করলেন।
রুমের বাইরে এলেন জিলানী এবং সোহরাব। জিলানী সন্ধ্যার পর অফিসে থাকাকালীন তাঁর মোবাইলে যে নির্বাক কলটা এসেছিল তার নাম্বারটা দেখালেন। সোহরাব নাম্বারটা নিজের মোবাইলে সেভ করলেন।
‘আর্জেন্টলি সন্ধান করো এ নাম্বার কার এবং কোন্ জায়গা থেকে কলটা করা হয়েছিল।’ জিলানী বললেন।
‘এখনই দেখছি স্যার।’ সোহরাব জবাব দিল। এরপর সোহরাব বলল,‘স্যার, দেখলাম জীপে আপনার সিটের পাশের জানালাটা ছিদ্র হয়েছে। ছিদ্রের চতুর্দিকের কাঁচ ফেটে ফেটে গেছে। কিন্তু ড্রাইভিং সিটের জানালাটা অক্ষত রয়েছে। অন্যদিকে ড্রাইভারের শরীরে বুলেট হিট করলেও বিদ্ধ হয় নি। তার মানে সেই গুলিটা জীপের ভেতরেই পড়ে আছে।’
‘তাই তো! ঠিক আছে থানার পুলিশকে আসতে দাও। ওরাই টেক-আপ করুক।’
স্টিচ দেওয়া শেষ। কায়েসকে ওয়ার্ডে শিফ্ট করা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে ইতোমধ্যে কায়েসের স্ত্রীও চলে এসেছে। সিআইডি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং কর্মচারীও হাসপাতালে এসেছে। সবাই উদ্বিগ্ন।
এর মধ্যে তাঁর আরেক সহযোগী রাইসও এসে হাজির হলো।
জিলানী তাঁর স্ত্রীকে কল দিলেন। সাজিয়া ফোন রিসিভ করল।
‘তুমি কি বাসায় আসছ?’ সাজিয়া জিজ্ঞেস করল।
‘একটু দেরি হবে। তুমি খেয়ে নাও। আমি এখন ঢাকা মেডিকেলে আছি।’
‘মেডিকেলে কেন?’ সাজিয়া কিছুটা উদ্বিগ্ন।
‘ড্রাইভার কায়েসকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’
‘কেন ? তার কী হয়েছে ?’
‘পরে এসে বলবো। নাভিদ কি শুয়ে পড়েছে ?’
‘এই কেবল শুয়েছে। ও হ্যাঁ, সন্ধ্যার পর পর ল্যান্ডফোনে তোমার এক বন্ধু ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করলো তুমি বাসায় কিনা। আমি বললাম না, অফিসে।’
‘সন্ধ্যার পর পর! তুমি নাম জিজ্ঞেস করেছিলে?’
‘করেছিলাম। বলে নি। বলেছিল, তোমার মোবাইলে ফোন দেবে।’
‘আচ্ছা, তার নাম্বারটা বলো তো !’
সাজিয়া ল্যান্ডফোনের কলার আইডি থেকে টুকে রাখা নাম্বারটা জিলানীকে বলল। জিলানী মিলিয়ে দেখলেন এই নাম্বার এবং তাঁর মোবাইলের সেই নির্বাক কলের নাম্বার একই। তার মানে দুষ্কৃতকারী খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে ইন্সপেক্টর জিলানী কোথায় আছেন। তারপর তাঁকে সুপারশপ পর্যন্ত অনুসরণ করে সুযোগ বুঝে তাঁর ওপর গুলি চালিয়ে দ্রুত কেটে পড়েছে!
মালিবাগ থানার ডিউটি অফিসারের কল এলো।
‘স্যার আমি স্পটে আছি। আপনি কি হসপিটালে?’
‘হ্যাঁ। অসুবিধা নেই, আমি এখনই আসছি।’
রাইসকে হাসপাতালের রেখে সোহরাবকে সাথে নিয়ে জিলানী স্পটে ছুটলেন। জীপটা নিজেই চালাচ্ছেন।
থানা থেকে আগত এসআই বাবুল জিলানীর কাছ থেকে সব শুনলো। স্পটটা দেখলো। টর্চ জ্বালিয়ে জিলানীর জীপের জানালার কাঁচ এবং জীপের ভেতরটা দেখল। কিন্তু ভেতরে গুলি খুঁজে পাওয়া গেল না।
‘গাড়ি কি চলতি অবস্থায় ছিল ?’ এসআই বাবুল জিজ্ঞেস করল।
‘না, ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়েছিল। গিয়ার নিউট্রালে ছিল। আমি আমার জানালাটা কেবল বন্ধ করেছি, তখনই কাণ্ডটা ঘটল।’ জিলানী বললেন।
‘তাহলে স্যার, এমন হতে পারে যে ড্রাইভার তার জালালটা তখনো বন্ধ করে নি। গুলিটা জানালা দিয়ে বাইরে চলে গেছে।’
‘সেটাও হতে পারে। আমি কায়েসকে জিজ্ঞেস করব। আপনি তো কায়েসকেও দেখতে যাবেন?’ জিলানী বললেন।
‘জি স্যার, যাব।’ এসআই বাবুল জবাবে বললেন।
জিলানী সাব ইন্সপেক্টরকে সেই সন্দিগ্ধ মোবাইল নাম্বারটা দিলেন পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। তারপর জিজ্ঞাসা সুরে বললেন, ‘ওসি সাহেব নিজেই আসবেন বলেছিলেন।’
‘স্যারকে বেশ বিজি দেখে এলাম।’ এসআই জানালেন।
জিলানী মন্তব্য করলেন, ‘ও, বিজি !’
সোহরাবকে হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে জিলানী বাসার দিকে রওয়ানা করলেন। পথে মোবাইলটা বেজে উঠল। তাঁর বন্ধু ধামরাই থানার ওসি’র ফোন। ধলেশ্বরী নদী থেকে উদ্ধারকৃত মহিলার ছবি পাঠানোর কথা রয়েছে। জিলানী ভাবলেন,ছবিটা যদি জেরিনের হয় তাহলে কালই তিনি পুবাইল ভবঘুরে পুনর্বাসন কেন্দ্রে যাবেন এবং জেরিনকে সাথে নিয়ে আসবেন।
‘হ্যালো, খবর কী দোস্ত ?’ জিলানী বললেন।
‘দোস্ত, ওসি মানিকগঞ্জ সদর রোজিনার, মানে সেই জীবিত উদ্ধারকৃত মহিলার ছবি আমার মোবাইলে পাঠিয়েছে। আমি তোমার হোয়াটস-অ্যাপে দিয়েছি। দেখেছ ?’
‘না। হোয়াটস অ্যাপে যাই নি। তুমি বললে, এখন দেখব।’
জিলানী গাড়ি চালাচ্ছেন। ভাবলেন, এ অবস্থায় দেখা ঠিক হবে না। বাসায় গিয়ে দেখবেন।
গাড়ি গ্যারেজে রেখে জিলানী উপরে উঠলেন। সাজিয়া দরজা খুললো। জিলানী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন, যেন কিছুই হয় নি!
‘তুমি ড্রয়িং রুমে ঢুকলে যে? ফ্রেশ হয়ে ডিনার সেরে নাও!’ সাজিয়া বলল।
‘জাস্ট এ মিনিট, মাই ডিয়ার!’ বলেই জিলানী খুশি খুশি তাঁর মোবাইলের হোয়াটস-অ্যাপে গেলেন। বন্ধুর পাঠানো ছবিটা দেখলেন।
দেখেই তাঁর মুখটা কালো হয়ে গেল!
[চলবে]
আরও পড়ুন :বিধ্বংসী প্রহর,পর্ব-১বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ৩বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৪বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৫বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৬বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৭বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৮বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৯বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ১০বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১১বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১২বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৩বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৪বিধ্বংসী প্রহর,পর্ব— ১৫বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৬বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৭বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৮বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ১৯বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২০বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব—২১বিধ্বংসী প্রহর,পর্ব—২২বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২৩বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব—২৪
Craft narratives that ignite inspiration, knowledge and entertainment.
Proudly powered by WordPress | Walker News Template by WalkerWP
